১
সকাল থেকেই কুন্তলবাবু বাড়িময় পায়চারি করে বেড়াচ্ছেন। এটা তাঁর বহু দিনের অভ্যাস। "টেনশন আর উদ্বেগ কাটাতে হাঁটার জুড়ি মেলা ভার।" কথাটা বলেছিলেন শিক্ষক জীবনের একেবারে শুরুর সময়ের প্রধান শিক্ষক সুকুমারবাবু। তিনিও সারা দিন হেঁটে বেড়াতেন স্কুল জুড়ে। সেই থেকে কুন্তলবাবু আজও হাঁটেন, টেনশনে হাঁটেন, উদ্বেগে হাঁটেন, ডায়াবেটিস না থাকলেও নিয়ম করে হাঁটেন। আড্ডায়, চায়ের দোকানে, ক্লাবে, অনুষ্ঠানবাড়িতে, স্টাফরুমে, এমনকি ক্লাসরুমেও হাঁটার উপকারিতা নিয়ে ছোটোখাটো বক্তৃতা করে বসেন। সামনে কিছু না বললেও পিছনে কেউ কেউ তাঁকে পাগল বলে। তাতে অবশ্য কুন্তলবাবুর বিশেষ কিছু ক্ষতি-বৃদ্ধি হয় না। তিনি থামেন না, হেঁটে চলেন।
নিয়মিত হাঁটা আর খালি হাতে কিছু ব্যায়ামের জোরে এই বাষট্টিকে বেঁধে রেখেছেন বাহান্নতে। পাঁচ ফুট আট ইঞ্চির মেদের বাহুল্যবর্জিত পেটানো শরীর, বাজখাঁই অমায়িক গলা। শালীনতাপূর্ণ রুচিজ্ঞান তাঁর ব্যক্তিত্বকে আরো সুস্পষ্ট ও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। পরিমিত তালজ্ঞানসম্পন্ন সেই মানুষটার চোখে-মুখে নির্ঘুম রাত্রিজাগরণের ছাপ স্পষ্ট। ঘড়ির কাঁটার ঘূর্ণন আর টিকটিক আওয়াজের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে হাঁটার গতি। নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় আজ সুপ্রিম রায়দান।
বাড়ির ভিতর হাঁটতে হাঁটতে কখন যে রাস্তায় এসে পড়েছেন খেয়ালই নেই। বাড়ি থেকে বেরিয়ে গলি ছাড়িয়ে বড়ো রাস্তার মোড়ের মাথায়।
"কী দাদা, ক’জন গেল?"
পিছনে ঘাড় ঘোরাতেই ঘাড়ের কাছে নিশ্বাস ফেলছে প্রশ্নকর্তা রমেন হাটুই, প্রাক্তন কাউন্সিলর, করিতকর্মা ছেলে, বয়স পঞ্চাশের আশেপাশে। এই বয়সেই একটা চালকল, দুটো ইটভাটা, শহর জুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে খান পাঁচেক বাড়ি ও গোটা দশেক প্লটের মালিক। শাসক দলের সঙ্গে বনিবনা হচ্ছিল না দেখে এখন বিরোধী দলে নাম লিখিয়ে মণ্ডল সভাপতি।
"মানে?"
"মানে, আপনার স্কুলে ২০১৬-র কতজন ছিল? সব তো গেল। পুরো প্যানেল বাতিল করে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।"
কুন্তলের পায়ের তলাটা যেন কেঁপে উঠল। ভূমিকম্প হলো নাকি? অদ্ভুত ভ্রম! কেঁপে উঠল কুন্তলবাবুর শরীর। চোখের দৃষ্টি ঘোলাটে হয়ে এল। মাথাটা, প্রেসার কমে গেলে বসে উঠতে যেমন হয়, তেমনই চাঁই করে ঘুরে গেল। পৃথিবীর ঘোরাটা কি থেমে গেল? না তো, তেমন কিছু তো হয়নি। বেসরকারি স্কুলের বাস মর্নিং শিফটের বাচ্চাদের নামিয়ে দিয়ে গেল। মায়েরা, যারা এতক্ষণ কানের পোকা মারছিল, তারা নিজের বাচ্চার হাত মুঠোয় পুরে স্কুলব্যাগ পিঠে নিয়ে দুলকি চালে শৈশবে ফিরে যাচ্ছে। কেউ কেউ আবার দিনের পাঠ, টিফিনকৌটোর বর্তমান অবস্থা জেনে নিচ্ছে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। দুধ দিতে আসা ঘোষ চেনা চোখের আড়ালে জল আর গুঁড়ো দুধ মিশিয়ে চলেছে পরিমাণমতো। আরামবাগ চিকেনের কাউন্টারে এম.এ পাশ বাপ্পা মুরগির শরীরবিদ্যা বোঝাচ্ছে রসিক খদ্দেরকে। রাস্তা স্বাভাবিক গতিতে চলমান। কোনার মুদি দোকানে দাঁড়িপাল্লাও সচল আছে।
সেটাই তো স্বাভাবিক। কোনো কিছু তো হওয়ার কথা ছিল না। যার হারায়, সেই জানে হারানোর যন্ত্রণা। থেমে যায় শুধু তার জগৎ — সে প্রেম হোক বা প্রিয়জন, চাকরি হোক বা চাষের জমি। কুন্তল জানে, সে কী হারিয়েছে। আজকের সুপ্রিম রায়ে চাকরিহারা হাজার হাজার পরিবারের সেও একজন হিস্যা।
কোনো রকমে নিজেকে সামলে সামনের দিকে এগিয়ে যায়। অনেকটা পথ যেতে হবে। এত তাড়াতাড়ি ভেঙে পড়লে চলবে না। রমেন হাটুইয়ের কথায় শ্লেষ থাকলেও কুন্তলবাবু তা এড়িয়ে যান অবলীলায়। তিনি জানেন, আজকের এই অবস্থার জন্য দায়ী রমেনদের মতো আনপড় কিংবা শিক্ষিত শয়তান দুর্নীতিগ্রস্ত নেতারা, যারা ঠান্ডা ঘরে কিংবা নিউজ চ্যানেলে বসে কারণ বিশ্লেষণ করবে, জ্ঞানগর্ভ বাণী দেবে, চাকরিহারা শিক্ষকদের যোগ্যতা নিয়ে হাস্যকর প্রশ্ন তুলবে।
২
এখনো অনেক পথ হাঁটা বাকি অমিনার। বেশ কিছুদিন থেকেই আনমনা হয়ে যাচ্ছিল। ক্লাসে পড়াতে পড়াতে খেই হারিয়ে ফেলছিল। বারবার কুন্তল স্যারের কথাই মনে হচ্ছিল। তার পায়ের তলার মাটিটা যে মানুষটা শক্ত করে ধরে আছে, সেই মানুষটার মানসিক প্রতিক্রিয়ার কথা ভেবেছে প্রতি মুহূর্তে। রায় কী হবে, তা প্রায় সকলেরই জানা ছিল। তবুও "আশায় বাঁচে চাষা", "যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ আশ" গোছের আপ্তবাক্যকে সঙ্গে করে মনকে প্রবোধ দিচ্ছিল। আজ সব শেষ। কী হবে? এরপর কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?
