About Bangali.Network
About Bangali.Network
মাসিক সংখ্যা
লেখক–লেখিকা
লেখা পাঠান
আমাদের কথা
উদ্যোগ
Web Magazine
Contests


উদ্যোগ Web Magazine
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
চন্ডীভিটে ও রজকিনী রাই
দায়স্বীকার

লেখা, মতামত, মন্তব্য, বিশ্লেষণ, সাক্ষাৎকার বা অন্য যে কোনো প্রকাশিত লেখার সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সকল বক্তব্যের নৈতিক, তথ্যগত ও আইনগত দায় সম্পূর্ণভাবে তাঁদের উপরই বর্তায়। কোনো লেখা প্রকাশিত হওয়া মাত্রেই তা Bangali Network-এর সম্পাদকীয় অবস্থান, নীতি, মতাদর্শ, সমর্থন, অনুমোদন বা সরকারি মতামতের প্রতিফলন হিসেবে গণ্য করা যাবে না।

তথ্যভিত্তিক প্রবন্ধে ব্যবহৃত তথ্য, উদ্ধৃতি, অনুবাদ, পরিসংখ্যান, গবেষণা, শাস্ত্রীয় বা ঐতিহাসিক সূত্র, আইনগত বা বৈজ্ঞানিক তথ্য, বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা, সিদ্ধান্ত ও উপসংহারের যথার্থতা, নির্ভুলতা, পূর্ণতা, প্রাসঙ্গিকতা, বৈধতা ও হালনাগাদকরণের দায় সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকার। Bangali Network সম্পাদকীয় বিবেচনায় কোনো লেখা প্রকাশ, সম্পাদনা, সংক্ষিপ্তকরণ বা ভাষাগত সংশোধন করতে পারে; তবে এ ধরনের সম্পাদকীয় প্রক্রিয়াকে প্রকাশিত তথ্য, সূত্র, উদ্ধৃতি, বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা বা মতামতের সত্যতা, নির্ভুলতা, বৈধতা বা নির্ভরযোগ্যতার প্রত্যয়ন বা নিশ্চয়তা হিসেবে গণ্য করা যাবে না। এ-সংক্রান্ত কোনো দায় Bangali Network গ্রহণ করে না।

লেখক পরিচিতিতে প্রকাশিত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণের ভিত্তিতে প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ-সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

কোনো প্রকাশিত বিষয়বস্তুর কারণে কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সংস্থা বা গোষ্ঠীর আপত্তি, দাবি বা আইনগত প্রশ্ন উত্থাপিত হলে, প্রযোজ্য আইন অনুসারে তার দায় সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা বা সাক্ষাৎকারদাতার উপর বর্তাবে, যদি না আইন ভিন্নভাবে নির্ধারণ করে।

কোনো প্রকাশিত তথ্য বা দাবির যথার্থতা সম্পর্কে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণসহ আপত্তি উত্থাপিত হলে Bangali Network বিষয়টি সম্পাদকীয়ভাবে পর্যালোচনা করবে। পর্যালোচনায় তথ্যগত ভুল প্রমাণিত হলে, Bangali Network নিজস্ব সম্পাদকীয় বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট অংশ সংশোধন, অপসারণ, প্রত্যাহার বা প্রয়োজনীয় সম্পাদকীয় নোট সংযোজন করার অধিকার সংরক্ষণ করে।

দায়স্বীকার

লেখা, মতামত, মন্তব্য, বিশ্লেষণ, সাক্ষাৎকার বা অন্য যে কোনো প্রকাশিত লেখার সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সকল বক্তব্যের নৈতিক, তথ্যগত ও আইনগত দায় সম্পূর্ণভাবে তাঁদের উপরই বর্তায়। কোনো লেখা প্রকাশিত হওয়া মাত্রেই তা Bangali Network-এর সম্পাদকীয় অবস্থান, নীতি, মতাদর্শ, সমর্থন, অনুমোদন বা সরকারি মতামতের প্রতিফলন হিসেবে গণ্য করা যাবে না।

