About Bangali.Network
About Bangali.Network
মাসিক সংখ্যা
লেখক–লেখিকা
লেখা পাঠান
আমাদের কথা
উদ্যোগ
Web Magazine
Contests


উদ্যোগ Web Magazine
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
যে চিঠিটা খোলা হয় নি
দায়স্বীকার

লেখা, মতামত, মন্তব্য, বিশ্লেষণ, সাক্ষাৎকার বা অন্য যে কোনো প্রকাশিত লেখার সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সকল বক্তব্যের নৈতিক, তথ্যগত ও আইনগত দায় সম্পূর্ণভাবে তাঁদের উপরই বর্তায়। কোনো লেখা প্রকাশিত হওয়া মাত্রেই তা Bangali Network-এর সম্পাদকীয় অবস্থান, নীতি, মতাদর্শ, সমর্থন, অনুমোদন বা সরকারি মতামতের প্রতিফলন হিসেবে গণ্য করা যাবে না।

তথ্যভিত্তিক প্রবন্ধে ব্যবহৃত তথ্য, উদ্ধৃতি, অনুবাদ, পরিসংখ্যান, গবেষণা, শাস্ত্রীয় বা ঐতিহাসিক সূত্র, আইনগত বা বৈজ্ঞানিক তথ্য, বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা, সিদ্ধান্ত ও উপসংহারের যথার্থতা, নির্ভুলতা, পূর্ণতা, প্রাসঙ্গিকতা, বৈধতা ও হালনাগাদকরণের দায় সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকার। Bangali Network সম্পাদকীয় বিবেচনায় কোনো লেখা প্রকাশ, সম্পাদনা, সংক্ষিপ্তকরণ বা ভাষাগত সংশোধন করতে পারে; তবে এ ধরনের সম্পাদকীয় প্রক্রিয়াকে প্রকাশিত তথ্য, সূত্র, উদ্ধৃতি, বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা বা মতামতের সত্যতা, নির্ভুলতা, বৈধতা বা নির্ভরযোগ্যতার প্রত্যয়ন বা নিশ্চয়তা হিসেবে গণ্য করা যাবে না। এ-সংক্রান্ত কোনো দায় Bangali Network গ্রহণ করে না।

লেখক পরিচিতিতে প্রকাশিত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণের ভিত্তিতে প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ-সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

কোনো প্রকাশিত বিষয়বস্তুর কারণে কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সংস্থা বা গোষ্ঠীর আপত্তি, দাবি বা আইনগত প্রশ্ন উত্থাপিত হলে, প্রযোজ্য আইন অনুসারে তার দায় সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা বা সাক্ষাৎকারদাতার উপর বর্তাবে, যদি না আইন ভিন্নভাবে নির্ধারণ করে।

কোনো প্রকাশিত তথ্য বা দাবির যথার্থতা সম্পর্কে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণসহ আপত্তি উত্থাপিত হলে Bangali Network বিষয়টি সম্পাদকীয়ভাবে পর্যালোচনা করবে। পর্যালোচনায় তথ্যগত ভুল প্রমাণিত হলে, Bangali Network নিজস্ব সম্পাদকীয় বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট অংশ সংশোধন, অপসারণ, প্রত্যাহার বা প্রয়োজনীয় সম্পাদকীয় নোট সংযোজন করার অধিকার সংরক্ষণ করে।

দায়স্বীকার

লেখা, মতামত, মন্তব্য, বিশ্লেষণ, সাক্ষাৎকার বা অন্য যে কোনো প্রকাশিত লেখার সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সকল বক্তব্যের নৈতিক, তথ্যগত ও আইনগত দায় সম্পূর্ণভাবে তাঁদের উপরই বর্তায়। কোনো লেখা প্রকাশিত হওয়া মাত্রেই তা Bangali Network-এর সম্পাদকীয় অবস্থান, নীতি, মতাদর্শ, সমর্থন, অনুমোদন বা সরকারি মতামতের প্রতিফলন হিসেবে গণ্য করা যাবে না।