বাড়ির ইএমআই, বাবার ওষুধ, ভাইবোনদের পড়াশোনার খরচ, তিন মাস পর মেজোর বিয়ে, সংসারের দৈনন্দিন খরচ — কী ভাবে চালাবে? নিচে থেকে একাগ্র শ্রম, নিষ্ঠা আর সাধনায় উপরে ওঠার আনন্দ যতটা, এক ধাক্কায় উপর থেকে নিচে পড়ার যন্ত্রণা তার শত গুণের বেশি। স্যার হয়তো কিছুটা সাহায্য করতে চাইবে, কিন্তু সে নেবে কেন? স্যার তাদের জন্য যা করেছে, বিনিময়ে কিছুই প্রায় গ্রহণ করেনি।
কুন্তলের একমাত্র মেয়ে আমেরিকায় গবেষণা করতে করতে আমেরিকান সহকর্মীকে বিয়ে করে সেখানেই থিতু হয়েছে। স্ত্রী গত কুড়ি বছর ধরে গুরুতর হাঁপানিতে ভুগছে। ঘরে অক্সিজেন সিলিন্ডার মজুত রাখতে হয় সবসময়। এখন আর বিছানা ছাড়তে পারেন না। একজন সবসময়ের আয়া রাখলেও কুন্তল বিশেষ প্রয়োজন ব্যতীত কোথাও যায় না, আর গেলেও রাত কাটায় না।
কপাল ভালো হলে এক হাতেই চার-পাঁচটা ছেলে-মেয়ে নিয়ে অভাব আর অপমানে সরগরম সংসার। নয়তো হাত বদল হতে হতে ভিক্ষাপাত্রের দিকে এগিয়ে যাওয়ার ভবিতব্য। সে চেষ্টা যে একেবারে হয়নি, তা নয়। ক্লাস সেভেনে পড়তে মায়ের এক খালা বছর তিরিশের এক পাত্র সঙ্গে নিয়ে হাজির তাদের বস্তিতে। তার অদম্য জেদের কাছে হার হয়েছে সবার। এখন সেই হারতে বসেছে, ডুবতে বসেছে তার সোনার পানসি। যে অন্ধকার থেকে আলোয় এসেছে, সেই অন্ধকারে ফিরে যেতে হবে? এই সময় স্যারকে তার খুব প্রয়োজন। তার শক্তি, সাহস, তেজ, জ্ঞান — সবই তো সেই মানুষটাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়ে চলেছে আহ্নিক গতির আঙ্গিকে।
৩
সকাল থেকে টিপটিপে বৃষ্টির চোখরাঙানি আর মেঘলা আকাশের ফাঁক গলে বেরোনো সূর্যটা হেলে পড়েছে পশ্চিম দিগন্তে, তার শেষ স্বর্ণাভ আভা ছড়িয়ে দিয়েছে। মানুষের দ্বিগুণ দৈর্ঘ্যের ছায়া প্ল্যাটফর্ম জুড়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে। দিনের শেষ রক্তিম চুম্বনে বিদায় চাইছে বিষণ্ন দয়িতা। কুন্তলবাবু, পাঁচটা দশের ডাউন থেকে নেমে ডাউন লাইন ধরে হেঁটে রেলগেটের ডানদিকে প্রতিদিনের অভ্যাসমতো মোড়ের মাথায় মজনুর চায়ের দোকানে এসে বসেছেন। মাথা ভরা কালো চুল আর সাদার ছোপ ধরা পুরুষ্টু গোঁফে লেগে আছে পুরনো দিনের শিক্ষকদের এক অদৃশ্য কাঠিন্য। কর্তব্যে অবিচল চোখে এখনো আদর্শের ঝিলিক, শিক্ষার্থীদের প্রতি অসীম মমত্ব আর দরদবোধ। যেন এক প্রাচীন জ্ঞানবৃক্ষের শিকড় তাঁর গভীরে প্রোথিত। তিনি অনুভব করেন, তাঁর সত্তার প্রতিটি কোষে জ্ঞান বিতরণের এক অদম্য তৃষ্ণা।
একহারা চেহারার মজনু, ল্যাংড়া মজনু — একটা পা কৃত্রিম। বহু বছর আগে রেললাইন পার হতে গিয়ে এক ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিল। চা বানাতে বানাতে অবিরাম বকবক করে চলে। তার কথাগুলো যেন চা তৈরির ফিসফিস শব্দের সঙ্গে মিশে এক অদ্ভুত সুর তৈরি করে। চায়ের পাশাপাশি লটারির টিকিটও বিক্রি করে মজনু। কুন্তল বরাবরই লটারিকে জুয়া জ্ঞান করতেন। তাঁর নীতিশাস্ত্রে এর কোনো ঠাঁই ছিল না। জুয়া! ধুর! মানুষ কেন এমন অলস পথে টাকা রোজগারের স্বপ্ন দেখে? শ্রমই একমাত্র পথ, জ্ঞানের পথ, সততার পথ। এই চিন্তাধারা ছিল তাঁর মেরুদণ্ড, তাঁর আত্মপরিচয়। স্মৃতির সারণি বেয়ে হামাগুড়ি দিয়ে অনেকটা পিছনে হাঁটলে দেখা যাবে, একটা গ্রামের মেলায় এক একাকী কিশোর তার মায়ের অনেক কষ্টে জোগাড় করা দু’টাকা নিয়ে মেলা দেখতে গিয়ে লোভের বশবর্তী হয়ে এক টাকা কুড়ি পয়সা জমে ওঠা চরকি জুয়াতে হারিয়ে শপথ নেয়, জীবনে ও পথ মাড়াবে না।
স্টেশন-লাগোয়া বস্তির স্যাঁতসেঁতে অন্ধকার কোণে মজনুর জন্ম। জন্ম থেকেই অন্ধকারের সঙ্গে তার সহবাস। বাপের নাম জেনেছে মায়ের ভুল করে ফেলে যাওয়া ভোটার কার্ডে। তার জন্মটা ঈশ্বরের এক মারাত্মক ভুল ছিল। মায়ের মুখটা মগজের স্মৃতিকোষে আঁকবার আগেই সেও ছেড়ে গেছে অন্ধকারে। যেন অন্ধকারই তার ভবিতব্য। দু’বেলা দু’মুঠো ভাত জোগাড় করতে প্রথমে ভিক্ষা করত। তারপর নিমাইয়ের চায়ের দোকানে জল তোলা, কয়লা ভাঙা, ঝাঁট দেওয়া, কেটলি-ডেকচি-কাপ-প্লেট ধোয়ার বদলে তিন বেলা খেতে পেত। ক্ষুধার জ্বালায় জীবনের প্রথমভাগেই তাকে চরম বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। এক শীতের কুয়াশার চাদরে মোড়া সকালে রেললাইন পার হতে গিয়ে ট্রেনের ধাক্কায় একটি পা হারিয়েছে। এনজিও-র সাহায্যে কৃত্রিম পা একটা মিলেছে বটে, কিন্তু তাতে হাঁটার ছন্দ আর স্বাভাবিক হয়নি, জীবনের মতো।
