পরীক্ষার খাতার ওপর ঝুঁকে থাকা সেই গোঁড়া, অহংকারী অধ্যাপক হয়তো সেদিন মনে মনে হেসেছিলেন। আর মাত্র একটা নম্বর পেলেই মেয়েটা এমবি (MB) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে যেত। কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক অহংকারে আঘাত লেগেছিল। মাত্র এক নম্বরের জন্য প্র্যাক্টিকালে ফেল করিয়ে দেওয়া হলো কাদম্বিনী গাঙ্গুলীকে। উদ্দেশ্য যেন ছিল পরিষ্কার — মেয়েরা আবার ডাক্তার কিসের?
কিন্তু ওই এক নম্বরের দেওয়াল তুলে কাদম্বিনীর মতো ইস্পাত-কঠিন জেদকে আটকে রাখা যায়নি। ১৮৮৬ সালে তাঁকে ‘জিবিএমসি’ (Graduate of Bengal Medical College) ডিগ্রি প্রদান করা হয়, যার ভিত্তিতে তিনি পাশ্চাত্য চিকিৎসাবিদ্যায় পেশাগতভাবে কাজ করার অধিকার লাভ করেন। আর এই জেদের পেছনে পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন তাঁর স্বামী, প্রখ্যাত সমাজসংস্কারক দ্বারকানাথ গাঙ্গুলী।
১৮৬১ সালের ১৮ জুলাই ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির ভাগলপুরে (বর্তমান বিহার) এক বাঙালি কুলীন কায়স্থ পরিবারে কাদম্বিনী বসুর (পরে গাঙ্গুলী) জন্ম। তাঁদের আদি নিবাস ছিল বরিশালের চাঁদশী গ্রামে, যা বর্তমানে বাংলাদেশের অন্তর্গত। তাঁর বাবা ব্রজকিশোর বসু ছিলেন ভাগলপুর স্কুলের প্রধান শিক্ষক এবং ব্রাহ্ম সমাজের একজন বিশিষ্ট সমাজসংস্কারক। নারীশিক্ষা ও নারীমুক্তির প্রসারে তিনি অভয়চরণ মল্লিকের সঙ্গে ১৮৬৩ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘ভাগলপুর মহিলা সমিতি’, যা ভারতের প্রথমদিকের নারী সংগঠনগুলির অন্যতম।
কাদম্বিনীর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সূচনা হয় ঢাকার ব্রাহ্ম ইডেন ফিমেল স্কুলে। এর পরে তিনি ভর্তি হন কলকাতার হিন্দু মহিলা বিদ্যালয়ে, যার নাম ১৮৭৬ সালে পরিবর্তন করে বঙ্গ মহিলা বিদ্যালয় রাখা হয়। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগ, যখন মেয়েদের অক্ষরজ্ঞান হওয়াই এক বিরাট চ্যালেঞ্জ ছিল, সেই দমবন্ধ করা সমাজকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রথম মহিলা হিসেবে ইতিহাস সৃষ্টি করেন। ১৮৮৩ সালে ভারতের প্রথম মহিলা স্নাতক (বি.এ) হওয়ার ঐতিহাসিক গৌরব অর্জন করেন কাদম্বিনী ও তাঁর বেথুন কলেজের সহপাঠিনী চন্দ্রমুখী।
চন্দ্রমুখী বসুর জন্ম তৎকালীন অবিভক্ত ভারতের দেরাদুনের এক খ্রিস্টান পরিবারে। ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি শিক্ষার জগতেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ১৮৮৪ সালে তিনি বেথুন কলেজে লেকচারার হিসেবে যোগ দেন এবং ১৮৮৮ সালে কলেজের প্রিন্সিপাল বা অধ্যক্ষা নিযুক্ত হন। তাঁর নিরলস প্রচেষ্টায় বেথুন কলেজ ভারতের নারী শিক্ষার অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। শুধু ভারতেরই নন, সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম মহিলা কলেজ-অধ্যক্ষা ছিলেন চন্দ্রমুখী বসু। তাঁর অনন্য জীবনসংগ্রাম ও অবদান নিয়ে ‘স্পটলাইটে বাঙালি’-র কোনো এক ভবিষ্যৎ পর্বে আলাদা করে ফিরে আসব।