তথ্যভিত্তিক প্রবন্ধে ব্যবহৃত তথ্য, উদ্ধৃতি, অনুবাদ, পরিসংখ্যান, গবেষণা, শাস্ত্রীয় বা ঐতিহাসিক সূত্র, আইনগত বা বৈজ্ঞানিক তথ্য, বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা, সিদ্ধান্ত ও উপসংহারের যথার্থতা, নির্ভুলতা, পূর্ণতা, প্রাসঙ্গিকতা, বৈধতা ও হালনাগাদকরণের দায় সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকার। Bangali Network সম্পাদকীয় বিবেচনায় কোনো লেখা প্রকাশ, সম্পাদনা, সংক্ষিপ্তকরণ বা ভাষাগত সংশোধন করতে পারে; তবে এ ধরনের সম্পাদকীয় প্রক্রিয়াকে প্রকাশিত তথ্য, সূত্র, উদ্ধৃতি, বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা বা মতামতের সত্যতা, নির্ভুলতা, বৈধতা বা নির্ভরযোগ্যতার প্রত্যয়ন বা নিশ্চয়তা হিসেবে গণ্য করা যাবে না। এ-সংক্রান্ত কোনো দায় Bangali Network গ্রহণ করে না।

লেখক পরিচিতিতে প্রকাশিত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণের ভিত্তিতে প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ-সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

কোনো প্রকাশিত বিষয়বস্তুর কারণে কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সংস্থা বা গোষ্ঠীর আপত্তি, দাবি বা আইনগত প্রশ্ন উত্থাপিত হলে, প্রযোজ্য আইন অনুসারে তার দায় সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা বা সাক্ষাৎকারদাতার উপর বর্তাবে, যদি না আইন ভিন্নভাবে নির্ধারণ করে।

কোনো প্রকাশিত তথ্য বা দাবির যথার্থতা সম্পর্কে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণসহ আপত্তি উত্থাপিত হলে Bangali Network বিষয়টি সম্পাদকীয়ভাবে পর্যালোচনা করবে। পর্যালোচনায় তথ্যগত ভুল প্রমাণিত হলে, Bangali Network নিজস্ব সম্পাদকীয় বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট অংশ সংশোধন, অপসারণ, প্রত্যাহার বা প্রয়োজনীয় সম্পাদকীয় নোট সংযোজন করার অধিকার সংরক্ষণ করে।

যে চিঠিটা খোলা হয় নি
তোমার বাবা ... শরৎ ... খুব ভালো মানুষ ছিল। খুব শান্ত। আমি গান গাইতাম, আর সে শুনত নিঃশব্দে। সেই শীতকালেই ও প্রথম আমাকে ওর কোটটা দিয়েছিল — সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল — ও যেন আমাকে পুরো পৃথিবীটা দিয়ে দিল।


শীতের সকালগুলো একেকটা আলাদা জগত। ঘুমের সঙ্গে ঝগড়া লাগিয়ে যে-আলো জানলা পেরিয়ে ঘরে ঢোকে, তার রংটা অন্য সব ঋতুর থেকে আলাদা — বেশি কোমল, বেশি নির্লিপ্ত, আবার একই সঙ্গে কেমন যেন আপনমনে হাসিখুশি। রোদ দেখে মনে হয় সে জানে, শীতের কনকনে কামড়ে আজ তারই সবচেয়ে বেশি দরকার।

মাধবী সেদিন এমনই এক সকালে তার বাবার পুরোনো কাঠের আলমারি খুলেছিল। বাবার মৃত্যুর পর বছর চারেক কেটে গেছে। বাড়িতে ছোটখাটো সংস্কার চলছে, তাই ঘরদোর গোছোতে গিয়েই আলমারির দিকে নজর পড়ে। বাবার আলমারি — অসংখ্য স্মৃতি, কিন্তু কখনও সাহস করে খোলা হয়নি।