এই অক্ষমতা তাকে আরও বেশি সংগ্রাম করতে শিখিয়েছে। ছোটবেলা থেকেই সে ছিল পরিশ্রমী, তেমনই সৎ। শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে বহু কষ্টে এই ছোট্ট চায়ের দোকানটি সে খুলেছিল। এর ওপর নির্ভর করেই তিন মেয়ে আর এক ছেলেকে মানুষ করার এক কঠিন ব্রত নিয়েছিল সে। দোকানটা ছিল তার কাছে শুধু রুটি-রুজির উৎস নয়, এটা ছিল তার জীবনের টিকে থাকার এক সংগ্রামক্ষেত্র, মমতাময়ী মায়ের বুকের মতো নির্ভয় আশ্রয়। দু’বেলা ভরপেট খাবার যাদের জোটে না, শিক্ষা যে তাদের কাছে বিলাসসামগ্রী, তা সে ভালোই জানত। বস্তির গাঢ় অন্ধকারে মেয়েদের মানুষ করা যে "সোনার পাথরবাটি", তাও জানত মজনু। তবুও নিজের ভিতর অক্ষম পিতৃত্বের আক্রোশ, সীমাহীন দারিদ্র্য আর অপ্রাপ্তির বেদনাবাহী অশ্রুগুলো লুকিয়ে বরফ জমিয়ে রেখে মেয়েদের উৎসাহ দেওয়ার চেষ্টা করত।
সেদিন পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। মেঘলা আকাশকে সঙ্গে নিয়ে ভোররাত থেকে দুপুর পর্যন্ত একটানা একঘেয়ে টিপটিপ বৃষ্টি বাজারের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে। হয় সবার ঘরেই খাবার মজুত আছে, নয়তো "খাই না খাই শুকনো ডাঙায় পড়ে থাকি" তত্ত্ব চিবুচ্ছে। কিন্তু মজনুদের কী হবে? যেন অস্থিরমতি প্রকৃতি নিজেও মজনুর অসহায়ত্বের সাক্ষী হতে চাইছে। শেষ বিকেলের অলস সূর্যটা ক্ষণিক জ্বলে উঠলেও মজনুর অভাবী মুখের ফ্যাকাশে ভাবটা ঢাকতে পারছে না সেই অনুজ্জ্বল আলো।
সারাদিনের ক্লান্ত শরীরের ভারটা নড়বড়ে বেঞ্চের উপর ছেড়ে দিয়ে মজনুর দিকে তাকাতেই কুন্তলের চোখে পড়ল, মজনুর দু’চোখ ঢেকেছে বিষণ্নতা, মুখময় খেলে বেড়াচ্ছে গভীর উদ্বেগের এক কালো মেঘের ছায়া।
"কী ব্যাপার মজনু? খুব চিন্তিত মনে হচ্ছে।"
"না স্যার, তেমন কিছু না। সকাল থেকে একটা দিন গেল না রাত গেল বুঝতে পারলাম না।"
"কেন?"
"সকাল থেকে এখনো শতখানেক টাকার সওদা করতে পারিনি। এক ঘর টিকিট পর্যন্ত বিক্রি করতে পারিনি। ওদিকে ছেলেটার খুব জ্বর। একবার ডাক্তারের কাছে না নিয়ে গেলেই নয়।"
মজনুর কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে এল, তার দীর্ঘশ্বাস যেন ফুটন্ত চায়ের মিষ্টি ধোঁয়ার সঙ্গে মিশে দ্রুত অদৃশ্য হয়ে গেল। এক অসহায় পিতার নীরব আর্তনাদ।
কুন্তলবাবুর মনটা নরম হয়ে গেল। তাঁর শিক্ষকসত্তা আজ তাঁর নীতিবোধকে অতিক্রম করতে চাইল। তিনি সবসময় শিক্ষার্থীদের নীতি ও নৈতিকতার পাঠ দিয়েছেন, আজ তাঁর সেই নীতিবোধ চরম বাস্তবতার মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে। মজনুর চোখে তিনি শুধু একজন অসহায় বাবার আকুতি দেখছেন না, দেখছেন শোষণের যাঁতাকলে পিষ্ট অসহায় মানবাত্মার নিদারুণ পরিণতির চিত্র, শুনছেন আর্তপীড়িত মানুষের বেঁচে থাকার করুণ আর্তনাদ।
দু’জন কুন্তল অনেকক্ষণ ধরে লড়ল, জয়-পরাজয়হীন যুদ্ধ। যুদ্ধ শেষে পকেটে হাত ঢুকিয়ে কলমের বদলে বের করলেন একশ টাকার একটা নোট। নোটটা দেখে মজনুর চোখটা চকচক করে ওঠে। তবু সে গলায় কৃত্রিম নিরাসক্তির ভাব এনে বলে, "খুচরো নেই স্যার, চায়ের দামটা কাল দিয়েন।"
কুন্তল দ্বিধা ও সংকোচ কাটিয়ে নিজেকে একটু তৈরি করে নিয়ে মিহি গলায় বললেন, "চায়ের দাম কাল দেব। এটা রাখো, টিকিটের বউনি করো।"
বহুমুখী পরিকল্পনায় থেমে যাওয়া নদীর মতো নয়, অপরিকল্পিত অভাবিত চমকে থমকে যায় মজনুর হৃৎপিণ্ড। মজনুর চোখে সৃষ্টি রহস্যের গূঢ় সত্য আবিষ্কারের বিস্ময়, তার অভিব্যক্তি যেন বলছে — "স্যার, আপনি? আপনি তো..."
