গরমের ছুটি মানেই আমার কাছে একরাশ অপেক্ষা। শহরের ভ্যাপসা গরম, হর্নের আওয়াজ, একঘেয়ে রুটিন — সব পেছনে ফেলে গ্রামের দিকে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ।
এবারও তাই। মামার বাড়ি।
শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে লাল মাটির উঠোন, পুকুরের ধারে বাঁশঝাড়, দুপুরবেলা ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, আর সন্ধ্যেবেলায় কেরোসিন ল্যাম্পের মিটমিটে আলো।
আমি ঠিক করেছিলাম, সাত দিন পুরো কাটাব। ফোন কম ধরব, রাতে দেরি করে ঘুমোব, দিদার হাতে বানানো খাবার খাব। কিন্তু প্রথম দিন থেকেই বুঝে গেলাম — কিছু একটা ঠিক নেই। বাড়িটা যেন বদলে গেছে। আগে যেখানে হাসি-ঠাট্টায় ভরে থাকত, সেখানে এখন একটা চাপা নীরবতা। মামারা বেশিরভাগ সময় বাইরে। কেউ ঠিক করে চোখে চোখ রাখে না। দিদা আগের মতো গল্প বলেন না — অকারণেই চুপ করে বসে থাকেন।
আমি ভেবেছিলাম, হয়তো বয়সের ভার। কিন্তু গ্রামের বাতাসেও যেন কেমন একটা অস্বস্তি।
মামার বাড়ির পেছনেই ছিল একটা পুরোনো কুয়ো। শৈশবে ওই কুয়োর ধারেকাছেও আমাদের যেতে দেওয়া হতো না। "ওখানে যাস না" — এই একটাই কথা।
কুয়োটা এখন আধা ঢাকা। ইট আর কংক্রিটে মুখ বন্ধ করা, তবু মাঝখানে একটা গোল ফাঁক। চারপাশে আগাছা, শ্যাওলা, আর একটা অদ্ভুত ঠান্ডা ভাব। প্রথম দিন সন্ধ্যেবেলা আমি ওদিকে তাকিয়েই চমকে উঠেছিলাম। কারণ কুয়োটাকে দেখেই মনে হচ্ছিল — ওখানে কেউ আছে।
কিন্তু কে?
নিজেকে সামলে নিলাম। ভাবলাম, শহরের ছেলে গ্রামের অন্ধকারে ভয় পাচ্ছে।
প্রথম রাত। ঘুম ভাঙল হঠাৎ করেই। ঘড়িতে তখন প্রায় দুটো। ঘরটা অস্বাভাবিক ঠান্ডা। জানালার পাল্লা খোলা। বাইরে বাতাস বইছে না, তবু একটা সোঁ সোঁ আওয়াজ। আর তখনই — স্পষ্ট করে শুনলাম। আমার নাম। খুব আস্তে। খুব কাছে।
"……আয়…"
রক্ত জমে গেল। ঘুম ভাঙা স্বপ্ন, না কি সত্যি — বুঝে ওঠার আগেই বুকের ভেতর ধক করে উঠল। আমি উঠে জানালার কাছে গেলাম। বাইরে অন্ধকার। শুধু কুয়োর দিক থেকে যেন একটু বেশি কালো। আর আবার —
"……আয়…"
এবার আর সন্দেহ নেই। ই ডাক স্বপ্ন নয়।
পরদিন সকালে দিদাকে সব বললাম। তিনি প্রথমে চুপ করে শুনলেন। তারপর হালকা হেসে বললেন, "ভয় পাস না। নতুন জায়গা, নতুন আওয়াজ — মন থেকে হয়।" কিন্তু তাঁর চোখের কোণে আমি ভয় দেখেছিলাম।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, "কুয়োর ব্যাপারে কেউ কিছু বলে না কেন?"
দিদা মুখ ঘুরিয়ে নিলেন। "ওসব পুরোনো কথা।"
এই "পুরোনো কথা" শব্দটাই আমার মাথায় আটকে গেল।
আমি খোঁজ নেওয়া শুরু করলাম। গ্রামের বয়স্ক লোকদের সঙ্গে কথা বললাম। কেউ কথা বলতে চায় না। কেউ বললেও অর্ধেক বলে থেমে যায়।
এক সন্ধ্যেবেলা দিদাকে একা পেলাম। আমি সোজা প্রশ্ন করলাম, "আমার নামটা কে রেখেছিল?"
