About Bangali.Network
About Bangali.Network
মাসিক সংখ্যা
লেখক–লেখিকা
লেখা পাঠান
আমাদের কথা
উদ্যোগ
Web Magazine
Contests


উদ্যোগ Web Magazine
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
মসনদ
দায়স্বীকার

লেখা, মতামত, মন্তব্য, বিশ্লেষণ, সাক্ষাৎকার বা অন্য যে কোনো প্রকাশিত লেখার সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সকল বক্তব্যের নৈতিক, তথ্যগত ও আইনগত দায় সম্পূর্ণভাবে তাঁদের উপরই বর্তায়। কোনো লেখা প্রকাশিত হওয়া মাত্রেই তা Bangali Network-এর সম্পাদকীয় অবস্থান, নীতি, মতাদর্শ, সমর্থন, অনুমোদন বা সরকারি মতামতের প্রতিফলন হিসেবে গণ্য করা যাবে না।

তথ্যভিত্তিক প্রবন্ধে ব্যবহৃত তথ্য, উদ্ধৃতি, অনুবাদ, পরিসংখ্যান, গবেষণা, শাস্ত্রীয় বা ঐতিহাসিক সূত্র, আইনগত বা বৈজ্ঞানিক তথ্য, বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা, সিদ্ধান্ত ও উপসংহারের যথার্থতা, নির্ভুলতা, পূর্ণতা, প্রাসঙ্গিকতা, বৈধতা ও হালনাগাদকরণের দায় সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকার। Bangali Network সম্পাদকীয় বিবেচনায় কোনো লেখা প্রকাশ, সম্পাদনা, সংক্ষিপ্তকরণ বা ভাষাগত সংশোধন করতে পারে; তবে এ ধরনের সম্পাদকীয় প্রক্রিয়াকে প্রকাশিত তথ্য, সূত্র, উদ্ধৃতি, বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা বা মতামতের সত্যতা, নির্ভুলতা, বৈধতা বা নির্ভরযোগ্যতার প্রত্যয়ন বা নিশ্চয়তা হিসেবে গণ্য করা যাবে না। এ-সংক্রান্ত কোনো দায় Bangali Network গ্রহণ করে না।

লেখক পরিচিতিতে প্রকাশিত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণের ভিত্তিতে প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ-সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

কোনো প্রকাশিত বিষয়বস্তুর কারণে কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সংস্থা বা গোষ্ঠীর আপত্তি, দাবি বা আইনগত প্রশ্ন উত্থাপিত হলে, প্রযোজ্য আইন অনুসারে তার দায় সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা বা সাক্ষাৎকারদাতার উপর বর্তাবে, যদি না আইন ভিন্নভাবে নির্ধারণ করে।

কোনো প্রকাশিত তথ্য বা দাবির যথার্থতা সম্পর্কে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণসহ আপত্তি উত্থাপিত হলে Bangali Network বিষয়টি সম্পাদকীয়ভাবে পর্যালোচনা করবে। পর্যালোচনায় তথ্যগত ভুল প্রমাণিত হলে, Bangali Network নিজস্ব সম্পাদকীয় বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট অংশ সংশোধন, অপসারণ, প্রত্যাহার বা প্রয়োজনীয় সম্পাদকীয় নোট সংযোজন করার অধিকার সংরক্ষণ করে।

দায়স্বীকার

লেখা, মতামত, মন্তব্য, বিশ্লেষণ, সাক্ষাৎকার বা অন্য যে কোনো প্রকাশিত লেখার সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সকল বক্তব্যের নৈতিক, তথ্যগত ও আইনগত দায় সম্পূর্ণভাবে তাঁদের উপরই বর্তায়। কোনো লেখা প্রকাশিত হওয়া মাত্রেই তা Bangali Network-এর সম্পাদকীয় অবস্থান, নীতি, মতাদর্শ, সমর্থন, অনুমোদন বা সরকারি মতামতের প্রতিফলন হিসেবে গণ্য করা যাবে না।

