অপূর্ব সুন্দর নিসর্গ প্রকৃতি পরিবেষ্টিত আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ কে তার নিঃসর্গের শোভা জনিত কারণেই অনেকে স্বর্গের সঙ্গে তুলনা করেন। সেই দ্বীপপুঞ্জের রূপ-রস-গন্ধ-সুধা অনুভব করার আকর্ষণে যাঁরাই সেখানে ভ্রমণে যান না কেন, অন্তরে একটা সুপ্ত এবং অদম্য আকাঙ্ক্ষা থাকে 'জারোয়া' দর্শনের জন্য। ভ্রমণ সম্পন্ন করলেন অথচ জারোয়া দর্শন হলো না, সেই ভ্রমণকে অনেকে অসমাপ্ত ভ্রমণ কাহিনীর চোখে দেখেন। আর ভাগ্যক্রমে যদি জারোয়া দর্শনের কপাল খুলে গেল তাহলে তো সোনায় সোহাগা। অনেকেই মনে মনে সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্রের সেই বক্তব্যটাকে পুনরোচ্চারিত করেন। বলেন — "আহা হা! কী দেখিলাম, জন্ম জন্মান্তরেও ভুলিব না"। তাই আন্দামান দর্শন আর জারোয়া দর্শন একে অন্যের সঙ্গে অঙ্গীভাবে জড়িত হয়ে আছে একথা অনস্বীকার্য। আজকের প্রবন্ধে আন্দামান দর্শন নয়, জারোয়া দর্শন তথা জারোয়াদের বর্তমান চালচিত্র সম্পর্কে একটা সুস্পষ্ট ধারণা তৈরি করা যাক। একথা বলা বাহুল্য হলেও বলা প্রয়োজন যে রচনাটির মধ্যে জল মেশানোর প্রবণতা একেবারেই নেই বরং নিজের আন্দামান বসবাসের ৩০ বছরের অভিজ্ঞতা কে কাজে লাগিয়ে জারোয়াদের সম্পর্কে একটা সুস্পষ্ট ধারণা তৈরি করার চেষ্টা হয়েছে, যাতে জারোয়া সম্পর্কে যাঁরা উৎসাহী তাঁদের কল্যাণে লাগে।
প্রখ্যাত সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কাহিনী আর তপন সিংহ পরিচালিত "সবুজ দ্বীপের রাজা" কাহিনী চিত্রের মধ্যে দিয়ে জারোয়া নামের এই আদিবাসী গোষ্ঠীর মানুষদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের পরিচয় অনেক বেশি ঘনীভূত হয়েছে। কিন্তু প্রথমেই জানিয়ে রাখা প্রয়োজন — চলচ্চিত্রায়িত এই কাহিনী থেকে জারোয়া সম্পর্কে যে ধারণা পাওয়া যায় সেটা তথ্যগতভাবে তেমন সত্যি নয়। যতটা বিস্তারিতভাবে জানা গেছে এই জারোয়া জাতিগোষ্ঠী 'জাঙ্গিল' নামের এক উপজাতি গোষ্ঠী থেকে শতাব্দী বা সহস্রাব্দ যুগ আগে উৎপন্ন হয়েছে। যদিও জাঙ্গিল উপজাতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে সম্ভবত ১৯৩১ সালে, কিন্তু জারোয়া উপজাত গোষ্ঠী এখনো বিলুপ্ত হয়নি। তারা বর্তমানে কতটা রাজকীয় ভাবে বেঁচে আছে সেটা খুবই বিতর্কিত একটা বিষয়, তবে তারা আজও আছে।
উনিশ শতকের আগে দক্ষিণ আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের দক্ষিণ পূর্ব অংশে এবং কাছাকাছি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দ্বীপগুলিতে এদের বসবাসের বিস্তৃত অঞ্চল ছিল। আন্দামানে প্রথম ইংরেজ উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার পরে ১৭৮৯ সালে এরা রোগাক্রান্ত হয়ে বিলুপ্ত হতে থাকে বলে একটা সন্দেহ করা হয়। বলা