পূবালী রিটায়ার করেছেন চাকরি থেকে বছর দুয়েক হলো, ভেবে ছিলেন অবসর কালীন জীবনে যা যা শখ, ইচ্ছা এই যাবৎ পূর্ণ হয়নি এইবার করবেন। কিন্তু ঐ যে মানুষ ভাবে এক আর কোনো এক জায়গায় যে জাদুকর বসে আছেন তিনি জাদুদণ্ডটা ঘুরিয়ে নিমেষে সব এলোমেলো করে দেন। এই যেমন পূবালির জীবনটা করে দিয়ে মজা দেখছেন। নিজের বইয়ের তাকটা গোছাতে গিয়েও ক্লান্তি এসে গেল যেন! "দুচছাই ভালো লাগে না এই সংসার!" বলেই ফেলেন পূবালী।
দু-কামরার আটশ স্কোয়ার ফিটের এই ফ্ল্যাট-টার বয়স প্রায় কুড়ি বছর হতে চললো। পুবমুখী ঘর, সারা দিন রোদ খেলা করে, বাড়ি থেকে কিছুটা গিয়েই বাজার, পার্ক, বড় রাস্তা। সব কিছুই মনের মতো কিন্তু সমস্যা হয়ে গেছে অন্য জায়গায়, টালিগঞ্জের নেহরু কলোনিটা এখনো সেই মধ্যবিত্ত মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। বাহারে সে একজন ঝলমলে সাজের দর্পিতা তরুণী কিন্তু মনটা তার আদ্দিকালের, বড় বেশি কৌতুহল এই পাড়ার লোকজনের। পূবালী নিজে কেন্দ্রীয় সরকারের একজন কর্মচারী ছিলেন সারা জীবন তিনি কাউকে কৈফিয়ত দেননি, এখন দ্যাখো জনে জনে উত্তর দিতে হচ্ছে! রান্নাঘরে রুমা বাসন মাজছে, উফফ চা-টা যে কি করে নিয়ে আসবে বুঝে উঠতে পারছেন না পূবালী। স্বামী নির্মল বাবুকে দেখে রেগেই গেলেন পূবালী। "দ্যাখো কেমন নির্লিপ্ত! পার্ক থেকে হেঁটে এসে নাচতে নাচতে আহ্লাদী মেয়ের ঘরে গেল, মেয়ে কে ঘুম থেকে ওঠাতে"। গজগজ করে ওঠেন পূবালী। রান্না ঘরে গিয়ে চার কাপ জল বসান সসপ্যানে, রুমা সকালে এক কাপ চা খায় এখানেই। আড় চোখে দেখলেন, রুমার কাজ প্রায় শেষের মুখে। পূবালীকে রান্নাঘরে আসতে দেখে বলে উঠলো , "আমি তো ভেবেছিলাম আজ চা অন্য বাড়িতে খেতে হবে মামী।"
উত্তর দিলেন না পূবালী, মাথা গরম আছে বাজে কথা বেরিয়ে যেতে পারে। যত্ন করে চা-টা কাপে ঢেলে একটা বিস্কুট দিয়ে বললেন আরো একটা নিবি রুমা? ঘাড় নেড়ে না বলে রুমা চলে আসে তাঁর প্রিয় বিষয়ে, "জামাইবাবু কি আর আসবে না মামী?"
