ব্যস্ত শহরের সুসজ্জিত একটা শপিং মল, সময় তখন সন্ধ্যা। বারো বছরের মেয়ের জন্য কেনাকাটায় ব্যস্ত ছিল রুবি রায়। বয়স উনচল্লিশ ছুঁয়েছে, তবুও মুখে এখনও সৌন্দর্যের ছাপ স্পষ্ট। শুধু চোখের নিচের ক্লান্তির রেখাগুলো বলে দেয় — জীবন তাকে কম পথ হাঁটায়নি।
হঠাৎ তার সেলফোনটি বেজে ওঠে — "হ্যালো হ্যাঁ, মামণি, তুমি আন্টির কাছে তোমার পড়া শেষ করো, তার আগেই চলে আসব আমি... উঃ... মা... আমার সোনা মা। আচ্ছা, রাখছি এখন, ওকে।" ফোনে কথাগুলো শেষ করেই রুবি ফোনটা ব্যাগের মধ্যে ঢুকিয়ে রেখে মাথা তুলতেই মলের জামাকাপড়ের ফাঁক দিয়ে দূরে এক প্রৌঢ় ভদ্রলোকের দিকে দৃষ্টি পড়তেই একপ্রকার যেন চমকে উঠল রুবি। আরে! এ তো সেই অতনুদা না? হ্যাঁ হ্যাঁ, হুবহু সেইরকম চেহারা, বয়সের ছাপ পড়ে গেছে বটে, তবে হাঁটাচলা একই রকমের, মুখের দাড়িগুলো একটু পেকে গেছে, কিন্তু এখনও বেশ সুদর্শন। কথা বলব গিয়ে? যদি অতনুদা না হন? এক মুহূর্তের মধ্যে এইসব কথাগুলো রুবির মনকে যেন তোলপাড় করে তুলল। কেনাকাটা ফেলে কী যেন একটা তাড়নায় হনহন করে এগিয়ে গেল রুবি সেই ভদ্রলোকের দিকে, যদি উনি মল ছেড়ে বেরিয়ে যান, যদি আর না দেখা হয় — এতশত ভাবতে ভাবতেই ভদ্রলোকের একদম ঠিক কাছেই চলে এল সে, বুকে তখন তার অজানা ভয় আর দ্রুততার সঙ্গে বেড়ে ওঠা হৃদকম্পন, কোনোমতে চোখকান বুজে ডেকেই ফেলল — "অ... অতনুদা..." রুবির তখন গলা শুকিয়ে কাঠ। ডাক শুনেই চমকে পিছন দিকে ঘুরে তাকাল অতনু চ্যাটার্জী, বছর বিয়াল্লিশের নিপাট ভদ্রলোক, সুঠাম চেহারা, ফরসা, একসময় রুবির চোখে কলেজের সবচেয়ে সুদর্শন ব্যক্তি।
আশ্চর্য হয়ে গেল রুবির দিকে তাকিয়ে, চোখের পলক পড়ে না তার। ভুল দেখছে না তো, এ তো সেই কলেজে পড়া তার সবচেয়ে প্রিয় বান্ধবী রুবি রায়। গলাটা শুনেই বুঝতে পেরেছে সে, অনেক চেনা একটা কণ্ঠস্বর। এতসব ভাবতে ভাবতেই রুবি বলে উঠল, "দেখুন, কিছু যদি মনে না করেন, মানে আপনি সেই অতনু চ্যাটার্জী তো? বিদ্যাসাগর কলেজ? মানে..."
"আরে রুবি, কী বলছো? তোমায় আমি চিনতে পারব না, কলেজের সেই ছটফটে মেয়েটাকে? কী সুন্দর চমক! কী খবর বলো? কেমন আছো? কোথায় থাকো?" অবাক চোখে হাজারটা প্রশ্ন করে ফেলল অতনু। রুবি হাসতে হাসতে — "বলছি বলছি, সব বলছি। তার আগে আপনি বলুন তো, হঠাৎ করে আপনি এই মলে কোথা থেকে এলেন? কোথায় থাকেন এখন? কী করেন? কেমন আছেন?" অবাক করা হাজারও প্রশ্ন তখন রুবির মুখেও। হা হা করে হাসতে হাসতে অতনু বলল — "দুজনের মধ্যে জমে থাকা এত প্রশ্নের উত্তর কি আর এই ব্যস্ত মলে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেওয়া সম্ভব? আচ্ছা, হাতে কি একটু সময় আছে? মানে যদি সম্ভব হয় তবে একটু কোথাও বসে — মানে..."