তথ্যভিত্তিক প্রবন্ধে ব্যবহৃত তথ্য, উদ্ধৃতি, অনুবাদ, পরিসংখ্যান, গবেষণা, শাস্ত্রীয় বা ঐতিহাসিক সূত্র, আইনগত বা বৈজ্ঞানিক তথ্য, বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা, সিদ্ধান্ত ও উপসংহারের যথার্থতা, নির্ভুলতা, পূর্ণতা, প্রাসঙ্গিকতা, বৈধতা ও হালনাগাদকরণের দায় সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকার। Bangali Network সম্পাদকীয় বিবেচনায় কোনো লেখা প্রকাশ, সম্পাদনা, সংক্ষিপ্তকরণ বা ভাষাগত সংশোধন করতে পারে; তবে এ ধরনের সম্পাদকীয় প্রক্রিয়াকে প্রকাশিত তথ্য, সূত্র, উদ্ধৃতি, বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা বা মতামতের সত্যতা, নির্ভুলতা, বৈধতা বা নির্ভরযোগ্যতার প্রত্যয়ন বা নিশ্চয়তা হিসেবে গণ্য করা যাবে না। এ-সংক্রান্ত কোনো দায় Bangali Network গ্রহণ করে না।

লেখক পরিচিতিতে প্রকাশিত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণের ভিত্তিতে প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ-সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

কোনো প্রকাশিত বিষয়বস্তুর কারণে কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সংস্থা বা গোষ্ঠীর আপত্তি, দাবি বা আইনগত প্রশ্ন উত্থাপিত হলে, প্রযোজ্য আইন অনুসারে তার দায় সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা বা সাক্ষাৎকারদাতার উপর বর্তাবে, যদি না আইন ভিন্নভাবে নির্ধারণ করে।

কোনো প্রকাশিত তথ্য বা দাবির যথার্থতা সম্পর্কে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণসহ আপত্তি উত্থাপিত হলে Bangali Network বিষয়টি সম্পাদকীয়ভাবে পর্যালোচনা করবে। পর্যালোচনায় তথ্যগত ভুল প্রমাণিত হলে, Bangali Network নিজস্ব সম্পাদকীয় বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট অংশ সংশোধন, অপসারণ, প্রত্যাহার বা প্রয়োজনীয় সম্পাদকীয় নোট সংযোজন করার অধিকার সংরক্ষণ করে।

মসনদ


চৈত্র মাস শেষ হওয়ার মুখে, সুবে বাংলার বাতাসে বসন্তের রেশটুকু নেই। তবে বিকেলে বেশ মনোরম হাওয়া দেয়। এই বিকেলের দিকেই মুর্শিদাবাদের খানদানি, রইস আদমিরা ভাগীরথীর বুকে নৌবিহারে বের হন। চকে বসে বেলফুলের পসরা, কোঠাগুলোতে শুরু হয় নূপুরের বোলের মিষ্টি আওয়াজ, সন্ধ্যায় হাওয়ায় ভাসতে থাকে সুরিলি গলায় গজল, হাভেলিগুলোতে জ্বলে আলো। মুর্শিদাবাদ তখন বড়ই রঙিন।

ইদানীং নিজামতের হাভেলিসহ তামাম মুর্শিদাবাদের রং যেন কেউ শুষে নিচ্ছে। কেউ নয় — ‘ডর’। কুড়ি বছর আগের বর্গী আক্রমণের ডর আবার ফিরে আসছে। হাওয়ায় গুজব ভাসছে, দিল্লির বাদশাহ শাহ আলম তাঁর সুদক্ষ সেনাপতি কামগড় খাঁকে নিয়ে মুর্শিদাবাদের দিকে এগিয়ে আসছেন। তাঁকে নাকি বর্ধমান, বাঁকুড়া, বীরভূমের রাজা ও কিছু জমিদার সাহায্য করছেন। আবার শিব ভট্টের হাত ধরে বর্গীরা নাকি এগিয়ে আসছে। মুর্শিদাবাদ এখন দিশেহারা। কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে, “নবাব মীরজাফর খান আক্রমণ রুখবার জন্য নবাবজাদা মীরণকে পাটনায় পাঠিয়েছেন কোম্পানির ফৌজের সঙ্গে, দামাদ মীরকাশিমকে কলকাতায় পাঠিয়েছেন কোম্পানির কাছে আরও সৈন্যের সাহায্য লাভের আশায়। আর নিজে নিজামতের কিছু ফৌজ নিয়ে তাঁবু গেড়েছেন কাটোয়ায়। তবে বুড়ো অথর্ব নবাব কি পারবেন সামান্য কিছু ফৌজ নিয়ে বাদশাহকে আটকাতে?” সুবে বাংলার আকাশে কালো মেঘের ঘনঘটা।