"জানি না রে", এক কথায় উত্তর দিয়ে দেন পূবালী।
"জামাইবাবু কি দিদির সাথে খারাপ ব্যবহার করতো গো? দেখে তো জামাইবাবুকে খারাপ মনে হতো না। দিদিও তো জামাইবাবুকে চোখে হারাতো! অবশ্য এখন কিছুই বোঝা যায় না, এই তো আমার বোনের বরটা সবার সামনে কত খেয়াল রাখে কিন্তু রাগ হলে আর বোধ বুদ্ধি কিছুই কাজ করে না! বাপ রে কি চিৎকার! ছুটে ছুটে মারতে আসে! ভয় পেয়ে বোন তখন আমার কাছে এসে ওঠে জানো!" চা-টা শেষ করে রুমা কাপটা ধুয়ে রেখে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে যায়। "এগারোটা নাগাদ আসবো মামী ভেজানো গুলো কাচতে" বলে, দরজাটা টেনে দিয়ে চলে যায় ও।
মিষ্টির ঘর থেকে বাপ-মেয়ের হাসির আওয়াজ আসছে, কানে আসে পূবালীর। মাথাটা আবারও গরম হয়ে যায় । "ইসস রুমার ফালতু কথা শুনতে গিয়ে চা ঠান্ডা হয়ে গেল! দূর আমি আর কিচ্ছু করতে পারবো না।" অস্থিরতা কাটাতে বারান্দায় চলে আসেন পূবালী।
সারা ঘরে পুবের রোদ খেলে বেড়াচ্ছে, বাড়িটা কে বড় নরম, আহ্লাদী মনে হচ্ছে। বাড়ির সামনে এখনো অনেক গাছ আছে, মজার কথা হলো কাঠ বিড়ালির দেখা পান মাঝে মাঝে, বারান্দায় আসলে। দ্যাখো নিজেদের মধ্যে কেমন খুনসুটি করছে! দেখতে দেখতে হেসেই ফেলেন। পূবালী টের পান না তাঁর টানাটানা দু'চোখেও এখন শীতের ঝলমলে রোদ খেলা করে বেড়াচ্ছে।
আজ জলখাবার বানিয়েছে মিষ্টি ডিমটোস্ট আর চা বানিয়েছেন নির্মলবাবু। পূবালী আপাতত তাঁর ঘরে। তাঁর স্কুলের বন্ধুদের সাথে এখনো যোগাযোগ আছে, আজ বেরোবেন বিকালে। মেয়ে তাঁর ল্যাপটপ নিয়ে কাজে বসে গেছে, ডিজাইনিং এর কাজ করে। নির্মলবাবুও ব্যস্ত তাঁর শেয়ার মার্কেট নিয়ে। অবসরের পর নির্মল বাবুও অনেকটা সময় শেয়ার বাজারকে দেন।
ঘাড়ের কাছে একটা গরম নিশ্বাসের আভাস পেয়ে চমকে পেছন ঘুরে তাকান পূবালী, নির্মল বাবু! তাঁর বত্রিশ বছরের সঙ্গী। কত উথালপাথাল সময় একসাথে হাত ধরে পাড় হয়েছেন, এইবার যে কি হলো! স্বামীর হাতটা চেপে ধরেন পূবালী।
"কি দ্যাখো বলতো ছবিটা তে, পুপু"?
"তোমার মনে আছে ঐ প্রবল ঠান্ডায় যখন আমি কাবু, আমাদের কাল রাত্রির দিন ঠান্ডা লাগিয়ে খক খক করে কাশছিলাম, তুমি আমার কাশির আওয়াজ শুনে সবিতাদির হাত দিয়ে কাফসিরাপ পাঠিয়ে দিয়েছিলে, আর সবিতাদিকে বলেছিলে আমার খেয়াল রাখতে।"
নির্মল বাবু বোঝার চেষ্টা করেন তাঁর পুপু ঠিক কি বলতে চাইছে! তাকিয়ে থাকেন বউয়ের দিকে।
"বিশ্বাস করো কলকাতায় থাকা, চাকরি করা আমি তোমাকে বিয়ে করতে খুব একটা চাইনি কিন্তু তোমার ঐ নরম মনটার খোঁজ কালরাত্রির রাতে যখন পেলাম বুঝলাম ঠকিনি। তবু আমাদের কি পরে মনে হয়নি এক সাথে আর চলা যাচ্ছে না। কখনও মনে হয়েছে তুমি বড্ড স্বার্থপর। আবার আমরা এক হয়েছি, ভরসা করেছি। তবে আমার মেয়েটা এতো খামখেয়ালি হলো কি করে বলতো!"
ছবিটাকে সরিয়ে রাখেন পূবালী, নির্মল দেখেন তাঁর পুপুর গালের এক পাশে রোদে তৈরি হওয়া পেয়ারা গাছের পাতার নকশা এসে পড়েছে, চিরচেনা পুপু কোথাও গিয়ে কি রকম অচেনা মানুষ মনে হচ্ছে। মিষ্টিকেও ঠিক ধরতে পারছেন না নির্মলবাবু! কি বলবেন বৌকে?