আলমারির দরজা খুলতেই ধুলো, পুরনো কাগজের গন্ধ, আর কিছু অচেনা স্যাঁতসেঁতে গন্ধ একসঙ্গে বেরিয়ে এল। ভাঁজ করা গামছা, পুরনো পাঞ্জাবি, কয়েকটা নোটবই আর শেষে একটা গাঢ় বাদামি রঙের উইলন কোট — অতি প্রিয় কোট ছিল এটা। ছোটবেলায় মাধবী বাবাকে এই কোট পরে শীতের সকালে ছাদে রাখা উনুনে চা বানাতে দেখেছে। সেই কোটের কলার উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা বাবার মুখ, হালকা রোদে চোখ ছোট হয়ে যাওয়া, আর দূর কোথাও তাকিয়ে থাকা — এসব ছবি যেন আলমারির সঙ্গে সেঁটে ছিল।

মাধবী কোটটা বের করে ঝাড়তে গিয়েই লক্ষ্য করল — এক পাশে পকেটটা ফুলে আছে। এমন কিছু কি থাকতে পারে? সে ভাবল — হয়তো পুরনো প্রয়োজনীয় কাগজ, হয়তো পুরনো কোনো বাজারের তালিকা।

কিন্তু পকেট থেকে বের হলো একটা ছোট খাম। সাদা খামের রং হলদেটে হয়ে গেছে। সামনে বড় হরফে বাবার নাম — "শরৎচন্দ্র মিত্র"। পেছনে তারিখ — ১৫ ডিসেম্বর ১৯৮৫।

মাধবীর বুকের ভেতর কেমন একটা দুরুদুরু ভাব ওঠে। কার চিঠি? মা যে বলতেন বাবার খুব বেশি বন্ধু ছিল না! আর প্রেমপত্র?

সতর্ক হাতে খামটা ছিঁড়ে চিঠিটা খুলতেই যেন এক ধাক্কা হাওয়ার ঝাপটা মুখে লাগল। চিঠির প্রথম লাইন —

"শরৎ, তোমার সঙ্গে শেষ দেখা হয়নি। ইচ্ছে ছিল। কিন্তু ততদিনে তোমার জীবনে বোধহয় অন্য গল্প শুরু হয়ে গেছে..."

মাধবীর চোখ স্থির হয়ে গেল।

চিঠিটা বেশ ছোট, কিন্তু প্রতিটি শব্দ যেন কোনও গোপন আলোক রেখা হয়ে বাবার অতীতের দিকে নিয়ে যায়। লাইনগুলো কাঁপা হাতে লেখা —

"আমি তোমাকে দোষ দিই না। আমাদের দেখা যাই হোক না কেন, তোমার মুখটা হাসলেই আমার মন শান্ত হত। তুমি বোধহয় জানোনি — তোমার জন্য আমার ভেতরে কী বিশাল জায়গা তৈরি হয়েছিল। আমি সে কথা কাউকে বলতে পারিনি। শীত পড়েছে, জানো তো? শীত মানেই তোমার কোটের গন্ধ আমার নাকে ভাসে।

যদি কোনোদিন সময় পাও, একটা বার লেখা দিও।

— তোমার,
অ."

শুধু "অ।" কে এই 'অ'?

পুরো চিঠিটা পড়তে পড়তে মাধবীর মনে হচ্ছিল — কেউ যেন তার বুকের ভেতর ধীরে ধীরে অতীতের দরজা খুলে দিচ্ছে। বাবা কি কখনো জানতেন যে এমন কেউ তাকে এতটা ভালোবাসত? কেন চিঠিটা তিনি উত্তর দেননি? অথবা দেননি বলে কি এই 'অ' তার জীবনে আর ফিরে আসেনি?

আরও আশ্চর্যের হলো — চিঠিটা কখনো খোলা হয়নি। খামের ছেঁড়া দাগটা নতুন — অর্থাৎ বাবার মৃত্যুর পর এতদিন এই চিঠি নিজের খোলসেই বন্দি ছিল।

মাধবীর মনে হলো — কেউ যেন তার কাঁধে হাত রেখে বলছে, "এই গল্পটার একটা শেষ তো আছে, মাধবী।"

হঠাৎই তার মনে হলো — নতুন বছরে একটা লক্ষ ঠিক করা যাক। চিঠির প্রেরক 'অ' কে খুঁজে বের করতেই হবে।


