১
উত্তর দমদমের বর্মন বাড়ির চুন-সুরকি খসা দেওয়ালগুলো থেকে যে গন্ধটা বেরোয়, তা শুধু সিক্ত শ্যাওলার নয়; ওটা আসলে এক ক্ষয়ে যাওয়া আভিজাত্যের সূক্ষ্ম পচন। জুনের শেষাশেষি কলকাতার আকাশ যখন কালচে কুয়াশায় ঢেকে যায়, তখন এই দেড়শো বছরের পুরনো প্রাসাদের অন্দরমহল এক অপার্থিব গোলকধাঁধায় রূপ নেয়। বিকেলের মরা আলো নাচঘরের বেলজিয়াম গ্লাসের মস্ত আয়নাটার ওপর পড়লে চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। মেহগনি কাঠের ফ্রেমে খোদাই করা লতাগুল্মের নকশাগুলো অন্ধকার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মনে হয় যেন কিলবিল করছে জীবন্ত সাপের মতো। মানুষ যেমন নিজের ভেতরের আদিম অন্ধকারকে সুচারুভাবে লুকাতে ভালোবাসে, এই আয়নাও তেমনি আলো লুকাতে ওস্তাদ। ঠিকঠাক তাকালে মনে হবে, কাচের ওপার থেকে কেউ একজন উষ্ণ নিঃশ্বাস ফেলছে; বাষ্প জমছে এক অচেনা অবয়বের ছদ্মবেশে।
প্রদীপ সিল্কের কালো রুমালটা দিয়ে আয়নার বুকটা মুছছিল। খুব সাবধানে, পরম মমতায় — যেন কোনো সদ্যোজাতের নরম চামড়া পরিষ্কার করছে। সাধারণ মানুষের চোখে যা শুধুই ধুলো আর প্রাচীন কাচের অস্বচ্ছতা, প্রদীপের চোখে তা ইতিহাসের এক-একটা স্তর। এই বাড়ির প্রতিটি ঘরের দর্পণে সে নিজের হাতে পারদের প্রলেপ নতুন করে লেপেছে। মার্কারি ক্লোরাইডের সঙ্গে নির্দিষ্ট অনুপাতে সিলভার নাইট্রাইটের বিক্রিয়া ঘটিয়ে সে এমন এক ধূসর অবতল আস্তরণ তৈরি করেছে, যা আলোর সাধারণ প্রতিসরণাঙ্ককে সামান্য বাঁকিয়ে দেয়। এই আয়নার সামনে দাঁড়ালে মানুষের কাঁধের রেখা তিন ডিগ্রি ঝুঁকে যায়, চোখের মণি দেখায় সাপের মতো স্থির ও প্রসারিত। প্রদীপ আড়াল থেকে সেই প্রতিবিম্ব দেখে আর তার ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে এক চিলতে ঠান্ডা, তৃপ্তির হাসি। আসলে আয়না তো মিথ্যা বলে না, সে শুধু সত্যিটাকে একটু কুৎসিত করে দেখায় — যা মানুষ এমনিতে নিজের সচেতন চোখে দেখতে ভয় পায়।
রোহিণী যখন এই আয়নাগুলোর সামনে এসে দাঁড়ায়, তখন সে নিজেকে ঠিকঠাক দেখতে পায় না। নিজের চেনা নাক, চিবুক আর কপালের চামড়া তার নিজের চোখেই কেমন যেন কুয়াশায় ঢাকা, অচেনা কোনো অবয়ব মনে হয়। রোহিণী এই বর্মন বংশের শেষ জীবন্ত শৃঙ্খল। শান্ত, স্থির, যেন উনিশ শতকের কোনো তৈলচিত্র থেকে নেমে এসেছে। তার ঠোঁটের কোণে সবসময় একটা আলগা, বিষণ্ণ হাসি লেগে থাকে। উত্তর দমদমের মোড়ের চায়ের দোকানে বসা পাড়ার ছোকরারা ওই হাসির গভীরতা মাপতে পারে না; তারা ওটাকে চিরন্তন বাঙালি নারীর প্রেম ভাবে। কিন্তু বাঙালির প্রেম তো এখন সস্তা মেগা সিরিয়ালের টিআরপি-তে বন্দি। প্রদীপ জানে, ওই হাসির আড়ালে কী লুকিয়ে আছে। সে রোহিণীর দূরসম্পর্কের মামাতো ভাই, এই ভগ্ন প্রাসাদের কেয়ারটেকার। কিন্তু তার আসল পরিচয় অন্য। সে এই প্রাসাদের গোপন ইতিহাসের একমাত্র জীবিত ভাস্কর। সে নিজেকে এই গল্পটার মূল লেখক মনে করে।
"প্রদীপদা, চা-টা টেবিলে রাখলাম।"
রোহিণীর গলার মিহি আওয়াজে প্রদীপ একটুও চমকালো না। হাত থেকে রুমালটা না নামিয়েই সে ফিসফিস করে বলল, "সমীরণবাবু আজ কটায় আসবে?"