তথ্যভিত্তিক প্রবন্ধে ব্যবহৃত তথ্য, উদ্ধৃতি, অনুবাদ, পরিসংখ্যান, গবেষণা, শাস্ত্রীয় বা ঐতিহাসিক সূত্র, আইনগত বা বৈজ্ঞানিক তথ্য, বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা, সিদ্ধান্ত ও উপসংহারের যথার্থতা, নির্ভুলতা, পূর্ণতা, প্রাসঙ্গিকতা, বৈধতা ও হালনাগাদকরণের দায় সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকার। Bangali Network সম্পাদকীয় বিবেচনায় কোনো লেখা প্রকাশ, সম্পাদনা, সংক্ষিপ্তকরণ বা ভাষাগত সংশোধন করতে পারে; তবে এ ধরনের সম্পাদকীয় প্রক্রিয়াকে প্রকাশিত তথ্য, সূত্র, উদ্ধৃতি, বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা বা মতামতের সত্যতা, নির্ভুলতা, বৈধতা বা নির্ভরযোগ্যতার প্রত্যয়ন বা নিশ্চয়তা হিসেবে গণ্য করা যাবে না। এ-সংক্রান্ত কোনো দায় Bangali Network গ্রহণ করে না।

লেখক পরিচিতিতে প্রকাশিত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণের ভিত্তিতে প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ-সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

কোনো প্রকাশিত বিষয়বস্তুর কারণে কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সংস্থা বা গোষ্ঠীর আপত্তি, দাবি বা আইনগত প্রশ্ন উত্থাপিত হলে, প্রযোজ্য আইন অনুসারে তার দায় সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা বা সাক্ষাৎকারদাতার উপর বর্তাবে, যদি না আইন ভিন্নভাবে নির্ধারণ করে।

কোনো প্রকাশিত তথ্য বা দাবির যথার্থতা সম্পর্কে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণসহ আপত্তি উত্থাপিত হলে Bangali Network বিষয়টি সম্পাদকীয়ভাবে পর্যালোচনা করবে। পর্যালোচনায় তথ্যগত ভুল প্রমাণিত হলে, Bangali Network নিজস্ব সম্পাদকীয় বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট অংশ সংশোধন, অপসারণ, প্রত্যাহার বা প্রয়োজনীয় সম্পাদকীয় নোট সংযোজন করার অধিকার সংরক্ষণ করে।

চন্ডীভিটে ও রজকিনী রাই

কেতুগ্রামে যেখানে চণ্ডীদাস বাস করতেন, সেই স্থানটি চণ্ডীভিটে নামে লোকমুখে প্রচারিত। চোদ্দপুরুষের ভিটে বাঙালির মনে অমলিন এক বিষয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মায়ার চাদরের নকশিকাঁথা, জনম জনমের মরমী ভালোবাসা।

কেতুগ্রামের বাহুলক্ষ্মী সতীপীঠের পুরোহিত কালক্রমে নানুরে কয়েক বৎসরের জন্য চলে যান। তারপর আবার ফিরে আসেন কেতুগ্রামে।

বিদ্যাপতির সমসাময়িক একজন শ্রেষ্ঠ কবি চণ্ডীদাস। চৈতন্য-পূর্বযুগে বিদ্যাপতির সমসাময়িক একজন শ্রেষ্ঠ রাধাকৃষ্ণ-পদাবলি রচয়িতা কবি চণ্ডীদাস, যিনি বাংলা ভাষায় প্রথম পদাবলি সাহিত্য রচনা করেন। চণ্ডীদাস জাতিতে ব্রাহ্মণ ছিলেন। চণ্ডীদাসকে নিয়ে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে জটিল সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে, কারণ — চণ্ডীদাস নামধারী অন্তত চারজন কবি ছিলেন বলে সাহিত্যের ঐতিহাসিকগণ সমস্যায় পড়েছেন, যার প্রকৃত সমাধান এখনও হয়নি।

নানুরে যে এক চণ্ডীদাস বাস করতেন, তা তিনি নিজেই লিখে গেছেন —

নানুরের মাঠে গ্রামের পাশে বাসুলী আছে তথা।
তাহার আদেশে কহে চণ্ডীদাস
সুখ যে পাইবে কোথা।।

