১
ভাইঝির বিয়ের উপলক্ষে রাণীবালা আজ বাপের বাড়িতে পা দিলেন। সেই এসেছিলেন পনেরো বছর আগে দাদার কাজে। এরপর আর ইচ্ছাই যায়নি লাহিড়ী বাড়িতে পা দিতে। রাণীবালার ছেলে-মেয়ে এসেছে মামীর কাছে, বোন ইরা খবর এনে দিয়েছেন একমাত্র আদরের ভাইঝি দীপশিখার। দীপশিখা কৃষ্ণনগরে ছুটে গিয়ে বড় পিসির গলা জড়িয়ে অভিমান করেছে। কিন্তু রাণীবালা কিছুতেই পারেননি লাহিড়ী বাড়ির চৌকাঠ ডিঙাতে। খালি ভেবে গেছেন, ছোটবেলাটা, কিশোরীবেলাটা ওই দোতলা বাড়ির ছাদে বা বাড়ির আনাচেকানাচে কোথাও রাখা আছে। পা দিলেই হাওয়াতে মিশে যাবে বুঝি, দাদার মতো, অথবা মা-কাকিমার মতো ধুলো-মাটি হয়ে যাবে।
তবে এইবার আসতেই হলো, আদরের দীপশিখার মুখ চেয়ে। একমাত্র ভাইঝির আইবুড়ো ভাত আজ। দাদা যখন অসময়ে খেলাঘরটা ভেঙে দিয়ে চলে যায়, এই মেয়েটার বয়স ছিল মাত্র বারো। পিসতুতো দাদা-দিদিদের থেকে কত ছোট, কত আদরের! তবু মেয়েটার মুখ চেয়েও পারেননি এই লাহিড়ী বাড়িতে পা দিতে। এইজন্য অবশ্য রাণীবালার কোনো আফসোস নেই।
২
পৈতৃক বাড়িটি তৈরি হয়েছিল চল্লিশের দশকে। রাণীবালার ঠাকুরদাদা ঈশ্বর কেশব চন্দ্র লাহিড়ী মহাশয় একজন নামী হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার ছিলেন। তাঁর ওষুধ ডেকে কথা বলত। পসার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে একটা নিজস্ব ভদ্রাসনের প্রয়োজন বোধ করেন এবং তৈরি হয় এই "লাহিড়ী নিবাস"। রাণীবালার মন্দির — এইভাবেই রাণীবালাকে ভাবতে শিখিয়েছিলেন তাঁর মা পূর্ণিমা দেবী।
অসম্ভব শ্রদ্ধা করতেন নিজের শ্বশুরবাড়ি এবং স্বামীকে। রেলের ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন রাণীবালার বাবা দীপেন্দ্রনাথ লাহিড়ী, যার চাকরিজীবনের বেশির ভাগ সময়টাই বাইরেই কাটে। পূর্ণিমা দেবীকে নিতে হয়েছিল যাবতীয় দায়িত্ব — সংসার, ছেলে-মেয়ে, পরিবার। কিন্তু রাণীবালা দুইজনের মধ্যে কোনো মতভেদ দেখেননি। তাই কী মসৃণ, আনন্দময় ছিল তাঁদের ছেলেবেলা।
শাঁখের আওয়াজে হুঁশ আসে রাণীবালার। জাফরি-কাটা বারান্দায় একটা গোল সেগুন কাঠের টেবিল আছে, সেখানেই দীপশিখা বসেছে তার আইবুড়ো ভাত খেতে। বসন্তের রোদ এখনও সেই রকম চড়েনি। মেয়েটার গায়ে-মুখে এসে পড়েছে। বাড়ির সামনেই আমগাছটাতে ভর্তি মুকুল এসেছে।
বিরক্তি এসে যায় রাণীবালার, ইরার ওপর। সত্তর ছুঁতে চলল। একটা স্কুলের দিদিমণি ছিল, ছেলেমানুষিটা রয়েই গেছে। তাই হয়তো এখনও এত হাসতে পারে। রাণীবালা তো সময়ের আগেই বৃদ্ধ হয়ে গেলেন।
নাঃ, এই হৈ-হট্টগোল ভালো লাগছে না। পায়ে পায়ে ছাদের সিঁড়ির দিকে এগোলেন। ওখানেই খুঁজবেন তাঁর কিশোরীবেলাকে।
৩
ছাদের চৌকাঠটা ডিঙিয়ে প্রায় ছুটে যান রেলিংয়ের কাছে। ওই তো গঙ্গাটা দেখা যাচ্ছে। নদীর হাত ধরেই খুঁজবেন রাণীবালা আজ তাঁর হারানো সম্পদগুলোকে। সেটাই সবচেয়ে ভালো কাজ হবে। মনে মনে ভারী মজা পেলেন রাণীবালা।
সবার আগে কী দেখবেন? ছাদের দেওয়ালের গায়ে লিখে রেখেছিলেন যশোয়ান্ত, "কোয়েলের কাছে" উপন্যাসের নায়কের নাম। খিলখিল করে কিশোরীর মতো হাসেন রাণীবালা। না, ভুল হল। তাঁর স্বপ্নের নায়কের নাম। কোথায় যেন ছিল বেশ। না, খুঁজে পেলেন না।
"থাকে নাকি এতদিনে! কত বার রং হলো বাড়ি। তার চেয়ে ছাদের ঘরটাই ভালো।"
বিড়বিড় করতে করতে চললেন রাণী ছাদের ঘরটার কাছে। দুরুদুরু বুকে কত দিন পর রাণীবালা হাত রাখলেন সেই ছাদের ঘরের দরজায়...
