দীপাবলি কথার মধ্যে যেমন আলো আছে, জ্যতির্ময়ী রাতের আনন্দ আছে, তেমন কালী কথাতে আছে ভয়, অমাবস্যার অন্ধকার। কালো রূপে উমা কে দেখে স্বয়ং শিব ও ভয় পেয়েছিলো, আমরা তো মানুষ মাত্র। সে ই ভয় কে জয় করে মা-এর কাছে আসতে শিখিয়েছিলেন রামপ্রসাদ তাঁর আবেগে গাথা সুর দিয়ে। তবে থেকে মন খারাপ হলে "মা", আনন্দে "মা", বিপদে "মা", সত্যির দাবিতে ও "মা"। এতো আত্বিক যোগে মা-এর আরাধনা সারারাত হয় ভক্তির আনন্দে ভরে ।
ছোটবেলায় দেখতাম আমাদের মামাবাড়ির গ্রামে সাবেকিয়ানায় কালীপূজা। কলকাতার শহরে দেখেছি দুর্গাপূজার জাঁকজমক, আর গ্রামে তেমন ধুম কালী পূজার। মেলা বসেছে স্কুলের মাঠে। নাগর দোলা, বেলুন ওয়ালা, মাটির পুতুল, আলুকাবলি, বারোভাজা, ঝাল ঘুগনি, ঘটিগরম, জিলিপি মন কাড়ছে গাঁয়ের লোকেদের। তখন বাজারে উঠেছিল ক্যাপ বাজি। আমরা সব ভাই বোনেরা একত্রিত হয়ে হাতে বন্দুক নিয়ে সেজেছি মিঠুন চক্রবর্তী, চলেছে সেই বাজি ফাটানোর প্রতিযোগিতা। গ্রামে আমাদের ঘুটঘুটে অন্ধকার, এমনি রাত থাকে চাঁদের জ্যোৎস্নায় সজ্জিত। কিন্তু কালীপূজাতে চাঁদেরও ছুটি। তখনও টুনিলাইট আমরা দেখিনি। দেখেছি দিদাকে দুয়ারে মাটির প্রদীপ দিতে। আর আমাদের দায়িত্ব ছিল মোমবাতি জ্বালিয়ে ঘর আলো করার। যতবার হাওয়ায় সে মোমবাতি নেভে, সারারাত ততবার আমরা জ্বালাই। ওটাই খেলা।
মামা নারিকেলের খোল আর মোমবাতি দিয়ে টর্চ বানাতে শিখিয়েছিলেন আমাদের। তখন মনে হয়েছিল গ্রামের লোকেরা নালিশ করতে, অজুহাত দিতে শেখেনি। "এটা নেই, ওটা নেই" বলে হার মানেনা। নিজেদের কি কি আছে তা দিয়ে বৃহৎ কিছু গড়তে পারে। তাদের শুধু এক টাই আর্জি — "আমাদের অল্প সম্বল টুকু কেড়ে নিও না"।
কালীপূজায় যাব বলে দিদা বানিয়ে রাখতো বয়ামভর্তি নাড়ু। টুক টুক করে খেতে খেতে কবে যে তা শেষ হয়ে যেতো — টেরটিও পেতাম না। মুখ ভার করে বলতাম, "আমি তো নাড়ু ই পেলাম না"।
কালী পূজার অন্যতম রোমাঞ্চ ছিল নানারকম প্রতিযোগিতা — মেয়ে-বৌদের জন্য শঙ্খ বাজানো, মোমবাতি জ্বালানো, ফুচকা খাওয়া। সর্বসাধারণের জন্য কুইজ, গান, নাচ এবং আবৃত্তি। ছোটোদের জন্য অঙ্কন প্রতিযোগিতা। বিভিন্ন ক্লাবের উদ্যোগক্তারা সুন্দর করে প্রতিযোগিতার আয়োজন করতেন। বাড়ির মেয়ে-বৌরা এই প্রতিযোগিতাতে দারুণভাবে অংশগ্রহণ করতো। শুধু তাই নয়, পরের বছরের জন্য নিয়ম মেনে এই প্রতিযোগিতার জন্য তৈরি হতো। এই প্রতিযোগিতাতে বাটি, ঘটি পুরস্কারের চেয়েও তারা পেত নিজের আলাদা পরিচিতি। সারাজীবন হেঁসেল সামলাতে গিয়ে নিজের জন্য যারা ভাববার অবকাশ পায়নি — তাদের জন্য এই প্রতিযোগিতাগুলিতে উত্তীর্ণ হওয়া যেন নোবেল পাওয়ার সমান। আমি প্র্তক্ষ্যদর্শী — নিজের স্ত্রীদের উৎসাহ দিতো কত প্রান্তিক শ্রেণির পুরুষ, কোনো কিছু পাওয়ার আশায় নয়, ভালোবাসে বলে।
এখন আর এই আনন্দ চোখে পড়ে না। শারদীয়ার ধুনুচিনাচের মতো এই সংস্কৃতি ও অবলুপ্তের পথে!