লেখক বিনয় ঘোষ লিখেছেন, "চণ্ডীদাস, অর্থাৎ দ্বিজ চণ্ডীদাস, কোন ধারাবাহিক কৃষ্ণলীলার বই কিছু রচনা করেননি। তিনি রচনা করেছেন সুমধুর সুললিত গীতিকাব্যের মালা, যা স্বপ্নভঙ্গ-নির্ঝরের উচ্ছ্বসিত ধারার মতো বাঙালির মনপ্রাণ উদ্বেল করে তুলেছে। বাংলার গীতিকাব্যের লীলায়িত ধারার যিনি অন্যতম প্রবর্তক, বাংলার অমর পদাবলীর স্রষ্টা সেই চণ্ডীদাসের কথা আমরা বলছি। এই চণ্ডীদাস বীরভূম জেলার নানুরেরই অধিবাসী ছিলেন বলে আমার মনে হয়। চণ্ডীদাস–নানুর তাঁরই লীলাক্ষেত্র।"

পদাবলী স্রষ্টা যে এককালে এই নানুরে বসবাস করেছিলেন, এ বিষয়ে পণ্ডিতেরা এখন একমত। চণ্ডীদাসের রজকিনী-প্রেম কাহিনী, চণ্ডীদাসের সাধন-ভজন কাহিনী ও চণ্ডীদাসের মৃত্যু কাহিনী ইত্যাদি সম্বন্ধে অনেক প্রবাদ-কিংবদন্তি প্রচলিত আছে নানুর ও কীর্ণাহারে।

চণ্ডীদাস প্রাক-চৈতন্যযুগের কবি (পঞ্চদশ শতাব্দী)। বীরভূম জেলার অন্তর্গত নান্নুর গ্রামে (সম্ভবত ১৪১৭ খ্রিস্টাব্দে) তাঁর জন্ম হয়। তিনি বাশুলী বা চণ্ডীর উপাসক ছিলেন। চণ্ডীদাস "রামী" নামে এক রজক-কন্যাকে সাধনসঙ্গিনী হিসেবে গ্রহণ করেন। পূর্বরাগ পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ কবি চণ্ডীদাস। চণ্ডীদাস সম্পর্কে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মন্তব্য করেছিলেন — "চণ্ডীদাস সহজ ভাষায় সহজ ভাবের কবি — এই গুণে তিনি বঙ্গীয় প্রাচীন কবিদের মধ্যে প্রধান কবি।" তাঁর মতে, চণ্ডীদাস "দুঃখের কবি"।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় — চণ্ডীদাস একছত্র লিখে পাঠককে দশছত্র লিখিয়ে নেন।

বঙ্কিমচন্দ্র চণ্ডীদাস সম্পর্কে বলেছিলেন — "সায়াহ্ন সমীরণের দীর্ঘশ্বাস"। মহাপ্রভু যে চণ্ডীদাসের পদ আস্বাদন করতেন, তার প্রমাণ পাই কৃষ্ণদাস কবিরাজ রচিত "চৈতন্যচরিতামৃত" গ্রন্থে। সেখানে বলা হয়েছে —

চণ্ডীদাস বিদ্যাপতি রায়ের নাটকগীতি
কর্ণামৃত শ্রীগীতগোবিন্দ।
স্বরূপ রামানন্দ সনে মহাপ্রভু রাত্রিদিনে
গায় শুনে পরমানন্দ।।

চণ্ডীদাসের ভাবশিষ্য হলেন জ্ঞানদাস। চণ্ডীদাস সম্পর্কে সর্বপ্রথম বিস্তৃত আলোচনা করেন — রামগতি ন্যায়রত্ন।

চণ্ডীদাসের সঙ্গে বিদ্যাপতির পার্থক্য :

চণ্ডীদাস গ্রামবাংলার কবি। পাণ্ডিত্যবর্জিত সহজ-সরল ভাষায় তিনি রাধাকৃষ্ণ-বিষয়ক পদ রচনা করেন। অন্যদিকে বিদ্যাপতি নাগরিক কবি পণ্ডিত। তাই তাঁর রচনায় বাকবৈদগ্ধ ও মণ্ডনকলার বৈচিত্র্য আছে।

রবীন্দ্রনাথের মতে, বিদ্যাপতি সুখের কবি, চণ্ডীদাস দুঃখের কবি। চণ্ডীদাস গভীর এবং ব্যাকুল, বিদ্যাপতি নবীন এবং মধুর।