বাড়ির বারান্দায় রোদ পড়ে আছে। মাধবী কম্বল কাঁধে জড়িয়ে বসে আছে; কোলে কমলালেবু। রোদে বসে এসব ভাবতে ভাবতে কমলা খাওয়ার আলাদা একটা আনন্দ আছে। লেবুর গন্ধ শীতে বিশেষভাবে ছড়িয়ে থাকে। শুকনো পাতার মতো হালকা, আবার তীক্ষ্ণও।

চিঠির শেষ লাইনের নিচে একটা ফোন নাম্বার ছিল। সাত সংখ্যার পুরনো ল্যান্ডলাইন নম্বর। এখনকার দিনে যার মানে হয়তো নেই — কোনো এলাকার কোডও নেই।

মাধবী প্রথমেই ভাবল পুরনো বন্ধু-বান্ধবদের জিজ্ঞেস করবে। কিন্তু বাবার জীবনে তিনি খুবই স্থির, গম্ভীর প্রকৃতির ছিলেন। তার কলেজ-জীবনের গল্প বলে শুনেছেন খুব কম। তবু প্রথম ফোন গেল বাবার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু নির্মল কাকাকে। ছোট থেকে মাধবী তাকে কাকা বলে ডাকে।

নির্মল কাকা শুনেই বলল, "অ? সেই অর্পিতা নাকি?"

মাধবীর শিরা-উপশিরায় যেন বিদ্যুৎ বয়ে গেল।

"অর্পিতা? বাবা চিনতেন?"
"চিনত তো। কলেজের বন্ধু ছিল। খুব ভালো গায়িকা। খুব হাসিখুশি। ও আর শরৎ একটা সময় বেশ ঘন ঘন মেলামেশা করত। আমরা অনেকেই ভাবতাম ওদের কিছু হবে। কিন্তু..."
"কিন্তু?"

নির্মল কাকা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

"হঠাৎই অর্পিতা কলেজ পরিবর্তন করে দিল। ঠিক কারণটা আমরা কেউ জানতাম না। শরৎও বলত না। পরে তো ওর (অর্থাৎ তোমার মায়ের) সঙ্গে বিয়ে ঠিক হল। তারপর অর্পিতা কেমন যেন হারিয়েই গেল।"

মাধবীর বুকের ভেতর শক্ত কিছু জমাট বেঁধে উঠল। বাবার মুখ মনে পড়ে — নরম, স্নিগ্ধ, শান্ত। তার বাবা — যিনি কখনো গলগল করে কথা বলতেন না, সব অনুভূতি জমিয়ে রাখতেন, সেই মানুষটির জীবনে এমন একটা গল্প লুকিয়ে ছিল, যা মা-ও জানতেন না?

চিঠিটা আবার পড়ল — "তোমার কোটের গন্ধ..." এই কোট! হয়তো সেই সময়ের স্মৃতি নিয়েই কোটটা বাবার এত প্রিয় ছিল।

মাধবী সিদ্ধান্ত নিল — কলেজের রেজিস্ট্রি অফিসে যাওয়া দরকার।


শীতের দুপুরগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে একটা হালকা কুয়াশা ভেসে থাকে। বিশাল ফাঁকা মাঠ, মাথার ওপর গাছের পাতারা ঠাণ্ডার চাপে আরও ঝিমিয়ে থাকে।

মাধবী রেজিস্ট্রার ভবনে গিয়ে জানল — ১৯৮৫ সালের ব্যাচের তথ্য খুঁজে পাওয়া কঠিন হলেও পুরনো ফাইল সংরক্ষণাগারে রাখা আছে। আধ ঘণ্টার মধ্যে একটা ফাইল তার হাতে দিয়ে গেল একজন দপ্তরকর্মী।

ফাইলে কলেজের সাংস্কৃতিক ক্লাবের সদস্যদের তালিকা ছিল। সেখানে খুঁজে পেল — "অর্পিতা ব্যানার্জি — সঙ্গীত বিভাগ"

সঙ্গীত বিভাগে একটা ফোন নম্বরও দেওয়া আছে, কিন্তু সেটা চলার কোনো সম্ভাবনাই নেই। তবে পাশে একটা ঠিকানা। কলকাতার এক পুরনো পাড়ায় — তারই শহরের। মাধবী ঠিক করল — সেদিনই যাবে।

