About Bangali.Network
About Bangali.Network
মাসিক সংখ্যা
লেখক–লেখিকা
লেখা পাঠান
আমাদের কথা
উদ্যোগ
Web Magazine
Contests


উদ্যোগ Web Magazine
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
সুমি
দায়স্বীকার

লেখা, মতামত, মন্তব্য, বিশ্লেষণ, সাক্ষাৎকার বা অন্য যে কোনো প্রকাশিত লেখার সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সকল বক্তব্যের নৈতিক, তথ্যগত ও আইনগত দায় সম্পূর্ণভাবে তাঁদের উপরই বর্তায়। কোনো লেখা প্রকাশিত হওয়া মাত্রেই তা Bangali Network-এর সম্পাদকীয় অবস্থান, নীতি, মতাদর্শ, সমর্থন, অনুমোদন বা সরকারি মতামতের প্রতিফলন হিসেবে গণ্য করা যাবে না।

তথ্যভিত্তিক প্রবন্ধে ব্যবহৃত তথ্য, উদ্ধৃতি, অনুবাদ, পরিসংখ্যান, গবেষণা, শাস্ত্রীয় বা ঐতিহাসিক সূত্র, আইনগত বা বৈজ্ঞানিক তথ্য, বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা, সিদ্ধান্ত ও উপসংহারের যথার্থতা, নির্ভুলতা, পূর্ণতা, প্রাসঙ্গিকতা, বৈধতা ও হালনাগাদকরণের দায় সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকার। Bangali Network সম্পাদকীয় বিবেচনায় কোনো লেখা প্রকাশ, সম্পাদনা, সংক্ষিপ্তকরণ বা ভাষাগত সংশোধন করতে পারে; তবে এ ধরনের সম্পাদকীয় প্রক্রিয়াকে প্রকাশিত তথ্য, সূত্র, উদ্ধৃতি, বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা বা মতামতের সত্যতা, নির্ভুলতা, বৈধতা বা নির্ভরযোগ্যতার প্রত্যয়ন বা নিশ্চয়তা হিসেবে গণ্য করা যাবে না। এ-সংক্রান্ত কোনো দায় Bangali Network গ্রহণ করে না।

লেখক পরিচিতিতে প্রকাশিত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণের ভিত্তিতে প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ-সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

কোনো প্রকাশিত বিষয়বস্তুর কারণে কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সংস্থা বা গোষ্ঠীর আপত্তি, দাবি বা আইনগত প্রশ্ন উত্থাপিত হলে, প্রযোজ্য আইন অনুসারে তার দায় সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা বা সাক্ষাৎকারদাতার উপর বর্তাবে, যদি না আইন ভিন্নভাবে নির্ধারণ করে।

কোনো প্রকাশিত তথ্য বা দাবির যথার্থতা সম্পর্কে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণসহ আপত্তি উত্থাপিত হলে Bangali Network বিষয়টি সম্পাদকীয়ভাবে পর্যালোচনা করবে। পর্যালোচনায় তথ্যগত ভুল প্রমাণিত হলে, Bangali Network নিজস্ব সম্পাদকীয় বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট অংশ সংশোধন, অপসারণ, প্রত্যাহার বা প্রয়োজনীয় সম্পাদকীয় নোট সংযোজন করার অধিকার সংরক্ষণ করে।

দায়স্বীকার

লেখা, মতামত, মন্তব্য, বিশ্লেষণ, সাক্ষাৎকার বা অন্য যে কোনো প্রকাশিত লেখার সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সকল বক্তব্যের নৈতিক, তথ্যগত ও আইনগত দায় সম্পূর্ণভাবে তাঁদের উপরই বর্তায়। কোনো লেখা প্রকাশিত হওয়া মাত্রেই তা Bangali Network-এর সম্পাদকীয় অবস্থান, নীতি, মতাদর্শ, সমর্থন, অনুমোদন বা সরকারি মতামতের প্রতিফলন হিসেবে গণ্য করা যাবে না।

