কম্যুনিস্ট পার্টির একনিষ্ঠ কর্মী, অথচ নিজের দলেরই কাজের ধরন আর তত্ত্বের ফাঁকফোকর নিয়ে প্রশ্ন তোলায় দল থেকে সোজা সাসপেন্ড! হ্যাঁ, বাদল সরকারের থিয়েটার জীবন নিয়ে কথা বলতে গেলে এই অদ্ভুত সত্যটা দিয়ে শুরু করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। তিনি আজীবন বামপন্থী ভাবধারায় বিশ্বাসী ছিলেন, কিন্তু কোনোদিনই অন্ধ অনুগামী হতে পারেননি। আর এই যে কোনো বাঁধাধরা কাঠামোর বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানোর জেদ, এটাই পরে জন্ম দিয়েছিল ভারতের বুক কাঁপানো এক আন্দোলনের — যার নাম ‘ফ্রি থিয়েটার’ বা ‘থার্ড থিয়েটার’।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে নাটক মানেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে চড়া দামের টিকিট, বড় বড় অডিটোরিয়ামের এসি হল, ঝকঝকে আলো আর বিশাল সব সেট। বাদল সরকার এই পুরো বিলাসবহুল বাবু কালচারটাকে লাথি মেরে ভেঙে দিয়েছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, নাটক কোনো ড্রয়িংরুমের শৌখিন জিনিস নয়, নাটক হলো মানুষের প্রতিবাদের ভাষা। আর সেই ভাষাকে অডিটোরিয়ামের চার দেয়াল থেকে মুক্ত করে তিনি নিয়ে এলেন কার্জন পার্কের খোলা চত্বরে, কলেজের ঘাসের লনে, কিংবা অজ পাড়াগাঁয়ের কোনো ধুলো ওড়া তেমাথায়।
এই ফ্রি থিয়েটারের সবচেয়ে বড় মজাটা ছিল এর অর্থনৈতিক স্বাধীনতায়। বাদল সরকারের নাটক দেখতে কোনো টিকিট লাগত না। নাটক শেষ হলে অভিনেতারা দর্শকদের মাঝখান দিয়ে একটা চাদর মেলে ধরে হেঁটে যেতেন। যে যা খুশি দিত — কেউ একটা কয়েন, কেউ একটা পাঁচ টাকার নোট। বাদল বাবু এটাকে অনুদান বা দয়া বলতেন না, বলতেন ‘পার্টিসিপেটরি টোকেন’। অর্থাৎ, আপনি নাটকটা দেখলেন, আপনার ভালো লাগল, তাই আপনি এই যজ্ঞের অংশীদার হলেন। কর্পোরেট স্পন্সর বা সরকারি অনুদানের তোয়াক্কা না করে, পুরোপুরি জনগণের পয়সায় নাটক করার এই যে ক্ষমতা, এটাই ছিল তাঁর থার্ড থিয়েটারের আসল জোর।
থিয়েটারের এই খ্যাপাটে মানুষটার ব্যাকগ্রাউন্ড কিন্তু মারাত্মক রকমের কর্পোরেট ও টেকনিক্যাল। তিনি ছিলেন শিবপুর বি.ই. কলেজের (আজকের IIEST) তুখোড় সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। চাকরি জীবনটাও ছিল বেশ জমকালো। দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশন (DVC)-এর টাউন প্ল্যানার হিসেবে কাজ করেছেন মাইথনে। এরপর সরকারের টাউন প্ল্যানিংয়ের চাকরি নিয়ে চলে যান সুদূর ইংল্যান্ড আর নাইজেরিয়ায়। পরে কলকাতায় ফিরেও দীর্ঘ সময় ক্যালকাটা মেট্রোপলিটন প্ল্যানিং অর্গানাইজেশন (CMPO)-র মতো বড় জায়গায় মোটা মাইনের চাকরি করেছেন। ১৯৭৭ সালে এসে তবেই তিনি পাকাপাকিভাবে চাকরি ছাড়েন।