হয় ব্রিটিশ রাজশক্তি বিভিন্ন মাদকাসক্তি এবং অন্যান্য রোগ ব্যাধি ছড়ানোর মাধ্যমে এদেরকে ধ্বংস করার চেষ্টা চালায়। বিভিন্ন সময়ে বহিরাগতদের কুপ্রভাবে এবং দৈহিক সম্পর্ক স্থাপনের কারণে বিভিন্ন রোগ ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়েছে। চোরা শিকারিদের দৌরাত্ম্য এদের উপর বিভিন্ন সময়ে নেমে এসেছে। পরবর্তীতে ১৯৯৮ সাল থেকে বাইরের লোকেদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ অনেক ঘনিষ্ঠ হয়েছে। যদিও এই প্রসঙ্গে স্মরণ করা যেতে পারে আন্দামানের উপজাতি গোষ্ঠীদের মধ্যে 'সেন্টিনেল' নামের যে জাতিগোষ্ঠী আছে তাদের সঙ্গে কোনোভাবেই যোগাযোগ স্থাপন করা এখনো পর্যন্ত সম্ভব হয়নি। তারা আধুনিক জনগোষ্ঠীর হাত থেকে পুরোপুরি ভাবে নিজেদের দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করে গেছে এবং সে ব্যাপারে তারা এখনো ১৬ আনা সফল। কিন্তু জারোয়ারা নানা ভাবে নিজেদেরকে সভ্য সমাজের কাছে সমর্পন করে দিয়েছে এ কথা বলা যায়।
স্বাধীন ভারতে ব্রিটিশ উপনিবেশ গড়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসা হলেও উদ্বাস্তু উপনিবেশ স্থাপন একটা উল্লেখযোগ্য ঘটনা। ১৯৫২, ১৯৫৪, ১৯৬২, ১৯৬৯ এইসব বিভিন্ন বিভিন্ন সময়ে যখন উদ্বাস্তু পুনর্বাসনে প্রয়োজনে আন্দামানের জারোয়া দের ভূখণ্ড দখল করা শুরু হয়েছিল, তখন থেকেই জারোয়াদের উপর সভ্য মানুষের অত্যাচার বৃদ্ধি হতে শুরু করে। ব্যাপারটা একটা প্রবাদের মত হয়ে আন্দামানে চালু আছে, শোনা যায় ৫২ সালে উদ্বাস্তু পুনর্বাসন এর কাজে সংশ্লিষ্ট এক আমলা নাকি বলেছিলেন — "তোমরা আমাকে একটি ফাইটার প্লেন দাও, আমি জারোয়াদের এলাকায় বোমাবর্ষণ করে আসি।" আসলেই যারা এই অঞ্চলের আদিম বাসিন্দা, দাদাগিরি করে তাদের ওপর জুলুমবাজি করার কী নির্মম, কী নির্লজ্জ প্রয়াস! ব্রিটিশ শাসিত ভারতের কথা ছেড়ে দিয়েও বলা যায় স্বাধীন ভারতের এই আন্দামানের পশ্চিমে ঘন বন-জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে ১৯৭০-এ যখন আন্দামান ট্রাঙ্ক রোড বা এ টি আর নির্মাণের কাজ শুরু হয়, তখন এই জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে হাহাকার শুরু হয়ে যায়। বুশ পুলিশ এবং জারোয়াদের মধ্যে মুহুর্মুহু বিভিন্ন রকমের আক্রমণ ঘটতে দেখা যায়। এই সময় অনেক জারোয়ার মৃত্যু হয়েছে এটা অস্বীকার করার কথা নয়। জারোয়ারা কিছুতেই সভ্য সমাজকে তাদের অঞ্চলে অনুপ্রবেশ ঘটাতে দিতে চায়নি। আবার বুশ পুলিশ বা রাস্তা নির্মাণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও নিজেদের প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে তাদের উপর কারণে-অকারণে বিভিন্ন রকম হাঙ্গামা, হামলা, অকথ্য অত্যাচার চালিয়ে গেছে।
