সকালের চা হাতে নিয়ে ঠাকুমা যখন ব্যাংক থেকে আসা এসএমএসটি আমার সামনে ধরে বললেন, "এই যে একটা নম্বর এসেছে, এটা আবার কাকে বলব?", তখন বুঝতে পারলাম, আমাদের জীবনে প্রযুক্তির অগ্রগতি যত দ্রুত ঘটছে, তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা সবার পক্ষে সমান সহজ নয়। যে মানুষটি একসময় সংসারের হিসাব মাথায় রেখে পুরো পরিবার সামলেছেন, বাজারের দাম মুখস্থ জানতেন, আত্মীয়-স্বজনের জন্মদিন থেকে পারিবারিক আচার — সবকিছু নিখুঁতভাবে মনে রাখতেন, সেই মানুষটিই আজ একটি ওটিপির সামনে অসহায় বোধ করেন।
ওটিপি — ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড। আধুনিক ডিজিটাল নিরাপত্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ব্যাংকিং, অনলাইন কেনাকাটা, সরকারি পরিষেবা, মোবাইল রিচার্জ, গ্যাস বুকিং, বিমার প্রিমিয়াম জমা — প্রায় সব ক্ষেত্রেই এখন ওটিপি অপরিহার্য। এর উদ্দেশ্য হলো ব্যবহারকারীর পরিচয় নিশ্চিত করা এবং প্রতারণা রোধ করা। কিন্তু প্রযুক্তির এই নিরাপত্তা ব্যবস্থা অনেক প্রবীণ মানুষের কাছে এক নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আমার ঠাকুমার বয়স পঁচাত্তর বছর। জীবনের অধিকাংশ সময় তিনি কাটিয়েছেন এমন এক পৃথিবীতে, যেখানে ব্যাংকের কাজ মানে ছিল পাসবই আপডেট করা, বিদ্যুতের বিল জমা দেওয়া মানে লাইনে দাঁড়ানো, আর খবর নেওয়ার জন্য দরকার হতো মানুষের সঙ্গে সরাসরি কথা বলা। তাঁর কাছে বিশ্বাস মানে ছিল মানুষের মুখের কথা। অথচ আজকের পৃথিবীতে একটি ছোট্ট ছয় সংখ্যার কোডের উপর নির্ভর করছে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা।
প্রযুক্তির উন্নয়ন নিঃসন্দেহে আমাদের জীবনকে সহজ করেছে। ভারতের ডিজিটাল বিপ্লবের ফলে কোটি কোটি মানুষ ঘরে বসে নানা পরিষেবা পাচ্ছেন। ইউনিফাইড পেমেন্টস ইন্টারফেস (UPI)-এর মাধ্যমে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ লেনদেন হচ্ছে। সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের সুবিধাও এখন ডিজিটাল মাধ্যমের মাধ্যমে পৌঁছে যাচ্ছে সাধারণ মানুষের কাছে। কিন্তু এই পরিবর্তনের মধ্যে প্রবীণদের একটি বড় অংশ নিজেদের বিচ্ছিন্ন মনে করছেন।
এই ভয় অমূলক নয়। বর্তমানে ওটিপি প্রতারণা বা সাইবার জালিয়াতির ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। প্রতারকেরা নিজেদের ব্যাংককর্মী বা সরকারি আধিকারিক পরিচয় দিয়ে ফোন করে ওটিপি জেনে নেওয়ার চেষ্টা করে। ফলে প্রবীণদের মধ্যে বিভ্রান্তি আরও বাড়ে।
আমার ঠাকুমাও একদিন এমন একটি ফোন পেয়েছিলেন। ফোনের ওপারে থাকা ব্যক্তি বলছিলেন যে, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আপডেট করতে ওটিপি জানাতে হবে। ঠাকুমা কিছুটা বিচলিত হয়ে আমাকে ডাকলেন। আমি তাঁকে বুঝিয়ে বললাম যে, ব্যাংক কখনও ফোন করে ওটিপি চায় না। সেদিন তাঁর মুখে স্বস্তির হাসি ফুটে উঠেছিল। কিন্তু সেই হাসির আড়ালে আমি একটি বড় সত্য উপলব্ধি করেছিলাম — প্রযুক্তি সম্পর্কে সচেতনতার অভাব শুধু অসুবিধা নয়, বিপদেরও কারণ হতে পারে।
তবে এই গল্প কেবল অসহায়তার নয়; এটি শেখার ইচ্ছা ও মানিয়ে নেওয়ার গল্পও। প্রথমদিকে ঠাকুমা স্মার্টফোন হাতে নিতেই ভয় পেতেন। কিন্তু ধীরে ধীরে তিনি শিখলেন কীভাবে এসএমএস পড়তে হয়, কীভাবে ওটিপি খুঁজে বের করতে হয় এবং কোন পরিস্থিতিতে সেটি ব্যবহার করতে হয়। এখন তিনি মাঝেমধ্যে নিজেই বলেন, "এই নম্বরটা কি ওই ওটিপি?" তাঁর এই ছোট্ট প্রশ্নের মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক বড় জয়।
