নয়াদিল্লির লোধি গার্ডেন মানেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে মুঘল আমলের গম্বুজ, শান্ত পরিবেশ আর ভিআইপিদের সকাল-বিকালের জগিং। কিন্তু গত কিছুদিন ধরে এই চেনা উদ্যানই হয়ে উঠেছে পক্ষীবিদ আর ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফারদের প্রধান হটস্পট। সৌজন্যে — একটি ওরিয়েন্টাল পাইড হর্নবিল এবং একটি স্থানীয় ইন্ডিয়ান গ্রে হর্নবিল পরিবারের মধ্যে চলা এক নজিরবিহীন, অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন। পাখিদের দুনিয়ায় এমন ঘটনা এতটাই বিরল যে, খোদ 'ডাব্লিউডাব্লিউএফ ইন্ডিয়া' এবং 'দিল্লিবার্ড ফাউন্ডেশন' মাঠের নেমে পড়েছে এদের ওপর নজর রাখতে।
ঘটনার গভীরে যাওয়ার আগে চরিত্রগুলোর সঙ্গে একটু পরিচয় করিয়ে দেওয়া যাক। দিল্লির আদি বাসিন্দা হলো ইন্ডিয়ান গ্রে হর্নবিল। এরা আকারে মাঝারি, ধূসর রঙের এবং খাস দিল্লির রুক্ষ আবহাওয়াতেই অভ্যস্ত। লোধি গার্ডেনের একটা পুরনো শিমুল গাছের কোটরে এই গ্রে হর্নবিল অর্থাৎ ধূসর ধনেশদম্পতি বাসা বেঁধেছিল। ধূসর ধনেশদের প্রজনন প্রক্রিয়াটা বেশ অদ্ভুত। ডিম পাড়ার পর মা পাখিটি গাছের কোটরে নিজেকে বন্দি করে ফেলে এবং কাদা ও মলমূত্র দিয়ে কোটরের মুখটা সিল করে দেয়। শুধু একটা সরু লম্বালম্বি ফুটো খোলা থাকে, যা দিয়ে বাইরে থেকে বাবা পাখিটি রোজ খাবার এনে মা ও বাচ্চাদের মুখে তুলে দেয়। বাচ্চা ওড়ার যোগ্য না হওয়া পর্যন্ত মা পাখিটি ওই অন্ধকার কোটরেই বন্দি থাকে।
এই নিখুঁত ও স্বাভাবিক নিয়মে টুইস্ট এনে হাজির করল ওরিয়েন্টাল পাইড ধনেশটি। এই প্রজাতিটি আকারে ধূসর ধনেশের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ, গায়ের রঙ কুচকুচে কালো আর ধবধবে সাদা, আর মাথায় থাকে এক বিশাল হলুদ রঙের চঞ্চু বা ক্যাস্ক। এদের আসল বাড়ি কিন্তু দিল্লিতে নয়, এরা মূলত বাস করে হিমালয়ের পাদদেশ, তরাইয়ের স্যাঁতসেঁতে জঙ্গল বা উত্তর-পূর্ব ভারতে। খাস দিল্লিতে এই পাখির দেখা মেলাটাই একটা বড় বিস্ময়। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এই হর্নবিলটি কোনো বন্য পরিযায়ী পাখি নয়, বরং এটি কোনো ব্যক্তিগত কালেকশন বা ফার্মহাউস থেকে পালিয়ে এসেছে।
পাখিটি মানুষের উপস্থিতিতে খুব একটা ভয় পাচ্ছে না এবং শহুরে পরিবেশে সহজেই মানিয়ে নিয়েছে। তা ছাড়া জানা গেছে যে, দিল্লিতে এই মুহূর্তে অন্তত দু’টি স্ত্রী ওরিয়েন্টাল পাইড ধনেশ রয়েছে (অন্যটি জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া ক্যাম্পাসের দিকে দেখা গেছে)। যেহেতু দু’টিই স্ত্রী পাখি, তাই ধারণা করা হচ্ছে কোনো সৌখিন সংগ্রাহক এদের একসাথে এনেছিলেন, যেখান থেকে এরা কোনোভাবে মুক্ত হয়ে গেছে।
আসল ঘটনাটি শুরু হয় যখন লোধি গার্ডেনের নিঃসঙ্গ স্ত্রী পাইড ধনেশটির মধ্যে প্রজনন-সম্পর্কিত হরমোনজনিত তাড়না জেগে ওঠে। নিজের কোনো সঙ্গী বা ডিম না থাকায়, সে লোধি গার্ডেনের ওই ধূসর ধনেশের বাসাটিকে লক্ষ্যবস্তু বানায়। বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় একে বলা হয় Inter-species provisioning, অর্থাৎ নিজের প্রজাতি ছেড়ে অন্য প্রজাতির বাচ্চাকে খাওয়ানো। পাইড ধনেশটি প্রতিদিন সকাল থেকে লোধি গার্ডেনের আনাচ-কানাচ ঘুরে ভালো ডুমুর, জামজাতীয় ফল এবং বড় বড় শামুক বা পোকা জোগাড় করে আনতে শুরু করে। এরপর সে সোজা চলে যায় ধূসর ধনেশের বাসার সামনে এবং ওই সরু ফুটো দিয়ে ভেতরের বন্দি মা ও ছানাদের খাওয়াতে থাকে। কোটরের ভেতরে থাকা পাখিরাও এই পুষ্টিকর খাবার পেয়ে সানন্দে তা গ্রহণ করতে শুরু করে।
