সেই ছোট্ট থেকে একটা মানুষের উজ্জ্বল উপস্থিতি। তার নানান গন্ধে-বর্ণে-রূপে ধরা দেওয়া এই জগত সংসারে। কিছু ভালবাসার মুহূর্ত, কিছু দুঃখের রেশ, কিছু চোখের জল, কিছু আবেগপ্রবণ মূহূর্ত ― এসবেরই সংমিশ্রণে গড়ে ওঠে একের সঙ্গে অপরের সম্পর্কের এক অদেখা বাঁধন। ঠিক যেন গানের সুরের মতোই, প্রাণোজ্জ্বল গাথা-মালায় সেই সম্পর্কের বাঁধন গড়ে ওঠে।
সেই বাঁধনের তার ছিন্ন করে যখন একজনের যাবার সময় চলে আসে, তখন কেমন অনুভূতি হয় মনের মাঝে? সময় বড় বিচিত্র! আজ আছে, কাল সে নেই। জীবনকে ধরার চেষ্টা আমরা করেই চলেছি বারংবার। কিন্তু তাকে ধরবো কেমন করে? সে প্রশ্নের উত্তর তো কেউ দিচ্ছে না!
সময়ের রহস্য ও মানব অস্তিত্ব
কি আজব এই সৃষ্টি! কি আজব এই পৃথিবী! আমরা সবাই নামধারী এক জীব—মানুষ। যার আছে অগাধ বুদ্ধি, সবথেকে বেশি এই পৃথিবীতে। এমন একটা কথা আছে না, যে তার ক্ষমতা বলে নাকি সবকিছু ধ্বংস করে দিতে পারে? যে স্বয়ং সৃষ্টিকর্তাকে চ্যালেঞ্জ করে এবং নিজেই সৃষ্টিকর্তা রূপে অবতীর্ণ হয়।
কিন্তু একটা প্রশ্ন বারে-বারে থেকেই যায় না কি, সময়-কে নিয়ে? সময়-কে, সত্যি কি ধরে রাখা যায়? তার মুহূর্তে খসে যাওয়া, তার মুহূর্তেই হারিয়ে যাওয়ার যে ইতিবৃত্তের উপাখ্যান, তা যে বড়ই ক্ষণস্থায়ী! তেমনই এক ইতিহাসের কাহিনী বারবার সামনে আসে।
ব্রিটিশ শাসনের শোষণ
একদা যে ভারতে, সমগ্র বিশ্বের মোট দেশীয় পণ্য (জিডিপি)-র ১/৩ ভাগেরও বেশি ছিল, সেখানে ইংরেজ রাজত্ব শেষে তা দাঁড়ায় ৪ শতাংশেরও কম। তাহলে বোঝাই যায় ভারতকে তারা শুধু নানাভাবে শোষণ করেনি, একেবারে নিঃস্ব করেছিল। এ দেশ তার প্রাচীন ঐশ্বর্য, প্রতিপত্তি, মান খুইয়ে সর্বহারায় পতিত হয়েছে; আর ইংরেজ নিজেকে ঈশ্বর রূপে প্রতিপন্ন করেছে।
সেই প্রতিষ্ঠার মাঝে যে কতটা শোষণ, নির্যাতন, নিপীড়নের কাহিনী জড়িত আছে ― তা যারা ভুক্তভোগী তারাই বোঝে। আমাদের আত্মার মধ্যে সেই অত্যাচারের ছিটেফোঁটা কি এখনও লেগে নেই? নিজের অন্তরের কাছে তুমি এ প্রশ্ন করে দেখো। উত্তর তুমি নিজে থেকেই পেয়ে যাবে।
অর্থনীতি, শিল্প ও সাধারণ মানুষের দুর্দশা
ব্রিটিশরা আমাদের উৎপাদিত দেশীয় প্রতিটা পণ্যের তথা শিল্পের উপর ক্রমাগত অত্যধিক হারে করের পরিমাণ বাড়িয়েছিল—তা সে ধান, তাঁত, স্টিল, সোনা, রূপা, এমন কী খনিজের উপরও হোক। তার ফলে রাতারাতি সাধারণ দেশবাসী বঞ্চনার শিকার হয়ে দীন থেকে আরও হীনতর হয়ে পড়ল!
চারিদিকে অনাহার, ক্রন্দনহীন হাহাকারের যে বেদনাময় অর্থ ফুটে উঠেছিল মানুষের শিরায় শিরায়, তা অদৃষ্টের খাতা-কলমে লেখা রয়ে গেল ― মানুষকে নিঃস্ব, একেবারে নিঃস্ব করার মধ্য দিয়ে। তার মূল্য কে দেবে?
সৈন্যদের আত্মদান ও অবমূল্যায়ন
অপর দিকে, আমাদের সৈন্যদের প্রাণ নিয়েও ছিনিমিনি খেলেছিল নিজের স্বার্থে; ব্রিটিশরা। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তাদের হয়ে লড়াই-এ প্রাণ দেওয়া সৈন্যের সংখ্যা ১৫ লক্ষেরও বেশি। কিন্তু, হায়! আমাদের এই আনুগত্য ও ত্যাগের কোনো মূল্য ছিল কি তাদের কাছে?