কেউ কেউ দাবি করেছেন যে কেতুগ্রাম হল খ্যাত চতুর্দশ শতকের গীতিকার কবি চণ্ডীদাসের জন্মস্থান। কথিত আছে যে, চণ্ডীদাস নিম্নবর্ণের বিধবাকে বিবাহ করায় কেতুগ্রামের লোকেরা ক্ষুব্ধ হয়েছিল। তিনি বীরভূম জেলার নানুরে চলে গিয়েছিলেন।

এ সময় তিনি উপাসনাকৃত বিশালাক্ষীর প্রতিমা সঙ্গে করে নিয়ে যান। পরবর্তীকালে উত্তেজনা কমে গেলে চণ্ডীদাসকে আবার কেতুগ্রামের বহুলাক্ষী মন্দিরের পুরোহিত হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল। কেতুগ্রামের উত্তর অংশে যে স্থানটি চণ্ডীদাসের জন্মস্থান বলে মনে করা হয়, স্থানীয়রা আজও ঐ এলাকাটিকে "চণ্ডীভিটা" বলে উল্লেখ করে থাকেন।

রামী নামের একজন রজকিনী, যিনি ছিলেন বাল্যবিধবা, তাঁর সঙ্গে প্রেম হয় চণ্ডীদাসের। জমিদারের নির্দেশে গ্রামদেবী বিশালাক্ষীর মন্দিরে পরিচারিকার কাজ করতেন রামী। ওই সময় মন্দিরের পূজারির দায়িত্বে ছিলেন চণ্ডীদাস, যিনি আদতে ছিলেন একজন বৈষ্ণব কবি। তাঁরই প্রচেষ্টায় এবং দেবীর স্বপ্নাদেশ পেয়ে মন্দিরে ঢোকার অধিকার পান তথাকথিত "অছুত" ধোপানি রামী। ক্রমে ক্রমে দু’জনের মধ্যে জন্ম নেয় গভীর প্রেম। কথিত আছে, রামী যখন ঘাটে কাপড় কাচতেন, তখন ছিপ হাতে পুকুরপাড়ে বসে থাকতেন চণ্ডীদাস। প্রেম যে মানুষের তৈরি জাত-পাতের ধার ধারে না — এটি তার একটি জ্বলন্ত প্রমাণ।

বৃন্দাবনে যেমন কানু ছাড়া গীত নাই, চণ্ডীদাস ছাড়া কথা নাই নানুরে আর কেতুগ্রামে। এ নেহাত মিল খোঁজা নয়। নানুর নামের সঙ্গেই জড়িয়ে রয়েছে বৈষ্ণব কবি চণ্ডীদাসের নাম। এখনও মানুষ একই শব্দে বলে থাকে — চণ্ডীদাস–নানুর। সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে রজকিনী-রামীর নামও, যিনি তাঁর সাধনের সঙ্গিনী ছিলেন।

শুন রজকিনী রামি
ও দুটি চরণ শীতল জানিয়া
শরণ লইনু আমি।।

ক্রমে রামীর প্রেম এবং বাসলীদেবীর আশীর্বাদ দুই মিলে যে "শ্রীকৃষ্ণকীর্তন" কাব্যগ্রন্থ তিনি রচনা করে গেছেন, তা আজও বাংলা সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ। চণ্ডীদাস একান্ত সহজ-সরল গ্রাম্য জনগণের প্রচলিত আটপৌরে ভাষায় পদাবলি রচনা করেছেন। সাধারণ বাঙালির দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত ভাষাতেই তাঁর পদ রচনা। কিন্তু সেই সর্বজনপরিচিত লৌকিক ভাষা চণ্ডীদাসের সহজাত প্রতিভার স্পর্শে অলৌকিক ভাবব্যঞ্জনায় শিল্পমূল্য পেয়েছে। তাঁর ভাষা শব্দের বন্ধন ছাড়িয়ে ভাবের স্বাধীন লোকে ঊর্ধ্বগামী হয়েছে। ভাষার অলংকরণে সচেতনভাবে প্রয়াসী না হলেও, কল্পনায় স্বতঃস্ফূর্ত আবেগে যা সৃষ্টি করেছেন, তা গভীর ভাবব্যঞ্জনায় শ্রেষ্ঠ শিল্পরূপ লাভ করেছে।