দিদা কেঁপে উঠলেন। চুপ করে রইলেন অনেকক্ষণ। তারপর ধীরে বললেন —
"এই নাম… আগে আরেকজনের ছিল।"
দিদার কথায় সব পরিষ্কার হতে শুরু করল। আমার এক ছোট মামা ছিল। আমার নামেই তার নাম। সে ছিল খুব শান্ত, খুব আবেগী। গ্রামে এক মেয়েকে ভালোবাসত। কিন্তু পরিবার রাজি হয়নি। বিয়ে ভেঙে দেওয়া হয়। এক রাতে সে নিখোঁজ হয়। পরদিন সকালে — এই কুয়োতেই তার দেহ পাওয়া যায়। পরিবার লোকলজ্জার ভয়ে সব চাপা দেয়। কুয়োটা ঢেকে দেওয়া হয়। কিন্তু নামটা থেকে যায় — আমার নামে।
আমি তখন বুঝলাম। সে আমাকে ডাকছে। কারণ আমার নামেই সে বেঁচে আছে। আমি তার শেষ স্মৃতি। তার অসমাপ্ত জীবন। ভয়টা তখন আর শুধু ভৌতিক নয় — ভয়টা হয়ে উঠল ভারী। আমি শেষ রাতে সিদ্ধান্ত নিলাম। আমি যাব।
রাত দুটো। সবাই ঘুমিয়ে। আমি কুয়োর সামনে দাঁড়ালাম। ঠান্ডা বাতাস। অদ্ভুত নীরবতা। আমি বললাম, "আমি জানি তুমি কে।"
কোনো শব্দ নেই।
আমি আবার বললাম, "তুমি একা নও। তোমার নাম কেউ ভুলে যায়নি।"
হঠাৎ কুয়োর ভেতর থেকে হালকা কান্নার শব্দ। তারপর — নীরবতা।
ভোরে উঠে দেখি — কুয়োর মুখ পুরো কংক্রিটে বন্ধ করা হয়েছে।
আমি শহরে ফিরে এসেছি। জীবন আবার স্বাভাবিক। অফিস, রাস্তা, ফোন — সব আগের মতোই। কিন্তু ঘুমটা আর আগের মতো নেই। কিছু কিছু রাতে, হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায়। ঘরটা অস্বাভাবিক ঠান্ডা লাগে। জানালা বন্ধ থাকা সত্ত্বেও মনে হয় কেউ বাইরে দাঁড়িয়ে আছে।
এক রাতে হঠাৎ বুঝলাম — ডাকটা আর বাইরে থেকে আসছে না। ডাকটা আসছে আমার মাথার ভেতর থেকে। ঠিক আমার গলাতেই। আয়নায় তাকিয়ে আমি চমকে উঠি। আমার মুখে আমারই মুখ — কিন্তু চোখদুটো আমার নয়। সেই চোখ আমি কুয়োর জলে দেখেছিলাম। সেই রাতে প্রথমবার বুঝলাম — সে আর আমাকে ডাকছে না। সে আমার ভেতরেই কথা বলছে।
পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি, আমার ডায়েরিতে অচেনা হাতের লেখা —
"এবার তুই থাকবি। আমি মুক্ত।"
আজও গ্রামের লোকেরা বলে, কুয়োটা বন্ধ। কিন্তু কেউ জানে না — কিছু কুয়ো মাটির নিচে থাকে না। কিছু কুয়ো মানুষের ভেতর খুলে যায়।
আপনার ভোটেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
বিস্তারিত নিয়ম
একজন পাঠক একটি সংখ্যায় সর্বোচ্চ ৫টি ভিন্ন কলম প্রতিক্রিয়া দিতে পারবেন — অর্থাৎ প্রতিটি প্রতিক্রিয়া একবার করে দেওয়া যাবে। একই মাসে একই প্রতিক্রিয়া ভিন্ন কোনো লেখায় নতুন করে নির্বাচন করলে, আগেরটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং সর্বশেষ নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটিই গণ্য হবে। অর্থাৎ, পাঠক প্রতিটি প্রতিক্রিয়া বিভাগে একটি করে লেখা নির্বাচন করতে পারবেন। এই প্রতিক্রিয়াগুলির ভিত্তিতেই নির্বাচিত হবেন ‘মাসের সেরা কলম’ সম্মানের ‘পাঠকের প্রতিক্রিয়া’ বিভাগে পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক–লেখিকারা।