এখানে লড়াইটা কি শুধুই অস্তিত্বের? ―না! অস্তিত্বের থেকেও বেশি; 'মানবতার'। মানুষ হিসেবে বাঁচবার অধিকারের।
সমাজব্যবস্থা ও শিক্ষার ধ্বংস
আমাদের সমাজের প্রতিটা স্তরের বুনিয়াদি গঠনকে ধরে ধরে খুবই systematic পদ্ধতিতে ধ্বংস করেছে ইংরেজরা। তা সে আমাদের প্রাচীন সমৃদ্ধশালী শিক্ষাব্যবস্থা; যা ভারতের গৌরবময় অধ্যায়কে তুলে ধরেছিল এক সময় বিশ্ব দরবারে। বা ঐশ্বর্যশালী অর্থনীতি, ঐতিহ্যময় সংস্কৃতি, জাতিতে জাতিতে সৌভ্রাতৃত্ব বোধ ― প্রতিটা জিনিসই নিয়েছে তারা কেড়ে।
আর তার বদলে উপহার স্বরূপ দিয়েছে একটা কঙ্কালসার জীর্ণ সমাজ। যেখানে বোধের থেকে আনুগত্যের মূল্য বেশি! যে সমাজে নেই চাল, নেই চুলো। যে সমাজে জাতিতে-জাতিতে শুধুই বিবাদ ও যুদ্ধ। যে সমাজে সংস্কৃতি হবে পরের নয় কো নিজের। যে সমাজ উদ্দেশ্যহীন ভাবে খুঁজে যাবে উদ্দেশ্য। যে সমাজে মানুষের গায়ের রঙের মূল্য মনুষ্যত্বের থেকেও বেশি! এমনই এক ভয়াবহ বাস্তবতার সামনে এসে দাঁড়ানো, হায়।
সর্বশক্তিমান হওয়ার ভ্রম
আমার প্রশ্ন: আমরা মানুষ বলে যা খুশি তাই করতে পারি নিজের ইচ্ছে মত? আমরা কি সর্বশক্তিমান? একদল মানুষ আছে যারা মনে করে তারা মানুষ হিসাবে অপরাজেয়, পৃথিবীতে এমন কিছু নেই যা তারা জয় করতে পারে না।
কিন্তু সত্যিই কি তাই? ―না। তারা তাদের শক্তি প্রদর্শনে কেবলই ধ্বংস করে চলে; তা সে প্রকৃতির আদিমতা, সৌন্দর্য থেকে শুরু করে মানুষের মানবতা প্রতিটা জিনিসই রয়েছে তাতে! তবু দিনশেষে আমরা তাদেরই নজর কাড়তে চাই! এ এক ভয়াবহ দৈন্যতা।
সভ্যতার পতন ও সময়ের শক্তি
অতীতের চাবিকাঠির তুমি সেই বন্ধ করা দরজার 'অনাগত ইতিহাসের চিত্র'। সেই অতীতকেই খুব ভালভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, 'অতীত' যে অন্য কথা বলছে। আদিম সময় থেকে এখনও পর্যন্ত, প্রতি সভ্যতাই তার শেষের সাক্ষ্য হয়েছে।
তার কারণ, মানুষের থেকেও এক বড়ো শক্তি এই মহাবিশ্বে বিরাজমান। "যিনি" সময় মত তাঁর শক্তি প্রদর্শনে কখনও পিছপা হন না। তাঁর নিয়মের কাছে সবাই পরাজিত, কারণ তিনি কখনও জাতি-অর্থ-শক্তি-কে দাখিল করেন না বিচারের ক্ষেত্রে। তার কাছে সবাই সমান। কেউ তাঁকে থামাতে পারে না। তিনি যে অপ্রতিরোধ্য।
সময়ের সত্য ও উপসংহার
সভ্যতার বিবর্তনে, সময়ের ইতিহাস আমাদের নিঃশব্দে সেই সত্য কথাই বলে চলে বারে বারে। আমরাই অজ্ঞ তা বুঝেও বুঝিনা, হায়! 'এই জগতে যার শুরু আছে; তা সে যতই শক্তিশালী হোক না কেন, তার শেষও আছে।'
সময়... আমরা তাকে দেখতে পাইনে, ছুঁতেও পারিনে, তবুও তার উপস্থিতি জীবনের প্রতিটি নিঃশ্বাসে, প্রতিটি স্পন্দনে, প্রতিটি চোখের পলকে রয়েছে। মানুষের অস্তিত্ব যেন সময়ের পথেই খোদাই করা এক উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি ― যা গড়ে ওঠে মুহূর্তের পর মুহূর্তের, অভিজ্ঞতার স্তরে স্তরে।
যদি বলতে হয় গানের সঙ্গে সময়ের সম্পর্ক কোথায়, তাহলে বলতে হয়, গানের সুরের মতোই সময় বয়ে যায় ― কখনো প্রাণময় উচ্ছ্বাসে, কখনো গভীর বিষণ্ণতায়। সময়ের অদ্ভুত দিক হলো — সে একইসঙ্গে স্রষ্টা আবার বিধ্বংসী।
সে জন্ম দেয় নতুন দিনের, নতুন সম্পর্কের, নতুন স্বপ্নের। আবার একই সাথে কেড়ে নেয় যৌবন, ভেঙে দেয় সম্পর্ক, নিভিয়ে দেয় স্বপ্ন। সে আমাদের শেখায় ― সবকিছুই ক্ষণস্থায়ী, আর সেই ক্ষণস্থায়ী সৌন্দর্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে জীবনের সকল সত্য, যা তোমাকে বুঝে নিতে হবে।
কারণ সময়ই একমাত্র সত্য, যা কখনও মিথ্যে হয় না, কখনও থামে না, আর কখনও ফিরে আসে না।
সেই সময় নামক কালপ্রবাহকে, কি আজও মানুষরূপী ভগবান করায়ত্ত করতে পেরেছে? উত্তরে বলতে হয় না। তা এখনও পেরে ওঠেনি। তাই তারা এখনও মানুষই রয়ে গেছে।
ভগবান হয়ে ওঠা এখনো হয়নি! দেখা যাক আগামীতে তা হয় কিনা।