নীলবন নামটা শুনলেই মানুষ ভয় পেত। কারণ ওই বনের গাছগুলোর পাতা সবসময় নীলচে, দিনের আলোতেও সেখানে অদ্ভুত এক গোধূলি নেমে থাকত। শোনা যেত, নীলবনের ওপারে আছে সপ্তদ্বার — সাতটি জাদু দরজা, যেগুলো পার হতে পারলে মানুষ নিজের ভাগ্য নিজে লিখতে পারে। কিন্তু শত বছরে কেউ আর ফিরে আসেনি।
এই গল্পের নায়ক ছিল এক সাধারণ কিশোর — নাম তার আরিন। সে কোনো রাজপুত্র নয়, কোনো বীরযোদ্ধাও নয়। সে ছিল এক মানচিত্র আঁকা শিখতে ভালোবাসা ছেলে। তার বাবা ছিলেন নৌকার মাঝি, যিনি একদিন ঝড়ের রাতে আর ফেরেননি। যাওয়ার আগে বাবাই আরিনকে বলেছিলেন, “পৃথিবীটা শুধু চোখে দেখা যায় না, বুঝে দেখতে হয়।”
সেই কথাই আরিনের মাথায় ঘুরত।
একদিন গ্রামে এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। নদীর জল হঠাৎ কালো হয়ে গেল, মাছ মরে ভেসে উঠল, আর রাতে আকাশে লাল চাঁদ দেখা দিল। গ্রামের বৃদ্ধরা বলল, “সপ্তদ্বার বন্ধ হয়ে গেছে। ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।”
সেই রাতেই আরিন সিদ্ধান্ত নিল সে নীলবনে যাবে।
ভোরের আগে সে রওনা দিল। সঙ্গে নিল বাবার দেওয়া পুরোনো কম্পাস, এক টুকরো শুকনো রুটি আর নিজের আঁকা অসম্পূর্ণ মানচিত্র। নীলবনে ঢুকতেই বাতাস ভারী হয়ে এল। শব্দগুলো যেন দমবন্ধ করা। পাখি নেই, পোকাও নেই — শুধু অদ্ভুত নীল আলো।
কিছুদূর যেতেই প্রথম বিপদ।
মাটি হঠাৎ দুলে উঠল। আরিন বুঝল এটা চলমান জমি। এখানে দাঁড়িয়ে থাকলে ধীরে ধীরে সে মাটির নিচে তলিয়ে যাবে। ভয় পেলেও সে দৌড়ায়নি। সে লক্ষ্য করল মাটির নড়াচড়া একটা ছন্দে হচ্ছে। সেই ছন্দ বুঝে সে এক লাফে এক স্থির পাথরে উঠে পড়ল।
এইভাবেই সে পার হল প্রথম দ্বার — ভয়ের দ্বার। সেখানে লেখা ছিল:
“যে ভয় বুঝে নেয়, সে পথ পায়।”
দ্বিতীয় দ্বার ছিল মায়ার দ্বার। সেখানে একই পথ বারবার ঘুরে আসছে বলে মনে হচ্ছিল। ইলু বিভ্রান্ত হয়ে পড়ল, কিন্তু আরিন মানচিত্র বের করল। সে বুঝল এই পথ চোখে নয়, দিকনির্দেশে চলে। কম্পাসের কাঁটা যেখানে থামে, সেদিকেই হাঁটতে হবে।
দ্বার খুলল।
তৃতীয় দ্বার ছিল সবচেয়ে অদ্ভুত — নীরবতার দ্বার। সেখানে ঢুকতেই সব শব্দ হারিয়ে গেল। কথা বলা অসম্ভব। ইলু ভয় পেয়ে পালাতে চাইছিল। তখন আরিন তার হাত ধরল। কোনো কথা নয় — শুধু বিশ্বাস। সেই বিশ্বাসেই তারা পার হল।
চতুর্থ দ্বারে পৌঁছাতে পৌঁছাতে আকাশ কালো হয়ে গেল। এখানে ছিল ছায়ার দ্বার। নিজের ছায়াই শত্রু হয়ে দাঁড়াল। আরিনের ছায়া তাকে বলল, “তুই পারবি না। তোর বাবা পারেনি, তুই কী করে পারবি?”