তথ্যভিত্তিক প্রবন্ধে ব্যবহৃত তথ্য, উদ্ধৃতি, অনুবাদ, পরিসংখ্যান, গবেষণা, শাস্ত্রীয় বা ঐতিহাসিক সূত্র, আইনগত বা বৈজ্ঞানিক তথ্য, বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা, সিদ্ধান্ত ও উপসংহারের যথার্থতা, নির্ভুলতা, পূর্ণতা, প্রাসঙ্গিকতা, বৈধতা ও হালনাগাদকরণের দায় সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকার। Bangali Network সম্পাদকীয় বিবেচনায় কোনো লেখা প্রকাশ, সম্পাদনা, সংক্ষিপ্তকরণ বা ভাষাগত সংশোধন করতে পারে; তবে এ ধরনের সম্পাদকীয় প্রক্রিয়াকে প্রকাশিত তথ্য, সূত্র, উদ্ধৃতি, বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা বা মতামতের সত্যতা, নির্ভুলতা, বৈধতা বা নির্ভরযোগ্যতার প্রত্যয়ন বা নিশ্চয়তা হিসেবে গণ্য করা যাবে না। এ-সংক্রান্ত কোনো দায় Bangali Network গ্রহণ করে না।

লেখক পরিচিতিতে প্রকাশিত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণের ভিত্তিতে প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ-সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

কোনো প্রকাশিত বিষয়বস্তুর কারণে কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সংস্থা বা গোষ্ঠীর আপত্তি, দাবি বা আইনগত প্রশ্ন উত্থাপিত হলে, প্রযোজ্য আইন অনুসারে তার দায় সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা বা সাক্ষাৎকারদাতার উপর বর্তাবে, যদি না আইন ভিন্নভাবে নির্ধারণ করে।

কোনো প্রকাশিত তথ্য বা দাবির যথার্থতা সম্পর্কে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণসহ আপত্তি উত্থাপিত হলে Bangali Network বিষয়টি সম্পাদকীয়ভাবে পর্যালোচনা করবে। পর্যালোচনায় তথ্যগত ভুল প্রমাণিত হলে, Bangali Network নিজস্ব সম্পাদকীয় বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট অংশ সংশোধন, অপসারণ, প্রত্যাহার বা প্রয়োজনীয় সম্পাদকীয় নোট সংযোজন করার অধিকার সংরক্ষণ করে।

সুমি

ঘড়িতে তখন চারটে। শীতের সূর্যটা কুয়াশার চাদরের আড়ালে মুখ লুকোতে ব্যস্ত। সাইকেলের চেনটা লাগিয়ে বারান্দার কোণায় পড়ে থাকা ছেঁড়া গামছাটাতে হাতের কালি মুছতে মুছতে রংচটা দেওয়ালে ঝুলন্ত বুড়ো ঘড়িটার দিকে চোখ তুলে তাকাতেই চমকে যায় সুমি। তার মুখ থেকে অস্ফুট শব্দ বেরিয়ে আসে, "আজকেও লেট।"

বৌদি, মানে তার ছাত্র রোহিতের মা, এমনিতে খুব ভালো, কিন্তু রোজ রোজ দেরি করে টিউশনি পড়াতে গেলে কতদিন আর ভালো থাকবে। পনেরো-বিশ মিনিট সাইকেল চালাতে হবে রোহিতদের বাড়ি পৌঁছাতে, তাও যদি সাইকেলটা সাথ দেয়। কদিন থেকেই সাইকেলের চেনটা বারবার খুলে যাচ্ছে। মনু ভাইয়ের সাইকেল সারাইয়ের দোকানের সামনে দিয়ে দিনে দশবার যাতায়াত করলেও চেনটা ঠিক করে দিতে বলতে পারছে না সুমি। কারণ, আগের বার সাইকেল সারাইয়ের পনেরো টাকা এখনও দেওয়া হয়নি।

সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে সাইকেলটা ঘুরিয়ে দরজা দিয়ে বেরোতে যাবে, অমনি মা পিছন থেকে ডেকে উঠল —