৪
দীপশিখা রেজিস্ট্রি করবে বলেছে, তাও এই বাড়িতে। লোক খাওয়ানো হবে এক রবিবার দেখে। দুই বাড়ির আত্মীয়দের একসঙ্গে নেমতন্ন করে বাইরে কোথাও খাওয়ানোর কথা ভাবা হয়েছে। এত সংক্ষেপে, জৌলুসহীন বিয়ে শ্রী দীপেন্দ্রনাথ লাহিড়ীর নাতনির! সত্যি ভাবা যায়নি। কিন্তু যে মেয়ে বারো বছর বয়সে বাবাকে হারায়, তার বোধহয় শখ-আহ্লাদ সংক্ষিপ্ত হয়ে যায় এই রকম।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘরের দরজাটা খুললেন রাণীবালা। বৌদি দেওয়ালে ঠেসান দিয়ে সারি সারি পিঁড়িগুলো রেখে দিয়েছে। তার কতগুলোতে হালকা আলপনার দাগ। বিয়ের পিঁড়ি সব। খাবার টেবিল এই বাড়িতে আসার আগে বিশেষ সময়ে এগুলোকে পংক্তিভোজনের কাজে লাগানো হতো।
গ্রামোফোনটা? এটা কি কাকা কিনেছিলেন? মা, কাকিমার বড় শখ ছিল গান শোনার। দুপুরে ঘুমানো বাড়ির বৌদের সে বড় নিন্দের কাজ। কিছু না কিছু করতে হবে — হয় সেলাই করো, না হলে বড়ি, আচার বানাও। নভেল পড়লে রাণীবালার ঠাকুমা ভুবনমোহিনী দেবী বড় রাগ করতেন। তাই এল এই গ্রামোফোনটা। দুই বৌ দুপুরে কুরুশ কাঠি নিয়ে বসেছে, আর সারা ঘরে ছড়িয়ে পড়েছে "দীপ নিভে গেছে মম"। খাটের এক কোণে মায়ের আঁচলের একটা অংশ হাতে নিয়ে চোখ বুজে আসছে ছোট্ট রাণীর। আহ! কী আরাম, কী শান্তি।
না, এটা তো সেই গ্রামোফোনটা নয়। এটা তো দাদা কিনেছিল মির্জা গালিব স্ট্রিট থেকে। তখন শুধুমাত্র রাণীবালার বিয়ে হয়ে গেছে। দাদা খুব কিশোর কুমারের ভক্ত ছিল। কৃষ্ণনগরে গিয়ে গান শোনাত। গ্রামোফোনটার গায়ে হাত বোলাতে বোলাতে ভাবেন, "দাদা কত দূরে! কেন যে তুই খেলার গুটি কাঁচিয়ে দিয়ে চলে গেলি!"
