পুরীর আকাশে তখনও ঠিকভাবে আলো ফুটতে শুরু করেনি। কিন্তু জগন্নাথ মন্দিরের সামনে তখন প্রবাহমান জনস্রোত। ভক্তদের চোখে আকণ্ঠ প্রতীক্ষা, কণ্ঠে মন্ত্রপাঠ, আর হৃদয়ে অদ্ভুত এক প্রশান্তি। সূর্য ওঠার আগেই শঙ্খধ্বনি, ঘণ্টাধ্বনি, কাঁসরের ছন্দ থেকে ধূপের সুবাসে, ভোরের আকাশ যেন নিজেই পবিত্রতার এক বিশাল ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। পুরীর এই মন্দির কেবলমাত্র এক ধর্মীয় স্থাপনাই নয়, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অনুভব করলে এই জগন্নাথ ধাম এক বিশ্বাসের ও অগণিত মানুষের আস্থার শরীরী রূপ। আর যাঁকে ঘিরে সেই অনুভব, তিনি শ্রী জগন্নাথ — জগতের নাথ, সকলের ঈশ্বর।
কে তিনি? তিনি বিশ্বনাথ, এই জগতের পালনকর্তা। তিনি সেই দেবতা, যাঁর কাছে পৌঁছতে দরকার হয় না জাতের পরিচয়, পদমর্যাদার ছায়া, কিংবা উচ্চবর্ণের সনদ। তিনি সবার জন্য, যিনি রাজাকে বাধ্য করেন ঝাঁটা হাতে রাস্তা পরিষ্কার করতে, আবার পথচলতি গরিব ভক্তকে দেন রশি ধরে টানার সম্মান। তাঁর রথযাত্রা শুধুই এক ধর্মীয় আচার নয়, এ এক সামাজিক বিপ্লব, যেখানে ভক্তি আর সমতার মধ্যে থাকে না কোনও বিভাজনের সীমারেখা।
আজ আমি লিখছি কিভাবে পরম করুণাময় শ্রী জগন্নাথ হয়ে উঠলেন Juggernaut এ! সে বহুকাল আগের কথা, যখন এই রথযাত্রাই একদিন বিদেশি চোখে ধরা পড়ল ভিন্ন আলোয়। সময় তখন ঊনবিংশ শতক, ব্রিটিশ পর্যটক, মিশনারি আর লেখকরা ক্রমশ ভারতে আসতে শুরু করেছেন। সেই সময়ে পুরীর এই মহাযাত্রা তাদের চোখে হয়ে উঠল এক বিস্ময়ের বিষয়। তারা হতচকিত হল রথের আকার দেখে, মানুষের উচ্ছ্বাস দেখে, ঈশ্বরের এই জনসমাগমে মিশে যাওয়ার দৃশ্য দেখে। সর্ব ধর্ম-বর্ণ-জাতি সম্মিলনের চিত্র দেখে, কিন্তু তারা যেন কোনো এক প্রকারে অনুভব করতে পারল না তার গভীরতা। বরং তারাই তৈরি করল এক কল্পিত কাহিনি — তাদের বর্ণনানুযায়ী, যেখানে ভক্তরা নিজের ইচ্ছায় ঝাঁপিয়ে পড়েন রথের চাকার নিচে, আত্মবলি দেন ঈশ্বরের উদ্দেশে।
এই ভুল ব্যাখ্যা ক্রমেই ছড়িয়ে পড়ে পাশ্চাত্যে। ওখানে তখন ভারতীয় ভক্তি ও সংস্কৃতি রূপ নেয় কুসংস্কার হিসেবে, ঈশ্বরের প্রতি আত্মসমর্পণকে দেখা হয় উন্মাদনা হিসেবে। এখান থেকেই জন্ম নিল একটি নতুন শব্দ 'Juggernaut'। 'Jagannath' নাম বিকৃত হয়ে প্রবেশ করল ইংরেজি ভাষায়, একেবারে নতুন অর্থ নিয়ে। এই 'Juggernaut' শব্দের অর্থ যারা জানেন না, তাদের বলি — এই শব্দটি দ্বারা বোঝায় এমন কিছু, যা ভয়ংকর, অপ্রতিরোধ্য, বিশাল এবং ধ্বংসাত্মক। কোনো রাজনৈতিক আন্দোলন, বৃহৎ সংস্থা, প্রযুক্তি বা যুদ্ধ, যা একবার চলতে শুরু করলে আর থামানো যায় না, তাকেই সাধারণ অর্থে বলা হয় 'Juggernaut' ["The ruling party's election machine is a juggernaut, well-funded and meticulously organized." — The Washington Post]। এমনকি পশ্চিমা কল্পকাহিনির জগতে 'Juggernaut' এক অতিমানবীয় চরিত্র, যে সব কিছু গুঁড়িয়ে এগিয়ে চলে।
কিন্তু বাস্তবতা ও সত্যের অবস্থান যেন অনেক ওপরে — জগন্নাথ তো ছিলেন করুণার প্রতীক। তাঁর রথে বসে ঈশ্বর স্বয়ং চলেন মানুষের সঙ্গে, মানুষের হয়ে। যে শব্দ আজ পাশ্চাত্যে একটি নির্মম শক্তির প্রতীক, তার উৎস ছিল এক দিব্য আস্থা—যেখানে ঈশ্বর নিজেই নেমে আসেন ভক্তের দরজায়। যিনি মানুষের মাঝে এসে জুড়ে দেন সমস্ত বিচ্ছিন্নতাকে। সেই ভাবনার মধ্যেই তো লুকিয়ে থাকে সত্যিকারের ঈশ্বরত্ব।