"সুমি, বেরোচ্ছিস? আমার ওষুধটা শেষ হয়ে গেছে।"
"ঠিক আছে।" — বলে সে বেরিয়ে যায়।

মায়ের হাঁপানি, ভালো ডাক্তার দেখাতে পারলে হয়তো কিছুটা সুস্থ থাকত, কিন্তু টাকা কোথায়? আর সরকারি হাসপাতালে যা অবস্থা! তবে খুব বাড়াবাড়ি হলে অগত্যা মধুসূদন! সারাবছর দোকান থেকে হাঁপানির ওষুধ নিয়ে আসতে হয় তাকে, যাতে রাত্রে একটু ঘুমোতে পারে। কারণ শ্বাসকষ্ট শুরু হলে মাঝরাতে তাকেই উঠতে হয়। বৌদি সারাদিনের সংসারের ঘানি টেনে তখন গভীর নিদ্রায় মগ্ন। বৌদিকে আর জাগাতে ইচ্ছে করে না, নিজেই সামলে নেয়।

বাবা, অরবিন্দ সরকার, ছিলেন চতুর্থ শ্রেণির কর্মী। বছর দশেক আগে মারা গেছেন। সুমি সেবার মাধ্যমিক দিয়েছিল। তার মনে আছে, বাবা তেষট্টি বছর বয়সেও রোজ সাইকেলের পিছনে বসিয়ে সেন্টারে নিয়ে যেত। তার রেজাল্ট বেরোনোর আগেই সুস্থ-সবল মানুষটা ঘুমের মধ্যেই চলে গেলেন। বড় ভালো মানুষ ছিলেন। জীবনে কখনও কোনও অন্যায় করেননি। বাবা তাকে খুব ভালোবাসত। এখনও প্রতি রাতে বাবার মুখটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। বাবা মাথায় হাত বুলিয়ে না দিলে তার ঘুমই আসত না।

সামান্য বেতনের চাকরি করে দুই ছেলে আর দুই মেয়ে নিয়ে সংসার চালিয়ে নামমাত্র পি.এফ. ছাড়া কোনও সঞ্চয় যেমন করতে পারেননি, তেমনই ছেলে দুটোকে মানুষও করে যেতে পারেননি। বড়টা মাধ্যমিক পাশ করে আর পড়াশোনা করেনি। সাহেবকে বলে ভূমি সংস্কার দপ্তরে অস্থায়ী পিওনের একটা কাজের ব্যবস্থা করেছিলেন। ঝামেলা করে ছেড়ে চলে না এলে, হয়তো ছয় মাস বা এক বছরের মাথায় স্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা ছিল।

এখন চৌরাস্তার মোড়ে গুমটিতে চা-পানের দোকান দিয়েছে। বিয়ে করেনি, সংসারেও টাকা-পয়সা কিছু দেয় না। যা হয় নিজের ইচ্ছামতো খরচ করে। কখনও ইচ্ছে হলে দুপুরে খেতে আসার সময় বেলা শেষের ঢালা সবজি নিয়ে আসে। ছোটটা বরাবরই পড়াশোনায় অনাগ্রহী। ক্লাস সেভেনেই পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে ইলেকট্রনিক্সের কাজ শিখেছে। আয়ের বেশিরভাগই লটারির টিকিট কেনে, আর প্রতি রাতেই স্বপ্ন দেখে সকাল হলেই সে কোটি টাকার মালিক হবে। বিয়ে হয়েছে, দুটি ছেলে — একটি ক্লাস সেভেন আর একটি ক্লাস ফোর।

বড় মেয়ের বিয়ে অরবিন্দবাবুই দিয়ে গিয়েছিলেন। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান, ছোট সংসার। মায়ের ফ্যামিলি পেনশন আর চৌধুরীদের ওষুধের দোকানে কাজ করে যা পায়, তাতে আহামরি কিছু না হলেও স্বচ্ছলভাবে চলে যায়। দু-তিন বছরে একবার দীঘা বা পুরী বেড়াতে যায়। তারও চিন্তা এই পরিবারটিকে নিয়ে।

