বর্তমান সমাজে শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করা একটা সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা আমরা সকলেই কম বেশি করে থাকি। Covid-19 এর পর এই প্রবণতা আরো বেড়েছে। সবার মনেই প্রশ্ন থাকে যে — "কোন শেয়ার কিনবো, কত দামে কিনবো।" কেউ কেউ এটার সঠিক উত্তর খুঁজে পেয়ে অর্থলাভ করতে পারে এবং বাকিরা বেশিরভাগ সময়ই পারে না।
শেয়ার কেনার জন্য খুব সংক্ষেপে বললে, তিনটে বিষয় খেয়াল করতে হয় —
🔸 কোম্পানির বর্তমান অবস্থা। এটাকে আমরা অনেক সময় Fundamental Analysis বলে থাকি।
🔸 কোম্পানির ভবিষ্যৎ কতটা উজ্জ্বল।
🔸 কোম্পানির শেয়ারের ন্যায্য মূল্য। শুধু মূল্য নয় কিন্তু — ন্যায্য মূল্য।
আজকে এই ন্যায্য মূল্যের গুরুত্ব কতটা সেটা তুলে ধরার চেষ্টা করছি। অনেক সময় দেখা গেছে, ভালো কোম্পানি বাজে দাম অর্থাৎ ন্যায্য মূল্যের থেকে অনেক বেশি দামে কিনে, অনেক টাকা লোকসান হয়েছে। আবার বাজে কোম্পানি ভালো দাম বা ন্যায্য মূল্যের কাছে কিনে, কম প্রফিট বা খুব কম লসে বেড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ মার্কেট করে দিয়েছে। এর মানে, ন্যায্য মূল্য এক অপরিহার্য বিষয় যেটা কখনোই অবজ্ঞা করা উচিৎ না। এটা অবজ্ঞা করলে কিন্তু বাজার চরম শাস্তি দেবে যা মনোবল ধ্বংস করার জন্য যথেষ্ট। তখনই অনেকে বলবে শেয়ার বাজার জুয়া, এবং অর্থ লাভ না বরং নষ্ট হয়। বেশিরভাগ লোকে এই ভুলটা করে থাকে।
এটা কেনো হয় এবং কখন হয়। FII এবং DII শেয়ারের দাম উপরে নিয়ে যায়, তারপর ভালো লাভে বিক্রি করে দেয়। তাঁদের হাতে শেয়ার বাজারের দাম ওঠা নামা করে। এবার ভাবুন, যদি আপনি ন্যায্য মূল্য না দেখে কেনেন ও মার্কেট মুভাররা বিক্রি শুরু করে, তাহলে আপনি লোকসান করতে বাধ্য। আরেকটি বিষয় জানতে হবে যে, ভালো কোম্পানির দাম উঠবেই, FII ও DII রা তাতে বিনিয়োগ করবেই। শুধু আপনাকে ন্যায্য মূল্যে কিনতে হবে। এই ন্যায্য মূল্যকে বাজারে বলে Fair Valuation।
অনেক পদ্ধতি আছে ন্যায্য মূল্য বার করার। ইন্টারনেট আপনাকে এখানে সাহায্য করবে। তাও আপনি নিজে শিখেও এটি বার করতেই পারেন বা কোনো SEBI রেজিস্টার্ড এনালাইস্টের থেকেও ন্যায্য মূল্যের ব্যাপারে পরামর্শ নিতে পারেন।
ন্যায্য মূল্য মাথায় রেখে আপনি এই পদক্ষেপ গুলো নিতে পারেন, নিজের পোর্টাফোলিওর ঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রে। এখানে মুল্যকে Valuation বলে সম্বোধন করবো —
🔸 ভালো Fundamental, বাজে Valuation: শেয়ারটা আপনার ওয়াচলিস্টে রাখুন। সঠিক দামে আস্তে দিন। হয়তো, নিজের নিয়মে দাম নিচে আসবে অতিরিক্ত বিক্রয়ের জন্য। আবার, মার্কেট ক্র্যাশ করে সমগ্রিক ভাবে সমস্ত শেয়ারের দাম পড়লে তখনও ন্যায্য মূল্যে বা তার নিচে দাম চলে আসবে। সেটা একটা ভালো দামে কেনার সুযোগ হতে পারে।