ছোট্ট ট্যাকসিতে চেপে পুরো পথটাই শীতের রোদে গায়ে গায়ে উষ্ণতা নিয়ে যায়। রাস্তার ধারে গাছেরা যেন নিস্তব্ধ হয়ে বসে আছে। মাঝে মাঝে কুয়াশার ফাঁক গলে আলো আসে। ট্যাকসির কাঁচে আঁকা হয় থার্মালের মতো ধোঁয়া, আর মাধবী নিজের হাতের তালু দিয়ে তা মুছে দেয়। এই যাতায়াতটাও যেন এক সময়যন্ত্র — তাকে নিয়ে যাচ্ছে বাবার যুবক বয়সের গল্পের দিকে।

ওই ঠিকানায় পৌঁছে মাধবী চমকে গেল — একসময় হয়তো তা ছিল অনেক বড় বাড়ি, এখন ভেঙে পড়তে পড়তে একটা অংশে টিকে আছে। জানলা কাঠে রং চটে গেছে, লোহার গ্রিল মরচে ধরে বাদামি। এক বৃদ্ধ দরজা খুললেন। মাধবী বলল — "আমি অর্পিতা ব্যানার্জির খোঁজে এসেছি।"

বৃদ্ধ ভ্রূ কোঁচকালেন। "অর্পিতা? ও তো বহু বছর আগেই বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে। আমার বোনের মেয়ে ছিল। এখন কোথায় থাকে জানি না। সুনীল দার ছেলে আছে, ওঁকে ধরো। হয়তো খবর দিতে পারবে।"

ঠিকানাটা পাওয়া গেলো।


সুনীল দার ছেলে — অর্থাৎ অর্পিতার মামাতো ভাই। তিনি থাকেন শহরের একটু বাইরে। সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। ডিসেম্বরের সন্ধ্যা মানেই শীত জমে থাকা। মাধবী সেখানে পৌঁছতে পৌঁছতে হালকা কুয়াশা জমল। বাড়িটা খুবই শান্ত। উঠোনে একটা আমগাছের ডালগুলো ঠাণ্ডায় কাঁপছে।

দরজা খুললেন পঞ্চাশোর্ধ্ব ভদ্রলোক — "আপনি মাধবী মিত্র? ফোনে বলেছিলেন... শরৎ মিত্রর মেয়ে?"
মাধবী মাথা নেড়ে বলল, "হ্যাঁ, আমি অর্পিতার খোঁজ করছি। খুব জরুরি।"
ভদ্রলোক এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "জানি না ওর সঙ্গে আপনার কী সম্পর্ক, তবে এত বছর পরে যদি কেউ ওকে খুঁজতে আসে, তা হলে সেটা হয় ভালোবাসার, নয়তো অনুতাপের গল্প। কিন্তু ও এখন শান্তিনিকেতনে থাকে। অনেকদিন আগেই চলে গেছে। সঙ্গীত শেখায়। খুব ভালো আছে।"

মাধবীর মনে অদ্ভুত একটা হালকা আলো জ্বলে উঠল — অন্তত অর্পিতা বেঁচে আছেন।

ভদ্রলোক বললেন, "ওর ফোন নম্বর দেব। তবে একটা কথা — ওর অতীত নিয়ে কথা বলার সময় সাবধানে বলবেন। ও খুব বেশি কথা বলে না এখন। একা থাকতে ভালোবাসে।"

মাধবী মাথা নেড়ে ঠিকানা আর নম্বর লিখে নিল।

রাতের দিকে বাড়ি ফেরার পথে তার মনে হচ্ছিল — সমগ্র শীত যেন তাকে গাঢ় আলোর মতো জড়িয়ে ধরেছে। হাওয়ায় কমলালেবুর গন্ধ নেই, কিন্তু আছে কুয়াশার ভেতর দিয়ে আলো ছড়িয়ে পড়ার মায়া।

নতুন বছরের আগেই খুঁজে পেতে হবে অর্পিতাকে।


শান্তিনিকেতন — শীতকালে যেন আরও বিশেষ হয়ে ওঠে। লাল মাটির পথ, খেজুর গাছের সোঁদা গন্ধ, আর সকালবেলায় ধুপ ধুপ করে বাজতে থাকা ঢোলের আওয়াজ।

