ইদানীং স্প্যানিশ ফুটবলের দৌলতে 'এল ক্লাসিকো' সকলের কাছেই খুব পরিচিত শব্দবন্ধ। 'এল ক্লাসিকো' স্পেনীয় শব্দটি ইংরেজিতে 'দ্য ক্লাসিক', বাংলায় যার অর্থ সর্বোৎকৃষ্ট। খেলার মাঠে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা বোঝাতে বাঙালিদের বেশি পছন্দের 'ডার্বির মহারণ', চিংড়ি-ইলিশের চিরন্তন লড়াই। একসময়ে ময়দানে টালিগঞ্জ অগ্রগামী, এরিয়ান থেকে ইস্টার্ন রেলওয়ে, প্রত্যেকেই খুব শক্তিশালী দল হিসেবে পরিচিত হলেও কেউই ময়দানের চতুর্থ বা পঞ্চম প্রধান হয়ে উঠতে পারেনি। তৃতীয় প্রধান মহামেডানকে বাদ দিলে মোহন-ইস্ট দ্বৈরথকেই বাঙালির চিরন্তন ডার্বির মর্যাদা দেওয়া হয়েছে, কারণ কৌলীন্য, ঐতিহ্য, পরম্পরায়, সাফল্যে দুই প্রধান ভারতীয় ফুটবলের স্তম্ভ।
ঠিক একইভাবে দক্ষিণ কলকাতার পুজো মানচিত্রে এরকম বড়ো দলের সংখ্যা নেহাত কম নয়। গড়িয়াহাট থেকে গড়িয়া, সাদার্ন এভিনিউ থেকে দেশপ্রিয় পার্ক — নিকটবর্তী বড়ো পুজোকে কেন্দ্র করে সুস্থ প্রতিযোগিতা ও মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত আবেগ আশি-নব্বইয়ের দশকে তো ছিলই। বর্তমানে পুজোর সামগ্রিক পরিসর ও জৌলুস বেড়ে যাওয়ার পরে সেই আবেগের আতিশয্য আরও বেড়েছে।
সমাজসেবী সংঘের অষ্টম দশক
গৌরচন্দ্রিকা ছেড়ে আসল কথায় ফিরি — লেক রোড সংলগ্ন দুই বড়ো দলের শারদোৎসবে এবার অন্য মাইলফলক রচিত হয়েছে। প্রথমেই আসি অশীতিপর 'সমাজসেবী' সংঘের কথায়। প্রাক-স্বাধীনতা পর্বে মানবসেবায় ব্রতী হওয়ার অঙ্গীকার থেকেই এই সার্বজনীন পুজোর সূচনা। কলকাতার অন্যতম জনবসতিপূর্ণ বালিগঞ্জে শিক্ষিত, রুচিশীল বাঙালির বাস, সুনীতি চট্টোপাধ্যায় থেকে নবনীতা দেবসেনের আস্তানা ও কৌলিন্য সর্বজনবিদিত।
এরকম পরিবেশে লেকভিউ ও লেক রোডের সংযোগস্থলে শ্রী কালিদাস মুখোপাধ্যায়ের বাড়ির সামনে জনা কয়েক তরুণ যুবক নিয়মিত মিলিত হতেন প্রাকৃতিক বিপর্যয় বা পাড়ার সমস্যা সমাধানের উদ্দেশ্যে। স্বাধীনতার প্রাক্কালে দাঙ্গাবিধ্বস্ত পরিস্থিতিতে 'ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল অ্যাম্বুলেন্স ক্রপ'-এর তত্ত্বাবধানে সেইসব তরুণ যুবা ঝাঁপিয়ে পড়লেন পাড়ার মানুষের সাহায্যের জন্য। অধ্যাপক ধ্রুব দত্ত ও অন্যান্য বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষের গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শে ভর দিয়ে সামাজিক কর্মকাণ্ডের অংশীদার হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ল চতুর্দিকে।