"হ্যাঁ, জানি। আমি এসব পছন্দ করি না। ঠিকই, কিন্তু আজ কেন জানি না মনে হচ্ছে, তোমার ভাগ্যে কিছু লেখা আছে। হয়তো তোমার ছেলের জন্য, তোমার পরিবারের জন্য। কিছু একটা ভালো হবে।"
কিন্তু কেউ কিছু বলল না। শুধু খারাপ ঘড়ির থেমে যাওয়া সময়ের অনুভূতিতে একে-অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে বয়ে যেতে দিল কিছুটা সময়। আর মগজ জুড়ে বুনে চলল ভাবনার সুতোর অদৃশ্য জাল। উত্তরহীন প্রশ্নের উত্তর ধরার ক্ষীণ প্রচেষ্টায়।
কুন্তল মৃদু হাসলেন। সেই হাসিতে ছিল এক অদ্ভুত মিশ্র অনুভূতি — কিছুটা নিজের কাছে হেরে যাওয়ার অনুভূতি, কিছুটা মানবিকতার তৃপ্তি। এত দিন বইয়ের পাতায় পড়া শব্দগুচ্ছ "পরাজয়ের মধ্যে জয়ের আনন্দ" নড়েচড়ে উঠল কালো অক্ষরগুলো। এক নতুন ধরনের জীবন্ত অনুভূতির স্বাদ পেলেন নিজের মধ্যে। এক অন্য রকম ভালো লাগার স্রোত বয়ে গেল তাঁর রোমে রোমে, শিরায় শিরায়। মজনু দ্রুত নোটটা কুন্তলবাবুর হাত থেকে নিয়ে একটা টিকিট বের করে দিকে বাড়িয়ে দেয়।
কুন্তল হাত না বাড়িয়ে বলে, "রেখে দাও তোমার কাছে। যদি কিছু হয়, তোমারই কাজে লাগবে।"
একশ টাকা তাঁর কাছে হয়তো সামান্যই, কিন্তু আজ মজনুর কাছে তার মূল্য সংখ্যার হিসাবে প্রকাশ করা যাবে না। ততক্ষণে মজনুর বড় মেয়ে আমিনা এসে দাঁড়িয়েছে তাঁদের মাঝখানে।
"মা এক্ষুনি যেতে বলল। ভাই কেমন করছে।"
"যাও মজনু, দোকান বন্ধ করো। ছেলের শরীর বোধ হয় আরও খারাপ হয়েছে।
পরদিন সকালে কুন্তল চায়ের দোকানে ঢুকতেই মজনুর উজ্জ্বল মুখ দেখে চমকে গেলেন। কালকের সেই ঘন কালো মেঘের চিহ্নমাত্র নেই। এ মুখ দেখে কেউ কল্পনা করতে পারবে না, কোনো কালে মেঘ উঠেছিল, বৃষ্টি হয়েছিল অঝোর ধারায়। মজনু প্রায় চিৎকার করে উঠল, তার চোখে আনন্দের ঝলকানি, "স্যার! স্যার! বিশ্বাস করতে পারবেন না! আপনার সেই টিকিটে এক লক্ষ টাকা প্রাইজ উঠেছে!"
"এক লক্ষ!" বিস্ময়াভিভূত কুন্তল।
দুই কুন্তল আবার সম্মুখসমরে। আনন্দ-বেদনার মিশ্র অনুভব। এক লক্ষ টাকা! একশ টাকার টিকিট! তাঁর নীতি, তাঁর আদর্শ, তাঁর এত দিনের বিশ্বাস — সব যেন একসঙ্গে প্রশ্নচিহ্নের সামনে এসে দাঁড়াল।
মনের গভীরে শুরু হলো প্রবল দ্বন্দ্ব। এই টাকা তো তাঁর প্রাপ্য নয়? লোকদেখানো ঠাকুর-দেবতায় ভক্তির প্রাবল্য না থাকলেও প্রবল যুক্তিবাদী অঙ্কের শিক্ষক কুন্তল কোনো মতে মেলাতে পারছেন না সময়ের জটিল অঙ্ক। জীবনে কিছু কিছু ঘটনা ঘটে, যুক্তি-বুদ্ধিতে যার হিসাব মেলে না। এটাও বোধহয় তেমনই কোনো মিরাকল।
"না মজনু, এ টাকা আমি নিতে পারব না। কুন্তলবাবু মাথা নাড়লেন, তাঁর কণ্ঠস্বরে দৃঢ়তা। এটা তোমার প্রাপ্য। আমি তো ওটা তোমার জন্যেই কিনেছিলাম। আমার তো দরকার নেই।"
মজনু হতবাক।
"কিন্তু স্যার, আপনি তো..." তার চোখে এক গভীর কৃতজ্ঞতা।
"আমার নীতির কাছে এ টাকা বড়ো নয়, মজনু। এই টাকা এখন তোমার দরকার"।
"কিন্তু স্যার..."
"বুঝেছি, কী বলতে চাইছ। ছোটোবেলায় মা শিখিয়েছিলেন, কুড়িয়ে পাওয়া জিনিস নিজে ব্যবহার করতে নেই। কাছাকাছি যারা থাকে, তাদের মধ্যে যার সব থেকে বেশি দরকার, তাকে দিতে হয়। এই টাকাটা তোমার ছেলে-মেয়ের পড়াশোনার কাজে লাগিয়ো। এটাই হবে এই টাকার আসল সার্থকতা।"
কুন্তলবাবুর কথায় মজনুর সামনে ভেসে উঠল তার সন্তানদের পাংশু মুখ, তাদের অনাগত ভবিষ্যৎ, তাদের অস্ফুট স্বপ্নগুলো।
"ঠিক আছে স্যার, তাই হবে। এই টাকা আমি তাদের পড়াশোনার জন্যেই খরচ করব।"
সেই টাকা মজনু আর আমিনার নামে একটা ব্যাংকে জমা পড়েছিল। মজনুর সন্তানদের ভবিষ্যতের ভিত গড়ার প্রথম ধাপ হিসেবে, যেন এক বীজ রোপিত হলো এক শুষ্ক জমিতে। সেই থেকে মজনুর পরিবারের সঙ্গে জুড়ে গেল কুন্তল। মাঝে মাঝে স্কুল থেকে ফেরার পথে কিছুটা সময় মজনুর সন্তানদের পড়ানোর জন্য ব্যয় করতে থাকল।
৪
ঋতুচক্রের মতো জীবনও চলতে থাকে তার আপন ছন্দে, কখনো মসৃণ, কখনো বন্ধুর। মজনুর বড় মেয়ে আমিনা ছিল খুব মেধাবী। কিছু মানুষ থাকে, যাদের মাড়িয়ে যাওয়া যায়, কিন্তু এড়িয়ে যাওয়া যায় না। আমিনা ছিল তেমনই। তার চোখে ছিল এক ভিন্ন আলো, এক অদম্য জেদ। যা ঠিকই টের পেয়েছিলেন কুন্তল স্যার। শৈশব-কৈশোরের অভাব-অনটনের মধ্যে, না-পাওয়া অব্যক্ত চাওয়া আর অন্যদের থেকে পাওয়া লাঞ্ছনা ও অবজ্ঞা তার মধ্যে কিছু করে দেখানোর আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল। কুন্তলবাবু অতি সন্তর্পণে সেই আগুনে একটু একটু করে যুগিয়ে গেছেন বারুদ।
পেটভরে খাওয়া, লজ্জা নিবারণের ন্যূনতম বস্ত্র যাদের কাছে বিলাসিতা, তাদের শেষ পরিণতি কি এমনই হয়? কাকে জিজ্ঞেস করবে? কে দেবে উত্তর? প্রতি মুহূর্তে বানের পানিতে ভেসে আসা মুহুর্মুহু বোদের মতো প্রশ্নরা জমা হচ্ছিল আমিনার মনে।