মায়ের সামান্য কিছু ফ্যামিলি পেনশনের টাকা আর ছোটদার অনিয়মিত টাকায় সংসার চলে না। নিজের খরচ, ভাইপোদের নানারকম আবদার ও সংসারের নানা খুঁটিনাটি প্রয়োজন মেটাতে টিউশনি পড়িয়ে বাড়তি আয় করতে হয় সুমিকে। টাকার অভাবে এম.এ.-তে ভর্তি হতে পারেনি।

সংসারের সাত-সতেরো ভাবতে ভাবতে একটু তাড়াতাড়িই সাইকেল চালাচ্ছিল। মিউনিসিপ্যালিটি মোড় পেরিয়েই থামতে হলো। এবার চেনটা কেটেই গেল। আর কোনও উপায় নেই।

চেনটা সারিয়ে পরপর দুটি টিউশনি পড়ানোর পর যখন বাড়ি ফেরে, তখন চারদিক শুনশান। শীতকালে রাত ন'টাই যেন মাঝরাত। বাড়ির দরজায় পৌঁছে মনে পড়ে, মায়ের ওষুধ আনা হয়নি। ইচ্ছে করে আনেনি এমন নয়। ১০০ টাকা ছিল, মায়ের ওষুধটা কেনা যেত, কিন্তু সাইকেলটা সারাতে গিয়ে ৮০ টাকা খরচ হয়ে গেল। হাতে মাত্র ২০ টাকা পড়ে আছে। আজ মাসের ২২ তারিখ। তাই মাকে মিথ্যা না বলে এড়িয়ে যাওয়াই শ্রেয় মনে করে সন্তর্পণে বাড়ি ঢোকে সুমি। যতই হোক, মা তো কেমন করে জানি না সন্তানের আগমনের বার্তা পেয়ে যায়।

মা হাঁক পাড়ে, "সুমি এলি? আমার ওষুধটা দিয়ে যা, ঘুম আসে না, বুকের মধ্যি খুব কষ্ট …" আরও কিছু বলে, সবটা শোনা যায় না।

ঘরে ঢুকে আলো জ্বালতেই বৌদি আসে পিছন পিছন। সুমি কোনওদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে আঁতিপাঁতি করে খুঁজতে থাকে তার গোপন জায়গাগুলো, যেখানে আপৎকালীন ২-৫ টাকা লুকিয়ে রাখে। সব ভান্ডার উপুড় করে পাওয়া টাকাগুলো চৌকির উপর নামিয়ে ঘুরে তাকাতেই বৌদিকে দেখে চমকে যায় সুমি।

"তুমি কখন ঢুকলে?"
"এই এখনই। মায়ের ওষুধ এনেছ?"
"না গো, সাইকেলের চেনটা কেটে গেল, অনেকগুলো টাকা খরচ হয়ে গেল। দেখলেই তো, সব খুঁজেপেতে বের করলাম। দেখি এখানে ক'টাকা আছে। কাল সকালে আবার বাজার করতে হবে।"

সুমি গুনে দেখল, ১৫০ টাকা।

"দেখো, মাত্র দেড়শো টাকা আছে। এই দিয়ে আট-দশ দিন কেমন করে চলবে? গত মাসে মায়ের যে শাড়িটা আনলাম, তার টাকা দিতে পারিনি। বৌদি, তুমি আজ মাকে ম্যানেজ করো, কাল এনে দেব। রাতে দাদা ফিরলে দাদার কাছ থেকে কিছু টাকা চেয়ে রেখো না।"
"না বাপু, আমি পারব না। তোমার দাদা, তুমি বোলো। আমি টাকা চাইলে গালাগালি করে, তুমি তো জানো।"
"ঠিক আছে।" বলে চুপ করে যায় সুমি।
"চলো, হাত-মুখ ধুয়ে খেয়ে নেবে।" বলে বৌদি চলে যায়।