২০০৬ সালে ভারতীয় পর্যটনকেন্দ্র জারোয়াদের সংরক্ষিত অঞ্চল থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার দূরে একটি রিসোর্ট তৈরি করে। এই নিয়ে আন্দামান প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের মধ্যেও নানা রকম বাদানুবাদ চলে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ১৭ই আগস্ট, ২০০৭-এ 'বাফার জোন' তৈরি করে আন্দামান প্রশাসন, জারোয়াদের সংরক্ষণ এবং সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে চেয়েছিল। যদিও এই ব্যবস্থাটা স্থানীয় মানুষজনের পক্ষে খুব কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। জারোয়া অঞ্চলের কেন্দ্রবিন্দু থেকে পাঁচ কিলোমিটার ব্যাসার্ধ জুড়ে এই 'বাফার জোন' তৈরির এই সিদ্ধান্ত কার্যকরী হলে সাদামাটা পুনর্বসতি পাওয়া স্থানীয় মানুষজনের পক্ষে বেঁচে থাকা খুব দুষ্কর হয়ে দাঁড়াতো। কারণ মধ্য-উত্তর আন্দামান এবং দক্ষিণ আন্দামানের ৩১ টি রেভিনিউয়ের গ্রামের ২২,০০০ মানুষ এবং রাজস্ব বিভাগের জমি এর দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়ছিল। মামলা মোকদ্দমা অনেক দূর পর্যন্ত গড়িয়েছিল এবং শেষে পর্যটন বিভাগ মামলা জিতে যায়।
নৃতত্ত্ববিদদের মতে জারোয়া উপজাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে আফ্রিকান উপজাতিগোষ্ঠীর নিবিড় যোগাযোগ রয়েছে। এরা নেগ্রিটো উপজাতি গোষ্ঠীভুক্ত। এদের গায়ের রং কালো কুচকুচে এবং মাথায় খুব স্বল্প পরিমাণে কুঞ্চিত কেশ। 'জারোয়া' শব্দের অর্থ 'আগন্তুক'। কিন্তু যারা নিজেদেরকে 'ang'/'aong' বলে অভিহিত করে, যার অর্থ হল 'জনতা'। এরা যাযাবর শ্রেণীর অন্তর্গত। নিজেদের বেঁচে থাকা, খাদ্য সংগ্রহ, শিকার ইত্যাদির কারণে প্রয়জনের তাগিদে এরা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াত করে। বসতি বা অঞ্চল অনুসারে তিনটে উপবিভাগ —
🔸 Tanmad — অর্থাৎ বহিরাগতরা যাদের বলে 'উত্তরের দল'। কদমতলা অঞ্চলে যাদের বসবাস।
🔸 Thidon — অর্থাৎ 'মধ্যভাগের দল' যারা 'আর কে নালা জারোয়া' নামে স্থানীয় ভাবে পরিচিত।
🔸 Bioab — অর্থাৎ যারা 'দক্ষিণের দল' নামে পরিচিত। এরা সাধারণত তিরুর অঞ্চলে বসবাস করে। তুলনায় এরা ঈষৎ দীর্ঘদেহী এবং অপেক্ষাকৃত হিংস্র প্রকৃতির।
প্রখ্যাত নৃতত্ত্ববিদ সীতা ভেঙ্কটেশ্বরের "Development And Ethnocide: Colonial Practices In The Andaman Islands" নামের গ্রন্থ যেটি ২০০৪ সালে প্রকাশিত হয়েছে, তা থেকে জানা গেছে ১৯০১ সালে জারোয়াদের জনসংখ্যা ছিল ৪৬৮ । বিভিন্ন কারণে ১৯৩১-এ নেমে আসে ৭০-এ। আবার ২০১১ সালের জনগণনা অনুসারে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৮০ তে। যদিও অ্যানথ্রোপলজি কাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার ২০১৬ সালের সমীক্ষা অনুযায়ী জানা যাচ্ছে জারোয়াদের বর্তমান সংখ্যা ৪২৯। আবার ডিরেক্টর অফ ট্রাইবেল ওয়েলফেয়ার, নরেন্দ্র কুমার সিং এর মতে ২০১৭ সালে জারোয়া জনসংখ্যা ৪৭১ জন।