পুরোনো বাড়ির জানলাগুলোতে খড়খড়ি লাগানো। ফাঁকফোকরের রোদ মায়াজালের সৃষ্টি করেছে। সেই মায়াজাল রাণীবালাকে দেখাচ্ছে, রেডিওতে অনুরোধের আসর শুরু হচ্ছে। লতা মঙ্গেশকর গাইছেন, "অন্তবিহীন কাটে না আর যেন বিরহেরই দিন..." খেয়াল নেই, কিশোরী রাণী খোলা চুলে চোখ বুজে গাইছেন। আচমকা রেডিওটা বন্ধ করে দিয়ে মা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। হতবাক রাণীবালা।
আচ্ছা, মা তো প্রতি বৃহস্পতিবার আলতা পরত, তাই না? তারপর লক্ষ্মীর পাঁচালীটাও তো মা-ই পড়ত। কিন্তু কানে আসছে শুধুমাত্র কাকিমার গলাটাই... "দোল পূর্ণিমার নিশি নির্মল আকাশ..." কী সুন্দর চন্দনের গন্ধ কাকিমার গায়ে ছিল। বড়দের যে কী হয়! কেন যে বাড়িটা আলাদা করে নিল কাকা! এখনও এই বাহাত্তর হতে চলা বয়সেও বুঝতে পারেননি। উত্তরটা ঠিক নিয়ে নেবেন রাণীবালা। হয়তো আরও কিছু বছর অপেক্ষা করতে হবে। চোখটা মোছেন রাণীবালা।
৫
"মা, ছাদে কী করছ? খাবে তো? সবাই অপেক্ষা করছে। দ্যাখো, টুটু চলে এসেছে তোমাকে নিতে।"
"বড় পিসি, কিছু খুঁজছ?"
মেয়েটাকে অবিকল রাণীবালার মা পূর্ণিমার মতো দেখতে লাগছে। জিনের ভেতর দিয়ে এইভাবেই হয়তো মানুষ ফিরে ফিরে আসে তাঁর আপনজনদের কাছে। কে জানে! একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকেন তার ভাইঝির দিকে রাণীবালা।
"কী দ্যাখো বড় পিসি? দ্যাখো, ঠাম্মার চুলের কাঁটা খোঁপায় দিয়েছি। কেমন লাগছে আমায়?"
৬
পুরোনো গন্ধ মাখানো ঘরটাকে ধীরে ধীরে বন্ধ করেন রাণীবালা। এই এতক্ষণ তিনজনের হাসি-ঠাট্টার আওয়াজটা নিয়ে আপাতত ঘুমিয়ে পড়ুক ঘরটা। রাণীবালা আর খুঁজলেন না তাঁর পুতুলের আলমারি, মেম পুতুল, মায়ের সিঁদুরের কৌটো। লক্ষ্মীপুজোর সেই বড়সড় ধানের কুনকেটা কি কাকিমা নিয়ে চলে গিয়েছিলেন আলাদা হওয়ার সময়? মনে করতে পারেন না রাণীবালা।
যে নানা বুনোটের নকশাটা আজ রোদের মায়াজাল রাণীবালাকে দেখাল, আর যা তিনি নিজে নাড়াচাড়া করলেন, এটাকে কী বলে? উত্তরাধিকার? কে জানে, হয়তো তাই।
দরজাটার গায়ে আরও একবার হাত বোলালেন রাণীবালা। মনে মনে ভাবলেন, "তিতিরকে বলব এই বাড়িটার, ছাদের চূড়োর কলসটার, ছাদ থেকে দেখা গঙ্গা নদীটা, ছাদের এই ঘরটা — যার কাছে রেখে গেল আজকের এই হাসির মুহূর্তকে — আর দেওয়ালের গায়ে লাহিড়ী বাড়ির নামফলকের সবেরই একটা একটা ছবি তুলে রাখতে। আবার কবে আসা হয়!"
কিন্তু ছবিগুলো রেখে দেবেন একেবারে তাঁর নিজের কাছে। কোনো একসময় পাতা খসে যাওয়ার আগে কাঁপা কাঁপা হাতে কাউকে বলবেন, "এই নে, তোর জন্যই তুলে রেখেছিলাম... তুই সামলা এগুলো এখন।"
দূরে গঙ্গার দিকে তাকিয়ে রইলেন রাণীবালা।
আপনার প্রতিক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
প্রতিক্রিয়া দেওয়ার নিয়ম
আপনি এই সংখ্যায় আপনার পছন্দের সব লেখাতেই প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবেন। তবে একটি লেখায় সর্বোচ্চ ২টি ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেওয়া যাবে। একই লেখায় তৃতীয় প্রতিক্রিয়া নির্বাচন করলে, প্রথমে নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং নতুন প্রতিক্রিয়াটি গণ্য হবে। আপনার প্রতিটি প্রতিক্রিয়া লেখকদের অনুপ্রেরণা জোগায় এবং বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সৃজনশীলতার প্রতি আপনার সমর্থনকে তুলে ধরে।