মণি বেগমের এই রাজনৈতিক ব্যাপার নিয়ে ভাবার কোনও ইচ্ছেই নেই। আজও ভাগীরথীতে তিনি তাঁর মকরমুখী বজরাটা নিয়ে ভ্রমণে বের হয়েছেন। দূর থেকে ভেসে আসা বাতাস নবাব বেগমের কোমল অঙ্গে জ্বালা ধরাচ্ছে। একটু লক্ষ করলে দেখা যাবে, মণি বেগমের খুবসুরত মুখে কালির ছোপ লেগেছে। বেহেস্তের গোলাপ যেন শুকিয়ে যাচ্ছে। হায়! নবাব বেগম ভয়ে-চিন্তায় কত রাত যে ঘুমান না।

মণি বেগম অস্থির হয়ে উঠছেন মাঝে মাঝে। আরামকেদারায় একবার বসছেন, একবার উঠছেন। ফরসির নলটা হাতে তুলে নিয়ে ভাবলেন, শিল্পী হয়ে থাকলেই বোধহয় ভালো ছিল। সিরাজের বিয়েতে মুজরো করতে এসে কেন যে প্রৌঢ় মীরজাফরের প্রেমের ফাঁদে ধরা দিলেন? আলিবর্দির সিপাহশালার সেনাপতি মীরজাফর যখন মণি বাঈয়ের ইশকে দিওয়ানা হয়ে উঠলেন, মণি বাঈ ভেবেছিলেন আর মুজরো করে জীবন কাটাতে হবে না, এবার একটু আরাম হবে।

কত খুন-জখম, বিশ্বাসঘাতকতার পথ পেরিয়ে মীরজাফর যখন নবাব হলেন, মণি বাঈ হলেন নবাব বেগম। শরিয়তি আইন মেনেই মীরজাফর নিকাহ করেছিলেন মণি বাঈকে। দুটো ফুটফুটে ছেলেও আছে — নজম আর সইফ। ফরসির নলটা মুখ থেকে সরিয়ে মণি বেগম ফিসফিস করে বললেন, “আহ্, আমার বেহেস্তের দুটো ফুল।”

দিওয়ানা আশিক মীরজাফরকে সামনে রেখে মণি বেগমের ইচ্ছেই ছিল সুবে বাংলা শাসন করার। তারপর তাঁর বালক পুত্ররা যখন লায়েক হবে, নবাব-বেগম থেকে মণি বেগম হবেন নবাবের মা। আহ্, সব স্বপ্ন মীরজাফর খান পা দিয়ে মাড়িয়ে শেষ করে দিলেন। মণি বেগম নবাব বেগম হলেও ক্ষমতা পেলেন না। যাবতীয় শাসনক্ষমতা প্রথম সন্তান মীরণের হাতে তুলে দিয়ে ইংরেজদের হাতের পুতুল মীরজাফর খান শরাব আর শবাবের মধ্যে ডুবে রইলেন। ঘেন্না, রাগে মুখটা বিকৃত করলেন নবাব বেগম।

