২৫শে ডিসেম্বর সারা পৃথিবী জুড়ে মহাপুরুষ যীশুখ্রীষ্টের আবির্ভাব তিথি হিসেবে পালিত হয় বড়দিন। বড়দিনের এই উৎসব সুদূর জেরুজালেম থেকে ভারতবর্ষের বিশাল দূরত্বটা এক লহমায় অতিক্রম করেছিলো প্রভু যীশুর ভালোবাসা, মানবতা ও সহজ সরল উপদেশাবলীর গুণে।
প্রাচীন গ্রীকরা কেককে πλακοῦς (প্ল্যাকাস) বলে ডাকত, যেটি 'ফ্ল্যাট', πλακόεις (প্ল্যাকোইস) শব্দ থেকে এসেছে। এটিকে তখন ডিম, দুধ, বাদাম এবং মধুর সাথে মিশ্রিত ময়দা ব্যবহার করে প্রস্তুত করা হতো । তারা 'সাতুরা' নামেও একটি ভারী কেক বানাতো। রোমান যুগে কেকের নাম হয়ে ওঠে 'প্ল্যাসেন্টা' যা গ্রীক শব্দ থেকে উদ্ভূত হয়েছিল। ভারতীয় বিশেষত বাঙ্গলী সমাজে Cake-এর অর্থ হল, 'মিষ্টি পিঠা'।
ইতিহাস অনুযায়ী, সন ৩৩৬-এর ২৫ শে ডিসেম্বর রোমান চার্চের পক্ষ থেকে খ্রিস্টের জন্মের স্মরণে একটি ভোজসভার আয়োজন করা হয়েছিলো। এর পর ৩৫০ খ্রিস্টাব্দের কাছাকাছি পোপ জুলিয়াস ঘোষণা করেন ২৫ ডিসেম্বর উদযাপন হবে ক্রিসমাস হিসেবে। ভারতবর্ষে প্রথম ক্রিসমাস পালন করা হয় ১৬৬৮ সালে। কলকাতার প্রাচীন ইতিহাস অনুযায়ী, জব চার্নক কলকাতার বুকে প্রথম বড়দিন পালন শুরু করেছিলেন।
বড়দিনের আয়োজনে সাজসজ্জার অনেক বড় একটি অংশ জুড়ে থাকে রঙবাহারী সুদৃশ্য মনোলোভা স্বাদের কেক, ক্রিসমাস ট্রি, বাহারী ঝালর, তারা, শীতের কনকনে হাওয়া, সাদা বরফ আর বৃদ্ধ সান্টাক্লসের উপহার। পাশ্চাত্য দেশের প্রায় সব শহরেই অলিগলি থেকে শুরু করে ছোট-বড় রেস্তরাঁ, ক্যাফে, শপিং মল সব সেজে ওঠে বড়দিনের জন্য। নানান রকম কেকের বাহার এবং কেক-মেকিং উৎসবের আয়োজনও করা হয় বড়দিনের আয়োজনকে ঘিরে।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, আজ থেকে আনুমানিক ১৪০ বছর আগে ভারতবর্ষে বড়দিনের প্রথম কেক তৈরি হয়। ১৮৮৩ সাল, মারডক ব্রাউন নামে ব্রিটেনের এক ব্যবসায়ী দক্ষিণ ভারতে এসেছিলেন। কয়েক মাস পরেই বড়দিন আসন্ন প্রায়; নিজের দেশ থেকে শত শত মাইল দূরে থাকা মারডক বাধ্য হয়ে বড়দিন উপলক্ষে কেক বানানোর আর্জি নিয়ে চলে গেলেন কেরালার এক বিস্কুট তৈরির কারখানায়। সেই বিস্কুট তৈরির কারখানার মালিক ছিলেন মাম্বালি বাপু। ১৮৮৩ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে কেরালার 'তেলিচেরি'তে মাম্বালি'র সেই 'রয়েল বিস্কুট ফ্যাক্টরি'তে ভারতবর্ষের প্রথম কেক তৈরি হয়েছিল। তাঁর কাছেই মারডক বড়দিনের জন্য কেক বানিয়ে দেওয়ার আর্জি রেখেছিলেন।
সমস্যা শুরু হয়েছিল প্রথমেই। কারণ, বাপু কেক কীভাবে বানাতে হয় তার কিছুই জানেন না। তখন সেই সমস্যার সমাধান করলেন মারডক স্বয়ং। দক্ষিণ ভারতের মালাবার উপকূলে স্কট নামের এক জন দারুচিনি ব্যবসায়ী ছিলেন। ব্যবসার খাতিরে ব্রিটেনে তাঁর বহুল যাতায়ত ছিল। মারডক কেক খেতে চেয়েছেন শুনে ব্রিটেন থেকে তড়িঘড়ি একটি কেক আনিয়ে ফেললেন স্কট। তারপর সেই কেক নিয়ে গেলেন বাপুর কাছে। সেটা চেখে স্বাদ আন্দাজ করে সম্পূর্ণ দেশীয় উপকরণ দিয়ে ও দেশীয় পদ্ধতিতে প্রথম ভারতীয় ঘরানার কেকটি বানিয়ে ফেলেন মাম্বালি বাপু। কথিত, পাশ্চাত্য স্বাদের চেয়ে আলাদা হওয়া সত্ত্বেও মারডক এই অভিনব পদ্ধতিতে বানানো কেক খেয়ে শুধু যে মুগ্ধ হয়ে যান তা'ই নয়, দেশীয় বন্ধুবান্ধবদের জন্য এরকম আরও এক ডজন কেক বানানোর অর্ডারও বাপুকে দিয়ে দেন।