জারোয়াদের ভাষায় 'Chadda' অর্থাৎ কুঁড়েঘরে এরা বসবাস করে। আর জঙ্গল নির্ভর মেটে আলু, বুনো ওল, মধু, বিভিন্ন রকমের মাছ, জংলি শুকর, কাঁকড়া ইত্যাদি হল তাদের খাদ্য। আর এইসব খাদ্য সংগ্রহের জন্য তারা তীর-ধনুক, বেতের ঝুড়ি, মশাল ইত্যাদি ব্যবহার করে। অগভীর সমুদ্রে এরা স্থির হয়ে তীর-ধনুক হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে এবং নিজেদের কাছাকাছি মাছ এলেই, তীর দিয়ে এরা মাছ শিকার করতে ওস্তাদ। সাধারণভাবে জারোয়ারা পোশাক-আশাক পরে না, পরতে পছন্দও করেনা। নগ্নতা এদের জীবনযাত্রার স্বাভাবিক অঙ্গ। যদিও মহিলারা নিম্নাঙ্গে লতাপাতা জাতীয় কিছু আচ্ছাদন ব্যবহার করে। যদিও বর্তমানে সভ্য সমাজের সংস্পর্শে আসার পর থেকে পোশাক-আশাক কেউ কেউ ব্যবহার করে। বিশেষ করে যখন কোন কারনে প্রয়োজনে বা চিকিৎসা সংক্রান্ত ব্যাপারের জন্য তাদেরকে সভ্য সমাজের সংস্পর্শে আনা হয়, তখন সাধারণত পোশাক পরিহিত অবস্থায়ই তারা জনসমক্ষে আসে।
কিন্তু জারোয়াদের মধ্যে যথেচ্ছভাবে শারীরিক সম্পর্ক করা তাদের বিধি বিরোধী এবং এরজন্য শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিচারও করা হয়। বিবাহ হয় ছেলেদের আঠারো থেকে কুড়ি বছর বয়সে আর মেয়েদের চোদ্দ থেকে পনের বছর বয়সে। যতদূর জানা গেছে বিধবাবিবাহ এদের সমাজে প্রচলিত আছে। এরা নিজেদের অঙ্গসজ্জার জন্য মাটি জাতীয় প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করে এবং রোগব্যাধি থেকে বাঁচার জন্যেও এরা সারা শরীরে বিভিন্ন রকমের মৃত্তিকা লেপন করে। সূর্য চন্দ্র এদের জীবনযাত্রায় বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ আর পূর্ণিমার রাতে এরা শিকার করতে বা নাচ গান করতে খুব ভালবাসে। এনথ্রোপলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া প্রকাশিত 'পর্টিকুলারলি ভালনারেবল ট্রাইবাল গ্রুপস অফ ইন্ডিয়া' গ্রন্থ থেকে জানা যায় — জারোয়াদের কোন ব্যক্তি মৃতপ্রায় হলে তাকে কুঁড়ে ঘরের বাইরে নিয়ে গিয়ে বসবাসপ্রবণ এলাকা থেকে দুরে অবস্থিত কোন গাছ তলায় বসিয়ে রাখা হয় আর তার মৃত্যু হলে দেহ আপনার থেকেই সেখানে পচন ধরে। এদের মৃতদেহ পোড়ানো বা কবর দেওয়ার রীতি নেই। এবং জানা গেছে মৃতদেহ পচে গলে গেলে তার হাড়গোড় নিয়ে যাওয়া হয় সেগুলো তীরের তীক্ষ্ণ মুখ হিসেবে ব্যবহার করার জন্য।