চন্দ্রমুখী শিক্ষার জগতে গেলেও, কাদম্বিনী চাইলেন চিকিৎসাশাস্ত্রে আসতে। তৎকালীন কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের দরজা নারীদের জন্য সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল। সেখানে তাঁর ভর্তি নিশ্চিত করতে দ্বারকানাথ গাঙ্গুলীকে তৎকালীন সমাজ, প্রশাসন ও ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে এক দীর্ঘ আইনি ও সামাজিক লড়াই লড়তে হয়েছিল।
এখানে ভারতের চিকিৎসা ইতিহাসের আরেকটি অনন্য অধ্যায় উল্লেখ করা জরুরি। কাদম্বিনী যখন বাংলায় লড়াই করছেন, ঠিক একই সময়ে দেশের আরেক মহীয়সী নারী, মহারাষ্ট্রের আনন্দীবাই জোশী, আমেরিকার ‘ওমেন্স মেডিক্যাল কলেজ অব পেনসিলভেনিয়া’ থেকে চিকিৎসাবিদ্যায় ডিগ্রি অর্জনের জন্য লড়াই করছিলেন। কাদম্বিনীর মতোই আনন্দীবাইয়ের ডাক্তার হয়ে ওঠার পেছনেও তাঁর স্বামী গোপালরাও জোশির অটল ভূমিকা ছিল।
আনন্দীবাইয়ের মাত্র ৯ বছর বয়সে বিয়ে হয় এবং ১৪ বছর বয়সে তিনি একটি সন্তান প্রসব করেন। শিশুটি চিকিৎসার অভাবে মাত্র দশ দিন বেঁচে ছিল। সন্তানহারানোর সেই শোকই আনন্দীবাইকে ডাক্তার হওয়ার অনুপ্রেরণা যোগায়। মহারাষ্ট্রের মিশনারি স্কুলে ভর্তি করতে না পেরে গোপালরাও স্ত্রীকে কলকাতায় নিয়ে আসেন এবং এখানেই আনন্দীবাইয়ের প্রথাগত ইংরেজি শিক্ষা শুরু হয়েছিল। এরপর নানা সামাজিক ও আর্থিক বাধা পেরিয়ে তিনি একা আমেরিকায় পাড়ি জমান।
আনন্দীবাই জোশীই ছিলেন প্রথম ভারতীয় নারী যিনি পাশ্চাত্য চিকিৎসাবিদ্যায় ডিগ্রি (MD) লাভ করেন। ১৮৮৬ সালের ১১ই মার্চ তিনি ডিগ্রি পান। এর মাস চারেক পর, ১৮৮৬ সালের জুলাই মাসে কাদম্বিনী গাঙ্গুলী ভারতের মাটিতে চিকিৎসাবিদ্যায় ডিগ্রি (GBMC) অর্জনকারী প্রথম নারী হন।
চিকিৎসকের ডিগ্রি পেলেও আনন্দীবাই ভারতে এসে প্র্যাকটিস শুরু করতে পারেননি। চরম দুর্ভাগ্যজনকভাবে ১৮৮৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মাত্র ২১ বছর বয়সে তিনি যক্ষ্ম রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। তবে তাঁর স্মৃতিকে মারাঠিরা সসম্মানে ও সগৌরবে লালন করেছে। তাই আজ তিনি শুধু মহারাষ্ট্রের নন, সমগ্র ভারতের গর্বের প্রতীক। অথচ বাঙালি সমাজ কাদম্বিনীকে বিস্মৃতির অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছে, যা অত্যন্ত লজ্জার।
