ঘরে ছিল পান্তাভাত আর চিংড়ি মাছ,
কাঁচা লঙ্কা, বড়ি পোড়া, কাছে কলাগাছ।
হ্যাঁ, সেই পান্তাভাত খাইয়ে “রাজা” উপাধি লাভ করেছিলেন সেকালের বাংলার এক মুদিদোকানি।
গরিব কৃষকের গামছায় বাঁধা মাটির সানকির পান্তাভাত হাল আমলে বাঙালির ডাইনিং টেবিলে যে কৌলীন্য অর্জন করেছে, তাও এক ইতিহাস বটে। কিন্তু তারও আগে সাধারণ জলসিক্ত এই খাবার এক ইংরেজ শাসকের মন জয় করতে পেরেছিল। তিনি হলেন ব্রিটিশ গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস।
ইতিহাসবিদ আবুল কালাম মোহাম্মদ জাকারিয়া নবাব সিরাজের জীবনীমূলক এক বইতে লিখেছেন, বাংলায় বাণিজ্য করতে আসা ইংরেজ বণিকরা তখন চুক্তির শর্ত ভেঙে সামরিক শক্তি বাড়াচ্ছিল। কলকাতা এবং কাশিমবাজার কুঠিতে তারা দুর্গ নির্মাণ করে। বাংলার নবাব সিরাজদ্দৌলা ক্ষুব্ধ হয়ে বেশ কয়েকবার দূত পাঠিয়ে দুর্গ ধ্বংস করার আদেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু ইংরেজ বণিকরা সে কথায় কর্ণপাত করেনি। শেষ পর্যন্ত সিরাজ কলকাতা আক্রমণ করলেন। তবে কলকাতা আক্রমণের আগে ১৭৫৬ সালের ২৪ মে তিনি ৩,০০০ অশ্বারোহী সৈন্য পাঠিয়ে দিলেন কাশিমবাজারের ইংরেজ কুঠি দখল করার জন্য। সে সময় কাশিমবাজার কুঠিতে ছিল বেশ কয়েকজন ইংরেজ অফিসারসহ শ্বেতাঙ্গ এবং অশ্বেতাঙ্গ সৈন্য ও ইংরেজ কর্মচারীদের পরিবার।
নবাবের বাহিনীর ওপর নির্দেশ ছিল কাশিমবাজার কুঠি শুধু অবরোধ করে রাখা। শেষপর্যন্ত দুর্গের ভেতরে থাকা কাশিমবাজার কুঠির প্রধান ওয়াটস নবাবের কাছে মুচলেকা দিয়ে আত্মসমর্পণ করেন। ইংরেজদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সুবাদে কৃষ্ণকান্ত নন্দী ইংরেজ কোম্পানিতে মুহুরির চাকরি পান।
জর্জ রবার্টস গ্লিগের লেখা ওয়ারেন হেস্টিংসের জীবনীসহ অন্যান্য বই থেকে জানা যায়, ইংরেজ কর্মকর্তাদের সপরিবারে আটক করে নিয়ে যাওয়া হয় মুর্শিদাবাদ কারাগারে। মহিলাদের স্থান হয় নবাবের জেনানা মহলে। আটক ইংরেজদের একজন ছিলেন পরবর্তীকালে বাংলার গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস।
সে সময়ে কাশিমবাজারের ডাচ ফ্যাক্টরি বা কুঠির দায়িত্বে ছিলেন মি. ভার্নেট। তিনি নবাব সিরাজ-উদ-দৌলাকে অনুরোধ করলেন হেস্টিংসকে ছেড়ে দিতে, কারণ তিনি ছিলেন কোম্পানির একজন সামান্য কর্মচারী। সিরাজ ডাচ ফ্যাক্টরির প্রধানের এই অনুরোধকে সম্মান জানিয়ে হেস্টিংসকে মুক্তি দিলেন।
কারাগার থেকে বেরিয়েই হেস্টিংস সোজা চলে যান কাশিমবাজারে। ওদিকে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার বিশাল সামরিক বাহিনী কলকাতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে শুনে ইংরেজ কোম্পানির সবাই পালিয়ে চলে যায় ফলতায়। ওয়ারেন হেস্টিংস কাশিমবাজারে থেকে নবাব সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে গোপনে তা পাঠাতে থাকেন ফলতায়। কিন্তু তাঁর গুপ্তচরবৃত্তির খবর ফাঁস হয়ে যায় এবং নবাব সিদ্ধান্ত নেন হেস্টিংসকে আবার গ্রেফতার করবেন।
এই খবর জানতে পেরে হেস্টিংস কাশিমবাজার ছেড়ে পালানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। কিন্তু নবাবের রাজ্যে পালাবেন কোথায়? শেষ পর্যন্ত তিনি হাজির হলেন তাঁর বাঙালি বন্ধু কৃষ্ণকান্ত নন্দীর কাছে।
উইকিপিডিয়ায় কৃষ্ণকান্ত নন্দী সম্পর্কে বলা হয়েছে, তাঁর পরিবার বর্ধমানের সিজনা গ্রাম থেকে এসে বসবাস করছিল কাশিমবাজারের কাছে শ্রীপুরে। সে সময় কাশিমবাজার ছিল একটি প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র। কাশিমবাজারে নন্দী পরিবার প্রথম দিকে মুদিদোকানদারি দিয়ে ব্যবসা শুরু করলেও পরে তুলা, লবণ এবং রেশমের ব্যবসায় অর্থলগ্নি করেছিল। ইংরেজদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সুবাদে ইংরেজ কোম্পানিতে কৃষ্ণকান্ত নন্দী মুহুরির চাকরি পান।