এবারে আসি ঠুঁটো জগন্নাথ প্রসঙ্গে। জগন্নাথের দিকে তাকালেই চোখে পড়ে তাঁর চওড়া, স্থির চোখজোড়া, উঁচু কপাল, গোলগাল মুখ। কিন্তু একটু ভালো করে দেখলে বোঝা যায়, তাঁর নেই হাত, নেই পা — তিনি যেন নির্বিকার। আর এখান থেকেই জন্ম নিয়েছে এক বহুলপ্রচলিত লোকপ্রবাদ — 'ঠুঁটো জগন্নাথ'। এই কথাটির অর্থ সাধারণভাবে নেওয়া হয় এমন কাউকে বোঝাতে, যার ক্ষমতা আছে, কিন্তু করণীয় বা প্রতিক্রিয়ার সামর্থ্য নেই। তিনি কেবল বসে থাকেন দর্শক হয়ে।
কিন্তু এই কথাটির পেছনে রয়েছে ইতিহাস, যা আমাদের এক সর্বৈব সত্যের দিকে অগ্রসর হতে নিয়ে চলে।
পুরাণ বলে, এক আদিবাসী শিকারি বিশ্ববাসুকে ঈশ্বর রূপে দর্শন দিয়েছিলেন 'নীলমাধব'। রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন তখন সেই ঈশ্বররূপের সন্ধান করেন। বহু খোঁজের পর যখন তাঁকে মূর্তি গড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়, তখন এক বৃদ্ধ কাঠুরে (অনেকে বলেন স্বয়ং বিশ্বকর্মা) বলেন, "আমি মূর্তি গড়ব, তবে এক শর্তে — আমি যতদিন কাজ করব, ততদিন আমায় নির্বিচারে গড়ার সময় দিতে হবে এবং মাঝপথে কেউ দেখবে না।"
ক্রমে একটা নির্দিষ্ট ঘরে দরজা জানালা বন্ধ রেখে কাজ শুরু হয়। রাজা অপেক্ষা করতে থাকেন। দিন কেটে যায়। একসময় রানী অধৈর্য হলে, দরজা খুলে দেখা যায় তিনটি অসম্পূর্ণ মূর্তি — জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা। নেই হাত-পা, মুখ গড়ার কাজও অসমাপ্ত। মূর্তিপ্রস্তুতকারক রহস্যময়ভাবে অদৃশ্য হয়ে যান। সেই মূর্তিগুলিকেই মন্দিরে স্থাপন করা হয়। সেই অসম্পূর্ণতাই হয়ে ওঠে চিরন্তন পূর্ণতা।
এরপরেই, আমার এই লেখার মূল উদ্দেশ্যে আসা যাক। শ্রীজগন্নাথদেবের এই অর্ধনির্মিত মূর্তিই আজ আমাদের এক চিরন্তন সত্যের সংকেত দেয় — ঈশ্বর সবসময় পরিপূর্ণ রূপে ধরা দেন না। তিনি অসম্পূর্ণতার মধ্যেও সদা বিরাজমান।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে আমরা অসম্পূর্ণ। আমরা মানবতাহীণ এমন এক সংকীর্ণ অবস্থানে দাঁড়িয়ে, যেখানে আমাদের সমগ্র চেতনা, শক্তি এক অন্ধকারের মাঝে হারিয়ে যাচ্ছে। আমাদের ক্ষমতা আছে সমাজকে পরিবর্তনের, সমাজকে উদার করে তোলার। আমাদের এই অক্ষমতার উদাহরণই যেন দেখিয়েছেন শ্রীজগন্নাথদেব। পার্থক্য শুধু আমাদের কার্যে ও ভাবনায়। আমরাই যারা পুণ্য অর্জনের আশায় দিনে-দিনে মন্দিরের দ্বারে ঘুরি, তারাই দিনান্তে দিকভ্রান্ত হয়ে প্রকৃত সত্যকে অবমাননা করে চলি।
যেখানে আমরা এই মনুষ্যজাতি ধর্ম থেকে জাত-পাত — আরও কত শত বিভেদ সৃষ্টি করে চলেছি অনবরত, সেখানে শ্রী জগন্নাথ নির্দেশ করছেন, বলছেন, "চেয়ে দেখ!"... পুরীর জগন্নাথ ধামে হিন্দু ধর্মানুসারী ছাড়া আর কোনো ধর্মের মানুষ তাতে পা রাখতে পারেন না — এ বিভেদ আসলে কার? এ তো মনুষ্যসৃষ্ট। জগন্নাথ, যিনি জগৎ-এর নাথ, তিনি তো প্রতিটা মানুষেরই আশ্রয়দাতা। তিনি যেমন উচ্চবিত্তের, তেমন দীন-দুঃখী অনাথেরও। অধিকার সবারই এক। তাঁর কাছে কি আদৌ কোনও বিভেদ আছে? নেই।
যারা সারাবছর ঈশ্বরের বিগ্রহ দর্শন করতে পারে না, প্রবেশের অধিকার পায় না — তাদের সকলের জন্য, সকল ধর্মের-জাতের-বর্ণের ব্যবধান-বিভাজনের সংকীর্ণ সীমারেখাকে রথের চাকার নিচে মিশিয়ে দিয়ে ঈশ্বর স্বয়ং তাঁর মন্দির ছেড়ে বেড়িয়ে এসে ভক্তের দ্বারে গিয়ে দর্শন দেন।
আসল বিভেদ যে আমাদের অভ্যন্তরে। আসলে আমরা আধুনিকতার মুখপাত্র হয়েও চিন্তাভাবনায় আমরা ঠিক আক্ষরিক অর্থে 'Juggernaut' আর 'ঠুঁটো জগন্নাথ'-এই সীমিত।