মেডিক্যাল কলেজ থেকে পাস করার পরেও বৈষম্য থামেনি। লেডি ডাফরিন হাসপাতালে যখন তিনি প্র্যাকটিস শুরু করলেন, দেখলেন শ্বেতাঙ্গ ডাক্তারদের তুলনায় তাঁকে কম মর্যাদা দেওয়া হচ্ছে; একজন পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসকের বদলে তাঁকে ‘মেডিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট’ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। কাদম্বিনী এই বৈষম্য মেনে নেননি। ১৮৯২ সালে, আট ছেলেমেয়ের ভরা সংসার সামলে তিনি একাই বিলেত পাড়ি জমান। মাত্র এক বছরের মধ্যে এডিনবরার রয়্যাল কলেজ অব ফিজিশিয়ান্স ও রয়্যাল কলেজ অব সার্জনস এবং গ্লাসগোর ফ্যাকাল্টি অব ফিজিশিয়ান্স অ্যান্ড সার্জনস থেকে ‘ট্রিপল কোয়ালিফিকেশন’ (LRCP, LRCS ও LFPSG) অর্জন করে দেশে ফেরেন।
কাদম্বিনী গাঙ্গুলীই ছিলেন দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম ‘প্র্যাকটিসিং’ মহিলা চিকিৎসক। তবে তিনি শুধু অপারেশন থিয়েটার আর চেম্বারেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না। ১৮৮৯ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের পঞ্চম অধিবেশনে যোগ দেওয়া প্রথম ছয়জন মহিলা প্রতিনিধির তিনি ছিলেন অন্যতম এবং ১৮৯০ সালের অধিবেশনে তিনিই ছিলেন কংগ্রেসের মঞ্চে দাঁড়ানো ইতিহাসের প্রথম মহিলা বক্তা। এছাড়া বিহার ও ওড়িশার কয়লা খনির মহিলা শ্রমিকদের ওপর চলা অমানুষিক নির্যাতনের বিরুদ্ধেও তিনি নিজে বুক চিতিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করেছিলেন এবং খনিগর্ভে নেমে শ্রমিকদের দুরবস্থা প্রত্যক্ষ করেছিলেন।
নারী অধিকারের দাবিতে সোচ্চার হওয়ার কারণে রক্ষণশীল ‘বঙ্গবাসী’ পত্রিকায় তাঁকে ‘বেশ্যা’ বলে কুরুচিকর আক্রমণ করা হয়। দ্বারকানাথ গাঙ্গুলী এই নোংরামিকে আদালত পর্যন্ত টেনে নিয়ে যান এবং বিচারে সম্পাদক মহেশচন্দ্র পালের ছয় মাসের কারাদণ্ড ও ১০০ টাকা জরিমানা ধার্য হয়। শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও সমাজের একাংশের মানসিকতায় খুব বেশি পরিবর্তন ঘটেনি। আজও স্বাধীনচেতা ও আধুনিকমনস্ক নারীদের উদ্দেশে অনেকেই একই ধরনের কুৎসিত তকমা ছুড়ে দেয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় কমেন্ট করতে গিয়ে এমন ভাষা ব্যবহার যে আসলে নিজের কদর্য মানসিকতারই পরিচয় দেয়, তা অনেকে অনুধাবনই করেন না। আর কাদম্বিনীর জীবদ্দশায় তো নারীরা পুরুষের করুণার পাত্রী হিসেবেই বিবেচিত হতেন। কিন্তু কাদম্বিনী কারোর করুণার পাত্রী ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন রূঢ় বাস্তববাদী যোদ্ধা।
অস্ত্রোপচার শেষ করে বাড়ি ফেরার পর সেই দিনই এই মহীয়সী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। আজ যদি বাঙালি সমাজ নিজের উদাসীনতায় এই গৌরবময় ইতিহাসকে বিস্মৃতির অন্ধকারে ঠেলে দেয়, তবে তা হবে আমাদের জাতীয় চরিত্রের এক চরম দেউলিয়াপনা।