এল সোশ্যাল সার্ভিস সেন্টারের পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতাস্বরূপ বার্তা, এলাকার প্রথিতযশা মানুষের আশীর্বাদ বর্ষিত হল তরুণ তুর্কিদের ওপর। বিশ্ববরেণ্য বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা, নেতাজীর আদরের মেজদাদা শরৎচন্দ্র, নেতাজীর স্নেহধন্যা লীলা রায় থেকে প্রখ্যাত ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকার — সকলেই অকুন্ঠ চিত্তে জনসেবামূলক কর্মকান্ডের জন্য উৎসাহিত করলেন। লীলা রায় তারাদাস দত্তের বাড়িতে এলাকার উৎসাহী যুবকদের সাথে মিলিত হলেন, পরামর্শ দিলেন ক্লাব গঠনের মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে সামাজিক প্রচেষ্টায় অংশীদার হওয়ার। সেভাবেই সৃষ্টি হল 'সমাজসেবী'।
এলাকাবাসীর মধ্যে একাত্মতা, সম্প্রীতি, আনন্দের বার্তা ছড়িয়ে দিতে শুরু হল দশভুজার আরাধনা। 'বিবিধের মাঝে মিলন মহান' এই মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ হয়ে পথচলা শুরু, দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে সার্বজনীন দুর্গোৎসব আজ ৮০ বছরে পদার্পণ করেছে। ক্যালকাটা কেমিক্যালের কর্ণধার বীরেন্দ্র মৈত্র, ধীরেন্দ্রনাথ বোস, লাদুরাম খৈতানের হাত ধরে যে সংগঠনের সূচনা, লম্বা সফর পেরিয়ে এই সংগঠনের দায়িত্ব আজ অরিজিৎ মৈত্রের কাঁধে, যিনি বীরেন্দ্র মৈত্রের পৌত্র।
প্রখ্যাত পন্ডিত কালিদাস নাগ, অমূল্য রতন মুখোপাধ্যায়, সুযোগ্য পুত্র স্বনামধন্য ক্রিকেটার রাজু মুখোপাধ্যায়, আরেক দিকপাল ক্রিকেটার গোপাল বোস ও তাঁর পরিবারবর্গ প্রমুখ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের বাস এই অঞ্চলে। এঁদের পরামর্শ, সাহচর্যে ও উজ্জ্বল উপস্থিতিতে চারাগাছ থেকে বটবৃক্ষের আকার নিয়েছে 'সমাজসেবী'।
১৯৬৯ নাগাদ পর্যটন মন্ত্রক কর্তৃক দুর্গাপুজোর পুরস্কার প্রদান শুরু হয়। সেবছর সমাজসেবী দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে রৌপ্যপদক লাভ করে। এরপর বিগত কয়েক দশকে নান্দনিক সৌন্দর্য ও অভিনবত্বের নজির স্থাপন করেছে সমাজসেবী। ২০১৭ থেকে থিম পুজোর সূত্রপাত। ২০১৯ এবং ২০২০ — পরপর দুবছর এশিয়ান পেইন্টস শ্রেষ্ঠ পুজো হিসেবে সমাজসেবী পুরস্কৃত হয়।
পুজোর মাইলফলক ছুঁয়ে ফেলা সমাজসেবীর এবছরের ভাবনা 'পথের পাঁচালী'। অপু-দুর্গার খুনসুটি বা রেললাইন, কাশফুল হয়তো নেই, তবে ফ্ল্যাশব্যাকে ছুঁয়ে দেখা 'পুরানো সেই দিনের কথা'। গুণী শিল্পী, পুরনো সৈনিক প্রদীপ দাসের কাঁধে ন্যস্ত সৃজনশীলতার গুরুদায়িত্ব। প্রিন্টিং মেশিন থেকে পুরনো সংবাদপত্র, দাঙ্গার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে শামিল হওয়া এলাকাবাসীর বারান্দা — সবকিছু জীবন্ত হয়ে উঠছে মন্ডপে। এক লহমায় টাইম মেশিনে চেপে ফিরে যাওয়া জাতপাতের আগুনে দগ্ধ, জীর্ণ বাংলার গল্পে, যার সাথে জড়িয়ে আছে স্বাধীনতার লড়াই।
এককালে সমাজসেবীর পূজা প্রাঙ্গণে যাত্রাপালা হত। পরবর্তীতে সমাজসেবীর সভ্য-সদস্যদের সক্রিয় অংশগ্রহণে পুজোর পরে নাটক মঞ্চস্থ হত। বর্তমান সময়েও সংস্কৃতিমনা সদস্যরা সেই রেওয়াজ বজায় রেখেছেন, সুস্থ সমাজের লক্ষ্যে ইতিবাচক পরম্পরা এগিয়ে নিয়ে চলছেন।