আরিন কেঁপে উঠল। কিন্তু সে মনে করল বাবার কথা। সে ছায়ার দিকে তাকিয়ে মাথা নোয়াল না। সে এগিয়ে গেল। ছায়া মিলিয়ে গেল।
পঞ্চম দ্বার ছিল ত্যাগের দ্বার। এখানে একটাই নিয়ম — কিছু ফেলে যেতে হবে। ইলু তার লেজ ছাড়ল না। আরিন থামল। সে বাবার দেওয়া কম্পাসটা রেখে দিল। দ্বার খুলল, কিন্তু আরিনের চোখ ভিজে উঠল।
ষষ্ঠ দ্বার ছিল সত্যের দ্বার। এখানে লুকোনো কিছুই রাখা যায় না। আরিন নিজের ভয়, রাগ, কষ্ট — সব মনে মনে স্বীকার করল। কোনো অজুহাত দিল না। দ্বার নিঃশব্দে খুলে গেল।
অবশেষে তারা পৌঁছোল সপ্তম দ্বারের সামনে — ভাগ্যের দ্বার।
দ্বার খুলতেই তারা দেখল এক বিশাল হ্রদ। জলের মাঝে ভাসছে আলো। সেখানে কোনো দেবতা নেই, কোনো রত্ন নেই। শুধু এক কণ্ঠ শোনা গেল — “তুমি কী চাও?”
আরিন ভাবল। সে চাইলে নিজের জন্য শক্তি চাইতে পারত, রাজত্ব চাইতে পারত। কিন্তু সে বলল, “আমাদের গ্রামটা যেন আবার বাঁচে। নদীটা যেন পরিষ্কার হয়।”
হ্রদ আলোয় ভরে উঠল। জল উথলে উঠল। দ্বার বন্ধ হয়ে গেল।
চোখ খুলতেই আরিন নিজেকে নীলবনের বাইরে পেল। ইলু নেই। কম্পাস নেই। কিন্তু আকাশ পরিষ্কার। গ্রামে ফিরে সে দেখল নদী আবার নীল, মাছ লাফাচ্ছে, লাল চাঁদ আর নেই।
লোকেরা জিজ্ঞেস করল, “তুই কী পেলি?”
আরিন হেসে বলল, “পথ চিনতে শিখেছি।”
লেখিকা ছোটো মফস্বলের মানুষ, আদতে বিজ্ঞান বিষয় নিয়ে পড়লেও সাহিত্যের প্রতি বরাবরই অনুরক্ত ছিলেন। ছোটো বেলাতে লেখার আগ্রহী থাকলেও পরবর্তীকালে সেখান থেকে সরে আসতে হয়। জীবনের বিভিন্ন পর্যায় অতিক্রম করে আবার তিনি কলম ধরেন। লিটল ম্যাগাজিন এবং ই-ম্যাগাজিনে লেখা শুরু করেন। উনি নানা ধরনের গল্প লেখেন কিন্তু বিশেষ ভাবে পছন্দ করেন বিজ্ঞান এর ওপর লিখতে।
আপনার ভোটেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
বিস্তারিত নিয়ম
একজন পাঠক একটি সংখ্যায় সর্বোচ্চ ৫টি ভিন্ন কলম প্রতিক্রিয়া দিতে পারবেন — অর্থাৎ প্রতিটি প্রতিক্রিয়া একবার করে দেওয়া যাবে। একই মাসে একই প্রতিক্রিয়া ভিন্ন কোনো লেখায় নতুন করে নির্বাচন করলে, আগেরটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং সর্বশেষ নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটিই গণ্য হবে। অর্থাৎ, পাঠক প্রতিটি প্রতিক্রিয়া বিভাগে একটি করে লেখা নির্বাচন করতে পারবেন। এই প্রতিক্রিয়াগুলির ভিত্তিতেই নির্বাচিত হবেন ‘মাসের সেরা কলম’ সম্মানের ‘পাঠকের প্রতিক্রিয়া’ বিভাগে পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক–লেখিকারা।