কথা শেষ হতে না হতেই রুবি বলে উঠল — "অবশ্যই। এতদিন পরে হঠাৎ করে দেখা হলো, একটু তো বসতেই হয়। দূরে যাওয়ারও দরকার নেই, এই মলেরই ওপরের তলায় একটা বেশ সুন্দর ফুড কোর্ট আছে। চলুন ওখানেই বসি, আমার হাতে একটু তো সময় আছেই।" রুবির কথায় হেসে সম্মতি জানিয়ে অতনু বলল — "সেই ভালো, তাহলে ওপরেই যাওয়া যাক। আচ্ছা চলুন।" এই কথা বলে দুজনে মিলে চলমান সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেল।
মলের ওপরের তলার ফুড কোর্টটি বেশ সুন্দর করে সাজানো, আলো-আঁধারি পরিবেশ, রকমারি খাবারের সুগন্ধে চারদিক ম-ম করছে। তারই মাঝে সাজানো টেবিলগুলোতে যে যার ঘনিষ্ঠজনের সঙ্গে খাবারের স্বাদ গ্রহণ করতে ব্যস্ত, আর খুব নিচুস্বরে সবাই কথা বলছে। এরকম স্বপ্নময় পরিবেশে কোণের দিকে একটা টেবিল পছন্দ করে ওরা দুজন গিয়ে বসল। পাশের খোলা জায়গা দিয়ে চলমান শহরটাকে বেশ সুন্দর দেখা যাচ্ছিল, অনেক উঁচু থেকে দেখতে আলাদাই রোমাঞ্চ লাগে। দুজনে মুখোমুখি, রুবি আর অতনু।
মুখে মৃদু হাসি নিয়ে অতনুই প্রথম শুরু করল কথাটা — "একটা কথা বলব তোমায়?" আয়ত চোখে অতনুর দিকে তাকিয়ে রুবি বলল, "হ্যাঁ বলুন না।" "না... বলছিলাম, সেই থেকে আমাকে আপনি আপনি বলে সম্বোধন করার মতো এতটা দূরত্ব মনে হয় এখনও তৈরি হয়নি।" অতনুর মুখে হঠাৎ এই কথাটা শুনে খুবই লজ্জা পেয়ে গেল রুবি। চোখটা নামিয়ে এক গাল হেসে সে বলল — "আরে না না, আসলে একটা দীর্ঘ দূরত্ব তো। আচ্ছা বলো, কী নেবে... কফি?" "হ্যাঁ, আপত্তি নেই," বলেই অতনু দুই কাপ কফি অর্ডার দিয়ে দিল। "আর কী কিছু অর্ডার করব?" রুবির মুখে এই প্রশ্ন শুনে অতনু বলে উঠল, "আরে না না, আসল উদ্দেশ্য তো কথা বলা। খেতে গিয়ে কথা কম পড়ে যায় যদি।" হা হা করে হেসে ফেলল রুবি, এখনও ঝলমলে সেই হাসি, ফেলে আসা সেই দিনগুলোর মতোই।
অতনু বলা শুরু করল — "আচ্ছা, কলেজের সেই হৈচৈ ভরা রঙিন দিনগুলোর কথা মনে আছে তোমার?" "বাব্বা! সে আর মনে থাকবে না! সবাইকে নিয়ে হৈ-হুল্লোড় করে গোটা কলেজ একেবারে মাতিয়ে রাখতে তুমি, সেই স্মৃতি কি ভোলা যায়? নাচ, গান, অন্ত্যাক্ষরী, লাফালাফি, দৌড়াদৌড়ি — উফ্, অসম্ভব সুন্দর কাটিয়েছি আমরা সেইসব দিনগুলি," এক নিঃশ্বাসে বলল রুবি। অতনু জবাব দিল — "হ্যাঁ, তুমিও তো কোনো অংশে কম যেতে না, সমানে আমার সঙ্গে পাল্লা দিতে। সেই জন্যই তো কলেজে এত মেয়ে থাকতে তোমাকেই আমার সেরা বন্ধু বলে মনে হতো। গানই ছিল আমাদের সম্পর্কের মূল সেতু।"