"ওই তো, গেটের মুখে ওর বাইকের শব্দ পেলাম," রোহিণী জানলার বাইরে তাকাল। তার চোখে সেই চেনা মায়াবী, অথচ শিকারির মতো তীক্ষ্ণ আলো।
তার কাজ হলো এই বিশাল বর্মন বাড়ির ভিৎ পরীক্ষা করা। কিন্তু আসল নজর সত্তর বিঘার ওই বিপুল প্রোপ্রাইটারি জমিতে। পোদ্দারের হাতে এই প্রাচীন স্থাপত্যের ধ্বংসাবশেষ তুলে দিতে পারলেই নগদ দুই পার্সেন্ট কমিশন। সেই লোভে সমীরণ ইদানীং রোজই আসে, আর আসার অছিলায় রোহিণীর ঘরের চৌকাঠের একটু বেশি কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। আধুনিক শিক্ষা তাকে ভদ্রতা শেখায়নি, শিখিয়েছে শুধু সুযোগসন্ধানী হতে।
২
"আসুন সমীরণবাবু, আজ তো বড় তাড়া দেখছি?" প্রদীপ বসার ঘরে এসে বসল। তার পরনের খাদি ধুতির খুঁট থেকে হালকা ল্যাবরেটরির রাসায়নিকের গন্ধ ছড়াচ্ছে।
সমীরণ রোদচশমাটা খুলে মেহগনি টেবিলের ওপর রাখল। "আরে প্রদীপদা, কাজ গুছিয়ে ফেলতে হবে তো। পোদ্দারবাবু বলছিলেন, সামনের মাসেই কর্পোরেশন থেকে নোটিশ আসতে পারে। হেরিটেজ তকমা লেগে গেলে এই ভাঙা ইটের স্তূপ থেকে এক পয়সাও বেরোবে না। রোহিণী দেবী, আপনার পেছনের ওই অন্ধকূপের মতো ঘরের দেওয়ালটা একটু ড্রিল করতে হবে। একটা স্ট্রাকচারাল রিপোর্ট জমা করতে হবে তো, যাতে দেখানো যায় এর ফাউন্ডেশন একদম কোলাপ্সড।"
রোহিণী চায়ের চিনেমাটির কাপটা সমীরণের দিকে এগিয়ে দিয়ে হাসল, "ফাউন্ডেশন তো অনেক আগেই ধসে গেছে সমীরণবাবু। এখন শুধু দেওয়ালগুলো যা জোড়াতালি দিয়ে খাড়া আছে। আমাদের সমাজের মতো, বাইরে ঝকঝকে তকতকে, ভেতরে খোলস।"
সমীরণ চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে রোহিণীর দিকে তাকাল। সেই চোখে একটা কাঁচা লালসা, আবার একই সঙ্গে এক মুক্ত জীবনের প্রলোভন। সে রোহিণীকে এই স্যাঁতসেঁতে অন্ধকূপ থেকে বের করে বাইপাসের ধারের কোনো ঝাঁ-চকচকে পেন্টহাউসে নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখায়। রোহিণীও যেন সেই স্বপ্নে একটু একটু করে সায় দিচ্ছে, অন্তত সমীরণের অতি-আত্মবিশ্বাসী মস্তিষ্ক তাই ধরে নিয়েছে। আসলে পুরুষ মানুষ নারীর মৌনতাকে সবসময় নিজের বিজয় বলে ভুল করে।
প্রদীপ লক্ষ্য করছিল সমীরণের ডান হাতের আঙুলগুলো। চায়ের কাপ ধরার বাহানায় রোহিণীর মসৃণ কবজি ছোঁয়ার একটা মরিয়া, অভদ্র চেষ্টা। প্রদীপের চোয়ালের পেশি শক্ত হয়ে উঠল। তার ভেতরের নিখুঁত রাসায়নিক সমীকরণগুলো ওলটপালট হয়ে যাচ্ছিল। সমীরণকে সরাতে হবে। এই আধুনিক জঞ্জালটা এই বাড়ির পবিত্রতা, এই ফ্রেমের নন্দনতত্ত্ব নষ্ট করছে। কিন্তু প্রদীপ নিজেকে শান্ত রাখল। অপরাধের বিজ্ঞান তাকে শিখিয়েছে — উত্তেজনা হলো কাঁচা খেলোয়াড়ের লক্ষণ। সে তো আর পাঁচটা সাধারণ প্রেমিকের মতো সস্তা ঈর্ষাকাতর নয়। তার আসক্তি অনেক গভীর, অনেক মনস্তাত্ত্বিক। সে বোঝে যে, হিংসা আর ত্যাগের মধ্যে দূরত্ব মাত্র একটা নিখুঁত রাসায়নিক বিক্রিয়ার।
