ভোর পাঁচটা দশ মিনিট। তখনও আকাশ ভালো করে ফোটেনি। মিনাখাঁ ইন্ডাস্ট্রিয়াল এস্টেটের ভেতরকার 'আলোকম টেক্সটাইল'-এর ক্যানটিন চত্বরটা জেগে উঠেছে। সিমেন্টের বেঞ্চে বসে আছে জনা পনেরো তরুণ-তরুণী। সবাই অপেক্ষায়। আজ রাতের শিফট শেষ হবে।
তাদের মধ্যে প্রবীণতম হলো বিশ্বজিৎ। বয়স তেত্রিশ। ফর্সা মুখটা এখন তেলকালি আর ক্লান্তিতে কালচে দেখাচ্ছে। পাশে বসে আছে সদ্য কলেজপাশ করা অরুণিমা। যার চোখে এখনও ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার স্বপ্ন ঝলমল করে। দু'জনেই এই কারখানায় যুক্ত 'সূর্যোদয় ভেন্ডার সার্ভিসেস'-এর মাধ্যমে।
বিশ্বজিৎ একটা বিড়ি ধরিয়ে ফিসফিস করে বলল, "আরে, অরুণিমা। আজ আবার 'সার্ভার ডাউনের' নাটক চলল? নাইট ডিউটি পনেরো মিনিট বাড়ালো কেন রে?"
অরুণিমা মুখে বিরক্তি ফুটিয়ে উত্তর দিল, "নাটক নয় তো কী! কাজটা পুরো শেষ করিয়ে তবে ছাড়বে। প্রোডাকশনের ডেডলাইন নাকি খুব টাইট। মেইন কোম্পানির কর্মচারীরা তো দশ মিনিট আগেই ব্যাগ গুছিয়ে নিয়েছে। কিন্তু আমরা? আমরা তো ভেন্ডারের লোক! আমাদের কোনো নিয়ম নেই।"
এই কারখানার মূল গেটের ওপারে যারা কার্ড পাঞ্চ করে ঢোকে, আর গেটের ভেতরে যারা 'ভেন্ডারের প্যাকেট' হিসেবে ঢোকে, তাদের মাইনে, ছুটি, এমনকি চা পানের বিরতিতেও আকাশ-পাতাল তফাৎ। তফাৎটা অরুণিমার মতো উচ্চাকাঙ্ক্ষী মেয়েদের চোখে বেশি জ্বালা ধরায়।
ভেন্ডারের মাধ্যমে নিযুক্ত কর্মীদের চোখে থাকে একরাশ আশা। তারা জানে, ঠিকা কাজ মানেই কম মাইনে, অনিশ্চিত জীবন। তাদের বিশ্বাস, কারখানার ভেতরে একবার ঢুকতে পারলে নিজেদের দক্ষতা প্রমাণ করে একদিন মূল কোম্পানিতে 'পাকা' কর্মী হওয়া যাবে। অরুণিমার তো স্বপ্ন, এই টেক্সটাইল কারখানায় কাজ করতে করতে সে সন্ধ্যেবেলা দূরশিক্ষায় ম্যানেজমেন্টের কোর্স করবে।
বিশ্বজিৎ হেসে বলল, "আরে বাবা, পাকা হওয়া কি মুখের কথা? আমি তো আট বছর ধরে এই কোম্পানির গেটে ঘুরছি। ছ'টা ভেন্ডার বদলে গেল আমার লাইফে। সেই একই মাইনে। একই ছুটিহীন জীবন। কী জানিস? ভেন্ডার বদলায়। আর শুধু ইএসআই কার্ডের নম্বরটা বদলায়। আমাদের ভাগ্যটা বদলায় না।"
পাশের যুবক, নাম প্রীতম। মাথা নাড়ল। প্রীতমের বাবা এই কারখানার মূল কর্মী ছিলেন। বাবার অবসরের পর সে সরাসরি কোম্পানিতে চাকরি চেয়েছিল। পায়নি। ভেন্ডার তাকে দিয়েছে 'ডাটা এন্ট্রি' অপারেটরের কাজ।
এরা যেন সবাই একটা কাঁচের জালের ভেতর আটকে থাকা প্রজাপতি। জালটা অদৃশ্য। কিন্তু খুব শক্ত। বাইরে বেরোনোর তীব্র আকাঙ্ক্ষা আছে। কিন্তু প্রতিবার চেষ্টা করলেই জালের তারে আঘাত লেগে রক্তাক্ত হচ্ছে তাদের স্বপ্ন।
সেদিন কারখানার ম্যানেজার মি. শর্মা ইনস্পেকশনে এলেন। মূল কর্মীদের সঙ্গে খুব ভালো ব্যবহার করলেন। ভেন্ডার কর্মীদের দিকে একবারও তাকালেন না।