গলাটা একটু পরিষ্কার করে নেন, বলেন "সাবালক এবং বুদ্ধিমতী মেয়ে আমাদের, পুপু ভেবে কিছু করতে কি পারবো বলো? ভেব না এতো।"
ফোঁস করে ওঠেন পূবালী, "তোমার প্রশ্রয়েই মেয়ের এতো বাড়, কলেজে পড়তে অভিজিতের সাথে এতো প্রেম, বাড়িতে নিয়ে আসছে, ওর জন্য লাইব্রেরিওয়ার্ক করছে। গোটা পাড়া জেনে গেল এই আমাদের জামাই হবে। কে না বলেছে বলো ওদের লেক, রবীন্দ্র সদন, অলি-গলিতে দেখা গেছে আমরা কত দেখেছি।
অভিজিতের মা ফোনে কত মিষ্টি মিষ্টি করে বাজে কথা শুনিয়েছে। তোমার মেয়ের কোনো হেলদোল ছিল? আমি বলতে গেছি, খারাপ হয়েছি।" কান্নায় বিকৃত হয়ে যায় গলার স্বর। ফর্সা মুখ টকটকে লাল। ভয় পান নির্মলবাবু। ফিসফিস করে জানতে চান, "অ্যামলোডাকটা আজ খেয়েছো? স্বপনবাবুকে একবার ফোন করি বহুদিন বিপি-টা দেখা হয়নি তোমার!"
"রাখো তোমার স্বপনবাবু। ঐ মিনমিনে স্বভাবের জন্য মিষ্টি মাথার ওপর উঠে নাচছে। তারপর মনে নেই কি হলো? ও মা, কোথায় কী, দেখি অভিজিতের বিয়ে! কার্ড হাতে মা-ছেলে হাজির। মেয়ে জানতো। কিচ্ছু বলেনি একবারও। কি লজ্জা! তারপর এই অভিষেক। কোথায় আলাপ হলো কিছুই বুঝলাম না, বিহারি ছেলেটাকে বিয়ের জন্য ক্ষেপে গেল। মনে আছে কোভিডের রাশ একটু আলগা হতে বিয়ের ব্যবস্থা করলাম আমরা। তারপর তো ওরা নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত। অভিষেকের বাঙ্গালীদের মতো জন্মদিন করা, মিষ্টির শরীর খারাপে অভিষেক রাত জাগছে। ওদের রাঁচীর বাড়িতে যাচ্ছে ছট পুজোয়, তীজে হাতে মেহেন্দি আঁকছে। মিথ্যে বলবো না নির্মল প্রথমে অপছন্দ করলেও অভিষেক কে আমি জামাই হিসেবে মেনে নিয়েছিলাম। এখন তো শুনি অভিষেকের সাথেও থাকা যাচ্ছে না। রাজকুমারীর সমস্যাটা কি তুমি কি জানো? দয়া করে বলবে আমায়?"
"বাপি আমি একটু হালতু যাচ্ছি, আমার কিছু জরুরি জিনিস আনার আছে।"
পূবালীর ওপর খুব বিরক্ত লাগছে, মেয়েটা সব শুনেছে, এতো অসহিষ্ণু কেন হচ্ছে পুপু! "দূর আজ আর এই বাড়িতে থাকবো না।" রাগী গলায় কথা কটা ছুঁড়ে দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যান নির্মল বাবু।
পূবালীর হলুদ কমলা রঙে রাঙানো ঘর আজ নিমেষে ধূসর । রান্না করার ইচ্ছেই নেই, তবু যদি ওরা খায়, ডাল সিদ্ধ, মাছ কটা ভাজলেন। একটা অবধি অপেক্ষা করে ভাত বসালেন, প্রায় দুটো অবধি বসে থেকে সামান্য ভাত আর মাছ ভাজা নিয়ে বসলেন খেতে। মুখে একটা গ্রাস তুলে মনে হলো এতো বিস্বাদ খাবার জীবনে খাননি। অতি কষ্টে খাওয়া শেষ করে সোফাতে এসে একটা বই নিয়ে বসলেন। অক্ষর গুলো বোধহয় পিঁপড়ে, যারা নিজের মতো করে চলে ফিরে বেরোচ্ছে। কিছুই মাথায় আসে না। নির্মল বাবুকে একটা ফোন করলেন, ধরলো না। এটা জানাই ছিল ধরবে না। মেয়েও ফোন ধরবে না। চারটের কমলা রোদের ছায়া সাদা দেয়ালের গায়ে পড়েছে, হঠাৎ কাঁপুনি ধরায় বুকের ভেতরে এই একাকিত্বটা। পূবালীর সাজানো ফ্ল্যাট যেন একটা আদিম গুহা। তাড়াতাড়ি টিভি চালান, টিভির সিরিয়ালের চরিত্রদের সংসারে প্রবেশ করাই এখন পূবালীর জীবনে একমাত্র কাজ। খেয়াল নেই কোনো কটা বাজে। বেলটা বাজলো। মিষ্টি দরজায়।