সমস্যা তৈরি হলো বাসার আসল কর্তা, অর্থাৎ ধূসর বাবা পাখিটিকে নিয়ে। সে যখন সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে ছোটখাটো জংলি ফল ঠোঁটে নিয়ে নিজের বউ-বাচ্চার জন্য বাসার সামনে আসে, তখন এই বিশাল চেহারার পাইড ধনেশটি তার ওপর চড়াও হয়। আকারে দ্বিগুণ হওয়ায় পাইড ধনেশটি অনায়াসেই আসল বাবা পাখিটিকে ঠুকরে, তাড়া করে এলাকা ছাড়া করছে। পরিস্থিতি এখন এতটাই জটিল যে, আসল বাবা পাখিটি নিজের বাসার ধারেকাছে ঘেঁষার সাহস পাচ্ছে না। সে দূর থেকে গাছের ডালে বসে করুণ চোখে দেখছে, কীভাবে এক বহিরাগত এসে তার পুরো সংসারের দায়িত্ব 'হাইজ্যাক' করে নিয়েছে।
এই অদ্ভুত আচরণ পাখি বিজ্ঞানীদের ঘুম উড়িয়ে দিয়েছে। সাধারণত পাখিদের মধ্যে এই স্তরের পরোপকার বা অন্য প্রজাতির বাচ্চার প্রতি এমন অন্ধ স্নেহ দেখা যায় না। এই ড্রামা ট্র্যাক করার জন্য শুরু হয়েছে 'দিল্লি হর্নবিল নেস্ট মনিটরিং প্রজেক্ট'। প্রতিদিন ভোর ৫টা থেকে গবেষক ও স্বেচ্ছাসেবকদের টিম দূরবীন ও ক্যামেরা নিয়ে ওই শিমুল গাছের নিচে শিফটে ডিউটি দিচ্ছেন। তারা নিখুঁতভাবে ডায়েরিতে নোট করছেন — পাইডেড পাখিটি দিনে কতবার আসছে, কী খাবার আনছে এবং আসল বাবার সঙ্গে তার সংঘাত কতটা তীব্র হচ্ছে।
লোধি গার্ডেনের এই ঘটনাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রকৃতির আচরণ সবসময় আমাদের পাঠ্যবইয়ের নিয়ম মেনে চলে না। মানুষের তৈরি খাঁচা থেকে মুক্ত হয়ে এই বিরল পাখিটি যেভাবে দিল্লির বুকে নিজের প্রজনন-প্রবৃত্তির এক অস্বাভাবিক বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে, তা যেমন বিস্ময়কর, তেমনই গবেষকদের কাছে এক বিরল আচরণগত ধাঁধা। ধনেশ পাখির এই সহাবস্থানের শেষ পরিণতি কী হবে — তা দেখার জন্য আপাতত চাতক পাখির মতো অপেক্ষা করছেন দিল্লির প্রকৃতিপ্রেমীরা।
লেখক একজন অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক এবং নিবেদিতপ্রাণ পক্ষীপর্যবেক্ষক (Birdwatcher)। পশুপ্রেমী হলেও পাখিদের প্রতি তাঁর টান একটু বেশি। ছোটবেলায় গ্রামের বাড়িতে বাসা থেকে পড়ে যাওয়া একটি শালিকের ছানাকে উদ্ধার করার মধ্য দিয়েই পাখির প্রতি তাঁর ভালোবাসার শুরু। কলেজ জীবন থেকেই প্রবাসী বাঙালি, বর্তমানে স্থায়ীভাবে দিল্লিতে বসবাস করছেন।
আপনার প্রতিক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
প্রতিক্রিয়া দেওয়ার নিয়ম
আপনি এই সংখ্যায় আপনার পছন্দের সব লেখাতেই প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবেন। তবে একটি লেখায় সর্বোচ্চ ২টি ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেওয়া যাবে। একই লেখায় তৃতীয় প্রতিক্রিয়া নির্বাচন করলে, প্রথমে নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং নতুন প্রতিক্রিয়াটি গণ্য হবে। আপনার প্রতিটি প্রতিক্রিয়া লেখকদের অনুপ্রেরণা জোগায় এবং বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সৃজনশীলতার প্রতি আপনার সমর্থনকে তুলে ধরে।