রাত যখন এগারোটা, উত্তর দমদমের আকাশ ভেঙে বৃষ্টি আরও বাড়ল। পুরো বর্মন বাড়ি নিঝুম। প্রদীপ একটা মোমবাতি নিয়ে অলিন্দের অন্ধকার দিয়ে হাঁটছিল। তার পায়ে স্পঞ্জ-সোলের চটি, কোনো শব্দ নেই। সে রোহিণীর শয়নকক্ষের সেই বড় বেলজিয়াম আয়নাটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। মোমবাতির কাঁপা আলো কাচের ওপর পড়তেই এক অদ্ভুত, বিকৃত প্রতিবিম্ব তৈরি হলো।
পারদের বিশেষ কারসাজিতে আয়নায় প্রদীপের নিজের মুখটা কেমন যেন মেয়েলি, অবিকল রোহিণীর আদলের মতো দেখাল। প্রদীপ আলতো করে নিজের খসখসে গালে হাত দিল, ঠিক যেভাবে রোহিণী সকালে উঠে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ত্বক পরীক্ষা করে। প্রদীপের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল সেই চেনা, বিষণ্ণ হাসি।
প্রদীপের সাইকোলজিক্যাল প্রোফাইলটা আসলে অত্যন্ত জটিল। সে ‘মিরর-ইমেজিং সাইকোসিস’ (Mirror-Imaging Psychosis) এবং তীব্র ‘আইডেন্টিটি ডিসঅর্ডার’-এ ভুগছে। সে অবচেতনভাবে বিশ্বাস করে, রোহিণী নামের কোনো আলাদা স্বাধীন সত্তা এই পৃথিবীতে নেই; সে নিজেই আসলে রোহিণী। রোহিণীর শরীরটা কেবল একটা বাহ্যিক খোলস বা ক্যানভাস, যা সমাজকে বিভ্রান্ত করার জন্য রাখা। আসল রোহিণী বাস করে এই আয়নার ওপারে, প্রদীপের নিজের মস্তিষ্কের গ্রে-ম্যাটারের কোষে। এই আয়নাগুলো সেই পরম সত্যকে রোজ রাতে পুনরুজ্জীবিত করে। আর এই ফ্রেমের মাঝে সমীরণ নামের ওই প্রমোটারের দালালের নোংরা হাতের স্পর্শ প্রদীপ কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না। এটা তার শিল্পের ওপর চরম আঘাত। যেমনটা অস্কার ওয়াইল্ড বলেছিলেন, "পাপ হলো আধুনিক জীবনের একমাত্র গতিশীল উপাদান।" প্রদীপও তার এই পাপকে শিল্পে রূপ দিতে চাইল।
৩
পরের দিন বিকেলে ঝড়-বৃষ্টির দাপট আরও বাড়ল। পুরো উত্তর দমদম অন্ধকারে ডুবে গেছে। সমীরণ ভিজে একসা হয়ে বর্মন বাড়িতে এসে আশ্রয় নিল। তার ওয়াটারপ্রুফ ল্যাপটপ ব্যাগটা আগলে সে রোহিণীর ঘরের তক্তপোশে বসল। ঘরের কোণে একটা পুরনো পিতলের হ্যারিকেন জ্বলছে, তার হলুদ আলো-ছায়ায় চারপাশের পরিবেশটা কোনো গথিক উপন্যাসের মতো দেখাচ্ছে।
"উফ, যা ওয়েদার! আজ আর সার্ভে হবে না," সমীরণ তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে বলল।
রোহিণী জানলার ধারে দাঁড়িয়ে ছিল। বাইরের ঝড়-বৃষ্টির শব্দে তার কোনো হেলদোল নেই। সে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, "কাজ না হলে গল্প হোক। প্রদীপদা তো কেমিক্যাল কিনতে শিয়ালদহ গেছে, ফিরতে অনেক রাত হবে।"
সমীরণ সুযোগটা হাতছাড়া করল না। সে তক্তপোশ থেকে উঠে রোহিণীর একদম কাছে গিয়ে দাঁড়াল। তার উগ্র পারফিউম ঘরের স্যাঁতসেঁতে গন্ধটাকে ছাপিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। "রোহিণী, তুমি এখনো এই মরণফাঁদে পড়ে আছ কেন?"
