বিজয়ী
প্রবীর কুমার চৌধুরী
অষ্টমীর দিন সকালবেলায় বাবার সঙ্গে লেগে গেল অয়নের। একটু আগেই প্রোমোটার এসেছিলেন কাগজপত্র নিয়ে সই-সাবুদ করানোর জন্য। কিন্তু বাবা মলয়বাবুর একটাই কথা, "এ বাড়ি, জায়গাজমি কিছুই আজ আর আমার নয়। আমি সই করতে পারি না।"
অয়ন হাজার চেষ্টা করেও যখন আসল সত্য বের করতে পারল না, তখন ছেলে আর ছেলের বউ সিদ্ধান্ত নিল বাবাকে বাড়ি থেকে বের করে দেবে।
দশ কাঠা জমির ওপর পেল্লায় বাড়িটা বিক্রির কথা আজ ছয় মাস ধরেই চলছিল। কিন্তু মলয়বাবুর ধনুর্ভাঙা পণ, তাঁর মৃত্যুর আগে এ বাড়ি বিক্রি করা চলবে না। দুই কোটি টাকা মূল্য নির্ধারণ হয়েছে। আজ তাঁকে জোর করে সই করানোর ব্যবস্থাও হয়েছিল। কিন্তু আজ তাও ব্যর্থ হল।
মলয়বাবুর জিনিসপত্র একটা ট্রলিতে ভরা হল। কিছু খাইয়েও দেওয়া হল। যখন ক্যাব এল তাঁকে নিতে, তিনি তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বললেন, "তোমাদের ক্ষমতাই নেই আমায় তাড়ানোর। একটু বাদেই তোমাদের চলে যেতে হবে এ বাড়ি ছেড়ে। সব জিনিসপত্র গুছিয়ে নাও।"
ছেলে অবাক হল বাবার কথায়।
ঘণ্টা দুয়েক পরেই একটি নামকরা মিশনের গাড়ি এসে থামল বাড়ির সামনে। সঙ্গে পুলিশের ভ্যান। এক গেরুয়াবসনধারী দিব্যকান্তি মহারাজ এসে বললেন, "আইনমতে এ সম্পত্তি আশ্রমের। মলয়বাবু ছাড়া আজ থেকে এ বাড়িতে অন্য কেউ থাকতে পারবেন না। আজ থেকে আমরা এ বাড়ির স্বত্ব গ্রহণ করলাম।"
বৃদ্ধ মলয়বাবুর মুখে বিজয়ীর হাসি ফুটে উঠল।
নেশার রোজনামচা
কৃশানু মিত্র
মনসা পূজায় উপোস দিয়েছিল বুধিয়া। ঝাপান মেলার আজ শেষ দিন। পূজা সেরে মুড়ি-আলু খাবে বুধিয়া। প্রসাদ আনবে বর চণ্ডীর জন্য। লখাকে দেবে বুকের দুধ।
চণ্ডী রাজবংশী। সাপের বিষ থেকে নেশাদ্রব্য তৈরি করে বেচে। বুধিয়া ভাবে, শহর থেকে বাবুরা ঝাপান মেলা দেখতে আসে। কোথায় সাপ খেলা দেখিয়ে দু'পয়সার রোজগার করবে, তা নয়, সকাল থেকেই চণ্ডী নেশা করে উদোম হয়ে পড়ে আছে।
পুজোর দিন বুধিয়া রাগ-ঝগড়া করেনি, কারণ বুধিয়া মনসা মায়ের পূজার আচার-আচরণে ত্রুটি মানতে পারবে না। ইদানীং চণ্ডী, বুধিয়ার রণমূর্তি দেখছে। লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের আশায় বুধিয়ার মনে বল এসেছে। কাজকাম বন্ধ করে নেশা করলে চণ্ডীর ভাগ্যে জুটছে গোবরডাঙা।
সে ঘরদোর গুছিয়ে আচ্ছন্ন চণ্ডীকে বলে যায়, সে যেন ঘুমন্ত লখার দেখভাল করে। পূজাপাঠ সেরে, বাবুদের বাড়ি ঘুরে প্রসাদ নিয়ে বুধিয়া ঘরপানে যাত্রা করে। তার গলায় বাবুদের মনসাপালার গান — "জয় জয় মা মনসা।" মন ফুরফুরে।
ঘরের দাওয়ায় পা দেওয়ার আগেই সে পুত্র লখাইয়ের আকুল কান্না শুনতে পায়। চণ্ডী তখনও নেশায় বুঁদ হয়ে ঘরের বাইরে চোখ বুজে পড়ে আছে। কান্নার তীব্রতায় বুধিয়ার মাথায় রক্ত চড়ে যায়। উনুনের পোড়া কাঠ তখনও শিশিরভেজা স্যাঁতস্যাঁতে। রণচণ্ডী বুধিয়া চ্যালাকাঠ হাতে তুলে নেয়। উত্তম-মধ্যম পড়তে থাকে চণ্ডীর শরীরে। মারের প্রচণ্ডতায় চণ্ডীর নেশা ছুটে যাওয়ার জোগাড়। তড়াক করে লাফিয়ে উঠে মার থেকে নিস্তার পেতে সে ঘরে ঢুকে পড়ে। যেখানে লখা খাটিয়ার কিনারে এসে চিৎকার করছে।