বাবার কাটা পায়ের যন্ত্রণা সে অনুভব করত প্রতিদিন, প্রতি রাতে। লটারির টাকায় তাদের দারিদ্র্যের মেঘ কিছুটা কেটেছিল বটে, তারা কুন্তল স্যারের কথামতো পেটে খেতে, নতুন জামাকাপড় কিনতে পাইপয়সা খরচ করেনি, মজনু। কুন্তল স্যারের নির্ভুল পথনির্দেশনা আর তার অদম্য ইচ্ছাশক্তিই তাকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। সে জানত, তার মেধা এবং পরিশ্রমই তাকে এই দারিদ্র্যের জাল থেকে মুক্তি দিতে পারে। সে স্বর্ণপদকসহ প্রথম শ্রেণিতে এম.এ পাশ করল। সে ছিল বস্তির গর্ব, মজনুর চোখের মণি, বস্তির পাঁকে ফোটা এক উজ্জ্বল তারা। কুন্তল স্যারের শ্রম আর ত্যাগের সফল প্রতিচ্ছবি। অমিনাও তার প্রতিটি সাফল্যের খবর প্রথম দিত তার প্রিয় স্যারকে। প্রতিটি সাফল্যের পর স্যারের পা ছুঁয়ে প্রণাম করে আশীর্বাদ না নিলে তার শান্তি হতো না। কুন্তলও প্রতিটা রেজাল্টের দিন অনাদি ময়রার রাজভোগ নিয়ে হাজির হতো, যেটা খেতে আমিনা খুব পছন্দ করত। নিজের হাতে গড়া ছাত্রীর সাফল্যে মনে এক অদৃশ্য তৃপ্তি অনুভব করত কুন্তল। পিছনের দিকে তাকালে মনে হতো, কোনো কালজয়ী নভেল পড়ছেন, যার নায়িকা জীবনের সব প্রতিবন্ধকতার ধূম্রজাল ছিন্ন করে এগিয়ে চলেছে সাফল্যের পথে। আমিনার চোখে-মুখে দারিদ্র্যের স্পষ্ট ছাপের সঙ্গে ফুটে উঠেছিল মেধা, বিনয়, জেদ আর স্বপ্নপূরণের আলো, যা তার জীবনকে আরও উজ্জ্বল করে তুলেছিল।
২০১৬ সাল। স্কুল সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষা। আমিনা দিনরাত এক করে প্রস্তুতি নিয়েছিল। সে জানত, এই পরীক্ষায় সাফল্য তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেবে, তার পরিবারের মুখে হাসি ফোটাবে। কুন্তলবাবু তাকে শিখিয়েছেন, কীভাবে কঠিন প্রশ্নের মোকাবিলা করতে হয়, কীভাবে জীবনের প্রতিটি ধাপেই নিজেকে প্রস্তুত রাখতে হয়। তার অদম্য প্রচেষ্টা আর কুন্তল স্যারের নিবিড় তত্ত্বাবধানে কোনো প্রথাগত কোচিং ছাড়াই প্রথম বারেই সাফল্য অনায়াসে ধরা দিল তার মুঠোয়। এ সাফল্য শুধু আমিনার নয়, এ সাফল্য মজনুর কাটা পায়ের, এ সাফল্য গোটা পরিবারের, এ সাফল্য বিশেষ ভাবে কুন্তলের। আমিনা পাশ করল, যেন মরুভূমির বুকে এক ঝলক বৃষ্টির মতো। ২০১৯ সালে উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষিকা হিসেবে যোগ দিল। প্রথম মাসের মাইনে যেদিন হাতে এল, সেদিনও তার চোখ ভরে উঠেছিল মিষ্টিজলে। এতগুলো টাকা একসঙ্গে কোনোদিন দেখেনি তাদের পরিবার। এই টাকা তার কঠোর পরিশ্রম, বাবার কষ্ট, মায়ের নীরব ত্যাগ, কুন্তল স্যারের নিঃস্বার্থ শিক্ষা, আরও অনেক অনেক অদৃশ্য হাতের স্পর্শের ফসল।
ব্যাংক থেকে বেরিয়ে আমিনা ঢুকল শহরের নামকরা কাপড়ের দোকানে, যেখানে এতদিন প্রবেশ নিষেধ ছিল। কাছাকাছি যেতেই দোকানের কর্মচারী সম্ভ্রমে ডেকে নিল ভিতরে। দোকানে পা দিয়ে সে তার ভিতরে অনুভব করল এক অন্য রকম আন্দোলন। দীর্ঘ অবজ্ঞা আর অপমানের অতীত পেরিয়ে এসে হাতের মুঠোয় পাওয়া বিপরীত দৃষ্টির সম্ভ্রম সে ঠিক উপভোগ করতে পারছিল না। এক গভীর নৈঃশব্দ তাকে আঁকড়ে ধরে, বোবা শব্দ গলা টিপে ধরে। ঠোঁটের কোনায় একটা হালকা হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলে ভিতরের যন্ত্রণার দগ্ধ ক্ষতগুলো ঢাকতে চেয়েও ঢাকতে পারেনি আমিনা। সদ্য-সদ্য পাতি মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে উত্তরণের বাকরুদ্ধ ভাবটা কাটিয়ে উঠতে একটু সময় নেয়। আজ সে বুঝতে পারে, এতদিনের সাদাকে সাদা, কালোকে কালো দেখার স্বাধীনতা তার শেষ হতে চলেছে। সময়ের অভিব্যক্তি সময়ের প্রলেপে ঢেকে সে চারদিকে তাকাতে থাকে। সে এমন কিছু একটা খুঁজছিল, যা তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারে, যা তার মনের গভীরের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে সুন্দর ভাবে। তার চোখে পড়ে দোকানের ভিতরে গমনোদ্যত ভঙ্গিতে দণ্ডায়মান সৌম্যদর্শন ড্যামি পুরুষের গায়ে সজ্জিত একটি মেরুন রঙের পাঞ্জাবি, সঙ্গে দুধসাদা ধুতি। গভীর মেরুন — যেন রক্ত আর ভালোবাসার মিশেল, যেন জীবনের প্রতিটি সংগ্রাম আর অর্জনের প্রতীক। সঙ্গে শুভ্রতা। সেই মানুষটির জন্য, যে প্রতিদানহীন দানে বিশ্বাস করে। এই পাঞ্জাবি যেন কুন্তল স্যারের নিষ্পাপ সত্তার প্রতীক, তাঁর ত্যাগের স্বীকৃতি। সে ধুতি-পাঞ্জাবি, বুকভরা ভালোবাসা আর কৃতজ্ঞতা নিয়ে কুন্তল স্যারের বাড়িতে হাজির হলো।
উচ্ছ্বসিত আবেগের প্রাবল্যে কখন বিকেল ডুবে গেছে সন্ধ্যার আলো-আঁধারির ভিতর, দিনের উজ্জ্বল আভরণ খুলে রেখে রাতের আলোয়ান খুঁজছে সময়। কলিংবেলে চাপ দিয়ে ভিতরের প্রতিক্রিয়া বোঝার অপেক্ষা করতে করতে তার উৎকণ্ঠিত কানে আসে দূরাগত পল্লির মগরিবের আজানের ধ্বনি। সে চমকিত হয়, ভাবে ফিরে যায়, কিন্তু ফেরে না। কী এক দুর্নিবার অমোঘ আকর্ষণ তাকে দাঁড় করিয়ে রাখে।
দরজা খুলে কুন্তলবাবু অবাক।
"আমিনা? এই অসময়?"
