দীর্ঘদিন ধরে বৃষ্টিপাত ছিল সম্পূর্ণভাবে প্রকৃতির ইচ্ছাধীন। অনাবৃষ্টিতে হাহাকার আর অতিবৃষ্টিতে দুর্ভোগ — এই দুইয়ের মাঝখানে মানুষ ছিল একরকম অসহায়। কিন্তু এখন সেই ছবিটা দ্রুত বদলাচ্ছে। বিজ্ঞানের হাত ধরে মানুষ আজ মেঘের রাজ্যে প্রবেশ করেছে, এনেছে এক বৈপ্লবিক পদ্ধতি — কৃত্রিম মেঘ বীজ বপন (Cloud Seeding)। হয়ত অনেকেই এই কৃত্রিম মেঘ বীজ বপন সম্পর্কে জানেন। যাঁরা এখনও সেভাবে অবগত হননি, তাদের অবগতির জন্যই আজকের এই নিবন্ধ।
মানুষ সবসময় পৃথিবীতে নিজের আধিপত্য কায়েম করতে চেয়েছে, আর আশিভাগ ক্ষেত্রে সাফল্যও অর্জন করেছে। প্রকৃতিকেও ধীরে-ধীরে মুঠোবন্দি করে ফেলেছে বিজ্ঞানের সাহায্য নিয়ে। কোনো একটা গল্পে পড়েছিলাম বাঁশের সাহায্যে মেঘ খুঁচিয়ে বৃষ্টিপাত ঘটানোর কথা। সেটা তখন গল্প হলেও এখন কিন্তু মানুষ নিজের নিয়ন্ত্রণাধীন করেছে বৃষ্টিপাতকে।
কৃত্রিম মেঘ বীজ বপন করে খরাপ্রবণ অঞ্চলে বৃষ্টিপাত ঘটিয়ে চাষবাস স্বাভাবিক করতে বা দিল্লির মত মারাত্মক দূষণের প্রতিকার করতে এই উদ্যোগ কাজে আসবে বলে বিজ্ঞানীরা আশাবাদী। কিভাবে প্রক্রিয়াটিকে কার্যকরী করা হচ্ছে জানেন?
বৈজ্ঞানিক কৌশলে মেঘের মধ্যে কিছু রাসায়নিক পদার্থ ছড়িয়ে বৃষ্টিপাতকে ত্বরান্বিত করে খরাপ্রবণ অঞ্চলে স্বাভাবিক বর্ষণ ঘটানোর প্রচেষ্টা চলছে। স্বাভাবিকভাবে মেঘে জলকণা বা তুষার কণা তৈরি হতে গেলে প্রয়োজন ধূলিকণা বা লবণের মত নিউক্লিয়াসের। এই নিউক্লিয়াসকে অবলম্বন করে জলীয় বাষ্প ঘনীভূত হয়। এই প্রক্রিয়াকেই মূলত ব্যবহার করা হয় কৃত্রিম মেঘ বীজ বপনের ক্ষেত্রে।
এবার বিস্তারিতভাবে বলা যাক, আসলে কিভাবে কার্যকর করা হচ্ছে এই পদক্ষেপ —
প্রথমে রাডার বা স্যাটেলাইট দিয়ে ২-৫ কিলোমিটার উচ্চতায় থাকা উপযুক্ত মেঘ চিহ্নিত হয়, তবে শুধু মেঘ হলেই হবে না, দরকার নির্বাচিত মেঘের মধ্যে যথেষ্ট পরিমাণে জলকণার উপস্থিতি। এরপর ড্রোন, বিমান বা গ্রাউন্ডভিত্তিক জেনারেটরের মাধ্যমে নির্বাচিত মেঘের উপর বীজ বা সীড হিসেবে কিছু রাসায়নিক পদার্থ ছড়িয়ে দেওয়া হয়। মেঘে সিলভার আয়োডাইড বা ড্রাই আইস ছড়িয়ে দিলে সিলভার আয়োডাইডের কণাগুলি বরফের ভ্রুণ তৈরি করতে সাহায্য করে। এই বরফকণাগুলি দ্রুত বড় হয় এবং মহাকর্ষ বলের প্রভাবে তুষারপাত বা বৃষ্টির আকারে মাটিতে নেমে আসে। আবার কোনো কোনো কোনো ক্ষেত্রে সোডিয়াম ক্লোরাইড বা ক্যালসিয়াম ক্লোরাইড ব্যবহার হয় যা জলের অণুগুলির সংস্পর্শে এসে ঘনীভূত হয় এবং বৃষ্টিপাত ঘটায়। তবে আবহাওয়া অনুকূল হতে হবে সর্বক্ষেত্রে।
বিশেষজ্ঞ মতানুসারে এই পদ্ধতিতে বেশ কিছু ক্ষেত্রে উপকার পাওয়া যাবে। শুষ্ক অন্ঞ্চলে জলসরবরাহ বৃদ্ধি, কৃষিকাজের সুবিধা ছাড়াও দূষণ-প্রতিরোধ বা শক্তি-উৎপাদনে এই প্রক্রিয়া বিশেষভাবে সাহায্য করবে। তবে কৃত্রিম এই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করতেও প্রকৃতিকে বিশেষ জায়গা দিতেই হবে, কারণ মেঘে পর্যাপ্ত জলীয় বাষ্পের অভাব বা বাতাসের গতি অনুকূল না থাকলে কিন্তু সকল প্রচেষ্টায় ব্যর্থ হবে।
বর্তমানে ভারত ও এই মেঘ বীজ বপনের কাজে তৎপর হয়েছে। দিল্লির বায়ুদূষণ রুখতে সম্প্রতি এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। দিল্লি সরকার আই আইটি কানপুরের সাথে যৌথ উদ্যোগে এই পাইলট প্রকল্পটি হাতে নিয়েছে। অনুমান করা হচ্ছে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা ব্যয় হবে একাধিক ট্রায়াল কার্যকরী করতে। সাম্প্রতিক যে কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তাতে বুরারি, ময়ূরবিহার ও করোলবাগের মত স্থানগুলিকে নির্বাচন করা হয়। প্রথমদিকের চেষ্টায় যদিও আশানুরূপ ফলে পাওয়া যায়নি, কারণ হিসেবে দেখা গেছে মেঘে পর্যাপ্ত জলীয় বাষ্পের অভাব ছিল। সফলভাবে ক্লাউড সিডিং করতে গেলে মেঘে কমপক্ষে ৫০% জলীয় বাষ্প দরকার, যা দিল্লির মত শুষ্ক আবহাওয়ায় প্রায়শই পাওয়া কঠিন। দিল্লির ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ মতানুযায়ী ক্লাউড সিডিং একটি অস্থায়ী সমাধান — মূল কারনগুলি মোকাবিলায় জন্য পর্যাপ্ত নয়। তবে স্বল্পমেয়াদী পরিত্রাণ ও পরিবেশগত জরুরি পরিস্থিতিতে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। দিল্লি সরকার আশা করছে ভবিষ্যতে ট্রায়ালগুলি সফল হলে শীতকালে দিল্লির বিষাক্ত বায়ু থেকে শহরবাসীকে কিছুটা হলেও স্বস্তি দেবে।