মানসী ফেসবুকে বুঁদ হয়ে "বুধিয়ার মনসা মা" পালা দেখছে। ছেলে রুদ্র বারবার মানসীর হাত টেনে ধরছে। বিরক্ত মানসী রুদ্রর মাথায় হাত বুলিয়ে কাছে টেনে নেয়। রুদ্র মায়ের আদর পেয়ে মোবাইলটা নিজের হাতে নিয়ে শান্ত হয়। সে যেন মোবাইল স্ট্যান্ড। মাকে এখন সে রিল দেখতে সাহায্য করছে। সে জানে, রিল শেষ হলেই মোবাইলের দখল তার।
সাপের বিষ থেকে তৈরি নেশার বোতল খাটিয়ার নিচে রাখা আছে। নেশার ঘোরে চণ্ডী কোনোরকমে বোতল খুলে আন্দাজমতো ঘুমপাড়ানি সাপের বিষ চালিয়ে দেয় লখাইয়ের পেটে। কান্না থেমে আসে। লখাই এখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।
বুধিয়া চিৎকার করে বলে ওঠে, "হা মনসা মা!"
স্মৃতির পুনর্জন্ম
কালপুরুষ
অনেক দিন পর চিলেকোঠার বন্ধ দরজাটা খুললাম। সঙ্গে সঙ্গে একরাশ ধুলো, আর তার সঙ্গে ভেসে এল ছোটবেলার বিবর্ণ, অথচ ভুলতে না-দেওয়ার জেদ ধরে বসে থাকা দুষ্টু-মিষ্টি স্মৃতিগুলো।
স্মৃতির টানে ধুলো আর মাকড়সার জাল সরাতে সরাতে এসে দাঁড়ালাম ছোট্ট জানলাটার কাছে। বয়সের ভারে সেও আমার মতোই কোনোরকমে অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে, আর চিলেকোঠার সম্মান বাঁচিয়ে চলেছে।
ছিটকিনিটা খুলতে একটু কসরত করতে হল। মনে হল, আমার ওপর তার বেশ অভিমান জমে আছে। আর হবে না-ই বা কেন? প্রায় বিশ বছর পর যে এসেছি তার সঙ্গে দেখা করতে!
জানলাটা খুলে দিলাম। সঙ্গে সঙ্গে তাজা বাতাসের এক স্রোত হুড়মুড় করে ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ল। মনে হল, এই বুঝি আমার কান দুটো মলে দিয়ে এত দিনের জমে থাকা অভিমান আর দুষ্টুমির হিসাব চুকিয়ে নেবে।
খোলা জানালার দিকে তাকিয়ে মধুর স্মৃতিতে বিলীন হয়ে গেলাম। হঠাৎ একটি আকস্মিক শব্দে থমকে গেল আমার মধুর স্বপ্নযাত্রা। পিছনে ফিরে দেখি, বহু পুরোনো ধুলো-মাখা একটি বই টেবিল থেকে হাওয়ার টানে মাটিতে পড়ে গেছে।
বইটা হাতে নিলাম। ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে হঠাৎ কী যেন একটা ছোট খাম বইয়ের ফাঁক গলে আমার পায়ের কাছে এসে পড়ল। খামটা খুললাম, আর যা অনুভব করলাম — তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।
মনে হল, অদ্ভুত এক ভালো লাগা আর ভালোবাসার সঙ্গে একরাশ হতাশা ও রাগের মরণপণ যুদ্ধ শুরু হয়েছে মনের ভেতর। তবে শেষ পর্যন্ত জয় হল হতাশারই। কারণ, ততক্ষণে চোখের কোণ ভিজে উঠেছে জলে।
মনকে বললাম, "কেন এত বছর পরে আবার তার কাছে আমাকে ফিরিয়ে আনলে? আমি তো বহু বছর আগেই নিয়তির কাছে হার মেনে নিয়েছিলাম।"
চোখের জলের এক ফোঁটা ওর ছবিটার ওপর গিয়ে পড়ল। ছবিটা ঝাপসা হয়ে এল, ঠিক যেমন ঝাপসা হয়ে গিয়েছিল আমাদের অসমাপ্ত গল্পটা।
ও — আমার হারিয়ে যাওয়া প্রথম প্রেম!