রুবি মাথাটা তুলে লাজুক চোখে একটু চারপাশ দেখে নিয়ে বলল, "এখানে?" "হ্যাঁ, তো কী হয়েছে, দু-লাইনই তো গাইব..." বলেই রাহুলদেব বর্মনের সেই বিখ্যাত গান — "মনে পড়ে রুবি রায়, কবিতায় তোমাকে..." প্রথম পঙ্ক্তিটা একটু নিচুস্বরে গেয়ে শোনাল অতনু। তারপর আনন্দে অমলিন হাসি হাসল দুজনে। পরে হাসি থামিয়ে রুবি বলল — "সত্যি! কী অসাধারণ গান বলো তো, অতনুদা? প্রেমে না পড়লে কি এমন গান লেখা যায়?" একটু থেমে একটা ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে রুবি আবারও বলল — "তখন বুঝিনি জানো তো, আজ বেশ বুঝতে পারি এই গানের প্রতিটি কথা আমাদের জীবনে বাস্তব সত্যি হয়ে গেল।" রুবির মুখের দিকে অল্পক্ষণ তাকিয়ে রইল অতনু, তারপর কফির কাপে চুমুক দিয়ে বলল — "কত কবিতাই লিখতাম তখন, প্রেমে পড়লেই লোকে কবি হয়ে যায়।"
"মনে আছে তোমার লেখা সেই চিঠিগুলোর কথা?" অতনুর দিক থেকে চোখটা নামিয়ে পুরনো স্মৃতিতে ডুবে গেল রুবি, বলল — "মনে নেই আবার! তোমার এক একটা চিঠি মানেই তো এক একটি কবিতা। আমি তো খুব চিন্তায় পড়ে যেতাম উত্তর দিতে গিয়ে, কারণ আমি তো আর তোমার মতো অত গভীর করে মনের কথা লিখতে পারতাম না। তাই সারারাত গালে পেন ঠেকিয়ে বসে বসে ভাবতাম আর ভাবতাম... এইভাবে যে কত রাত না ঘুমিয়েই সকাল হয়ে যেত, আজ আর তার হিসাব নেই।" অতনু বলল — "হ্যাঁ ঠিক, আমিও বেশ বুঝতে পারতাম তুমি প্রতিটি চিঠিতেই আমাকে টেক্কা দিতে চাইতে, কিন্তু পেরে উঠতে না। কিন্তু তাই বলে আমাদের মধ্যে একে অপরের প্রতি কোনো ঈর্ষা ছিল না। কত সহজ-সরল ছিল আমাদের সেই ফেলে আসা দিনগুলো, অতশত কিছু না ভেবেই কেবল অন্তরের আবেগ থেকে দুজন-দুজনকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবেসে যাওয়া... সেই সময়ে রুবি নামটা আমার শ্বাস-প্রশ্বাসে মিশে গিয়েছিল, শুধু কাগজে-কলমে না, আমার তরুণ হৃদয়ে গেঁথে নিয়েছিলাম ওই নামটা, যা আর কোনোদিনও মোছার ছিল না।"
কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে এতক্ষণ কথাগুলো শুনছিল রুবি। শেষের এই কথাটি শুনে তার কফির চুমুক যেন থমকে গেল। কাপটা শব্দ করে প্লেটের ওপর রেখে হতাশ সুরে বলে উঠল — "হ্যাঁ গো, আমিই দাম দিতে পারলাম না এই সম্পর্কটার।" কলেজ পাস আউট করার পর সবাই যে যার মতো ছিটকে গেল, তখন তো সেলফোন ছিল না, বাড়িতে শুধু একটাই ল্যান্ডফোন, তাও আবার বাবার ঘরে। আর তোমারও তখন এমন শরীর খারাপ করল, অনেক চেষ্টা করেও তোমার সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ করে উঠতে পারলাম না। এদিকে বাবাও প্রায় জোর করেই আমার বিয়ের ব্যবস্থা পাকা করে ফেললেন। অতনু রুবিকে চুপ করিয়ে দিয়ে বলল — "থাক না আজ ওসব কথা, সবার প্রেম কি জীবনে পূর্ণতা পায়? আর শুধু পাওয়াতেই কি প্রেমের সার্থকতা? কতজনের জীবনে প্রেম পরিণতি পায়!" রুবি ভাঙা গলায় বলল, "হয়তো সত্যিই তাই, আমাদের প্রেমটা কলেজ জীবনের একটা উন্মাদনাই ছিল।" দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে।