উদ্বাস্তু সমস্যার সমাধান হোক, আন্দামান ট্রাঙ্ক রোড নির্মাণ হোক, এইসব বিভিন্ন কারণে সভ্য সমাজের অনেকেই জারোয়াদের হাতে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ বিসর্জন দিতে বাধ্য হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। তবে সরকার থেকে মাঝে মাঝে এদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনের জন্যে চেষ্টাচরিত্র করা হতোনা তা নয়। তবুও মাঝেমধ্যেই অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে যেত। দুপক্ষই দুপক্ষকে চরম শত্রু মনোভাবাপন্ন দৃষ্টি দিয়ে দেখতেন। এই প্রতিবেদকের যাত্রাকালেই একবার এক্সপ্রেস বাসকে আক্রান্ত করা হয়েছিল। এবং বাসের মধ্যে তীরবিদ্ধ হয়ে অন্য এক যাত্রী (পরবর্তীতে কিছুটা চিকিৎসা দেবার চেষ্টা সত্ত্বেও) নিহত হয়। এবং জারোয়াদের হাত থেকে আত্মরক্ষা করার জন্য সেদিন কম বেগ পেতে হয়নি। প্রসঙ্গান্তরে সে কথা আলোচনা করা যাবে, ভবিষ্যতে।
জারোয়া ও সভ্য সমাজের মধ্যে বন্ধুত্ব স্থাপনের কাজে নিবেদিতপ্রাণ এরকম একজন মানুষ ভক্তোয়ার সিং। ১৯৭৪ সালে আন্দামান প্রশাসনের নেতৃত্বে একটা কন্টাক্ট টিম গঠন করা হয়েছিল যার প্রধান ছিলেন ভক্তোয়ার সিং। তিনি অতীতে বুশ পুলিশের ডেপুটি সুপারিনটেনডেন্ট ছিলেন। জারোয়াদের বিভিন্নভাবে সাহায্য করার জন্য আন্দামান জনজাতি বিকাশ সমিতি গঠন করা হয়। সেখানেও টি এন পন্ডিত এবং এ জাস্টিন নামের দুইজন ব্যক্তি খুব গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধনের সহায়তাকারী হিসেবে চিহ্নিত হয়ে ছিলেন। তবে ভক্তোয়ার সিং, টি এন পন্ডিত এবং এ জাস্টিন যা করতে পারেননি তা অনেকখানি পড়ে-পাওয়া ঘটনার মতো সহজসাধ্য হয়ে গেছে একটা সাদামাটা দুর্ঘটনার মধ্যে দিয়ে। সালটা ছিল ১৯৯৬-এর ১৫ই এপ্রিল। তখন আমি পোর্ট ব্লেয়ার থেকে প্রায় ৩৫০ কিলোমিটার দূরবর্তী স্থান ডিগলিপুরে কর্মরত। সে সময় একটা বিরাট হইচই শুরু হলো। ব্যাপার কী? না, এই সাড়ে তিনশ কিলোমিটারের মোটামুটি মধ্যবর্তী স্থানে অর্থাৎ মধ্য আন্দামানের কদমতলা সংলগ্ন বিজয় বারুই নামের এক গৃহস্থের বাড়ির নিকটবর্তী বাগানে সম্ভবত ফল-ফলাদি চুরি করতে এসেছিল এক জারোয়া দল। শোনা যায় কুকুরের তাড়া খেয়ে পালিয়ে যাবার পথে কুটির সংলগ্ন নালার কাছে গাছের শিকড়ে পা আটকে এক জারোয়া যুবক পড়ে গিয়ে পা ভেঙে যায়। সম্ভবত দলটি সে কথা বুঝতে না পেরে পালিয়ে যায়। পরে যখন অনেক কুকুরের চিৎকার শোনা যাচ্ছে তখন সরেজমিনে ঘটনা দেখতে গিয়ে আবিষ্কৃত হয় বছর চোদ্দের এক জারোয়া তরুণ বড় অসহায় ভঙ্গিতে সেখানে পড়ে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। শোনা যায় গ্রামবাসিরা তাকে খাবার বা জল দিতে গেলে সে তা গ্রহণ করেনা। কিন্তু খুব কালো বর্ণের এক তামিল যুবককে দেখে ওই জারোয়া তাকে কিছুটা নিজেদের মত মনে করে কাছে ডেকে তার কাছ থেকে জল এবং খাবার গ্রহণ করে। পরে গ্রামবাসিরা তাকে উদ্ধার করে কদমতলা প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যায়। এবং সেখান থেকে পরবর্তীতে রাজধানী পোর্ট ব্লেয়ারের গোবিন্দ বল্লভ পন্থ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