মাধবী সেদিন ভোরে গিয়ে পৌঁছল। যে বাড়িটাতে অর্পিতা থাকেন, তা বেশ ছোট। দেওয়ালে আলপনা আঁকা। জানলার কাছে টাঙানো মাটির ঘণ্টি ঠাণ্ডা হাওয়ায় একরকম বেজে ওঠে।

বাঁশের দরজাটা ঠেলে বাইরে এলেন এক মহিলা — মাথায় পাকা চুল, চোখদুটো চিকচিক করছে, কিন্তু অদ্ভুত প্রশান্তি আছে মুখে। হাসি নেই, কিন্তু মুখটা শান্ত। মাধবীর বুকের মধ্যে ধড়ফড় করে উঠল — এই কি সেই 'অ?'

"আপনি কি অর্পিতা ব্যানার্জি?"

মহিলা মৃদু মাথা নেড়ে বললেন, "হ্যাঁ, আপনি?"

মাধবী হাতের ব্যাগ থেকে কাগজটা বের করল — ১৯৮৫ সালের চিঠি। চিঠিটা দেখে অর্পিতা প্রথমে স্থির হয়ে গেলেন। যেন এক মুহূর্তের জন্য হাওয়াটাও থমকে গেল।

"এটা… কীভাবে পেলেন?"
মাধবী নরম গলায় বলল, "ওটা আমার বাবার কোটের পকেটে ছিল। তিনি... তিনি আর নেই। আমি চিঠিটা পেয়েছি, আর তাই... আপনাকে খুঁজে এসেছি।"

অর্পিতা চোখ নামিয়ে ফেললেন। একটা দীর্ঘ নীরবতার পর বললেন, "এত বছর পরে কেউ আমাকে খুঁজবে ভাবিনি।"
মাধবী সাহস জুগিয়ে বলল, "চিঠিটা আপনি পাঠিয়েছিলেন কিন্তু বাবা কখনো খোলেননি। হয়তো পৌঁছায়নি। আপনি চাইলে আমি পড়ে শোনাতে পারি।"
অর্পিতা হাত তুলে থামিয়ে দিলেন — "না। মনে আছে সব। প্রতিটি শব্দ।"

তাঁর কণ্ঠে কোনো অভিযোগ নেই — শুধু সময়ের দীর্ঘ দীর্ঘ নিঃশ্বাস।

তিনি বললেন, "ভেতরে আসুন।"


ঘরের ভেতর কাঠের গন্ধ। দেয়ালে রবিশংকরের পোস্টার। কোণায় একতারা। জানলার ধারে গরম চায়ের ভাঁড়।

অর্পিতা ধীরে ধীরে বললেন, "তোমার বাবা... শরৎ... খুব ভালো মানুষ ছিল। খুব শান্ত। তাতে একটা দূরত্বও ছিল। আমি অনেক দিন চেষ্টাও করেছিলাম সেই দূরত্ব ভাঙার। আমি গান গাইতাম, আর সে শুনত নিঃশব্দে। সেই শীতকালেই ও প্রথম আমাকে ওর কোটটা দিয়েছিল — একদিন খুব ঠান্ডায় কাঁপছিলাম বলে। কোটটা অনেক বড় ছিল, কিন্তু সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল — ও যেন আমাকে পুরো পৃথিবীটা দিয়ে দিল।"

মাধবী কিছু বলল না — শুধু শুনছিল।

অর্পিতা বললেন, "হঠাৎই আমার বাড়িতে ঝামেলা শুরু হলো। বাবার বদলি হয়েছিল অন্য শহরে। আমাকে কলেজ ছাড়তে হলো। শরৎকে বলতে পারিনি। শুধু একটা চিঠি লিখেছিলাম। আশা ছিল, হয়তো একদিন উত্তর দেবে। সে উত্তর আসল না। হয়তো তখন ওর জীবন অন্য পথে হাঁটছিল। পরে শুনলাম ওর বিয়ে হচ্ছে। তখন আর ফিরে দেখা চাইনি।"