সুমি ভাবতে থাকে, মাস শেষ হতে এখনও হাজারখানেক টাকা দরকার। ছোটদার কাছে টাকা পাওয়া দূর অস্ত! যারা ধার দেওয়ার মতো, তাদের সবার কাছেই তো ধার করে বসে আছি, আবার নতুন করে কার কাছে ধার চাইব।

ওষুধ আনা হয়নি শুনে মা গজগজ করে। কান দেব না বললেও দু-একটা কথা কানে আসে সুমির।

"সবার সবকিছু হয়, আর আমার ওষুধের বেলা টাকা থাকে না। আমি মরলেই তো তোদের জুড়োয়।"

সুমি কলতলায় হাত-মুখ ধুতে যায়। কলতলাটা বেশ অন্ধকার এবং অসমান। পাশে কুলগাছটায় একটা বাল্ব লাগানো আছে, যেটা বছরভর খারাপই থাকে। শুধু বর্ষার আগে আগে সাপের ভয়ে পাল্টানো হয়। বাল্বের উপরে কোনও আচ্ছাদন না থাকায় কিছুদিনের মধ্যেই খারাপ হয়ে যায়, বিদ্যুৎ খরচটাও বেঁচে যায়। তাই অন্ধকারেই সবাই অভ্যস্ত হয়ে গেছে।

সুমি রান্নাঘরের মেঝেতে খেতে বসে দেখে, বড় ভাইপো সুমন অন্যদিন ন'টার আগে ঘুমিয়ে পড়লেও আজ এখনও ঘুমায়নি।
সুমি তাকে জিজ্ঞাসা করে, "কিরে, তুই ঘুমাসনি এখনও?"

বৌদি সুমির থালায় রুটি দিতে দিতে বলে, "দেখো না, কখন থেকে বলছি খেয়ে শুয়ে পড়, বলছে আজ পিসি আসুক, একসঙ্গে খাব। জানি না বাপু, তোমাদের পিসি-ভাইপোর কী ব্যাপার।"

সুমি কারণটা বুঝতে পেরেও কিছু বলে না। থালায় শুকনো রুটি আর বাঁধাকপির তরকারি। রোজ রোজ একই খাবার আর গলা দিয়ে নামতে চায় না। তবুও বেঁচে থাকার জন্য খেতে হয়। আর প্রতিদিন নতুন লড়াইয়ের প্রস্তুতির জন্য বেঁচে থাকতে হয়।

খরচ বাঁচানোর জন্য একবেলা রেশনের আটার রুটি খেতে হয় তাদের, সঙ্গে থাকে যখন যেটা সহজলভ্য সেই সবজি।

সুমন বলে, "পিসি, জ্যামিতি বক্সটা আজকেও এনে দিলে না, কাল থেকে আর স্কুল যাওয়া হবে না।"

কথাটা শুনেই সুমির মুখটা কেমন যেন ফ্যাকাশে হয়ে যায়। কদিন ধরেই ছেলেটা বলছে জ্যামিতি বক্সের কথা। ক্লাস সিক্সটা বন্ধুদের নিয়ে কোনওরকমে পার করেছে। সেভেনে উঠে অঙ্কের শিক্ষক বলেছেন, জ্যামিতি বক্স না নিয়ে এলে স্কুলে আসবে না। মুখে ভরা রুটির টুকরোটা বিস্বাদ হয়ে যায়। খুব রাগ হয় তার নিজের উপর, দাদাদের ওপর, এমনকি মৃত বাবার ওপর, যে বাবা তাকে খুব ভালোবাসত। কষ্টগুলো সব দলা পাকিয়ে গলার কাছে চলে আসে। হঠাৎ ডুকরে কেঁদে উঠতে চায়, কিন্তু পারে না। কারণ বাবা তাকে শিখিয়েছে নারীর জীবনে ভালো থাকার মূল মন্ত্র — কখনও মিথ্যা বলবে না, কারও সম্পর্কে অনুমান বা স্বআরোপিত ধারণা করবে না, আর নিজের কষ্ট অন্যের কাছে প্রকাশ করে নিজেকে উপহাসের পাত্র করবে না।