"মা, আমি ঐ বাড়িতে গেছিলাম।" মিষ্টি কি টিভিকে বলছে না পূবালীকে! "আমার কিছু বই, জামা আনতে। আমাদের ডেট পরেছে মে'র পনেরো তে। ঐ দিন আমি ফ্ল্যাটের চাবি অভিষেক কে দিয়ে দেব। খোরপোষ নেবো না জানতো, কি দরকার বলো? আমিও তো রোজগার করি। খাটতেও পারি" এতোটা বলে চুপ করে মিষ্টি। আচমকাই পূবালীর কোলে মাথা রাখে ও, পূবালী অনুভব করেন তাঁর হাতের পাতায় জল।মেয়ে কাঁদছে তবে। শান্ত হয়ে থাকেন পূবালী, মিষ্টি বুঝতে যেন না পারে।
"মা জানো আজ পর্দাগুলোতে হাত বোলাতে কি কষ্ট হচ্ছিল, কত আনন্দ করে গড়িয়াহাট থেকে কেনা, আজ কি অনাদরে পড়ে আছে! আমার গোলাপ গাছে ফুল এসেছে একটু জল দিলাম। শেষ বারের মতো চলে আসার আগে তাকিয়ে দেখলাম একটু করে ঝুল হয়েছে, ধুলো পড়েছে ফ্ল্যাটে। অভিষেক যত্ন করেনা মা। অভিষেক জানেনা খেয়াল রাখতে। বিরক্ত হলে, রাগ করলে, ও তেড়ে তেড়ে আসতো। খাবার মনের মতো না হলে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে, না খেয়ে উঠে গেছে। আমি ওকে ভয় পেতে শুরু করেছিলাম। একসাথে শোয়ার সময় আমার দম বন্ধ হয়ে আসতো। শেষে তো আমার সাথে বাইরে বেরোতে চাইতো না। তবুও আমি বিয়েটা ভাঙতে চাইনি মা। বলেছিলাম চলো ম্যারেজ কাউন্সিলের কাছে চলো, কিন্তু ও আর থাকতে চাইলো না। অভিজিতের সাথে প্রেম নিয়ে খোঁচা দিতো। আমিই নাকি সংসার বাঁচাতে পারি না। আমার উচিত ছিল আগে কোনো মনোবিদের কাছে যাওয়া, তারপর বিয়ে করা। আমি নাকি ওর জীবন এই তিন বছরে নষ্ট করে দিয়েছি। কত আর সহ্য করবো বলতো?"
পূবালীর হাত, কোল ভেসে যেতে থাকে চোখের জলে। টিভির চরিত্রদের হাসি কান্না, খড়কুটো দিয়ে সংসার বাঁধার আপ্রাণ চেষ্টায় ছবির মতো সাজানো ঘর গুলো ভেসে যেতে থাকে, আর সোফায় বসে থাকা মা মেয়ে চেষ্টা করে চলে ছড়িয়ে পড়া খড়গুলোকে এক করতে — আরেকটি বাসা বাঁধার জন্য।
আপনার ভোটেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
বিস্তারিত নিয়ম
একজন পাঠক একটি সংখ্যায় সর্বোচ্চ ৫টি ভিন্ন কলম প্রতিক্রিয়া দিতে পারবেন — অর্থাৎ প্রতিটি প্রতিক্রিয়া একবার করে দেওয়া যাবে। একই মাসে একই প্রতিক্রিয়া ভিন্ন কোনো লেখায় নতুন করে নির্বাচন করলে, আগেরটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং সর্বশেষ নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটিই গণ্য হবে। অর্থাৎ, পাঠক প্রতিটি প্রতিক্রিয়া বিভাগে একটি করে লেখা নির্বাচন করতে পারবেন। এই প্রতিক্রিয়াগুলির ভিত্তিতেই নির্বাচিত হবেন ‘মাসের সেরা কলম’ সম্মানের ‘পাঠকের প্রতিক্রিয়া’ বিভাগে পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক–লেখিকারা।