সন্ধ্যাবেলা, কাজের বিরতিতে অরুণিমা এক সহকর্মীকে বলল, "জানিস, আমাদের ভেন্ডারের সুপারভাইজার গতকাল বলছিল, 'তোমরা মন দিয়ে কাজ করো। কোম্পানি তোমাদের কাজ দেখছে। খুব তাড়াতাড়ি তোমাদের সবাইকে 'ডিরেক্ট রোল'-এ আনা হবে।'"
বিশ্বজিৎ এবার উঠে দাঁড়াল। তার চোখে হাসি নেই। সে হতাশ কণ্ঠে বলল, "বাজে কথা! এই কোম্পানির ডিরেক্ট রোলে শুধু মালিকের আত্মীয়, আর বড় নেতাদের লোক ঢোকে। ভালো কাজ করার পুরস্কার? সেটা হলো, ভেন্ডার তোমার মাইনেটা আরও এক বছর বাড়াবে না। যাতে তুমি কোম্পানির কাছে কম টাকায় আরও বেশি কাজ করো।"
অরুণিমা একটু যেন চুপসে গেল। তার উচ্চশিক্ষিত মন এই হিসেবটা বোঝে। সে জানে, তার দক্ষতা মূল্যায়িত হচ্ছে না। শুধু তার শ্রমের মূল্য নির্ধারিত হচ্ছে চুক্তির কাগজে।
মনে পড়ল এক বন্ধুর কথা, যে তার চেয়েও কম পড়েছে, অন্য একটা ছোট কারখানায় সরাসরি কর্মী। কিন্তু তার মাইনেও বেশি। ছুটিও বেশি। আর সে? একটা 'নাম-করা' কোম্পানির ভেতরে থেকেও বাইরের লোক। এই হলো ভেন্ডার সিস্টেমের বাস্তব প্রতিফলন।
দিনের পর দিন তাদের এই আশা আর হতাশার দোলাচল চলতে থাকে। তারা জানে, তাদের কপালটা ঠিকা কাগজে লেখা হয়ে গেছে।
রাত শেষ হয়। বাইরে সূর্যোদয় হচ্ছে। ক্যানটিন চত্বর ছেড়ে সবাই বেরিয়ে আসছে। বিশ্বজিৎ, অরুণিমা, প্রীতম; সবাই একসঙ্গে হাঁটছে কারখানার মূল ফটকের দিকে।
গেট পেরিয়ে বাইরে বেরোনোর সময় বিশ্বজিৎ নিজের মনেই উচ্চারণ করল, "কাল আবার দেখা হবে।"
অরুণিমা শুধু মাথা নাড়ল। তার চোখে এখন আর কোনো স্বপ্ন বা বিরক্তির ঝলক নেই। শুধু এক গভীর নীরব ক্লান্তি। আগামীকালের শিফটে আবার সুপারভাইজার আসবে। নতুন মিথ্যে আশা দেবে। সে শুনবে, কিন্তু বিশ্বাস করবে না। আট বছরের অভিজ্ঞতা তাকে শিখিয়েছে, কারখানার ভেতরে থাকা সত্ত্বেও জীবনটা সবসময় ফটকের বাইরেই থেকে যায়।
তারা হেঁটে চলে গেল। পোশাক ধুলোয় ধূসর। ভেতরের যন্ত্রণাটা জ্বলজ্বল করছে এই শিল্পতালুকের অন্য হাজার হাজার ঠিকা শ্রমিকের মতো। তারাও একটা দীর্ঘ নীরবতার অংশ।
আপনার প্রতিক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
প্রতিক্রিয়া দেওয়ার নিয়ম
আপনি এই সংখ্যায় আপনার পছন্দের সব লেখাতেই প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবেন। তবে একটি লেখায় সর্বোচ্চ ২টি ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেওয়া যাবে। একই লেখায় তৃতীয় প্রতিক্রিয়া নির্বাচন করলে, প্রথমে নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং নতুন প্রতিক্রিয়াটি গণ্য হবে। আপনার প্রতিটি প্রতিক্রিয়া লেখকদের অনুপ্রেরণা জোগায় এবং বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সৃজনশীলতার প্রতি আপনার সমর্থনকে তুলে ধরে।