প্রবীণ মানুষদের প্রযুক্তি ব্যবহারে সক্ষম করে তোলার দায়িত্ব শুধু তাঁদের ব্যক্তিগত নয়; এটি পরিবারের এবং সমাজেরও দায়িত্ব। ধৈর্য ধরে তাঁদের শেখানো, একই বিষয় বারবার বোঝানো, নিরাপত্তা-সংক্রান্ত তথ্য সহজ ভাষায় জানানো অত্যন্ত জরুরি। অনেক সময় আমরা তরুণরা অধৈর্য হয়ে বলি, "এত সহজ জিনিসও বুঝতে পারো না?" কিন্তু আমরা ভুলে যাই, যাঁরা আজ প্রযুক্তির সঙ্গে লড়াই করছেন, তাঁরাই একদিন আমাদের হাঁটতে, কথা বলতে এবং জীবনের নানা শিক্ষা নিতে সাহায্য করেছিলেন।
ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি কেবল প্রযুক্তির প্রসার নয়; এটি সমান অংশগ্রহণের বিষয়। একটি সমাজ তখনই সত্যিকারের উন্নত হয়, যখন উন্নয়নের সুবিধা সব বয়সের মানুষের কাছে পৌঁছায়। যদি কোনও প্রবীণ মানুষ শুধুমাত্র প্রযুক্তিগত জটিলতার কারণে নিজের প্রাপ্য পরিষেবা থেকে বঞ্চিত হন, তবে সেই উন্নয়ন অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
আমার ঠাকুমার কাছে ওটিপি এখনও খুব প্রিয় কোনও শব্দ নয়। মাঝেমধ্যে তিনি বিরক্ত হয়ে বলেন, "আগে কত সহজ ছিল সব!" তাঁর কথায় নস্টালজিয়া আছে, কিছুটা আক্ষেপও আছে। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি এখন জানেন যে পরিবর্তন জীবনেরই অংশ। তিনি চেষ্টা করছেন নতুন পৃথিবীকে বুঝতে, আর আমরা চেষ্টা করছি তাঁকে সেই পথে সঙ্গ দিতে।
আসলে ওটিপির যুগে আমার ঠাকুমার গল্প শুধুমাত্র একজন প্রবীণ নারীর প্রযুক্তি শেখার গল্প নয়। এটি প্রজন্মের মধ্যে সেতুবন্ধনের গল্প। এটি ধৈর্যের গল্প, সহমর্মিতার গল্প এবং একসঙ্গে এগিয়ে চলার গল্প। প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, মানবিকতা যদি তার সঙ্গে না থাকে, তবে সেই উন্নয়ন অপূর্ণ থেকে যায়।
একটি ছয় সংখ্যার ওটিপি আমাদের কাছে হয়তো কয়েক সেকেন্ডের ব্যাপার। কিন্তু একজন প্রবীণ মানুষের কাছে এটি হতে পারে আত্মবিশ্বাস অর্জনের একটি নতুন ধাপ, স্বাধীনভাবে কাজ করার একটি সুযোগ এবং পরিবর্তিত সময়ের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেওয়ার এক সাহসী প্রচেষ্টা।
ওটিপির যুগে আমার ঠাকুমা তাই কেবল একজন প্রবীণ নারী নন; তিনি পরিবর্তনকে গ্রহণ করার সাহসের প্রতীক। তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন যে শেখার কোনও বয়স হয় না, আর সামান্য সহানুভূতি ও সহযোগিতা থাকলে ডিজিটাল পৃথিবীতেও মানবিক সম্পর্কের উষ্ণতা অটুট রাখা সম্ভব। প্রযুক্তি হয়তো আমাদের ভবিষ্যতের পথ দেখায়, কিন্তু সেই পথে এগিয়ে চলার শক্তি আমরা পাই পরিবার, ভালোবাসা এবং একে অপরের পাশে থাকার মধ্য দিয়ে।
আপনার প্রতিক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
প্রতিক্রিয়া দেওয়ার নিয়ম
আপনি এই সংখ্যায় আপনার পছন্দের সব লেখাতেই প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবেন। তবে একটি লেখায় সর্বোচ্চ ২টি ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেওয়া যাবে। একই লেখায় তৃতীয় প্রতিক্রিয়া নির্বাচন করলে, প্রথমে নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং নতুন প্রতিক্রিয়াটি গণ্য হবে। আপনার প্রতিটি প্রতিক্রিয়া লেখকদের অনুপ্রেরণা জোগায় এবং বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সৃজনশীলতার প্রতি আপনার সমর্থনকে তুলে ধরে।