বালিগঞ্জ কালচারাল অ্যাসোসিয়েশনের প্ল্যাটিনাম জুবিলী
এবার চলুন যাওয়া যাক লেকভিউ রোডের বালিগঞ্জ কালচারাল অ্যাসোসিয়েশনের মন্ডপে। প্ল্যাটিনাম জুবিলী বর্ষে ভাবনা 'প্রথা'— শিল্পসৃষ্টির দায়িত্বে বিশিষ্ট শিল্পী সুশান্ত শিবাণী পাল। সাম্প্রতিককালে 'কথাবলী' থেকে 'আরশিনগর', বিভিন্ন চমকপ্রদ শিল্প নৈপুণ্যে কালচারালের মন্ডপ সেজে উঠেছে। এবার সেই প্রাঙ্গণে নতুনত্বের মধ্যে দিয়ে পুরনো শেকড়ের সন্ধান, বিশ্বায়ন ও চিরাচরিত ধারার সংমিশ্রণে অদ্ভুত নস্টালজিয়া।
যে সংগঠনের নামের মধ্যে 'কালচারাল' লুকিয়ে আছে, সেই সংস্থার উৎকৃষ্ট সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল থাকবে তা বলাই বাহুল্য। কিংবদন্তি শিল্পী শ্যামল মিত্র এই পুজোর অন্যতম পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। যুগলস্-এর দোকানে অভিনব মিষ্টির সম্ভার চেখে দেখার পরে লেকভিউ রোডে পা বাড়ালেই আজ প্রচুর বাড়িঘর, ফ্ল্যাট, আলতামিরা আর্ট গ্যালারি — আরও কতকিছু।
এই পুজোর সূচনালগ্নে এই রাস্তায় তুলনামূলক কম চাকচিক্য ছিল। একটি মাঠের মধ্যে পুজোর সূচনা — যেটি আজ কালের নিয়মে অবলুপ্ত। মূলত সিনহা পরিবার ও বসু পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমে এই দুর্গাপুজোর সূত্রপাত, পরবর্তীতে এলাকাবাসীর সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে যার বিস্তার ঘটে। সনাতনী সাবেকি প্রতিমা থেকে থিমের আতিশয্য, সবকিছুতেই নতুনত্বের দরুন বালিগঞ্জ কালচারাল কলকাতার পুজো মানচিত্রে এক অনন্য আসন লাভ করেছে।
১৯৭৫ সালে রজতজয়ন্তী বর্ষ উদযাপিত হয় সাড়ম্বরে; সুবর্ণজয়ন্তী তে বালিগঞ্জ কালচারাল পুজো মন্ডপ সেজে উঠেছিল জমিদার বাড়ির আদলে। ১৯৭৫ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্য সম্প্রচার দপ্তরের আয়োজিত পুজোর পুরস্কারের প্রথম স্থান অর্জন, ১৯৭৬ সালে উপর্যুপরি দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে বালিগঞ্জ কালচারাল অ্যাসোসিয়েশন। এছাড়াও ক্লাবের মুকুটে বহু সংস্থার সম্মাননা জুড়ে রয়েছে।
এই পুজোর প্রাঙ্গণে যাত্রাপালা দেখানো হত, বহু কিংবদন্তি মানুষ এখানে সংগীত পরিবেশন করেছেন। স্বর্ণযুগের হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মান্না দে, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, আশা ভোঁসলে থেকে পরবর্তীতে কবিতা কৃষ্ণমূর্তি, অভিজিৎ ভট্টাচার্য, অনুপম রায় — কত খ্যাতনামা শিল্পীদের উপস্থিতিতে ঋদ্ধ হয়েছে লেকভিউ রোড ও অধুনা দেবব্রত বিশ্বাস সরণী সংলগ্ন চত্বর।