অতনু বলল — "না না, ঠিক তেমন নয়, আসলে আমরা দুজনেই ছিলাম পরিস্থিতির শিকার। আমিও তখন বেকার ছিলাম, তাই ইচ্ছেটা ইচ্ছেই হয়ে থেকে গেল, বাস্তবে রূপ দিতে পারলাম না।" দুজনেই একটুখানি চুপ করে রইল। তারপর অতনু আবার বলতে শুরু করল — "জানো... তোমার বিয়ের খবরটা বিজন এসে আমায় দিয়েছিল। আমি তখন হাসপাতালের বেডে শুয়ে, একটু একটু করে সুস্থ হয়ে উঠছি। বিজন আস্তে আস্তে কাছে এসে, আমার কানের কাছে মুখটা এনে বলল, তোর রুবির বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। সাতদিনের মধ্যেই ওর বিয়ে। সমস্ত পৃথিবীটা যেন এক মুহূর্তে আমার চোখের সামনে অন্ধকার হয়ে গেল। হাসপাতালের পাশ দিয়ে একটা সরু নদী বয়ে যেত। কোনোরকমে টলতে টলতে বিছানা থেকে নেমে বড় জানালাটার পাশে দাঁড়িয়ে ওই বয়ে যাওয়া নদীটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। সেদিন মনে হয়েছিল ওই নদীর সমস্ত জল যেন আমার দু-চোখ বেয়ে আমার জামা, আমার শুকনো বুকটা ভিজিয়ে দিচ্ছে। কিছুতেই রুখতে পারিনি সেদিন নিজেকে। শুধুই নদীটার দিকে তাকিয়ে নিজের কষ্টটাকে সবার কাছে লুকোনোর চেষ্টা করেছিলাম।"
রুবি মাথা নিচু করে বলল — "হ্যাঁ, ওই বিজনই একদিন এসেছিল আমাদের বাড়িতে। তখন আমার বিয়ের ঠিক সাতদিন বাকি। আমার আর কিছুই করার ছিল না। ওইদিন তোমার লেখা একটা চিঠি ও লুকিয়ে আমার হাতে গুঁজে দিয়েছিল। তুমি তোমার মনের কথা কাব্য করে লিখেছিলে। আমি মোটা রবীন্দ্র রচনাবলীর পাতার ফাঁকে তৎক্ষণাৎ চিঠিটা লুকিয়ে আমার নিরুপায়তার কথা জানিয়ে ব্যথিত মনে সেদিন বিজনকে বিদায় দিয়েছিলাম। সেই চিঠিটা আজও আমি লুকিয়ে রেখেছি আমার কাছে। আর তার ঠিক সাতদিন পরেই এলো সেই বিয়ের দিন। আমি তো তোমার চিঠিটার কোনো উত্তর দিতে পারিনি। বুকের ব্যথা তাই বুকেই চেপে রেখে হাসিমুখে অভিনয় করেছিলাম সেদিন, কারণ আমার বাবার কোনোরকম অসম্মান হোক, আমি তা চাইনি। মা তো ছোটবেলায় চলে গিয়েছিলেন। ওই বাবাই আমায় বুকে-পিঠে করে মানুষ করেছিলেন। তাই যখন বরবেশে একজন অচেনা মানুষ আমার সামনে এসে দাঁড়াল, তখন দাঁতে দাঁত চেপে এটাই আমার ভবিতব্য বলে মুখ বুজে সব মেনে নিয়েছিলাম।"
অতনু স্পষ্ট দেখতে পেল রুবির দু-চোখে জল চিকচিক করছে। মুখে সে আজ আর কিছুই বলতে পারল না। রুবি নিজেকে সামলে একটা ছোট্ট দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল — "তারপর আর কী — নতুন বাড়ি, নতুন সংসার, সবাইকে আপন করে মানিয়ে নেওয়া। জানোই তো সব বিবাহিত মেয়েদের এই একই নিয়ম, আমারও তার ব্যতিক্রম কিছু না। আমার বুকের ভিতর জমে থাকা কান্নার কেউ কোনোদিন কোনো হদিসই পেল না।" রুমালে চোখ মুছে রুবি আবার বলল — "আসলে মানুষটা খুব ভালো — সব ভুলিয়ে দিত আমায়। তবুও জ্যোৎস্না রাতে যদি কখনো একা একা ছাদে পায়চারি করতাম, তখন ফেলে আসা পুরনো কথাগুলো মনের মাঝে একটা বেদনার ঝড় তুলত..." একা একটানা কথাগুলো বলে রুবি একবার নিজের হাতঘড়ির দিকে তাকাল, কিন্তু মুখে বলল — "এই দেখো, তখন থেকে শুধু আমার কথাই তো বলে যাচ্ছি, তোমার কথা তো শোনাই হলো না। তা এতদিন পর তুমি হঠাৎ এই মলে কী করে এলে?"