পোদ্দারবাবু বলছিলেন, এই সপ্তাহের মধ্যে পেপারের ফাইনাল ড্রাফটে সই করে দিলে মোটা টাকা অ্যাডভান্স সঙ্গে সঙ্গে ক্লিয়ার হয়ে যাবে। চলো না, এখান থেকে পালাই। আমাদের নতুন জীবন..."
সমীরণ রোহিণীর হাতটা শক্ত করে ধরল। রোহিণী আবার হাসল। কিন্তু সেই হাসিতে আজ কোনো মায়া ছিল না, ছিল এক জমাট বাঁধা বরফের মতো শীতলতা। সে সমীরণের চোখের দিকে না তাকিয়ে সোজা তাকাল ঘরের উত্তর দেওয়ালের মস্ত আয়নাটার দিকে।
ঠিক তখনই দরজার আড়ালে একটা ছায়ামূর্তি নড়ে উঠল। প্রদীপ শিয়ালদহ যায়নি। সে দাঁড়িয়ে ছিল দরজার ঠিক বাইরে, অন্ধকারের ব্ল্যাক-হোলের সঙ্গে মিশে। তার ডান হাতে একটা ওয়ান-এমএল ইনসুলিন সিরিঞ্জ। তাতে ভরা আছে ‘সাকসিনাইলকোলিন ক্লোরাইড’ (Succinylcholine chloride) — এক তীব্র নিউরোমাসকুলার ব্লকিং এজেন্ট। শরীরে প্রবেশ করার ঠিক তিন মিনিটের মধ্যে এটি ফুসফুসের ডায়াফ্রামের পেশিগুলোকে অবশ করে দেয়। কোনো লিগেচার মার্ক থাকবে না, কোনো ধস্তাধস্তির চিহ্ন থাকবে না। মৃতদেহের ময়নাতদন্তে ফরেনসিক টক্সিকোলজি রিপোর্টে বড় জোর আসবে কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট। কারণ এই ড্রাগটি শরীরে যাওয়ার পর খুব দ্রুত মেটাবোলাইজড হয়ে প্রাকৃতিকভাবে উৎপন্ন সাকসিনিক অ্যাসিডে পরিণত হয়, যা সাধারণ প্যাথলজি টেস্টে ধরা প্রায় অসম্ভব। প্রদীপ তৈরি হচ্ছিল সমীরণের ঘাড়ে সিরিঞ্জটা ফোটানোর জন্য। এক নিখুঁত, শৈল্পিক খুনের খসড়া। মধ্যবিত্তের রাগ তো এমনই, চিৎকার করে নয়, নিঃশব্দে বিষ ঢেলে দেওয়ার মতো।
কিন্তু প্রদীপকে তার শিল্পের শেষ তুলির টান দেওয়ার সুযোগ না দিয়েই রোহিণী হঠাৎ হা হা করে হেসে উঠল। সেই হাসির শব্দে বর্মন বাড়ির প্রাচীন দেওয়ালগুলো যেন কেঁপে উঠল। এক অতিপ্রাকৃতিক, অথচ অত্যন্ত যান্ত্রিক, হিসেবি হাসি।
রোহিণী আলতো পায়ে হেঁটে গিয়ে বেলজিয়াম গ্লাসের আয়নাটার একদম সামনে দাঁড়াল। তার ডান হাতের তর্জনীটা আয়নার মেহগনি ফ্রেমের একটা নির্দিষ্ট খোদাই করা পদ্মকুঁড়ির ওপর চেপে ধরল। একটা মৃদু, ধাতব "ক্লিক" শব্দ হলো।
সেই কুঠুরির টেবিলে স্তূপীকৃত হয়ে আছে মানুষের মাথার খুলি, কিছু পুরনো ফরেনসিক নথিপত্র, আর একটি চালু থাকা প্রাচীন রিল-টু-রিল ম্যাগনেটিক টেপ রেকর্ডার, যার ফিতেটা নিঃশব্দে ঘুরে চলেছে। পুরো ঘরজুড়ে হঠাৎ ছড়িয়ে পড়ল ফরমালিন আর পচনের এক তীব্র গন্ধ। আধুনিকতা আর লোভের গন্ধের চেয়ে এই পচনের গন্ধ অনেক বেশি সৎ।
সমীরণ আর প্রদীপ দুজনেই নিজ নিজ জায়গায় পাথরের মতো জমে গেল। প্রদীপের হাতের সিরিঞ্জটা মেঝেতে পড়ে গিয়ে একটা মৃদু কাচ ভাঙার শব্দ হলো।