আরামকেদারা থেকে উঠে পড়লেন মণি বেগম। আকাশে কেউ যেন লাল রং মাখিয়েছে, সেই লাল রং ভাগীরথীর বুকেও। লাল রঙের জল কেটে মণি বেগমের বজরা এগিয়ে চলেছে। “কিন্তু এটা কী লাল রং? না, এটা খুন। হ্যাঁ, এটা খুন।” চিৎকার করে ওঠেন মণি বেগম।

এটা সিরাজের খুন, মির্জা মেহেদি বলে নিষ্পাপ ফুটফুটে কিশোরটার খুন। এই খুনেই মিশবে তাঁর নজম আর সইফের খুন। মীরণ, লোভী, হিংস্র মীরণ কাউকে ছাড়বে না। মসনদের লোভ, ক্ষমতার লোভ বড় সাংঘাতিক। মীরণ তাই মণি বেগমের কলিজার দুটো টুকরোকে নিশ্চয়ই নির্মমভাবে খুন করবে। মণি বেগম মীরণের চোখে তাঁর নজম ও সইফের জন্য নফরত, খুন দেখেন দিনরাত।

একবার মির্জা মেহেদির রক্তে মাখা দেহটা চোখে ভেসে উঠল, কানে ভেসে এল চিৎকার, কান্নার আওয়াজ। “কে কাঁদে? সিরাজ? মির্জা মেহেদি? শরিফুন্নিসা?” ভয়ে নবাব বেগম তাঁর দুই কান বন্ধ করে চোখ বুজলেন।


জাফরগঞ্জে মীরজাফরের কবরের পাশ থেকে সরে এসে বাব্বু বেগম, তারপর মণি বেগমের কবরের পাশে দাঁড়ালেন শ্রাবণী, ইতিহাসের অধ্যাপিকা এবং লেখিকা। বহুবার মুর্শিদাবাদে এসেছেন, তবে এবার ইচ্ছে আছে পলাশীর যুদ্ধ এবং তারপর নবাব-বেগমদের জীবন, রাজনীতি নিয়ে একটা বড় উপন্যাস লেখার। মীরজাফরের কবরের সামনে আবারও এলেন। মনে মনে বললেন, “হায় রে বদনসিব, এত সাধের মসনদ ভোগ করতে পারলেন কই?”

ধীরে ধীরে মণি বেগমের কবরের দিকে এগোতে মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠল। চোখের সামনে থেকে মুছে গেল জাফরগঞ্জের কবরস্থান। মনে হল তিনি দাঁড়িয়ে আছেন ভাগীরথীর ঘাটে। সূর্য অস্ত গেছে, লাল রঙে মাখামাখি ভাগীরথীর জলে ধীরগতিতে ভেসে চলেছে মকরমুখী বজরা। সেখানে দাঁড়িয়ে সাদা পোশাক পরিহিত সুন্দরী রমণী, কানে দুটো হাত চাপা, চোখ দুটো বন্ধ।

“কে এই রমণী? মণি বেগম? এতটা বিভ্রম সম্ভব?”


“শ্রাবণী...” গুরুগম্ভীর এক স্বর ভেসে এল যেন বাতাসে ভর করে।

অসহায়ের মতো ইতিউতি তাকাচ্ছেন শ্রাবণী। বড় অন্ধকার চারপাশটা। নদীর জলের শব্দ আর ঝিঁঝিঁর শব্দ ছাড়া বিশ্বচরাচরে যেন আর কোনও শব্দই নেই। শ্রাবণী এখন নিজের নিশ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ শুনছেন...

আবারও শোনা গেল সেই গলা, “শ্রাবণী...”
ভীত এবং বিস্মিত গলায় শ্রাবণী বলে ওঠে, “কে? কে আপনি? আমি এখানে কীভাবে এলাম? আপনাকে দেখতে পাচ্ছি না কেন?”