অতনু মুখে হালকা হাসি নিয়ে বলল — "আসলে আমার এক দূরসম্পর্কের মামা থাকেন এখানে। আমি তো সেই ছোটবেলার পর থেকে কোনোদিনই আর আসিনি এখানে, সেসব স্মৃতি আমার মনেও নেই। মায়ের অনেকদিনের বায়না, মামার বয়স হয়ে যাচ্ছে, তাই একবার দেখতে চায়। সেইজন্যই মাকে নিয়ে এসেছি। কালই চলে যাব। বাড়িতে একা বিরক্ত লাগছিল বলেই মামা এই মলটার ঠিকানা দিয়ে একটু ঘুরে আসতে বলল। প্রথমে আসতে মন চাইছিল না একা একা, কিন্তু ভাগ্যিস এলাম।" রুবি বলল — "হ্যাঁ... সত্যি, বহুদিন পর আমি তো ভাবতেই পারিনি আবার দেখা হবে। তা একা কেন, স্ত্রীকে তো সঙ্গে নিয়ে আসতে পারতে, আলাপ হতো।" মৃদু হেসে অতনু জবাব দিল — "আর স্ত্রী, বিয়েই করলাম না, অকৃতদারই রয়ে গেলাম।"
অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল রুবি তার অতনুদার চোখের দিকে, যেন এক অপরাধবোধ কাজ করল তার মনে। মুখে বলল — "এমা... এটা কেন করলে অতনুদা? আমাকে তো অপরাধী করে রেখে দিলে।" অতনু তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল — "আরে না না, ওরকম ভাবার কিছু নেই। প্রতিটা মানুষের চিন্তাধারা তো আর সমান হয় না। আমার জীবনে প্রেম একটাই ছিল, তাই আর বিয়ে করে সেই জায়গায় অন্য কাউকে বসাতে পারলাম না, অকৃতদারই রয়ে গেলাম। ছোটখাটো একটা বেসরকারি চাকরি করি, মাকে নিয়ে ছোট্ট সংসার দিব্যি চলে যায়। আমার এই সিদ্ধান্তের জন্য আমি কাউকেই দায়ী করি না। আর বলো — তোমার স্বামী কী করেন? আর ছেলে-মেয়ে কয়জন?"