তার চোখ বিস্ময়ে বিহ্বল। তিনি যেন আমিনাকে নয়, জীবন্ত কোনো স্বপ্নকে দেখছেন। যাপিত জীবনের চড়াই-উতরাই ভাঙে যে স্বপ্ন। গলায় ঝোলানো মাদুলি দুলিয়ে চায়ের দোকানে কাপ ধুতো যে লিকলিকে মেয়েটি, সে আজ উদ্ভিন্ন যৌবনা, পরিপূর্ণ নারী। ক্ষণিকের জন্য সময়কে ভুলে, নিজেকে ভুলে, উচ্ছল যৌবনের স্বাভাবিক আকর্ষণে তিনি সম্মোহিত, চোখ ফেরাতে পারেন না। দু’চোখে অপার মুগ্ধতা, নাকি অন্য কিছু! কিছুই বুঝে উঠতে পারেন না। বিস্মৃতির শৈবাল ঠেলে আত্মজের সাফল্যমাখা প্রগলভ মুখচ্ছবি ভেসে ওঠে। জীবনের অমীমাংসিত বহু মৌলিক প্রশ্নের সঙ্গে আর একটা নতুন প্রশ্ন যোগ করতে তিনি এতটাই ব্যস্ত ছিলেন, আমিনাকে ভিতরে ডাকতে ভুলে গেছেন।
"স্যার, আপনার জন্য। আমিনা পাঞ্জাবির প্যাকেটটা এগিয়ে দিল। স্যারের আঙুলের অসচেতন স্পর্শে তার হাতে তখন মৃদু কম্পন।"
কুন্তলবাবু দ্বিধান্বিত।
"এসবের কী দরকার ছিল? আমি তো শুধু..."
পিছন থেকে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের মতো বেজে চলেছে একটানা ঘড়ঘড় আওয়াজের সঙ্গে গৃহকর্ত্রীর স্বাভাবিক কৌতূহল — "কে? কে এল?" উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত চলতেই থাকবে প্রশ্নের পর প্রশ্ন।
"দরকার ছিল, স্যার। এর চেয়ে বেশি কিছু করার ক্ষমতা আমার নেই। আপনি আমাদের জন্য যা করেছেন, তার প্রতিদান নয়, সামান্য শ্রদ্ধার্ঘ্য। আমিনার চোখে জল, কণ্ঠ আবেগরুদ্ধ।"
কুন্তলবাবু পাঞ্জাবিটা হাতে নিলেন। এ জীবনে কেউ কখনো তাঁকে ভালোবেসে কিছু দেয়নি। কোনো উপহার তো সাগরপারের কল্পনা। বোধহয় কেউ প্রয়োজন বোধ করেনি প্রিয়জন ভাবার। বস্তির ঘন কালো অন্ধকারের কালিমা সঙ্গে নিয়ে বেড়ে ওঠা মেয়েটি যেটা করতে পারল, জীবনের সব কাঙ্ক্ষিত প্রয়োজন মুঠোর মধ্যে ভরেও অন্যরা সেটা পারেনি। পরক্ষণেই মনে হয়, যার উপর অভিমানের ভারটা নামতে চাইছে, সে তো সুস্থ নয়, স্বাভাবিক নয়। কিন্তু যখন সুস্থ ছিল, তখনও কি...? স্মৃতির জিজ্ঞাসাচিহ্নগুলো খুব ছোটো হয় না, তাই নিজেকে জিজ্ঞাসা করাই ছেড়ে দিয়েছেন অনেক দিন।
আসলে তাঁকে সবাই দেখেছে সুচারু দক্ষতায় দায়-দায়িত্ব-কর্তব্য পালনকারী যন্ত্র হিসেবে, মানুষ ভাবেনি কখনো। হয়তো তেমন ভাবে মানুষ হয়েই উঠতে পারেননি। মধ্যবিত্ত পরিবারের একমাত্র কর্মক্ষম পুরুষ হয়েই রইলেন। তাঁকে না জানিয়ে বা প্রয়োজন জিজ্ঞেস না করে একটা রুমাল পর্যন্ত কেনেনি কেউ। কেন? পুরুষ মানুষ প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে কাঁদতে পারে না বলে? নাকি... কত প্রশ্ন প্রতিদিন ভিড় করে আসে মগজে, কখনো কখনো ভালোমন্দ বোধটাও গুলিয়ে যায়, চিন্তাগুলো জট পাকিয়ে ওঠে তারাপীঠের তান্ত্রিকদের জটার মতো। তাই এখন সচেতন ভাবে নিজেকে নিয়ে, অতীতকে নিয়ে, অপূরিত ইচ্ছেগুলোকে নিয়ে ভাবেন না। আজ আমিনা সব গোলমাল পাকিয়ে দিল।
স্কুল আর শয্যাশায়ী রুগ্ণ স্ত্রীর দেখভাল করাতেই এখন তাঁর সময় চলে যায়। চাওয়া-পাওয়া, না-পাওয়া সব কিছু নিয়েই তাঁদের স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক খুবই গভীর, নিটোল, নিবিড় এক নীরব বোঝাপড়ার সম্পর্ক, কিন্তু তাতে উপহারের প্রদান থাকলেও আদান ছিল না। এই প্রথম কুন্তলবাবু অনুভব করলেন, নিঃস্বার্থ ভালোবাসা শব্দটা শুধু আভিধানিক নয়, বাস্তবেও তার কতটা শক্তিশালী অবস্থান আছে — অতল গভীর সাগর।
"আমিনা এসেছে। আমিনা।"
"তোমাকে ডাকছে, ভিতরে চলো।"
"আপনি পথ ছাড়লে তো!"