“দাঁড়াও, দাঁড়াও, অত উতলা হওয়ার কিছু নেই। তোমার সঙ্গে একটু কথা বলব, তারপর তুমি জাফরগঞ্জে চলে যাবে। তবে তোমাকে সব সত্যি কথা বলতে হবে।”
“আমি কোনও কথাই বলব না। বুঝতে পারছি আমাকে বোধহয় হিপনোটাইজ করা হয়েছে। তাই আমি খানিক আগে মণি বেগমকে দেখেছি আর এখন ভরসন্ধ্যায় একা ভাগীরথীর তীরে দাঁড়িয়ে আছি — সেটা হ্যালুসিনেট করছি।” বেশ রাগত স্বরেই কথাগুলো শ্রাবণী শূন্যে ছুড়ে দেয়।

“হো হো হো...” উফ্, কী জোরে হাসির আওয়াজ! যেন গুরুগম্ভীর, রাগী মেঘের ডাক। শিরদাঁড়া বেয়ে একটা যে শীতল স্রোত নেমে গেল, বেশ বোঝা যায়।

“উফ্, তোমার তো খুব বুদ্ধি! এই বুদ্ধির জোরেই তো বসু ম্যানসন থেকে বসুদের যাবতীয় ‘রাজপাট’ তোমার, না?”

শ্রাবণীর হাঁটু দুটোর জোর যেন কমে এল। ধপ করে জলে ভেজা ঘাটের সিঁড়ির ওপর বসে পড়ে ও, ফিসফিস করে বলে, “কে আপনি?”
“সেটা জরুরি নয়। আগে বলো, তোমার বৌদি আর একমাত্র ভাইঝিকে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করলে কেন?”

শ্রাবণী টের পাচ্ছে, কিছু যেন অলৌকিক, রহস্যময় ঘটছে তার সঙ্গে। এই গলার স্বরের মালিক তার ব্যক্তিগত কথা জানে, সেটা কী করে সম্ভব? আবারও বিশ্বচরাচরজুড়ে সেই মেঘের মতো গম্ভীর গলার স্বরটা ভেসে ওঠে, “শুধু শুধুই আমি কে, সেটা নিয়ে ভাবছ। আগে বলো, তুমি অঙ্কিতা আর রাইকে বঞ্চিত করলে কেন?”

“শ্রাবণী, সময় নষ্ট কোরো না। তুমি যদি কথা না বলো কিংবা আমার প্রশ্নের সঠিক উত্তর না দাও, সারাজীবন কিন্তু এই নির্জন ভাগীরথীর ঘাটে থেকে যাবে আর কোনও দিনও নিজের সন্তানের কাছে ফিরতে পারবে না।” স্বর একটু থামে। ঝিঁঝিঁর শব্দ কখন বন্ধ হয়ে গেছে, প্রকৃতিও বুঝি আজ ভয় পেয়েছে।

স্বরটা আবার বেজে ওঠে, “তুমি তো জানো, অষ্টাদশ শতকে সিরাজ-আলিবর্দিরা চলে যাওয়ার পর সুবে বাংলা, মুর্শিদাবাদের হালত কেমন। তার ওপর তুমি সুন্দরী, তাই আজ রাতে নিজামতের সেনা কিংবা কোঠার দালাল বা কোনও ভবঘুরের ‘খাদ্য’ হয়ে যেতেই পারো। যা জানতে চাইছি, এখন তার উত্তর দাও, নাহলে অপেক্ষা করো নিজের করুণ পরিণতির জন্য।”

“না, না... আমি বাড়ি যাব, মামাইয়ের কাছে ফিরব। সব বলছি তোমাকে।” ঘাটের সিঁড়িতে উঠে দাঁড়ায় শ্রাবণী। আয়নায় নিজের সঙ্গেই কথা বলছে যেন, এইভাবে বলতে শুরু করে, “দাদা মারা যাওয়ার পর আমার মনে হয়েছিল, বৌদি কেন পাবে দাদার সম্পত্তি? তাই মায়ের ওপর চাপ দিয়ে, বুঝিয়ে উইলটা নতুন করে বানিয়ে ওই মা-মেয়েকে বঞ্চিত করি।”

আবারও সেই গুরুগম্ভীর স্বর ভেসে ওঠে, “তুমি কি জানতে না, তুমি ওদের সঙ্গে অন্যায় করছ?”
“না, আমি অন্যায় করিনি। অঙ্কিতা চাকরি করে, বিয়ে করতে পারে ভবিষ্যতে, তাহলে দাদার অংশটা পুরো বেদখল হয়ে যাবে।”
“তুমি তো শিক্ষিত, আইনটাও ভালোই জানো। তুমি বিনা কারণে রাইকে বঞ্চিত করলে কেন? ও তো তোমার দাদার উত্তরাধিকারী, তাই তো?”