মজার বিষয় হলো, নাইজেরিয়ায় যখন তিনি টাউন প্ল্যানিংয়ের ব্লুপ্রিন্ট বানাচ্ছেন, তখন তাঁর মনের মধ্যে ঘুরছিল কলকাতার মধ্যবিত্ত সমাজের অস্তিত্বের সংকট। আর সেই সুদূর আফ্রিকায় বসেই তিনি লিখে ফেললেন বাংলা নাটকের এক অবিস্মরণীয় মাইলস্টোন — ‘এবং ইন্দ্রজিৎ’। কলকাতার একঘেয়ে, লক্ষ্যহীন ছকবাঁধা যুবসমাজের যে চরম হতাশা ও একাকীত্ব, তা তিনি নাইজেরিয়ার নির্জনতায় বসে নিখুঁতভাবে কাগজের পাতায় ফুটিয়ে তুলেছিলেন।
বাদল সরকার চিরকালই একজন জাত বিদ্রোহী বা রেবেল ছিলেন। তাঁর এই দ্রোহটা শুধু গল্পে বা সংলাপে ছিল না, ছিল তাঁর নাটকের ফর্মে। যেমন তাঁর বিখ্যাত নাটক ‘মিছিল’-এর কথাই ধরা যাক। এখানে সাধারণ থিয়েটারের মতো দর্শকরা সামনে বসে আর অভিনেতারা স্টেজে অ্যাক্টিং করে — এমনটা ছিল না। তিনি বসার আসনগুলো এমন গোলকধাঁধার মতো করে সাজাতেন যে, দর্শকরা একে অপরের দিকে পিঠ করে বসতেন। আর অভিনেতারা সেই দর্শকদের বসার ফাঁক ফোকর দিয়ে, গলি দিয়ে স্লোগান দিতে দিতে দৌড়াতেন। দর্শকদের মনে হতো তাঁরা নিজেরাও যেন কলকাতার কোনো উত্তাল রাজনৈতিক মিছিলের মাঝখানে ফেঁসে গেছেন!
এমনকি মণিপুরি থিয়েটারকেও তিনি বদলে দিয়েছিলেন এই রেবেল ফর্ম দিয়ে। পোল্যান্ডের বিখ্যাত নাট্যব্যক্তিত্ব জের্জি গ্রোটোভস্কির ‘প্যোর থিয়েটার’ বা শরীরী অভিনয়ের যে চল, সেটা বাদল সরকারই প্রথম ইম্ফলে গিয়ে সেখানকার তরুণ নাট্যকর্মীদের মধ্যে ছড়িয়ে দেন। চড়া মেকআপ বা জমকালো কস্টিউম ছাড়াও যে শুধু শরীরের ভাষায় থিয়েটারে আগুন জ্বালানো যায়, সেটা তিনি প্রমাণ করেছিলেন।
আসলে বাদল সরকার কোনোদিন খবরের শিরোনাম বা সস্তার জনপ্রিয়তার পেছনে দৌড়াননি। একজন সফল এবং উচ্চশিক্ষিত সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হয়েও তিনি বেছে নিয়েছিলেন রাস্তার ধুলোবালি। ২০১১ সালের ১৩ই মে, পঁচাশি বছর বয়সে কলকাতায় নিজের বাড়িতেই কোলন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন এই কিংবদন্তি। আমৃত্যু ক্ষমতার অলিন্দের বিরুদ্ধে গিয়ে, চাদর পেতে সাধারণ মানুষের ভালোবাসায় নিজের থিয়েটারকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন এই চিরবিদ্রোহী মানুষটা।
আপনার প্রতিক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
প্রতিক্রিয়া দেওয়ার নিয়ম
আপনি এই সংখ্যায় আপনার পছন্দের সব লেখাতেই প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবেন। তবে একটি লেখায় সর্বোচ্চ ২টি ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেওয়া যাবে। একই লেখায় তৃতীয় প্রতিক্রিয়া নির্বাচন করলে, প্রথমে নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং নতুন প্রতিক্রিয়াটি গণ্য হবে। আপনার প্রতিটি প্রতিক্রিয়া লেখকদের অনুপ্রেরণা জোগায় এবং বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সৃজনশীলতার প্রতি আপনার সমর্থনকে তুলে ধরে।