সুমি নিজেকে খুব কষ্ট করে সামলে নিয়ে বাঁ হাত দিয়ে সুমনকে কোলের কাছে টেনে নেয়। ঠোঁটে একটা হাসির রেখা টেনে আদর করে বলে, "সত্যিই তো, খুব ভুল হয়ে গেছে। আমার মিষ্টি সোনা, এখন খেয়ে শুয়ে পড়ো, কাল নিয়ে আসব। আর ভুল হবে না।"

সে আর খেতে পারে না।

"বৌদি, এই রুটিটা এঁটো হয়নি, আলাদা রাখো। কাল সকালে চায়ের সঙ্গে খাব।" বলেই উঠতে যাবে, অমনি তার চোখে পড়ে নিমন্ত্রণপত্রের মতো কিছু একটা রান্নাঘরের জানালায় পড়ে আছে। সেদিকে বৌদির দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলে, "ওটা কী গো বৌদি?"

বৌদি সুমির না-খাওয়া রুটিটা সযত্নে বাটিতে তুলে রাখতে রাখতে বলে, "কোনটা?" তারপর সুমির দৃষ্টি অনুসরণ করে বলে, "ওই দেখো, তোমাকে তো বলতেই ভুলে গেছি, অপর্ণা আর নন্দিনী এসেছিল তুমি পড়াতে বেরিয়ে যাওয়ার পরে।" বলতে বলতে কার্ডটা এনে তার হাতে দেয়, "অপর্ণার ছেলের মুখেভাতের নেমন্তন্ন।"

"কবে?"

"ফেব্রুয়ারির সাত তারিখে।" একমুখ হাসিতে গদগদ হয়ে বলতে থাকে, "জানো, আমাদের সকলকে যেতে বলেছে। অনেকদিন কোনও নেমন্তন্ন খাইনি। ওরা তো বড়লোক, মাংস করবে বলো?"

বৌদি বকবক করতে করতে রান্নাঘরের কাজ করছিল, যা শোনার মতো ধৈর্য সুমির ছিল না। তাই সে কোনও উত্তর না করে কার্ডটা বাঁ হাতে নিয়ে উঠে আসে। তার মাথায় তখন একটাই চিন্তা — উপহার কিনতে আবার বাড়তি খরচ।

কার্ডটা বিছানার উপর রেখে হাত-মুখ ধুয়ে আলোটা জ্বেলে আয়নায় নিজের সামনে নিজেকে দাঁড় করায় সুমি। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে নিজের মুখটা। সে কি বুড়িয়ে যাচ্ছে? কই, না তো। বয়সটা একটু বেড়েছে বটে, তবে ত্বকের টানটান ভাবটা এখনও আছে। যেটুকু গেছে, তাও সংসারের চিন্তায় আর চাপে। অতীতে দেখা ভবিষ্যতের রঙিন স্বপ্নরা আজ একটা দীর্ঘশ্বাস আর দিশাহীন শূন্য দৃষ্টি। কখন যে নিজের অজান্তেই চোখের কোণা দুটো ভিজে ওঠে, বুঝতে পারে না সুমি। চোখ দুটো খুব জ্বালা করে। চোখ মুছে আলো নিভিয়ে কম্বল ঢাকা দিয়ে শুয়ে পড়ে।

ঘুম আসে না, বিছানায় ছটফট করতে থাকে। পরদিন সকাল হলেই দরকার একগুচ্ছ টাকা, না হলে সুমন বলবে, "পিসি, তুমি ভীষণ রকম মিথ্যাবাদী।" মা বলবে, "আমার মরণ হলেই তো তোদের জুড়োয়।" বৌদি বাজারের থলেটা হাতে দিয়ে বলবে, "রোজ রোজ চুনো মাছ বাছতে আর খেতে ভালো লাগে না, আজ একটু কাটা পোনা এনো না, সুমন বলছিল।"

