জগন্নাথ দেখি প্রভুর প্রেমাবেশ হৈলো।
কম্প স্বেদ পুলকাশ্রু শরীর ভাসিল।।
পবিত্র তীর্থক্ষেত্র পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে বিরাজমান শ্রীকৃষ্ণ, বলরাম ও সুভদ্রার হস্ত-পদবর্জিত অসম্পূর্ণ কায়ার নিমকাষ্ঠে নির্মিত বিগ্রহটি সম্পর্কে ভক্তহদয়ে কৌতূহলের উদ্রেক হওয়া খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। এই মূর্তিটি অবলোকন করে জনসাধারণের মনে দুটি প্রশ্ন জন্ম নেয় — এক, ভ্রাতা-ভগ্নীত্রয়ীর বিচিত্র ধরনের অবয়বের প্রতিকৃতির পশ্চাতে কী রহস্য কথা সংগুপ্ত রয়েছে? দুই, শ্রীকৃষ্ণ সর্বত্র শ্রীরাধার সঙ্গে দৃষ্টিগোচর হলেও এখানে তিনি ভ্রাতা-ভগ্নির সঙ্গে বিদ্যমান, বিগ্রহ মধ্যে রাধারানীকে প্রত্যক্ষ করা যায়না কেন? মনলোকে উত্থিত হওয়া এই দুটি জিজ্ঞাসার ঔৎসুক্য নিবারণের জন্য পৌরাণিক আখ্যানের অমিয়সাগরে অবগাহন করতে হয়।
দ্বারকায় ঘটনার সূত্রপাত
পুরাণ কাহিনীর ঘটনাটি ঘটেছিল শ্রীকৃষ্ণের রাজধানী দ্বারকায়। রাজ অন্তঃপুরে তখন রুক্মিণী রাজরানী রূপে দ্বারকাপতির সঙ্গে প্রতিদিন একই শয্যাতে মধুযামিনী যাপন করে চলেছেন। একদিন রাত্রিকালে হঠাৎ রুক্মিণীর নিদ্রাভঙ্গ হলে তিনি শ্রবণ করেন যে তাঁর পার্শ্বদেশে নিদ্রিত দ্বারকেশ ঘুমের মধ্যেই "রাধা-রাধা" বলে চলেছেন। প্রাণপ্রিয় স্বামীর মুখে অন্যনারী অর্থাৎ রাধানাম শ্রবণ করে রুক্মিণী বিস্ময়াপন্ন হয়ে গভীর চিন্তায় নিমগ্ন হয়ে পড়েন। রুক্মিণী ভেবেই পান না যে, তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে স্বামী সেবা করে চলেছেন, তনু-মন যথা সর্বস্ব তাঁর শ্রীচরণে সমর্পণ করে দিয়েছেন, কেশবকে অদেয় তাঁর কিছুই নেই — এহেন আন্তরিক প্রেম ভালবাসা ও সেবা লাভ করবার পরও বাসুদেব কেন এখনো পর্যন্ত শ্রীরাধাকে বিস্মৃত হতে পারেননি!