প্রথম প্রথম এই জারোয়া তরুণ চিকিৎসাকর্মী থেকে তার কাছে আসা অন্যান্য মানুষজনকে নানাভাবে কামড়ে, থুতু দিয়ে অতিষ্ঠ করে দিয়েছিল। সভ্য সমাজের বিরুদ্ধে সে তার উষ্মা প্রকাশ করত ওইভাবেই। কিন্তু তিন মাস রাজধানী পোর্ট ব্লেয়ারের জেলা সদর হাসপাতাল — জি বি পন্থ হাসপাতালের ভি আই পি রুমে চিকিৎসা ও অন্যান্য পরিষেবা গ্রহণ করার পর রীতিমতো আধুনিক জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ে ছেলেটি। ইশারা ইঙ্গিতে সে তখন টিভি, ফ্যান চালানোর অনুরোধ করত। প্রয়োজনে কাজ চালানোর মত একটু-আধটু হিন্দিও সে বলার চেষ্টা করত। জানা যায় তার নাম 'ইন মে'। সম্পূর্ণ নিখরচায় উপযুক্ত চিকিৎসা দিয়ে সম্পূর্ণ সুস্থ করার পর সরকারি পক্ষ থেকে পরবর্তীতে 'ইন মে'-কে ছেড়ে দিয়ে আসা হয় তাদের এলাকার কাছাকাছি কোন জায়গায়। তারপর সেখান থেকে একটি ডিঙ্গি নৌকায় করে তাকে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয় তাদের একেবারে নিজস্ব এলাকায়। 'ইন মে'-র বাড়ির লোকজন ও প্রতিবেশী সকলে তাকে ফিরে পেয়ে অবাক হয়ে যায়। এবং তারা 'ইন মে'-র কাছে সভ্য জগতের গল্প শোনে। পরবর্তীতে এই 'ইন মে'-ই জারোয়া এবং সভ্য সমাজের মধ্যে একজন দূত হিসেবে কাজ করে। 'ইন মে' এরপর খুব অল্পদিনের মধ্যেই তার ছয় জন সঙ্গীসহ সভ্যসমাজের সাথে মিলিত হবার আগ্রহে এসে হাজির হয় লোকালয়ে। সাধারণ মানুষও চিনতে পারে পুরনো সেই জারোয়া বন্ধুটিকে। 'ইন মে'-র তিনজন তরুণ এবং তিনজন তরুণী বন্ধুর সঙ্গে অদ্ভুত এক সুন্দর সম্পর্ক গড়ে ওঠে গ্রামবাসীর। তারা জারোয়াদের প্রিয় কলা, নারকেল, অন্যান্য ফল ফলাদি বা অন্যান্য খাদ্যদ্রব্য উপহার হিসেবে দিয়ে পৌঁছে দেয় তাদের কুটিরে। এই ঘটনার দিন পনেরো বাদে ৭০ জন জারোয়া সাঁতার কেটে চলে আসে কদমতলা জেটিতে এবং এরপর থেকেই নতুন এক অগ্রগতির বন্ধন তৈরি হয়। যদিও এই সময় কিছু অবাঞ্ছিত এবং অনৈতিক কাণ্ডকারখানা ঘটছিল। জারোয়ারা যে সমস্ত খাবার-দাবাদের সঙ্গে অনভ্যস্ত ছিল অতিরিক্ত মেশামিসির ফলে কিছু মানুষ না বুঝেই এদেরকে সেই সব খাবারে অভ্যস্ত করে ফেলছিল। সরকারিভাবে মানুষকে বোঝানো হয় এদের কল্যাণের জন্য যেসব খাদ্যদ্রব্য নিষিদ্ধ বলে মনে করা হয়েছে সেগুলো যেন জারোয়াদের কাছে না পৌঁছে দেওয়া হয় কারণ এইভাবে তারা তাদের স্বাভাবিকতা হারিয়ে অন্য পথে চালিত হবে যেটা তাদের শারীরিক-মানসিক নৈতিক স্বাস্থ্যের দিক থেকে অসম্মত। এই অগ্রগতির পরিণতিতেই ১৯৯৭ সালে বুশ পুলিশ বাহিনীর নতুন নাম বদল করে রাখা হয় 'জারোয়া প্রটেকশন পুলিশ' সংক্ষেপে — জে পি পি।
