Go to Bangali.Network
Go to Bangali.Network



লেখা পাঠান


আমাদের কথা
Contests

উদ্যোগ
Web Magazine


উদ্যোগ Web Magazine
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
রাতের নদীতে দেবীর ছায়া, স্বপ্নে মনোবিশ্লেষণ
রাতের নদীতে দেবীর ছায়া, স্বপ্নে মনোবিশ্লেষণ

দুর্গা আমাদের কাছে এক অনন্ত চিত্র: মাটির প্রতিমায় মাতৃমূর্তি, ঢাকের শব্দে উল্লাস, নদীর জলে বিসর্জনের শূন্যতা। কিন্তু এই চিত্র আসলে কি কেবল ধর্মীয়? নাকি আমাদের অবচেতনের গভীরে থাকা এক মানসিক প্রতীক? দেবী দুর্গা যদি মিথের দেবী হন, তবে তিনি একইসঙ্গে সাইকোঅ্যানালিসিসের দেবীও — অবচেতনের আলো-ছায়ার নাটক, যা প্রতি বছর নতুনভাবে মঞ্চস্থ হয়।

ফ্রয়েড বলেছিলেন, মানুষের অবচেতন আসলে দমিত বাসনার ভাণ্ডার। মায়ের রূপ সেখানে কেন্দ্রীয়। শিশুর কাছে মা একদিকে আদরের আশ্রয়, অন্যদিকে ভয়ের উৎস। দুর্গা সেই দ্বৈত রূপেরই সাংস্কৃতিক প্রতিফলন। তিনি মা, যিনি স্নেহময়ী; তিনি আবার মহিষাসুরবধকারিণী, যিনি কঠোর। ফ্রয়েডীয় চোখে দুর্গা আমাদের ভেতরের মায়ের দ্বন্দ্ব: আকর্ষণ আর ভয়, স্নেহ আর দমন। ওডিপাস কমপ্লেক্সের ছায়ায় দাঁড়িয়ে তিনি একইসঙ্গে অভয় আর ভীতি।

কিন্তু জুং বললেন, অবচেতন কেবল ব্যক্তিগত নয়, সমষ্টিগতও। 'collective unconscious'-এ জন্ম নেয় archetype — প্রাচীন প্রতীক, যা সকল মানুষের মনে প্রতিধ্বনিত হয়। Great Mother archetype সেই প্রতীকের অন্যতম। দুর্গা সেই আর্কিটাইপের পূর্ণ রূপ। তিনি জীবনদাত্রী, আশ্রয়দাত্রী, আবার ধ্বংসকর্ত্রীও। শরৎকালের আকাশে তাঁর আগমন, নদীর জলে বিসর্জনের অশ্রুভেজা বিদায় — এই পুনরাবৃত্তি সমষ্টিগত অবচেতনের নাটক, যা সভ্যতার পর সভ্যতায় পুনর্লিখিত হয়। জুংয়ের ভাষায়, দুর্গা সেই চিরন্তন মাতৃপ্রতিমা, যিনি simultaneously nurturing এবং terrifying।

লাকাঁর আলোচনায় দেবী আরও জটিল। লাকাঁ বললেন, শিশুর জীবনে মা সবসময়ই থাকে এক অদ্ভুত অনুপস্থিতি। মায়ের পূর্ণ উপস্থিতি কখনো ধরা দেয় না; আমরা চিরকাল তাঁর পূর্ণ রূপ খুঁজি। দুর্গা সেই অনুপস্থিতিরই প্রতীক। তিনি আসেন, আবার ফিরে যান। তাঁর আগমন আনন্দ দেয়, বিদায় ফেলে যায় শূন্যতায়। তিনি সেই 'objet petit a' — হারানো বস্তু, যাকে আমরা সারাজীবন খুঁজি, অথচ পুরোপুরি পাই না। বিসর্জন তাই কেবল আচার নয়, মানসিক পুনরাভিনয়—অভাবের পুনর্লিখন।

তাহলে মহিষাসুর কে? ফ্রয়েডীয় দৃষ্টিতে তিনি দমনকৃত প্রবৃত্তি — কামনা, হিংসা, ক্ষুধা — যা সভ্যতার নিয়মে ঢেকে রাখা হয়। দেবী দুর্গা সেই দানবকে হত্যা করেন, আমাদের মানসিক ভারসাম্য ফিরিয়ে দেন। ঢাকের শব্দ, ভিড়ের উল্লাস, প্রতিমার জ্যোতি — এসব এক সম্মিলিত ট্রান্স তৈরি করে, যাকে বলা যায় ক্যাথারসিস। ফ্রয়েড বলেছিলেন, শিল্প ও ধর্ম অবচেতনের রূপান্তর। দুর্গাপুজো তাই এক সম্মিলিত মনোবিশ্লেষণ, যেখানে মানুষ নিজের দানবকে মারে প্রতীকীভাবে, আর অন্তরে খুঁজে পায় মুক্তি।

কিন্তু এই মুক্তি কি স্থায়ী? দেবী তো প্রতি বছর আসেন, আবার চলে যান। লাকাঁ বলবেন, এই পুনরাগমন সেই অভাবকেই টিকিয়ে রাখে। আমরা চাই দেবী থাকুন, অথচ তাঁকে হারানোই আমাদের অস্তিত্বের ছন্দ। বিসর্জনের কান্না আসলে সেই অনন্ত অনুপস্থিতির কান্না।

বাংলা সাহিত্যেও দেবী মায়ের এই প্রতীক খুঁজে পাওয়া যায়। শরৎচন্দ্রের উপন্যাসে মা মানে বশ্যতা আর দমন, রবীন্দ্রনাথের কবিতায় মা মানে স্নেহ আর ভয়, মহাশ্বেতা দেবীর রচনায় মা মানে সংগ্রামের প্রতীক। কবিদের কল্পনা ও ভাষা ধার নিয়ে বলা যায় — "আমি অনেক মায়ের ভিতর থেকে এক মায়ের খোঁজে বেরিয়েছি।" সেই এক মা কি দুর্গা নন? যিনি আমাদের চিরন্তন অনুপস্থিতির প্রতীক, যিনি আলো আর ছায়া মিলিয়ে আমাদের মানসিক প্রতিফলনে বেঁচে থাকেন?