৪
সমীরণ খেয়াল করল, তার নিজের হাত দুটো কাঁপছে। কথা বলতে গিয়ে দেখল, গলা শুকিয়ে কাঠ। চোখের মণি দুটো অতিরিক্ত প্রসারিত হয়ে চারপাশের হলুদ আলোটাকে সহ্য করতে পারছে না। সে অস্ফুটে বলল, "রোহিণী... আমার বুকটা... এরকম হচ্ছে কেন?"
রোহিণী সমীরণের দিকে তাকাল না। সে অন্ধকার কুঠুরি থেকে একটা মোটা চামড়ায় বাঁধানো ডায়েরি বের করে টেবিলের ওপর রাখল। ডায়েরির পাতায় পাতায় প্রদীপের রাতের বেলার সমস্ত কার্যকলাপের নিখুঁত স্কেচ আর ফরেনসিক অ্যানালিসিস। তার পাশে রাখা একটি পুরনো শিশি, যার গায়ে লেখা ‘অ্যাট্রোপিন সালফেট’। সমীরণের চায়ের লবঙ্গটা ওই তরলেই ডোবানো ছিল। ট্যাকিকার্ডিয়ার চেনা লক্ষণে সমীরণের হৃৎপিণ্ড তখন খাঁচায় বন্দি পাখির মতো ছটফট করছে। যে লোভ তাকে তাড়া করে নিয়ে বেড়াত, আজ সেই লোভের বিষই তার হৃদযন্ত্রের গতি থামিয়ে দিচ্ছে। একেই বলে প্রকৃতির অডিট রিপোর্ট।
"বর্মন বাড়ির এই নাচঘরের দেওয়ালে দেড়শো বছর ধরে অ্যাকোস্টিক কারসাজি করা আছে সমীরণবাবু," রোহিণী টেপ রেকর্ডারের বোতামটা আলতো করে টিপল। ঘরজুড়ে বেজে উঠল সমীরণ আর প্রমোটার পোদ্দারের সেই গোপন চক্রান্তের ফিসফিসানি। "এখানে বাতাসও কথা রেকর্ড করে।"
দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা প্রদীপ তখন কাঁপছে। তার হাতের সাকসিনাইলকোলিনের ভায়ালটা যে ইতিমধ্যেই রোহিণী বদলে রেখেছে, তা সে মেঝেতে পড়ে থাকা তরলের গন্ধেই টের পেয়েছে। সে নিজেই নিজের জালে আটকে পড়া এক অন্ধ মাকড়সা।
রোহিণী এবার ধীর পায়ে এগিয়ে গেল দেওয়ালে টাঙানো বর্মন বাড়ির সেই বিখ্যাত শিকারির মেয়ের তৈলচিত্রটার সামনে। ছবির মেয়েটির সেই শীতল, নিষ্ঠুর চোখ আর রোহিণীর চোখ একই আলোয় জ্বলছে।
"তোমরা ভেবেছিলে, এই বর্মন বাড়িটা একটা ভাঙা ইটের স্তূপ?" রোহিণী হ্যারিকেনের আলোটা এক ফুঁয়ে নিভিয়ে দিল। ঘরের একমাত্র আলোর উৎস এখন জানলা দিয়ে আসা উত্তর দমদমের সেই কালচে কুয়াশামাখা মরা জোছনা। সে অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বলল, "আমার বাবা ছিলেন এই রাজ্যের চিফ ফরেনসিক এক্সপার্ট। আর আমি শুধু আমার ডক্টরাল থিসিসের শেষ প্র্যাক্টিক্যাল অধ্যায়টা লিখছিলাম। তোমরা দুজনে ছিলে আমার ল্যাবের দুটো চমৎকার সাবজেক্ট। এক্সপেরিমেন্ট ইজ ওভার।"
কোনো পুলিশ এল না। কোনো সাইরেনের আওয়াজ উত্তর দমদমের নিস্তব্ধতাকে ভাঙল না। সমীরণ বিষের তীব্রতায় অবশ হয়ে তক্তপোশের ওপর ঢলে পড়ল, তার চোখ দুটো সিলিংয়ের দিকে স্থির। তার আইফোনটা মাটিতে পড়ে তখনো নিঃশব্দে ভাইব্রেট করে চলেছে পোদ্দারের কোনো ইনকামিং কলে। পোদ্দারেরা তো ফোন করেই যাবে, কিন্তু উত্তর দেওয়ার মতো মানুষগুলো সস্তা প্লটের খসড়া হয়ে ধুলোয় মিশে যাবে।