এতক্ষণে কুন্তলবাবুর খেয়াল হলো, তাঁরা বাইরেই দাঁড়িয়ে আছেন। নিজের ভুলে নিজেই লজ্জা পেয়ে আমিনাকে পথ ছেড়ে দিলেন।
তিনি পাশের ঘরে গিয়ে পাঞ্জাবিটা বুকে জড়িয়ে নিলেন, যেন তাতে আমিনার শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর তাঁর নিজের ত্যাগের স্বীকৃতি অনুভব করছেন। চোখের কোনায় জমেছিল নীরব শ্রাবণমেঘ, এক অব্যক্ত তৃপ্তি তাঁর মনকে ভরিয়ে দিল। যেন পাশের পাড়ার বৃষ্টির হেঁয়ালে সিক্ত এক ঝলক দমকা শীতল বাতাস চোখে-মুখে বুলিয়ে দিয়ে গেল শীতের আমেজ। বাইরে অন্ধকার যখন ধীরে ধীরে ঘনত্ব বাড়াচ্ছে, তখন তাঁর ভিতরের অনেক দিনের জমাট বাঁধা অন্ধকারের চ্যাঙড়টা গলতে শুরু করেছে। একটা স্ফটিক আলোর ক্রিস্টাল গড়িয়ে পড়ছে সে আঁধারের ভিতর থেকে। তিনি যেন সেই আলোটা ছুঁতে পারছেন।
আমিনা ম্যাডামের পা ছুঁয়ে প্রণাম করে সামনের দিকে গিয়ে মাথা নিচু করতে ম্যাডাম মাথায় হাত রাখলেন। বললেন, "আমি আর ক’দিন? স্যারকে সামলে রেখো।"
দু’চোখের কোণা পাতলা হয়ে আসা স্বচ্ছ অশ্রুতে চিকচিক করে ওঠে। হাতের নাগালে রাখা রুমালে গোপন ব্যথা গোপনে মুছে নেন সন্তর্পণে।
হাত-পায়ের ঢিলে হয়ে আসা দুধসাদা চামড়া আর কোঠরাগত উজ্জ্বল চোখ, খাড়া নাক, পাতলা লালচে ঠোঁট — সব মিলিয়ে বোঝা যায়, যৌবনে তিনি কতটা সুন্দরী আর স্যার কতটা সৌন্দর্যসচেতন ছিলেন। এই মহিলাকে যতই দেখে, ততই অবাক হয় আমিনা। জীবন, সময়, ঈশ্বর, কুন্তলবাবু বা নিজের — কারোর প্রতি কোনো অভিযোগ-অনুযোগহীন, শুধু শুয়ে, বসে, হাঁপিয়ে, কেশে কাটানো জীবন। মানুষ কীভাবে পারে... ভেবেই অবাক হয় সে। বসন্তের বিকাল যেন মেয়েলি যৌবনের মতো দ্রুত ফুরিয়ে আসে। আরো কিছুটা সময় একসাথে কাটাতে চাইলেও ফুরিয়ে আসা সময় আর আগত অন্ধকার তাকে বাধ্য করে বিদায় জানাতে। তার আগে অবশ্য ম্যাডামের নির্দেশে স্যার প্লেটে করে একগাদা মিষ্টি হাজির করে তার সামনে।
সেই মেরুন পাঞ্জাবি আর সাদা ধুতি বার দুই-তিন পড়েছেন কুন্তলবাবু। যখনই বের করেছেন, এক অপূর্ব স্নিগ্ধতা, মনোমুগ্ধকর সুবাস ঘিরে ধরেছে তাঁকে। ফিরে গেছেন যৌবনে, আকুল হিয়ার ব্যাকুলতা কানের কাছে গেয়ে গেছে কুহুতান।
আমিনার জীবনে মজনুর আর্থিক ও শারীরিক অক্ষমতার শূন্যতা অনেকটাই পূর্ণ করেছেন কুন্তলবাবু। একজন শিক্ষক, একজন অভিভাবক, একজন সুহৃদ বন্ধুর মতো তিনি সবসময় আমিনার জীবনযুদ্ধে ভারী ঢাল হিসাবে থেকেছেন। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি থেকে চাকরির পরীক্ষা — প্রতিটি ধাপেই কুন্তল স্যারের উপস্থিতি ছিল আমিনার শক্তি।
৫
জীবন তার নিজস্ব পথে চলে, কখনও আনন্দের সুবাস ছড়ায়, কখনও বিষাদের কালো মেঘে ঢেকে যায়। সময়ের গতির সঙ্গে বদলায় বাঁক, সাপের মতো বদলায় খোলস। আবার সময়ের প্রলেপ মুছে দেয় অভাবী অতীত। শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগে ওয়েটিং লিস্টে থাকা চাকরিপ্রার্থীরা হাইকোর্টের কড়া নাড়ল। মামলা সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়াল। সর্বোচ্চ আদালত সম্পূর্ণ প্যানেল বাতিল করে দিল। আমিনার অনেক কষ্টে বোনা স্বপ্ন, শ্রমে অর্জিত সম্মান — সব যেন এক মুহূর্তে খানখান হয়ে গেল। যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও চাকরি হারানোর যন্ত্রণা কতটা তীব্র হতে পারে, তা তারাই জানেন, যাদের কাঙ্ক্ষিত জীবনের সব পেয়েও হারানোর অভিজ্ঞতা আছে। আমিনার পায়ের নিচের মাটি যেন সরে সরে যাচ্ছে, চোখে শুধুই বিহ্বল শূন্যতা। আজ আমিনা স্যারকে ফোন করে খবরটা দিতে পারল না। তার জীবনের সুখে-দুঃখে জড়িয়ে থাকা মানুষটাকে দুঃখী করতে মন চাইল না।
যোগ্যদের নিঃশর্তে চাকরিতে পুনর্বহাল করার দাবিতে শিক্ষা দপ্তরের সামনে ধরনায় বসল যোগ্য চাকরিপ্রার্থীরা। তার মধ্যে ছিল অমিনাও। তার চোখে তখন এক নতুন দৃঢ়তা — অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর অদম্য জেদ। সব হারিয়ে দাবি করতে শেখা মানুষের ভিড়ে সে তখন শিখে নিচ্ছে জীবনযুদ্ধের নতুন পাঠ।
ছত্রিশ বছর শিক্ষকতা করে সদ্য অবসর নেওয়া কুন্তলবাবু এখন আমিনার নতুন পাঠ্যের সহপাঠী। সপ্তাহে তিন দিন আমিনার সঙ্গে ধরনামঞ্চে যাচ্ছেন। তাকে সাহস দিচ্ছেন, ভরসা যোগাচ্ছেন। কুন্তলবাবু দেখছেন, কীভাবে তাঁর চোখের সামনে আমিনার মতো হাজার হাজার শিক্ষক-শিক্ষিকা-শিক্ষাকর্মীর জীবন সরকারের দায়িত্বজ্ঞানহীনতায় গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে, কীভাবে তাদের স্বপ্নগুলো মুকুলেই চুরমার হয়ে যাচ্ছে। তাঁর শিক্ষকসত্তা আবার জেগে উঠল, সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার প্রশ্নে তিনি সর্বাগ্রে। তিনি সকল বঞ্চিত চাকরিপ্রার্থীর পাশে দাঁড়ালেন। স্লোগানে গলা মেলালেন, মুষ্টিবদ্ধ হাত ঊর্ধ্বে তুলে জানান দিলেন জাতির বিবেক। এত দিনের অনতিক্রমণীয় একান্ত ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে যথার্থ সমাজপ্রহরীর মতো রাত জাগলেন রাজপথে।
চারদিকে আর্তচিৎকার, হাহাকার। অন্ধকার রাজপথ যেন আর্তনাদে কেঁপে উঠল। কুন্তলবাবু আমিনাকে আগলে রাখতে চাইলেন, তার বুকে যেন এক অদৃশ্য প্রাচীর। তিনি জানতেন, এই তরুণ মুখগুলো দেশের ভবিষ্যৎ, তাদের রক্ষা করতে হবে। পুলিশের বেপরোয়া লাঠিচার্জে তিনি নিজেও আহত হলেন। তাঁর মাথার আঘাত থেকে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত ঝরে পড়ছে, তিনি ভ্রূক্ষেপ করলেন না। তাঁর একমাত্র চিন্তা ছিল আমিনা আর তার বন্ধুরা। একটা লাঠির ঘা এসে পড়ল আমিনার মাথায়।
"আহ্!"