জারোয়ারাও এবার ভরসা পেয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে মেশার সাহস পায়। কদমতলা হাসপাতালের ডাক্তাররা জারোয়াদের কুটিরে গিয়ে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেন। পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুরের মানুষ ডক্টর রতন চন্দ্র কর, যিনি আন্দামান-নিকোবর প্রশাসনের স্বাস্থ্য বিভাগের একজন যোগ্য কর্মী ছিলেন, তিনি 'আন্দামানের জারোয়া' নামে লেখা তাঁর গ্রন্থের মধ্যে জারোয়াদের জীবন ও সমাজের অনেক আধুনিক তথ্য তুলে ধরেছেন।
যেহেতু বর্তমান প্রবন্ধ রচনার পরিষদ কিছুটা সংক্ষিপ্ত তাই আমরা কিছুটা সংক্ষিপ্তভাবেই বলতে পারি — আমরা আধুনিক সভ্য মানুষেরা জারোয়াদের অত্যন্ত অশিক্ষিত, বন্য জাতি, হিসেবে যতই বাঁকা চোখে দেখি না কেন, তারা কিন্তু অনেক বেশি সংবেদনশীল। দুটো একটা ঘটনা আশ্চর্য রকমের প্রভাবিত করে আমাদের। ২০০৪ সালের ভয়ঙ্কর সুনামির ইতিহাস তো সবার জানা আছেই। অনেকেই তখন মনে করেছিলেন যে ভয়ঙ্কর জলোচ্ছ্বাসে আন্দামানের জনজাতি জারোয়া গোষ্ঠী সম্ভবত বিলুপ্ত হয়ে গেল। কিন্তু পরে তদন্ত করে দেখা গেছে একটি জারোয়াও ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি সেই জলোচ্ছ্বাসে। কারণ হিসেবে এরা জানিয়েছিল এদের পূর্বপুরুষের দেওয়া শিক্ষা যে, ভয়ঙ্কর ভূমিকম্প হলে জলোচ্ছ্বাস হতে পারে, এলাকা ভাসিয়ে দিতে পারে। তাই তাদের ব্যবহার্য ছোট-খাট ডিঙ্গি বা অন্যান্য জলযানের মাধ্যমে ওই ভূমিকম্পের পর তারা সমুদ্রে ভেসে গিয়েছিল এবং যার ফলে রক্ষা পায় তাদের জীবন। আবার অতি সাম্প্রতিক ভয়ঙ্কর বিষাক্ত এক আক্রমণ কোভিদ ১৯-এর ছোবলে যখন সারা বিশ্ব ত্রস্ত, কম্পিত হয়ে নাভিশ্বাস উঠে গেছে সবার, সে সময় অনেকেই হঠাৎ সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন যে এই জারোয়া দের মধ্যে অনেকেই আক্রান্ত হয়ে গেছে কোভিদ ১৯-এ। এবং একবার এই রোগাক্রান্ত হলে এদের বাঁচার রাস্তা নেই বলেই তারা মনে করেছেন। কিন্তু অনেক কষ্টসাধ্য প্রক্রিয়ায় ২৮০ জন জারোয়ার উপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে এদের একজনও করোনার প্রভাবে প্রভাবিত হয় নি। আরও একটা বেশ কৌতূহলোদ্দীপক খবর হল জঙ্গলে যে এলাকায় তারা বসবাস করে, সেই সব এলাকায় যথেচ্ছ ভাবে হরিণ ঘুরে বেড়ালেও, তারা কখনও এই হরিণ শিকার ক’রে তাদের খাদ্য সংস্থানের কথা ভাবে না। এরা নাকি অসভ্য? বর্বর? অথচ যারা ভদ্র সভ্য বলে পরিচিত সেই সাধারণ মানুষ কোন পুরনো যুগ থেকে এই হরিণ শিকার এবং তার মাংস ভক্ষণকে রাজকীয় বলে মনে করেন। ক্ষেত্র বিশেষে বন বিভাগ থেকে খুব কঠিন রকমের শাস্তির ব্যবস্থা করেও সেই হরিণ শিকার মাঝে মাঝে রোধ করা যায় না — যেটা আজকের যুগের পক্ষে একটা লজ্জা জনক পরিস্থিতি!