🔸 ভালো Fundamental, ভালো Valuation: শেয়ারটা অবশ্যই কিনতে পারেন। অথবা বাজারের সূচক, Nifty বা Sensex যদি অনেকটা উঠে যায়, তাহলে কারেকশন বা একটু মার্কেট নিচে আসার জন্য অপেক্ষা করতে পারেন। সে ক্ষেত্রে আরেকটু সস্তা দামে কিনতে পারবেন। ওয়াচলিস্টে রাখুন ও দামের গতি বিধি লক্ষ্য করে অল্প অল্প করে অনেকদিন ধরে কিনুন।
🔸 বাজে Fundamental, বাজে Valuation: শেয়ারটা এড়িয়ে চলুন। কখনোই কোনো পরিস্থিতেই কেনা বা ওয়াচলিস্টে রাখা উচিৎ না। লোকসান করার সম্ভবনা প্রবল।
🔸 বাজে Fundamental, ভালো Valuation: শেয়ারটা এড়িয়ে চলুন বা কোম্পানি ও সেক্টর বুঝে ওয়াচলাস্টে রাখুন। Fundamental বাজে বলেই হয়তো Valuation কম। যদি মনে করেন, Fundamental পরবর্তীকালে ঠিক হয়ে যেতে পার, তাহলে ওয়াচলাস্টে রেখে কোম্পানি ও তার দামের গতিবিধি লক্ষ্য করুন। এরকম কোম্পানি খুবই কম পাওয়া যাবে, এবং Fundamental ঠিক হতে শুরু করলে, দাম দ্রুত গতিতে বাড়বে ও ন্যায্য মূল্যের উপরে খুব তাড়াতাড়ি চলে যেতে পারে। তখন আর কেনার জায়গায় থাকবে না দাম, ও বিনিয়োগ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যাবে।
এইভাবে ন্যায্য মূল্য দেখে, ওয়াচলিস্ট থেকে পোর্টাফোলিওর জার্নি, শিক্ষা মূলক ও কম ঝুঁকিপূর্ণ হবে এবং আপনি ভালোই লাভ করার জায়গায় থাকবেন। পোর্টফোলিও আপনি যেমন করেই সাজনা না কেনো, শেয়ারের ন্যায্য মূল্য শিরোধার্য।
Covid-এর পর অনেক উৎসাহী বিনিয়োগকারী আমাদের দেশে তৈরী হয়েছে। এটি অত্যন্ত ইতিবাচক দিক। কিন্তু আমাদের এখানে একটা সমস্যা আছে। Covid-এ মার্কেট ক্র্যাশ হবার পর সেরকম ক্র্যাশ আর আসেনি এবং অল্প কারেকশন এলেই আবার খুব তাড়াতাড়ি উঠে গেছে। বিনিয়োগকারীরা খুব তাড়াতাড়ি লাভ করেছে। এটার কারণ আমাদের দেশের উর্ধগামী ইতিবাচক অর্থনীতি। ৮০-৯০ দশকের আমেরিকা অনেকটা এরকম ছিল।
এটাই সমস্যার যে আমরা লম্বা বেয়ার ফেস কখনোই খুব একটা দিখিনি। সুতরাং কখনো এরকম পরিস্থিতি এলে, আমরা অনেকেই ভয় পেয়ে যাবো — কারণ এটা সামলানোর অভিজ্ঞতা নেই। এই ক্ষেত্রে ন্যায্য মূল্য দেখে, ভালো শেয়ারে বিনিয়োগ আপনাকে ভবিষ্যতে ধনশালী করতে পারে। মহামান্য Warren Buffet বলেছেন — "সবাই যখন ভয় পাবে তুমি তখন লোভ করো, সবাই যখন লোভ করবে তখন তুমি ভয় পাও।" আপনি ন্যায্য মূল্য খেয়াল রেখে এই কথা অনুসরণ করতে পারেন।
ডিসক্লেইমার : এই লেখাটি শুধুই শিক্ষামূলক ও তথ্যভিত্তিক। এটি কোনো সরাসরি বিনিয়োগ-পরামর্শ নয়। শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ; সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে একজন SEBI-রেজিস্টার্ড বিশ্লেষকের পরামর্শ নিন।