পুরনো ঐতিহ্য পরম্পরা বজায় রেখে আজও এই পুজোর শোভাযাত্রার ক্ষেত্রে সাদা ধুতি-পাঞ্জাবিতে শোভিত পুরুষদের সাথে লাল পাড়ের সাদা শাড়িতে প্রমীলা বাহিনীর সক্রিয় অংশগ্রহণ বিশেষ আকর্ষণ। মনোগ্রাহী কবিপ্রণামের অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে বছরব্যাপী বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড — সবমিলিয়ে সৃষ্টি ও কৃষ্টির বোঝাপড়ার মধ্যে দিয়ে এই পাড়া সারাক্ষণ গমগম করছে। কল্লোলিনী কলকাতার প্রাণের স্পন্দন অনুভব করা যায় এই পাড়ায়।
শর্মিলা ঠাকুর থেকে বিদ্যা বালান — রুপোলি পর্দার অভিনেত্রীদের শুটিংয়ের জন্য এই পাড়ায় আগমন। মহানায়ক উত্তমকুমার, সত্যজিৎ রায়, চুনীবালা দেবী (ইন্দির ঠাকুরণ) প্রমুখের পদধূলিধন্য এই পুজোর সাথে বিগত কয়েক দশকে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছেন রণদেব বসু, সাহেব চট্টোপাধ্যায়ের মতো সেলিব্রেটি। টলিপাড়া থেকে ময়দানের বহু নামী ব্যক্তিত্বের পুজোয় অবশ্যম্ভাবী গন্তব্য থাকে বালিগঞ্জ কালচারালের মন্ডপ।
কৌলিন্য, চাকচিক্যময় নান্দনিকতার পাশাপাশি সাবেকি মাতৃ আরাধনার এই মহৎ প্রয়াসে তরুণ ব্রিগেড আজ সক্রিয়ভাবে ময়দানে হাজির। তবু তাদেরকে পরামর্শ দেওয়ার অজুহাতে বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্যদেরও অতি সক্রিয় হয়ে ওঠা এক মনোমুগ্ধকর বার্তা বহন করে। অমিতাভ সিনহার সুদক্ষ নেতৃত্বে, যুগ্ম সম্পাদক অঞ্জন উকিল ও ডঃ সপ্তর্ষি বসুর প্রাণোচ্ছল উদ্দীপনায় ভর করে বালিগঞ্জ কালচারাল আজ প্ল্যাটিনাম জুবিলী শারদোৎসবের মাহেন্দ্রক্ষণে দাঁড়িয়ে, ঢাকের তালে দেবীর বোধন হওয়া সময়ের অপেক্ষা।
২০২৫-এর গোড়ায় নজরুল মঞ্চে জমকালো অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বালিগঞ্জ কালচারাল অ্যাসোসিয়েশন নিজেদের প্ল্যাটিনাম জুবিলী উদযাপনের সূচনা করেছে। এই সময়ের খ্যাতনামা জুটি সৌরেন্দ্র-সৌম্যজিতের মন মাতানো পারফরমেন্সের পরে মঞ্চে হাজির ছিলেন সেনিয়া বঙ্গাশ ঘরানার জীবন্ত কিংবদন্তি উস্তাদ আমজাদ আলি খান, সাথে যোগ্য উত্তরসূরি আমান ও আয়ান, পৌত্রদ্বয় জোহান ও আবির। মন্দ্র সপ্তকের মাধ্যমে যে সুর সেদিন বাঁধা হয়েছিল, সেই সুরেরই প্রতিধ্বনি প্রস্ফুটিত হচ্ছে আজ 'প্রথা' শীর্ষক উপস্থাপনায়।
আভিজাত্য, ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মিশেলে সৃষ্ট এই থিম অবশ্যই দর্শকদের আলোড়িত করবে। এভাবেই লেক রোড সংলগ্ন দুই বড়ো ক্লাব অদৃশ্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও পারস্পরিক বন্ধুত্বপূর্ণ সহাবস্থানের নজির রেখে এগিয়ে যাবে।
লেখক সুচিত্রা মিত্রের 'রবিতীর্থে'র প্রাক্তনী। একসময় সরোদের তালিম নিয়েছেন পন্ডিত বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত ও তাঁর পুত্রের ছত্রচ্ছায়ায়। পেশায় গণিতের অধ্যাপনার সাথে যুক্ত। পাশাপাশি বিভিন্ন বিষয় নিয়ে টুকটাক লেখালেখি করেন পত্রপত্রিকায়। ক্রিপ্টোগ্রাফি, সাইবার সিকিউরিটি এবং ফুটবল তাঁর অন্যতম পছন্দের বিষয়।