চণ্ডীদাস পূর্বরাগের শ্রেষ্ঠ কবি। তাঁর পূর্বরাগের পদগুলিতে শ্রীরাধার হৃদয়গ্রাহী ব্যাকুলতা যে বেদনাঘন ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে, সমগ্র বৈষ্ণব পদসাহিত্যে তার তুলনা নেই। মানবহৃদয়ের চিরন্তন প্রেমাকুলতা যেন এসব পদে রূপ লাভ করেছে। মানবিক আবেদনে সর্বজনস্বীকৃত একটি পূর্বরাগের পদ —

সই কেবা শুনাইল শ্যাম নাম।
কানের ভিতর দিয়া মরমে পশিল গো
আকুল করিল মোর প্রাণ।

চণ্ডীদাসের কাব্য মানবতা, মর্ত্যপ্রীতি ও বাস্তবতার ত্রিবেণী-সঙ্গম। রাধাকৃষ্ণের প্রেমকথা বলতে গিয়ে তাঁর পক্ষে এই মানবতা থেকে বিস্মৃত হওয়া সম্ভব হয়নি। পল্লিকবি আসলে সহজিয়া দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখেছিলেন — "সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।" মানবজীবন ধন্য, কেননা মানবের সাধনা নির্মল নয়ন রাধাকৃষ্ণের অপ্রাকৃত প্রেমলীলা দেখতে পারে। কবির চেতনায় ও উপলব্ধিতে আধুনিকতার সুর ধ্বনিত। জগৎ ও জীবনের লীলাই হল তাঁর দর্শন।

চণ্ডীদাসের কবিপ্রতিভার একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য তাঁর গীতিপ্রাণতা। তিনি যেন সৃষ্ট রাধার মধ্যে আপনাকে মিশিয়ে ফেলেছেন। রাধার বিরহ-ক্রন্দনে যেন চণ্ডীদাসের ব্যক্তি-অনুভূতি আর্ত। চণ্ডীদাসের কবিতায় ভাবাবেগের প্রাধান্য লক্ষিত। রাধার প্রেমানুভূতিতে এক ইন্দ্রিয়-অনির্বচনীয় আত্মহারা ভাব আছে। নিখিলের রূপ থেকে অরূপের দিকে চিরন্তন সৌন্দর্য ও প্রেমকামনার এবং বিরহের সুতীব্র আর্তি চণ্ডীদাসের কবিতার শ্রেষ্ঠ সম্পদ।

বাংলা ভাষায় রাধা ও কৃষ্ণের প্রেম-সম্পর্কিত প্রায় ১২৫০টির অধিক পদের সন্ধান পাওয়া গেছে, যেখানে রচয়িতা হিসেবে বড়ু চণ্ডীদাস, দীন চণ্ডীদাস ও দ্বিজ চণ্ডীদাস — তিনটি ভিন্ন নামের উল্লেখ রয়েছে। আবার কোনোটিতে রচয়িতার নামের কোনো উল্লেখ পাওয়া যায়নি। এ কাব্যগুলো ভণিতা নামে পরিচিত। ভণিতা একই ব্যক্তি কর্তৃক রচিত কিনা, তা পরিষ্কার করে জানা যায় না। আধুনিক পণ্ডিতরা ধারণা করে থাকেন, বর্তমান যে সকল কবিতা চণ্ডীদাসের নামে রয়েছে, তা অন্তত চারজন ভিন্ন চণ্ডীদাস কর্তৃক রচিত হয়েছে। ভণিতা-কাব্যের রচনাশৈলী অনুযায়ী তাঁদের পৃথক করা যায়।