আর প্রদীপ? সে ধীরে ধীরে হেঁটে গিয়ে দাঁড়াল সেই পারদ-মুক্ত স্বচ্ছ কাচের সামনে।
বাইরে কুয়াশা আর বৃষ্টির শব্দ তখন এক ভৌতিক ঐকতান তৈরি করেছে। প্রদীপ কাচের ওপারে কোনো রোহিণীকে দেখতে পেল না। সে দেখল, অন্ধকারের ওপার থেকে সে নিজেই দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু তার শরীরে জড়ানো রোহিণীর সেই পুরনো ঢাকাই শাড়ি, আর তার নিজের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠেছে রোহিণীর সেই চিরন্তন, বিষণ্ণ, শিকারির হাসি। সে নিজেকে খুঁজতে গিয়ে অন্য এক সত্তার দাসত্ব মেনে নিল।
রোহিণী ঘর থেকে কখন নিঃশব্দে বেরিয়ে গেছে, কেউ তা টের পায়নি। শুধু বর্মন বাড়ির মেহগনি ফ্রেমের সেই আয়নাটা অন্ধকারের ব্ল্যাক-হোলে দাঁড়িয়ে রইল — এক অনন্ত মনস্তাত্ত্বিক খাঁচা হয়ে, যেখানে প্রদীপ নিজের তৈরি করা প্রতিবিম্বের গোলকধাঁধায় চিরদিনের মতো বন্দি হয়ে গেল।
মানুষ আসলে অন্য কাউকে খুন করে না, সে প্রতিদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের আসল রূপটাকেই একটু একটু করে হত্যা করে।
লেখক ২২ শে সেপ্টেম্বর, ১৯৫৫ সালে দমদম রবীন্দ্রনগরে জন্মগ্রহণ করেন এবং জন্মাবধি সপরিবারে পৈতৃক বসত বাড়িতেই বসবাস করেন। পিতা স্বর্গীয় সুরেন্দ্র নাথ চক্রবর্ত্তী এবং মাতা স্বর্গীয় বীনাপানি চক্রবর্ত্তী। বর্তমানে তাঁর পরিবারে রয়েছেন স্ত্রী শিবানী চক্রবর্ত্তী, কন্যা পূবালী (বিবাহিত) এবং পুত্র নবীন কুমার। 'নবু' নামে পরিচিত এই লেখক বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন অঙ্গনে তাঁর অনন্য প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন।
আপনার প্রতিক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
প্রতিক্রিয়া দেওয়ার নিয়ম
আপনি এই সংখ্যায় আপনার পছন্দের সব লেখাতেই প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবেন। তবে একটি লেখায় সর্বোচ্চ ২টি ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেওয়া যাবে। একই লেখায় তৃতীয় প্রতিক্রিয়া নির্বাচন করলে, প্রথমে নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং নতুন প্রতিক্রিয়াটি গণ্য হবে। আপনার প্রতিটি প্রতিক্রিয়া লেখকদের অনুপ্রেরণা জোগায় এবং বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সৃজনশীলতার প্রতি আপনার সমর্থনকে তুলে ধরে।