চোখে জল নেই, কিন্তু কণ্ঠে আছে এক ধরনের আদর-চাপা ব্যথা।

মাধবী বলল, "আপনি জানেন কি, চিঠিটা খোলাই হয়নি? হয়তো তিনি জানতেনই না।"

অর্পিতা বিস্ময়ে তাকালেন। তারপর ধীরে বললেন, "তাহলে এত বছর পরে কি লাভ?"
মাধবী মৃদু হাসল — "লাভ নেই, তবু একটা গল্প অসম্পূর্ণ ছিল। সেটাকে পূর্ণ করতে এসেছি।"

অর্পিতা জানলার দিকে তাকালেন। বাইরে শিমুল গাছের ডালে একটা কাক বসে আছে। তার চারপাশে কুয়াশা, সূর্য উঠছে ধীরে ধীরে।

তিনি ধীরে বললেন, "তোমার বাবা আমাকে যে কোটটা দিয়েছিল সেটা আমি অনেক দিন রেখেছিলাম। কিন্তু একসময় মনে হলো — যা কেউ নিতে পারে না, তা ধরে রাখার কী মানে?"

মাধবী চুপ করে শুনছিল।

অর্পিতা হঠাৎ বললেন, "তোমার মনে হয় আমি ফিরে গিয়ে ওকে দেখা উচিত ছিল?"
মাধবী একটু ভেবে বলল, "জানি না। হয়তো কী হতো তাও জানি না। তবে আপনি তাকে ভালোবেসেছিলেন — এটা জানাতে চেয়েছিলেন। আর আজ আমি তারই অংশ হয়ে আপনাকে জানাতে এলাম — হয়তো তিনিও..."

কথাটা শেষ করতে পারল না।

অর্পিতা মৃদু হাসলেন — "ভালোবাসা সবসময় উত্তর চায় না, মাধবী। কিছু ভালোবাসা থাকে শুধু শীতের সকালের মতো — টুকটুক আলো, ধোঁয়া, আর অল্প উষ্ণতার মায়ায়।"


মাধবী অনেকক্ষণ যাবৎ ভেবেছিল — কী বলা উচিত। কিন্তু তখন চা এল। ধোঁয়া ওঠা গরম চা হাতে অর্পিতা বললেন —
"বছরশেষে এত দূর থেকে এসেছ, কিছু শুনবে? একটা গান?"
মাধবী মাথা নেড়ে বলল, "হ্যাঁ।"
অর্পিতা একতারা হাতে তুলে নিলেন। তারপর ধীরে ধীরে গাইতে শুরু করলেন রবিঠাকুরের গান —
"তবু মনে রেখো..."

গানের সুর ঘরভর্তি করে দিল। বাইরের শিমুলপাতা নড়ে উঠল হাওয়ায়। মাধবীর মনে হলো — এক মুহূর্তের জন্য যেন সময় থেমে গেছে। যেন তার বাবা এই ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে আছেন — সেই পুরোনো উইলন কোট পরে। চোখে একই শান্ত আলো।

গান শেষ হলে অর্পিতা বললেন, "তোমার বাবা খুব ভালো মানুষ ছিল। আর তুমিও ঠিক ওর মতো — শব্দ বেশি নয়, কিন্তু অনুভূতিতে স্পর্শ আছে।"

মাধবী অনেকক্ষণ চুপ করে ছিল। তারপর ব্যাগ থেকে চিঠিটা বের করে অর্পিতার হাতে দিল।
"এটা আপনার কাছে থাকাই উচিত।"

অর্পিতা চিঠিটা হাতে নিয়ে বহুক্ষণ দেখলেন। তারপর ধীরে বললেন, "ধন্যবাদ।"


সন্ধে নামছে। লাল মাটির ওপর কুয়াশার হালকা আস্তরণ। মাধবী স্টেশনমুখী রাস্তায় হাঁটছে। আজ তার মনে অদ্ভুত হালকা একটা স্বস্তি। যেন একটা অগোচর গল্পের ভার তার কাঁধ থেকে নেমে গেছে। শীতের হাওয়া ঝিরঝির করে গাল ছুঁয়ে দিচ্ছে। আলো-ছায়ার মধ্যে মাধবী ভাবছে — বাবার কোটের পকেটে লুকিয়ে থাকা সেই চিঠি তাকে শুধু অর্পিতার কাছে পৌঁছে দেয়নি — এটা যেন এক অদ্ভুত যাত্রা ছিল, যেখানে ভালোবাসার সময়হীনতা তাকে দেখিয়েছে।