একটা তীক্ষ্ণ আর্তনাদ। তার জীবনের প্রতিটি অর্জন যেন শোণিতধারা হয়ে ঝরছে। ক্ষতস্থান হাত চেপে "বাবা গো" বলে সে লুটিয়ে পড়ল মাটিতে।
কুন্তলবাবু তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে অস্ফুটে চিৎকার করতে লাগলেন, "অ্যাম্বুলেন্স! অ্যাম্বুলেন্স!" তাঁর ভয়ার্ত শুষ্ক গলায় ক্ষীণ আওয়াজ বেরোচ্ছিল ঠিকই, কিন্তু তা কারো কানে পৌঁছাচ্ছিল না। তাঁর করুণ আর্তনাদ বাতাসের সাথেই মিলিয়ে যাচ্ছে। চারপাশে চরম বিশৃঙ্খলা। পুলিশের বুটের আওয়াজ, লাঠির শব্দ, আর আন্দোলনকারীদের আর্তনাদ — সব মিলিয়ে এক বীভৎস সিম্ফনি।
কুন্তলবাবু আমিনাকে বুকের মধ্যে ধরে বসে আছেন, তাঁর হাতের বাঁধন শক্ত। চারপাশে নৈঃশব্দ্য। পুলিশের লাঠিচার্জের পর রাজপথ অনেকটা ফাঁকা। কিছু আহত শরীর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে ইতস্তত, তাদের নীরব আর্তনাদ যেন বাতাসের ভার বাড়াচ্ছে। কুন্তলবাবুর সাদা পাঞ্জাবি রক্তে ভিজে যাচ্ছে — আমিনার রক্ত, তাঁর নিজের রক্ত। কোনটা কার, আলাদা করে চেনার উপায় নেই। জীবনে প্রথম পাওয়া প্রীতি-উপহারের মতো তাঁর পাঞ্জাবির বদলে যাওয়া রং যেন এক নতুন ইতিহাসের জন্ম দিচ্ছে, যেখানে জয়-পরাজয় কেবল কাগজ-কলমের হিসেবে নয়, হৃদয়ের গভীরে ভালোবাসার অবিস্মরণীয় এক রঙে লেখা হয়ে যায়। আমিনা জ্ঞান হারানোর আগে শেষবারের মতো তার চোখ খুলল, তার দৃষ্টি ঘোলাটে হয়ে আসছিল। সে দেখল, তার রক্তে ভেজা স্যারের সাদা পাঞ্জাবিতে লেগে থাকা পুরোনো দাগটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে। তাদের বিলীয়মান স্বপ্নের মতো। রক্তস্রোত জমাট বেঁধে কালচে রং ধরছে, পাঞ্জাবিটা কেমন যেন ধীরে ধীরে মেরুন হয়ে যাচ্ছে। তার দেওয়া সেই মেরুন পাঞ্জাবিটার মতো গাঢ় মেরুন — যেন রক্ত আর ভালোবাসার মিশেল। জীবনের নির্মম বাস্তবতা আর নিঃস্বার্থ ভালোবাসার এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ।
লেখক পেশায় একজন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। বই পড়া ও ভ্রমণ তাঁর নেশা। কলেজ জীবনে "প্রগত" নামের মাসিক দেয়াল পত্রিকা ও ত্রৈমাসিক লিটিল ম্যাগাজিন সম্পাদনা করেছেন। দীর্ঘ বিরতির পর পুনরায় সাহিত্যচর্চায় ফিরে এসে বর্তমানে মূলত ছোটগল্প ও অনুগল্প লেখেন; পাশাপাশি কখনো সখনো কবিতা ও প্রবন্ধও রচনা করেন। অজ পাড়াগাঁয়ের এক দরিদ্র কৃষক পরিবারে জন্ম। পড়াশোনার পাশাপাশি শ্রমসাধ্য কৃষিকাজের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা এই লেখক জীবনের বাস্তবতাকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন। মানুষের বেঁচে থাকার নিরন্তর সংগ্রামই তাঁর লেখার প্রধান উপজীব্য।
আপনার ভোটেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
বিস্তারিত নিয়ম
প্রতিটি কলম প্রতিক্রিয়াই একবার করে দেওয়া যাবে, তবে প্রয়োজনে সেই প্রতিক্রিয়া পরিবর্তন করা সম্ভব। কোনো লেখায় একটি কলম প্রতিক্রিয়া দেওয়ার পর, একই মাসে অন্য কোনো লেখায় সেই একই কলম প্রতিক্রিয়া নির্বাচন করলে আগের প্রতিক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে, রয়ে যাবে সর্বশেষ প্রতিক্রিয়াটি। এই প্রতিক্রিয়াগুলির মাধ্যমেই নির্বাচিত হবেন ‘মাসের সেরা কলম’ সম্মানের ‘পাঠকের প্রতিক্রিয়া’ পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক–লেখিকারা।