রুক্মিণী পরদিবস অপরাপর পাটরানীদের কাছে বিগত রজনীর ঘটনার কথা অভিব্যক্ত করলে তাঁরা সকলে মিলে মাতা রোহিনীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবার সিদ্ধান্ত নিয়ে বসেন। কারণ তাঁদের সকলেরই মনে এই ধারণা জন্ম নেয় যে, শ্রী কৃষ্ণের হৃদয় সিংহাসনে রাধারাণীর এখনো বিরাজিত থাকার গূুঢ় রহস্যটির কথা একমাত্র মাতার পক্ষেই বলা সম্ভবপর।
মাতা রোহিনী যে বৃন্দাবনে রাধাকৃষ্ণ রাসক্রীড়া বিষয়টি সম্পর্কে বিলক্ষণ অবগত ছিলেন সে কথা বলার অপেক্ষা রাখেনা। তা সত্ত্বেও প্রথমে তিনি পাটরানীদের কাছে কোনো মন্তব্য প্রকাশ না করার কথা মনে মনে স্থির করেন। কিন্তু রানীগণের বারংবার অনুরোধ উপেক্ষা করে নিজের সিদ্ধান্তে অবিচল থাকা রোহিণীর পক্ষে শেষ পর্যন্ত সম্ভব হয়নি। এক সময় তিনি এই শর্তে রাধাকৃষ্ণকথা শোনাতে সম্মত হন যে, যতক্ষণ পর্যন্ত তিনি বৃন্দাবনের সেই লীলার ব্যাখ্যান করবেন ততক্ষণ পর্যন্ত তাঁর কক্ষে যেন কেউ প্রবেশ না করে। এমনকি কৃষ্ণ-বলরামেরও সে সময় প্রবেশ নিষেধ।
রোহিনীর কড়ারে রানীগণ রাজি হয়ে যান এবং মাতার কক্ষমধ্যে যাতে কেউ প্রবেশ করতে না পারে তার জন্য সুভদ্রা দ্বারদেশে প্রহরীর দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। এরপর গৃহমধ্যে রোহিনী রাধাকৃষ্ণের বিচিত্র লীলাকথা বিবৃত করতে আরম্ভ করে দেন। এই অপূর্ব লীলাকাহিনী প্রারম্ভ হওয়ার ক্ষণকাল পরেই দ্বাররক্ষিণী সুভদ্রার দৃষ্টিগোচর হয় যে, কৃষ্ণ ও হলধর মাতার কক্ষের দিকেই আগতপ্রায়। তিনি দুই ভ্রাতাকে মাতার ঘরে প্রবেশ করা থেকে বিরত করতে প্রস্তুত হয়ে ওঠেন। ভ্রাতাদ্বয়ের মাতার কক্ষ দ্বারে আগমন ঘটলে সুভদ্রা নানা অছিলায় তাঁদের পথরোধ করে দাঁড়ান। অর্থাৎ মাতার গৃহদ্বারেই কৃষ্ণ, বলদেব এবং সুভদ্রা একত্রে দন্ডায়মান হয়ে পড়েন।
দেবত্রীণির অবচেতন রূপান্তর
এদিকে প্রকোষ্ঠের অভ্যন্তরে মাতা রোহিনী আপন মনে রাধাকৃষ্ণের অপূর্বলীলার বৃত্তান্ত পাটরানীদের শুনিয়েই চলেন। অপরদিকে মাতার এই বর্ণনা দ্বারদেশে দন্ডায়মান তিন ভ্রাতা-ভগ্নিরই কর্ণকুহরে স্পষ্টভাবে প্রবেশ করতে থাকে। রোহিনী এমন সুমধুর বচনে রাধাকৃষ্ণ লীলার বিবরণ দিয়ে চলেছিলেন যে তা শ্রবণ করতে করতে গৃহের বহির্ভাগের তিন শ্রোতা কৃষ্ণ-বলরাম-সুভদ্রা এইরূপ অবচেতন হয়ে পড়েন যে তাঁদের সকলেরই দেহ ধীরে ধীরে গলতে শুরু হয়ে যায়। এবং গলতে গলতে এক সময় এমন অবস্থা হয় যে, তিন জনারই হাত-পাগুলি বিলুপ্ত হয়ে পড়ে। শুধু তাই নয় শ্রীকৃষ্ণের হাতের গোল সুদর্শন চক্রটি গলে গিয়ে লম্বা আকার ধারণ করে নেয়।