প্রথম চণ্ডীদাস হিসেবে পদাবলীর চণ্ডীদাসকে ধারণা করা হয়, যিনি আনুমানিক চতুর্দশ শতকে বীরভূম জেলায় (বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ) জন্ম নেন। তিনি চৈতন্য-পূর্ব বাংলা সাহিত্যে বৈষ্ণব পদাবলি রচয়িতা হিসেবে বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছেন। কারও কারও মতে, তিনিই মধ্যযুগীয় বাংলা কবিতার অন্যতম নিদর্শন "শ্রীকৃষ্ণকীর্তন" রচনা করেন। তবে ড. মিহির চৌধুরী কামিল্যা ভাষাতাত্ত্বিক তথ্যপ্রমাণের সাহায্যে প্রমাণ করেছেন, "শ্রীকৃষ্ণকীর্তন"-এর রচয়িতা বড়ু চণ্ডীদাস বাঁকুড়া জেলার সদর মহকুমাস্থ ছাতনার অধিবাসী ছিলেন। এই কাব্যে কবি নিজেকে অনন্ত বড়ু চণ্ডীদাস হিসেবে ভণিতা দিয়েছেন। তাঁর আসল নাম অনন্ত, কৌলিক উপাধি বড়ু এবং গুরুপ্রদত্ত নাম চণ্ডীদাস। তিনি বাসলী/বাশুলী দেবীর উপাসক ছিলেন (বীরভূমের নানুরে এই দেবীর মন্দির আছে)। "বড়ু" শব্দটি "বটু" বা "বাড়ুজ্যে" (বন্দ্যোপাধ্যায়) শব্দের অপভ্রংশ বলে মনে করা হয়।

চণ্ডীদাসের মৃত্যু সম্বন্ধে "শ্রীকৃষ্ণকীর্তন" কাব্যের আবিষ্কর্তা বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভ স্থানীয় প্রবাদের উল্লেখ করেছেন — বীরভূমের নানুরে বাশুলীদেবীর মন্দিরের কাছে চণ্ডীদাসের কীর্তন-দলের একটি নাট্যশালা ছিল। চণ্ডীদাস একবার গৌড়ের নবাবের রাজসভায় গান গাওয়ার অনুরোধ রক্ষা করতে সেখানে যান। তাঁর কণ্ঠে ভক্তি-প্রেমের গান শুনে নবাবের বেগম মুগ্ধ হয়ে যান এবং তিনি চণ্ডীদাসের গুণের অনুরাগিণী হয়ে পড়েন। বেগম একথা নবাবের কাছে স্বীকার করলে, নবাব ক্রোধের বশে চণ্ডীদাসকে মৃত্যুদণ্ড দেন। আত্মীয়-বন্ধুবর্গের সামনে চণ্ডীদাস হস্তিপৃষ্ঠে আবদ্ধ হয়ে নিদারুণ কশাঘাত সহ্য করে প্রাণবিসর্জন দেন। বেগম সেই দৃশ্য দেখে শোকে মূর্ছিতা হয়ে প্রাণবিয়োগ করেন।

কথিত আছে, শূদ্র-কন্যা রামীর সঙ্গে তাঁর প্রেম ছিল বলে স্থানীয় লোকজন তাঁকে মেরে তাঁর বাড়িতে চাপা দিয়ে দেয়। আবার কারও মতে, তিনি সেই সময়ের বৈষ্ণব পীঠস্থান ইলামবাজারে পালিয়ে গিয়েছিলেন।

দীন চণ্ডীদাস এবং দ্বিজ চণ্ডীদাস নামক ভণিতার দুইজন কবিকে চৈতন্য-পরবর্তী যুগের কবি বলে ধারণা করা হয়। তবে এই নামদুটি ভণিতার হেরফের মাত্র বলেই অনুমিত হয়।