মনোবিশ্লেষণ তাই বলে, দুর্গা আসলে আমাদের অন্তরের আয়না। ফ্রয়েড তাঁকে দেখবেন মায়ের দ্বন্দ্বে, জুং দেখবেন আর্কিটাইপে, লাকাঁ দেখবেন অভাবের প্রতীকে। তিনি একদিকে মা, অন্যদিকে দমনকারিণী। তিনি অবচেতনের দেবী, যিনি আমাদের দানবকে শাসন করেন। মহিষাসুর কেবল পৌরাণিক চরিত্র নয়, আমাদের দমনকৃত আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। প্রতিবার দেবীর হাতে তার বধ আসলে আমাদের নিজেদের ভেতরের অন্ধকারকে নিয়ন্ত্রণে আনার প্রতীকী প্রক্রিয়া।

তবু প্রশ্ন থেকে যায় — দেবীকে আমরা কি সত্যিই পাই? নাকি তাঁকে হারানোই আমাদের উৎসবের প্রাণ? লাকাঁর মতো মনে হয়, আমরা দেবীর ভেতর চিরকাল খুঁজি এক অনুপস্থিত রূপ, যিনি আমাদের পূর্ণ করবেন, অথচ যাঁকে আমরা পুরোপুরি কখনোই পাই না। বিসর্জন সেই অনুপস্থিতির নাটককে প্রতি বছর নতুন করে লিখে যায়।

অতএব দুর্গা সাইকোঅ্যানালিসিসের আলোকে কেবল পৌরাণিক দেবী নন, বরং অবচেতনের আলো-ছায়ার প্রতীক। তিনি ফ্রয়েডের মায়ের দ্বন্দ্ব, জুং-এর মাতৃআর্কিটাইপ, লাকাঁর objet petit a। তিনি আলো আর ভয়ের মিশ্রণ, স্নেহ আর দমন, অনন্ত অভাব আর মুক্তির স্বপ্ন।

শেষ পর্যন্ত দুর্গাপুজো আসলে এক সম্মিলিত থেরাপি, যেখানে মানুষ নিজের ভেতরের দানবকে হত্যা করে, আবার নিজের ভেতরের শূন্যতাকে মেনে নেয়। নদীর জলে প্রতিমার প্রতিফলন, বিসর্জনের স্রোত, ঢাকের শব্দ — এসবই আসলে অবচেতনের খেলা। দুর্গা আমাদের মনে বেঁচে থাকেন রাতের নদীতে ছায়ার মতো, স্বপ্নে মনোবিশ্লেষণের মতো।




আপনি কি লিখতে ভালোবাসেন?

‘উদ্যোগ’ ওয়েব ম্যাগাজিনের এপ্রিল সংখ্যা ❛নববর্ষ ১৪৩৩❜ প্রকাশিত হবে ১৫ এপ্রিল। ওয়েবসাইটে ঘোষিত বিভাগগুলি থেকে আপনার পছন্দের বিষয়ে লেখা পাঠান ১০ই এপ্রিলের মধ্যে। লেখা পাঠানোর আগে অতি অবশ্যই শর্তাবলী পড়ুন। নির্বাচিত লেখাগুলি লেখক / লেখিকার ছবি ও সংক্ষিপ্ত পরিচিতিসহ Bangali.Network ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হবে, এবং ১২ জন পর্যন্ত লেখক / লেখিকা পাবেন 'মাসের সেরা কলম' সম্মান। বিশদে জানতে ও আপনার লেখা পাঠাতে এখানে ক্লিক করুন

পৃষ্ঠা

ডিসক্লেইমার : লেখা, মতামত, মন্তব্য বা সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সম্পূর্ণ দায়ভার তাঁদের উপরই বর্তায়। এই সমস্ত মতামত Bangali Network-এর নিজস্ব মতামত, অবস্থান বা নীতির প্রতিফলন নাও হতে পারে। লেখক পরিচিতিতে প্রদত্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণ অনুযায়ী প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

ডিসক্লেইমার : লেখা, মতামত, মন্তব্য বা সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সম্পূর্ণ দায়ভার তাঁদের উপরই বর্তায়। এই সমস্ত মতামত Bangali Network-এর নিজস্ব মতামত, অবস্থান বা নীতির প্রতিফলন নাও হতে পারে। লেখক পরিচিতিতে প্রদত্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণ অনুযায়ী প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

ভালো লাগলে ভালোবাসা দিন
অপছন্দ হলে পরামর্শ দিন
মতামত জানাতে মন্তব্য করুন
2.8 9 ভোট
স্টার
guest
1 কমেন্ট
নতুন থেকে পুরোনো
পুরোনো থেকে নতুন ভোটসংখ্যা অনুসারে
ইনলাইন প্রতিক্রিয়া
সকল কমেন্ট দেখুন
ফেসবুক পেজ
Udyog Bengali Web Magazine by Bangali Network

বিভিন্ন বিষয় থেকে বেছে নিয়ে লেখা পড়ুন

    বিভিন্ন সংখ্যায় প্রকাশিত হওয়া লেখা পড়ুন

    মাসিক সংখ্যাগুলি দেখুন
    Scroll to Top