১৭৭৩ খ্রিষ্টাব্দে রেগুলেটিং অ্যাক্টের অধীনে ভারতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিষয়াদি নিয়ন্ত্রণের জন্য একজন গভর্নর জেনারেল নিয়োগ করা হয়। ওয়ারেন হেস্টিংস নিযুক্ত হন কোম্পানির প্রথম গভর্নর জেনারেল বা বড়লাট পদে।
কিন্তু ভারতের ভাগ্যবিধাতা হয়েও তিনি তাঁর দু’দিনের খাদ্য পান্তাভাতের মাহাত্ম্য ভোলেননি। বড়লাট হয়েও নিয়মিত পান্তাভাত আর কুচো চিংড়ি খেতেন।
হেস্টিংসের পলায়ন আর তাঁর পান্তাভাত খাওয়ার ঘটনাটি নিয়ে সেকালের মানুষ মুখে মুখে যে ছড়া বেঁধেছিল, তা ছিল এরকম —
হেস্টিংস সিরাজ ভয়ে হয়ে মহাভীত
কাশিমবাজারে গিয়া হন উপনীত।
কোন স্থানে গিয়া আজ লইব আশ্রয়
হেস্টিংসের মনে এই নিদারুণ ভয়।
কান্তমুদি ছিল তার পূর্ব পরিচিত
তাহারি দোকানে গিয়া হন উপনীত।
মুস্কিলে পড়িয়া কান্ত করে হায় হায়
হেস্টিংসে কি খেতে দিয়া প্রাণ রাখা যায়?
ঘরে ছিল পান্তাভাত আর চিংড়ি মাছ
কাঁচা লঙ্কা, বড়ি পোড়া, কাছে কলাগাছ।
সূর্যোদয় হল আজি পশ্চিম গগনে
হেস্টিংস ডিনার খান কান্তের ভবনে।
ওয়ারেন হেস্টিংস বাংলার বড়লাট হয়েও কিন্তু দুঃসময়ের বন্ধু কৃষ্ণকান্ত নন্দীকে ভুলে যাননি। তিনি কৃষ্ণকান্তকে তাঁর বানিয়া বা কমার্শিয়াল এজেন্ট নিয়োগ করেন। অর্থাৎ হেস্টিংস তাঁর কাছ থেকেই টাকাপয়সা ধার করতেন।
উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হয়ে কাজ করে এবং রেশমের ব্যবসা করে কৃষ্ণকান্ত প্রচুর ধনসম্পদের মালিক হন। বাংলাপিডিয়া থেকে জানা যাচ্ছে, হেস্টিংসের পত্তনী ব্যবস্থার (১৭৭২–১৭৭৭) অধীনে কৃষ্ণকান্ত নন্দী প্রথমে বাহারবন্দ পরগণার — বর্তমান গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রাম জেলার — জমিদারি লাভ করেন। বাহারবন্দসহ অনেক পরগণা তাঁর কাছে পত্তন দেওয়া হয়। পরবর্তীকালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের আওতায় সুবিধাজনক রাজস্ব দাবিতে তাঁকে পরগণাটির জমিদারি বন্দোবস্ত দেওয়া হয়।
শুধু তাই নয়, চিরস্থায়ী প্রথার সুযোগ নিয়ে হেস্টিংস তাঁকে উত্তর ও পশ্চিম বাংলায় বহু জমিদারি কিনতে সাহায্য করেন। এমনকি নাটোরের রানি ভবানীর সম্পত্তির একাংশ দখল করে হেস্টিংস সেটি বন্ধু কৃষ্ণকান্তের হাতে তুলে দেন।
কৃষ্ণকান্ত নন্দী এতটাই ধনশালী হয়েছিলেন যে, তাঁকে কাশিমবাজারের “রাজা” খেতাব দেওয়া হয়। ওয়ারেন হেস্টিংস যখন বাংলা ছেড়ে চলে যান, তখন তাঁর সুপারিশ অনুযায়ী কাশিমবাজারের গভর্নর স্যার ফ্রান্সিস সাইকসও কৃষ্ণকান্তকে তাঁর কমার্শিয়াল এজেন্ট বা বানিয়া নিয়োগ করেন।
এভাবেই সামান্য পান্তাভাতের দৌলতে বদলে যায় কিছু মানুষের ভাগ্য।
আপনার ভোটেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
বিস্তারিত নিয়ম
একজন পাঠক একটি সংখ্যায় সর্বোচ্চ ৫টি ভিন্ন কলম প্রতিক্রিয়া দিতে পারবেন — অর্থাৎ প্রতিটি প্রতিক্রিয়া একবার করে দেওয়া যাবে। একই মাসে একই প্রতিক্রিয়া ভিন্ন কোনো লেখায় নতুন করে নির্বাচন করলে, আগেরটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং সর্বশেষ নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটিই গণ্য হবে। অর্থাৎ, পাঠক প্রতিটি প্রতিক্রিয়া বিভাগে একটি করে লেখা নির্বাচন করতে পারবেন। এই প্রতিক্রিয়াগুলির ভিত্তিতেই নির্বাচিত হবেন ‘মাসের সেরা কলম’ সম্মানের ‘পাঠকের প্রতিক্রিয়া’ বিভাগে পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক–লেখিকারা।