তাঁর লেখা কয়েকটি পদ —
🔸 সই কেবা শুনাইল শ্যামনাম (পূর্বরাগ)
🔸 রাধার কি হইল অন্তরে ব্যথা (পূর্বরাগ)
🔸 ঘরের বাহিরে দণ্ডে শতবার (পূর্বরাগ)
🔸 একে কুলবতী ধনি (পূর্বরাগ)
🔸 এমন পীড়িতি কভূ নাহি দেখি শুনি (পূর্বরাগ)
🔸 কাহারে কহিব মনের মরম (পূর্বরাগ)
🔸 এ ঘোর রজনী মেঘের ঘটা (অভিসার)
🔸 যত নিবারিয়ে চাই নিবার না যায় গো (আক্ষেপানুরাগ)
🔸 বঁধু, কি আর বলিব তোরে (আক্ষেপানুরাগ)
🔸 কি মোহিনী জান বঁধু (আক্ষেপানুরাগ)
🔸 তোমারে বুঝাই বঁধু তোমারে বুঝাই (আক্ষেপানুরাগ)
🔸 মন মোর আর নাহি লাগে গৃহকাজে (আক্ষেপানুরাগ)
🔸 কাল জল ঢালিতে সই কালা পড়ে মনে (আক্ষেপানুরাগ)
🔸 বঁধু কি আর বলিব আমি (নিবেদন)
🔸 বঁধু তুমি যে আমার প্রাণ (নিবেদন)
🔸 ললিতার কথা শুনি হাসি হাসি বিনোদিনী (মাথুর)
🔸 রাইয়ের দশা সখীর মুখে (মাথুর)।




আপনার ভোটেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’

এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন

এই সংখ্যায় প্রযোজ্য নিয়ম

একজন পাঠক এই সংখ্যায় সর্বোচ্চ ৫টি ভিন্ন কলম প্রতিক্রিয়া দিতে পারবেন — অর্থাৎ প্রতিটি প্রতিক্রিয়া একবার করে দেওয়া যাবে। একই প্রতিক্রিয়া এই সংখ্যার অন্য কোনো লেখায় নতুন করে নির্বাচন করলে, আগেরটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং সর্বশেষ নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটিই গণ্য হবে। অর্থাৎ, পাঠক প্রতিটি প্রতিক্রিয়া বিভাগে একটি করে লেখা নির্বাচন করতে পারবেন। এই প্রতিক্রিয়াগুলির ভিত্তিতেই নির্বাচিত হবেন ‘মাসের সেরা কলম’ সম্মানের ‘পাঠকের প্রতিক্রিয়া’ বিভাগে পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক–লেখিকারা। দ্রষ্টব্য: আষাঢ় ১৪৩৩ সংখ্যা থেকে এই নিয়ম আরও সহজ ও উদার করা হয়েছে।

আগামী সংখ্যার জন্য লেখা পাঠান

❛উদ্যোগ❜ ওয়েব ম্যাগাজিনের কার্তিক ১৪৩৩ সংখ্যাটি ১ নভেম্বর ২০২৬ (১৪ই কার্তিক) প্রকাশিত হবে। ওয়েবসাইটে প্রদত্ত লেখার বিভাগ ও বিষয় থেকে আপনার পছন্দের বিষয় বেছে নিয়ে লেখা পাঠান ২০ অক্টোবরের মধ্যে। নির্বাচিত লেখাগুলি লেখক / লেখিকার ছবি ও সংক্ষিপ্ত পরিচিতিসহ প্রকাশিত হবে। লেখা পাঠানোর ফর্ম এবং অন্যান্য সকল তথ্যের জন্য অনুগ্রহ করে মেনুতে ‘লেখা পাঠান’ বিভাগটি দেখুন।

ভালো লাগলে ভালোবাসা দিন
গঠনমূলক পরামর্শ দিন
মন্তব্যে আপনার মতামত জানান
0 0 ভোট
স্টার
guest
0 কমেন্ট
নতুন থেকে পুরোনো
পুরোনো থেকে নতুন ভোটসংখ্যা অনুসারে
ফেসবুক পেজ
Udyog Bengali Web Magazine by Bangali Network

বিভিন্ন বিষয় থেকে বেছে নিয়ে লেখা পড়ুন

বিভিন্ন সংখ্যায় প্রকাশিত হওয়া লেখা পড়ুন

মাসিক সংখ্যাগুলি দেখুন
Scroll to Top

‘উদ্যোগ’ ফোনে রাখুন

‘উদ্যোগ’ ওয়েব ম্যাগাজিন ইনস্টল করুন। ইনস্টলের পর অ্যাপ তালিকা থেকে আইকনটি হোমস্ক্রিনে যোগ করে নিতে পারেন। এরপর সহজেই পড়ুন আপনার প্রিয় ম্যাগাজিন। ভালো না লাগলে যেকোনো সময় এক ক্লিকে আনইনস্টল করতে পারবেন।