ভালোবাসা কখনো পুরোনো হয় না — শুধু অপেক্ষা করে থাকে, ঠিক সেই কোটের মতো — ভাঁজে ভাঁজে জমে থাকা উষ্ণতার স্মৃতি নিয়ে।


বাড়ি ফিরে মাধবী কোটটাকে আলমারিতে ঝুলিয়ে দিল। কিন্তু এবার কোটটা আর আগের মতো নিছক একটা পুরোনো কোট নয় — এটা যেন বাবার সেই অপ্রকাশিত গল্পের প্রতীক।

রাত বাড়ছে। ডিসেম্বরের রাত — দীর্ঘ, নরম, আর কল্পনায় ভাসবার মতো শান্ত।

মাধবী একমুঠো কমলালেবুর কোয়া তুলে নিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়াল। চাঁদের আলো ঝাপসা হয়ে আছে কুয়াশায়।

হঠাৎ মনে হলো — বাবা যেন পাশে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি বলছেন —
"সব গল্পের শেষ থাকে না, মা। কিছু গল্প শুধু পথ খুঁজে পায়। আজ তুমি সেই পথকে আলো দেখালে।"

মাধবী মৃদু হেসে বারান্দার রেলিং স্পর্শ করল। হাওয়ায় যেন কমলার গন্ধ ভেসে গেল। আর সেই মুহূর্তেই তার মনে হলো — এই ডিসেম্বর শুধু শীতের মাস নয়, স্মৃতি ও ভালোবাসার মাসও।

অর্পিতা এখন শান্ত।
বাবার গল্পও শান্ত।
নিজের মনও শান্ত।

নতুন বছর শুরু হওয়ার আগেই সবকিছু যেন তার জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে।




আগামী সংখ্যার জন্য লেখা পাঠান

❛উদ্যোগ❜ ওয়েব ম্যাগাজিনের শারদ ১৪৩৩ সংখ্যাটি ৫ অক্টোবর ২০২৬ (১৭ই আশ্বিন) প্রকাশিত হবে। ওয়েবসাইটে প্রদত্ত লেখার বিভাগ ও বিষয় থেকে আপনার পছন্দের বিষয় বেছে নিয়ে লেখা পাঠান ২৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে। নির্বাচিত লেখাগুলি লেখক / লেখিকার ছবি ও সংক্ষিপ্ত পরিচিতিসহ প্রকাশিত হবে। লেখা পাঠানোর ফর্ম এবং অন্যান্য সকল তথ্যের জন্য অনুগ্রহ করে মেনুতে ‘লেখা পাঠান’ বিভাগটি দেখুন।

ভালো লাগলে ভালোবাসা দিন
অপছন্দ হলে পরামর্শ দিন
মতামত জানাতে মন্তব্য করুন
0 0 ভোট
স্টার
guest
0 কমেন্ট
নতুন থেকে পুরোনো
পুরোনো থেকে নতুন ভোটসংখ্যা অনুসারে
ফেসবুক পেজ
Udyog Bengali Web Magazine by Bangali Network

বিভিন্ন বিষয় থেকে বেছে নিয়ে লেখা পড়ুন

    বিভিন্ন সংখ্যায় প্রকাশিত হওয়া লেখা পড়ুন

    মাসিক সংখ্যাগুলি দেখুন
    Scroll to Top

    ‘উদ্যোগ’ ফোনে রাখুন

    ‘উদ্যোগ’ ওয়েব ম্যাগাজিন ইনস্টল করুন। ইনস্টলের পর অ্যাপ তালিকা থেকে আইকনটি হোমস্ক্রিনে যোগ করে নিতে পারেন। এরপর সহজেই পড়ুন আপনার প্রিয় ম্যাগাজিন। ভালো না লাগলে যেকোনো সময় এক ক্লিকে আনইনস্টল করতে পারবেন।