বাপু তাঁর বানানো এই কেকের নাম রাখলেন 'প্লাম কেক'। অনেকে দাবি করেন, এটিই বড়দিন উপলক্ষে ভারতে বানানো প্রথম কেক। মামবালি বাপুর হাত ধরে যে ইতিহাসের সূত্রপাত হয়েছিল, ১৪০ বছর ধরে সেই ধারাই বয়ে নিয়ে চলেছে পরিবারের বংশধরেরা। আজও, চার প্রজন্ম ধরে প্লাম কেকের সেই জনপ্রিয়তা বজায় রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রকাশ মাম্বালি, মাম্বালি বাপুর ভাগ্নের নাতি। কথিত, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন তাঁর হাতে হাতে তৈরি কেক এবং মিষ্টি সৈন্যদের জন্য পাঠিয়েছিলেন বাপু।
স্বল্পতথ্যে এবারে ছুঁয়ে যাই পৃথিবীর বিভিন্ন প্রাচীন সভ্যতায় কেক তৈরির কথা —
🔸 মিশরীয় সভ্যতা: এই সভ্যতার মানুষেরাই কেকের আদিম রূপটি বানাতে মধু দিয়ে মিষ্টি করা রুটির মাধ্যমে।
🔸 গ্রীক সভ্যতা: এই সভ্যতায় 'প্ল্যাকাস' নামক এক ধরনের কেক তৈরি করত, যা ময়দা, দুধ, বাদাম এবং মধু দিয়ে তৈরি হতো।
🔸 রোম সাম্রাজ্য: রোমানরা এরপর ডিম এবং মাখন যোগ করে কেকের টেক্সচার উন্নত করে। তারা প্রায়শই জন্মদিন এবং বিবাহ অনুষ্ঠানে কেক পরিবেশন করত।
🔸 মধ্যযুগীয় জার্মান সমাজ: এইসময় কেক এবং উৎসবের মধ্যে সংযোগ আরও দৃঢ় হয়। মধ্যযুগে জার্মানিতে শিশুদের জন্মদিন উদযাপনের জন্য কেক তৈরির প্রথা শুরু হয়, যাকে 'কিন্ডারফেস্ট' বলা হতো।
🔸 ইংল্যান্ডের সমাজব্যবস্থা: এখানের প্রথম দিকের কেকগুলিও মূলত ছিল মিষ্টি রুটি। কেক-র গোলাকার, সমতল আকৃতি এবং রান্নার পদ্ধতিতে বেকিং প্রক্রিয়া জুড়ে একবার উল্টে দিয়ে তাতে ক্রিম বা সতেজ ফল বসিয়ে তারা কেক তৈরি করতো।
🔸 আধুনিক যুগে কেক: ইউরোপে পরবর্তীতে যে আধুনিক কেকের ধারণা বিকশিত হয়, যেখানে কেকগুলি গোলাকার এবং উপরে ক্রিম, চকলেট, আইসক্রিম প্রভৃতির আইসিং দিয়ে সাজানো হতো।
জন্মদিনের কেক কাটার ইতিহাসের শুরু হয় অবশ্য প্রাচীন গ্রিক ও রোমান সমাজে। তারা তাদের চন্দ্রদেবী আর্টেমিস-এর উদ্দেশ্যে নিজ নিজ জন্মদিনে গোলাকার কেক উৎসর্গ করত। এই কেকের উপর মোমবাতি জ্বালানো হতো, যা চাঁদের মতো উজ্জ্বল দেখাত এবং এর ধোঁয়া দেবীর কাছে প্রার্থনা পৌঁছে দিত বলে বিশ্বাস করা হতো। অষ্টাদশ শতকে এটি জার্মানিতে শিশুদের জন্মদিনের উৎসবে কিন্ডারফেস্ট নামে একটি প্রথায় পরিণত হয়ে ওঠে এবং ধীরে ধীরে বিশ্বজুড়ে এটি একটি জনপ্রিয় ঐতিহ্য হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে।
লেখিকা একজন পশুপ্রেমী। ভালোবাসেন আঁকতে, বাগান করতে, এবং অনাথ আশ্রম ও বয়স্ক কেন্দ্রে গিয়ে সেবা করতে। স্বপ্ন দেখেন গাছপালার জন্য নার্সারী, পশুপাখিদের জন্য শেল্টার, এবং বয়স্ক আশ্রয়হীনাদের জন্য বৃদ্ধাবাস গড়ে তোলার। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করে বর্তমানে একটি বেসরকারি প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকতা করছেন। বহু পত্রপত্রিকায় লিখেছেন, পুরস্কৃত হয়েছেন। মঞ্চস্থ হয়েছে তাঁর তিনটি নাটক। কলকাতা বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে কবিতার বই।