“আ... আমি রাইকে বঞ্চিত করিনি তো। ওর নামে কিছু টাকা, ওষুধের দোকানের শেয়ারের কিছু অংশ, আর... আর কিছু গয়না তো থাকল।”

“কী বিশাল বড় মন তোমার! বসু ম্যানসনে তো ওদেরও অধিকার ছিল। আর গোপালের সেই পৈতৃক সোনার মুকুট, যার গায়ে দামি দামি পাথরের কারুকাজ, তোমার মায়ের সেই পান্নার চিক, সোনার দুটো বালা, রুবি আর বোধহয় চুনি দেওয়া সেইগুলোর কী হল? বারাসাতের ওই জমিটা মনে হয় তোমার দাদা কিনেছিল, না?”

কানে আঙুল দেয় শ্রাবণী, রাগ-হতাশায় কেঁদে ফেলে। একটু শান্ত হয়ে বলে, “ওই গয়নাগুলো আমার পছন্দ ছিল। তাছাড়া আমারও মামাই আছে। রাইয়ের যখন বিয়ে হবে ভবিষ্যতে, ওই জমি, গয়না তো অন্য পরিবারে চলে যাবে।”
“তোমারও তো মেয়ে, শ্রাবণী। তুমি নিজেও বিবাহিত মেয়ে। তোমার যুক্তি অনুযায়ী তোমার প্রাপ্ত আর ছিনিয়ে নেওয়া সব সম্পত্তি বেহাত হল বলে। ঠিক বলছি?”
“আ... আমি জানি না। বাড়ি যাব, মামাই...”


“ম্যাডাম, ম্যাডাম, দিদি, দিদি, শুনছেন...”

খালেদ দেখে, শ্রাবণী মণি বেগমের কবরের পাশে শুয়ে পড়েছে কীরকম অসহায়ভাবে। ব্যাগটা পড়ে রয়েছে অবহেলায়। ও জানে দিদির ব্যাগে জলের বোতলটা আছে। সবার সামনে ব্যাগে হাত দেওয়াই যায়... “একটু সরে যান, হাওয়া আসতে দিন,” বলতে বলতে জলের ঝাপটা দিতে থাকে ও।

ভেজা ওড়নাটা দিয়ে মুখের ওপর থাকা জলের বিন্দুগুলোকে আলগা হাতে মুছতে থাকে শ্রাবণী। জলের বোতলে অল্প জল রয়েছে। খালেদ বোতলটা এগিয়ে দেয়, “দিদি...”

বিদেশি পর্যটকরা সবাই শ্রাবণীকে দেখতে দেখতে যাচ্ছেন। শ্রাবণী ওই দলটার দিকে তাকিয়ে অপ্রস্তুত একটা ছোট্ট হাসি হেসে হাত নাড়ে।

পাশে দাঁড়িয়ে খালেদ, “দিদি, আপনি উঠতে পারবেন?”
“হ্যাঁ ভাই, আসলে আজ রোদটা চড়া ছিল। তার ওপর মনে হয় প্রেশারের ওষুধটা খাইনি। তাই বোধহয়...”