যাইহোক এই কোনরকমে বেঁচে থাকা আন্দামানের জারোয়ারা, ভ্রমণ পিপাসু পর্যটকদের কাছে আজও এক বিস্ময়। দূর দূরান্ত থেকে ছুটে আসা সেই সব মানুষজনের আন্দামান আগমনের মূল আকর্ষণই হল এই 'জারোয়া'। পুনরুল্লেখ হলেও লিখছি — সেই নগ্ন মানুষদের একনজর দেখতে না পেলে কোন পর্যটকেরই যেন আন্দামান ভ্রমণ সম্পূর্ণ হয় না। পোর্ট ব্লেয়ারের প্রায় পঞ্চাশ কিমি দূরে জিরকাটাং নামের এলাকায় রয়েছে চেকপোষ্ট। সেখান থেকে প্রতিদিন চারবার সরকারী বিধি-বিধান মেনে 'কনভয়' প্রথায় অসংখ্য গাড়িঘোড়া এক সাথে ছুটে চলে জারোয়াদের জন্যে সংরক্ষিত প্রায় চঞ্চাশ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পথে। এই পথের বাঁকেই হঠাৎ দেখা হতে পারে প্রকৃতির সন্তান প্রকৃতির সঙ্গে মিশে থাকা সেই আদিম জনজাতি গোষ্ঠীর বাসিন্দাদের সাথে। একপলক দেখেই মনে হবে — আহা হা! দুর্লভ দৃশ্য। ছবি তুলে রাখি একটা। কিন্তু মনে রাখতে হবে ছবি তুলবেন মন ক্যামেরায়, বাস্তবে নয়, কারণ ব্যপারটা একেবারেই নিষিদ্ধ। বাধা না মেনে অত্যুৎসাহী কোন কোন পর্যটক গোপনে ছবি তোলার চেষ্টা করলে জারোয়া গোষ্ঠীর মানুষজনই হয়তো সেই ক্যামেরা নিয়ে ভেঙে দেবেন অথবা আইনের চোখে অপরাধী হয়ে আপনার জেল জরিমানা অনিবার্য। সুতরাং ......
তবে মানুষগুলোকে দেখে হয়ত মায়া হবে আপনার। কী হতচ্ছাড়া ভাব! মনটা আরও খারাপ হবে তখন — যখন শাস্ত্র বিরোধী, সরকার বিরোধী ভাষায় আরও শুনবেন আন্দামান আদিম জনজাতি বিকাশ সমিতি অগাধ পরিমান টাকা পায় এদের প্রতিপালনের নামে। অথচ সেই অর্থ কোথায় যে চলে যায় তার হদিশ কেউ পায় না! মাত্র ক’টা তো মানুষ, তবু বিপুল পরিমান অর্থের বিনিময়েও একটু উপযুক্ত খাদ্য জোটে না! এদের নাকি রাখতে হবে এদের মতই প্রাকৃতিক ভাবে, তাই স্বাভাবিক খাওয়া-পরা দেওয়া মানা। দুষ্টু জনেরা বলেন — আসলে তা নয়, জনজাতি বিকাশের নামে, এদের সংরক্ষণের নাম করে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা বরাদ্দ না করাতে পারলে বহু মানুষের পকেট ভারী হবে কী করে? যদি দেখতে না পান তাহলে একরকম আফশোস থাকবে। আর যদি দেখতে পান এবং যদি প্রাণ থাকে আপনার তাহলে নির্ঘাত মনটা আপনার ব্যথার ভারে ভেঙে পড়তে চাইবেই। সেই মুমূর্ষু জারোয়া নামের অসহায় মানুষগুলোর মুখগুলো তখন আপনাকে এক অভূতপূর্ব বিষন্নতায় ভরে দেবে।
লেখক স্বাধীনতা সংগ্রামী খলিলুর রহমান ও সেতারা বেগমের পুত্র, পূর্ব বর্ধমানের টোলা গ্রামে জন্ম। বাংলা ও শিক্ষা তত্বে স্নাতকোত্তর এবং বি.এড ডিগ্রিধারী এই শিক্ষাবিদ দীর্ঘদিন আন্দামানে শিক্ষা বিভাগে কর্মরত ছিলেন। শিক্ষকতা ও অনুবাদ ক্ষেত্রে অসাধারণ অবদানের জন্য তিনি লেফটেন্যান্ট গভর্নরের প্রশস্তিপত্রে সম্মানিত হন। CBSE-র ইংরেজি ও হিন্দি পাঠ্যপুস্তক বাংলায় অনুবাদের জন্যও তিনি বিশেষভাবে প্রশংসিত। বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত হলেও সাহিত্য, সঙ্গীত ও সংস্কৃতিচর্চার সঙ্গে তাঁর অটুট সম্পর্ক রয়েছে। প্রকাশিত গ্রন্থসংখ্যা ১৭; তাঁর লেখা নিয়মিত প্রকাশিত হয় আকাশবাণী, দূরদর্শন ও বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়।