প্রশ্নটা শুনে করুণ চোখে অতনুর দিকে তাকাল রুবি — "আমার একটাই মেয়ে, বছর বারো বয়স। এখন ওই আমার সব গো..." অতনু রুবির স্বামীর কথা জানতে চাইল, কিন্তু যে উত্তর সে তার মুখ থেকে পেল তার জন্য অতনু একেবারেই প্রস্তুত ছিল না। ফ্যালফ্যাল করে অতনুর গভীর চোখের দিকে তাকিয়ে রুবি বলল — "আমার কপালটাই খারাপ গো অতনুদা। বিয়ের পাঁচ বছর আমাদের কোনো সন্তান হয়নি। অনেক চেষ্টার পর একটা ফুটফুটে কন্যার জন্ম দিলাম আমি, বাড়িতে সবার সে কী আনন্দ। কিন্তু এদিকে আমার মেয়ের চার বছর বয়স হতেই ওর বাবার হঠাৎই ক্যানসার ধরা পড়ল। গোটা পরিবার মিলে দিশেহারা হয়ে পড়লাম আমরা। অনেক চেষ্টায় টিকে রইল আরও ছয় মাস, ব্যস তারপর একদিন সব নিভে গেল।"
রুবির চোখে জল, ভারী গলায় সে বলতে লাগল — "আজকে আমি নিঃসঙ্গ, সাথীহারা... আসলে যে কদিন ছিল মানুষটা আমাদের জীবনে, ওর সবটুকু উজাড় করে দিয়ে ভরিয়ে রেখেছিল জানো।" অতনুর বিস্ময়ভরা চোখটা রুবির হাতের দিকে পড়তেই রুবি বুঝতে পেরে বলল, "কী দেখছো, হাতে এখনও আমার শাঁখাপলা কেন? আসলে ওটাই ওর শেষ ইচ্ছা ছিল। যাওয়ার আগে আমার হাত ধরে বলে গিয়েছিল, যতদিন না মেয়েটা বড় হয়, ওসব নিজে থেকে বুঝতে পারে, ততদিন যেন আমি এইগুলো না খুলি। ও তো জানে ওর বাবা বিদেশে থাকে, একদিন ঠিক আসবে।"
ঘটনার আকস্মিকতায় হতবাক হয়ে গেল অতনু। কী বলবে ভেবে না পেয়ে পকেট থেকে কাঁপা কাঁপা হাতে নিজের রুমালটা বের করে এগিয়ে দিল রুবির দিকে... চোখের জল মুছতে মুছতে রুবি জানাল যে দেরি হয়ে যাচ্ছে, এবার তাকে বাড়ি যেতে হবে।
অতনুর আজ আর ওকে আটকানোর মতো কোনো ভাষা নেই। শুধু রাস্তা পর্যন্ত তাকে এগিয়ে দিতে আসতে চায় সে, এটুকুই শেষে বলল। তারপর দুজনে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এল, সামনে রুবি, পিছনে তার অতনুদা। দুজনের মুখে আর কোনো কথা নেই।
সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নেমে গেছে। "আসছি তবে..." রাস্তা পেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ওপারে চলে গেল রুবি। এই পারে স্ট্যাচুর মতো অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল অতনু। শেষবারের মতো দূর থেকে পিছন ফিরে অতনুর দিকে হাত নাড়া দিল রুবি। তারপর আবার চলতে লাগল, একটার পর একটা ছুটন্ত গাড়ি... একটা বেসরকারি পুরনো বাস কালো ধোঁয়া ছেড়ে চলে গেল দুজনের মাঝখানের রাস্তা দিয়ে, সেই কালো ধোঁয়ার মধ্যে হারিয়ে গেল অতনুর রুবি। আর দেখা গেল না তাকে। অতনু তখনও রইল সেই দিকেই তাকিয়ে। কিছু মানুষ হারিয়ে যায় না, শুধু জীবনের অন্য প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকে।
আপনার ভোটেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
বিস্তারিত নিয়ম
একজন পাঠক একটি সংখ্যায় সর্বোচ্চ ৫টি ভিন্ন কলম প্রতিক্রিয়া দিতে পারবেন — অর্থাৎ প্রতিটি প্রতিক্রিয়া একবার করে দেওয়া যাবে। একই মাসে একই প্রতিক্রিয়া ভিন্ন কোনো লেখায় নতুন করে নির্বাচন করলে, আগেরটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং সর্বশেষ নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটিই গণ্য হবে। অর্থাৎ, পাঠক প্রতিটি প্রতিক্রিয়া বিভাগে একটি করে লেখা নির্বাচন করতে পারবেন। এই প্রতিক্রিয়াগুলির ভিত্তিতেই নির্বাচিত হবেন ‘মাসের সেরা কলম’ সম্মানের ‘পাঠকের প্রতিক্রিয়া’ বিভাগে পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক–লেখিকারা।