খালেদ একটু মুচকি হেসে বলে, “আপনি একটু বিশ্রাম নিয়ে আসুন, আমি টোটোর কাছে গেলাম।”

বাগানের বেঞ্চে একা বসে আছে শ্রাবণী। যুক্তিবাদী মন বলছে, যা ও দেখেছিল, শুনেছিল সব বিভ্রান্তি। এতদিনের অঙ্কিতা, রাই, দাদাকে নিয়ে স্ট্রেস, তার সঙ্গে নিজের কাজ, গরম — সবকিছুর জন্যই ব্ল্যাকআউটটা হয়েছিল। আর কিছু নয়।

মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা অন্য একটা মন বলে, তোমার দাদার পরিবারের সঙ্গে করা বেইমানিটার জন্য যে অপরাধবোধ, সেটাই আজ অবচেতনে দেখলে, শ্রাবণী। ওটা তোমার ‘অপরাধবোধ’ ছিল।

দীর্ঘশ্বাস উঠে আসে একটা...

একবার চোখ যায় মীরজাফরদের কবরগুলোর দিকে। মনে হল, ভেতর থেকে যেন কেউ বলে উঠল, “মসনদ, ক্ষমতা, সম্পত্তির লোভ যতদিন বেঁচে থাকবে, রক্তবীজের মতো মীরজাফর, মীরণ, মণি বেগম, শ্রাবণীরাও এই পৃথিবীতে ফিরে ফিরে আসবে।”




আপনার প্রতিক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’

এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন

প্রতিক্রিয়া দেওয়ার নিয়ম

আপনি এই সংখ্যায় আপনার পছন্দের সব লেখাতেই প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবেন। তবে একটি লেখায় সর্বোচ্চ ২টি ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেওয়া যাবে। একই লেখায় তৃতীয় প্রতিক্রিয়া নির্বাচন করলে, প্রথমে নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং নতুন প্রতিক্রিয়াটি গণ্য হবে। আপনার প্রতিটি প্রতিক্রিয়া লেখকদের অনুপ্রেরণা জোগায় এবং বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সৃজনশীলতার প্রতি আপনার সমর্থনকে তুলে ধরে।

আগামী সংখ্যার জন্য লেখা পাঠান

❛উদ্যোগ❜ ওয়েব ম্যাগাজিনের শারদ ১৪৩৩ সংখ্যাটি ৫ অক্টোবর ২০২৬ (১৭ই আশ্বিন) প্রকাশিত হবে। ওয়েবসাইটে প্রদত্ত লেখার বিভাগ ও বিষয় থেকে আপনার পছন্দের বিষয় বেছে নিয়ে লেখা পাঠান ২৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে। নির্বাচিত লেখাগুলি লেখক / লেখিকার ছবি ও সংক্ষিপ্ত পরিচিতিসহ প্রকাশিত হবে। লেখা পাঠানোর ফর্ম এবং অন্যান্য সকল তথ্যের জন্য অনুগ্রহ করে মেনুতে ‘লেখা পাঠান’ বিভাগটি দেখুন।

পৃষ্ঠা
ভালো লাগলে ভালোবাসা দিন
অপছন্দ হলে পরামর্শ দিন
মতামত জানাতে মন্তব্য করুন
0 0 ভোট
স্টার
guest
2 কমেন্ট
নতুন থেকে পুরোনো
পুরোনো থেকে নতুন ভোটসংখ্যা অনুসারে
ফেসবুক পেজ
Udyog Bengali Web Magazine by Bangali Network

বিভিন্ন বিষয় থেকে বেছে নিয়ে লেখা পড়ুন

    বিভিন্ন সংখ্যায় প্রকাশিত হওয়া লেখা পড়ুন

    মাসিক সংখ্যাগুলি দেখুন
    Scroll to Top

    ‘উদ্যোগ’ ফোনে রাখুন

    ‘উদ্যোগ’ ওয়েব ম্যাগাজিন ইনস্টল করুন। ইনস্টলের পর অ্যাপ তালিকা থেকে আইকনটি হোমস্ক্রিনে যোগ করে নিতে পারেন। এরপর সহজেই পড়ুন আপনার প্রিয় ম্যাগাজিন। ভালো না লাগলে যেকোনো সময় এক ক্লিকে আনইনস্টল করতে পারবেন।