বেঁচে থাকার কোনও মানেই খুঁজে পায় না সুমি। সমস্ত কিছুই তার কাছে অন্ধকার মনে হয়। তন্দ্রাচ্ছন্নতার মধ্যেই অন্ধকার ঘরের দেওয়ালগুলো যেন এগিয়ে আসছে সুমির দিকে। শ্বাস নিতে খুব কষ্ট হয়। মনে হয় কেউ যেন বুকে চেপে বসেছে। জানুয়ারির এই হাড়কাঁপানো শীতেও সে ভিতরে ভিতরে ঘামতে থাকে। সে পাশ ফিরতে চায়, পারে না। মনে হয় কেউ তাকে বেঁধে রেখেছে চৌকির সঙ্গে। সে চেঁচাতে চায়, কিন্তু গলা দিয়ে আওয়াজ বের হয় না। বহু কষ্টে উঠে তাড়াতাড়ি আলোটা জ্বেলে চোখে-মুখে জল দেয়, জল খায়, তারপর আবার শোয়। নিজের অজান্তেই কখন যেন ঘুমিয়ে পড়ে।

ঘুম ভাঙতেই দেখে, হিমময় কুয়াশাঘেরা অস্পষ্ট সকাল আরও একটা অর্থহীন যন্ত্রণাময় দিনের প্রত্যাশায়।




আপনার প্রতিক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’

এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন

প্রতিক্রিয়া দেওয়ার নিয়ম

আপনি এই সংখ্যায় আপনার পছন্দের সব লেখাতেই প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবেন। তবে একটি লেখায় সর্বোচ্চ ২টি ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেওয়া যাবে। একই লেখায় তৃতীয় প্রতিক্রিয়া নির্বাচন করলে, প্রথমে নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং নতুন প্রতিক্রিয়াটি গণ্য হবে। আপনার প্রতিটি প্রতিক্রিয়া লেখকদের অনুপ্রেরণা জোগায় এবং বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সৃজনশীলতার প্রতি আপনার সমর্থনকে তুলে ধরে।

আগামী সংখ্যার জন্য লেখা পাঠান

❛উদ্যোগ❜ ওয়েব ম্যাগাজিনের শারদ ১৪৩৩ সংখ্যাটি ৫ অক্টোবর ২০২৬ (১৭ই আশ্বিন) প্রকাশিত হবে। ওয়েবসাইটে প্রদত্ত লেখার বিভাগ ও বিষয় থেকে আপনার পছন্দের বিষয় বেছে নিয়ে লেখা পাঠান ২৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে। নির্বাচিত লেখাগুলি লেখক / লেখিকার ছবি ও সংক্ষিপ্ত পরিচিতিসহ প্রকাশিত হবে। লেখা পাঠানোর ফর্ম এবং অন্যান্য সকল তথ্যের জন্য অনুগ্রহ করে মেনুতে ‘লেখা পাঠান’ বিভাগটি দেখুন।

পৃষ্ঠা
ভালো লাগলে ভালোবাসা দিন
অপছন্দ হলে পরামর্শ দিন
মতামত জানাতে মন্তব্য করুন
0 0 ভোট
স্টার
guest
6 কমেন্ট
নতুন থেকে পুরোনো
পুরোনো থেকে নতুন ভোটসংখ্যা অনুসারে
ফেসবুক পেজ
Udyog Bengali Web Magazine by Bangali Network

বিভিন্ন বিষয় থেকে বেছে নিয়ে লেখা পড়ুন

    বিভিন্ন সংখ্যায় প্রকাশিত হওয়া লেখা পড়ুন

    মাসিক সংখ্যাগুলি দেখুন
    Scroll to Top

    ‘উদ্যোগ’ ফোনে রাখুন

    ‘উদ্যোগ’ ওয়েব ম্যাগাজিন ইনস্টল করুন। ইনস্টলের পর অ্যাপ তালিকা থেকে আইকনটি হোমস্ক্রিনে যোগ করে নিতে পারেন। এরপর সহজেই পড়ুন আপনার প্রিয় ম্যাগাজিন। ভালো না লাগলে যেকোনো সময় এক ক্লিকে আনইনস্টল করতে পারবেন।