কৃষ্ণ-বলরাম-সুভদ্রার যখন এইরূপ ভাববিহ্বল অবস্থা এবং গলে যাওয়া শারীরিক দশার সেই বিশেষ মুহূর্তে দেবর্ষি নারদের সে স্থলে অকস্মাৎ আবির্ভাব ঘটে যায়। তিনিও এই অলৌকিক রূপদর্শন করে বিস্ময়-বিহ্বল হয়ে পড়েন। কৃষ্ণ, বলরাম ও সুভদ্রা দেবর্ষির উপস্থিতি অবগত হয়ে অতিশীঘ্র নিজেদের স্বাভাবিক অবস্থায় প্রত্যাবর্তন করেন, যাতে নারদ তাঁদের সেই লোকাতীত রূপটি প্রত্যক্ষ করতে না পারেন। কিন্তু নারদের চোখকে ফাঁকি দিতে তাঁরা অকৃতকার্য হন। পলকের মধ্যেই দেবর্ষির সুতীক্ষ্ণ নয়নপটে সেই অত্যন্ত বিস্ময়কর রূপটি চিত্রিত হয়ে যায়।
কৃষ্ণ, বলরাম ও সুভদ্রার কাছে দেবর্ষি নারদ সবিনয় প্রার্থনা করে বসেন যে মুহূর্তপূর্বে যে অলৌকিক রূপ দৃষ্টিগোচর হল, সেই স্বরূপের দর্শন করবার সৌভাগ্য যেন কলিযুগের ভক্তবৃন্দেরও হয়ে থাকে। নারদের অনুরোধ উপেক্ষা করতে না পেরে তিন ভ্রাতা-ভগ্নিই দেবর্ষির ইচ্ছা পূরণে সম্মত হয়ে যান।
বিশ্বকর্মার অলৌকিকতা ও রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন
পরবর্তী সময়ে নারদের মনোবাসনা পূর্ণ করবার জন্য ভগবান নীলাঞ্চলের পাশে সপরিবারে বসবাসকারী রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নকে মাধ্যম করেন। কথিত আছে রাজা সমুদ্রে এক বিশালকায় নিম্বকাষ্ঠ ভাসতে দেখতে পান। এক কাষ্ঠটি দেখা মাত্র রাজার মনে বিষ্ণুমূর্তি নির্মাণের বাসনা জাগ্রত হয়। রাজার মনোলোকে প্রতিকৃতি তৈরির ইচ্ছা হওয়া মাত্রই স্বয়ং বিশ্বকর্মা বৃদ্ধ ছুতারের ছদ্মভেসে নরপতির সম্মুখে এসে উপস্থিত হয়ে পড়েন। কিন্তু ছদ্মবেশধারী বিশ্বকর্মা প্রতিমা তৈরির জন্য রাজার কাছে শর্ত রাখেন যে তিনি যে কক্ষে মূর্তি নির্মাণকার্যে ব্রতী হবেন, সেখানে নির্মাণকার্য সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত কেউ প্রবেশ করতে পারবেন না।
রাজা ছদ্মবেশী ছুতারের কথায় সম্মত হয়ে যান। বর্তমানে যে স্থানে শ্রী জগন্নাথের মন্দিরটি বিরাজিত, তার পার্শ্বদেশে একটি কক্ষে দ্বাররুদ্ধ করে ছুতার মূর্তি নির্মাণের কাজ শুরু করে দেন। রাজপরিবারের কেউই জানতেন না যে, সমস্ত ঘটনায় দেবমহিমায় সংঘটিত হয়ে চলেছে, স্বয়ং বিশ্বকর্মা ছুতারের রূপধারন করে মূর্তি প্রস্তুত করতে এসেছেন। কিছুদিন অতিবাহিত হওয়ার পর মহারানীর মনে আশঙ্কা দেখা দেয় যে, দীর্ঘ দিন রুদ্ধদ্বারের অভ্যন্তরে থেকে ছুতারটি অভুক্ত অবস্থায় মারা যায় নি তো! রানীর আশঙ্কাতে যথেষ্ট যুক্তি রয়েছে দেখে মহারাজা সেই গৃহের দ্বার উন্মুক্ত করে দেন। কিন্তু সেখানে সেই ছুতারটির কোন সন্ধান পাওয়া যায় না। কেবলমাত্র শ্রীজগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলরামের অর্ধনির্মিত মূর্তিটিই প্রত্যক্ষ করা যায়।
রাজা ও রানি অসমাপ্ত বিগ্রহ খানি অবলোকন করে দুঃখে কাতর হয়ে পড়েন। কিন্তু তখনই আকাশ থেকে দৈববাণী ভেসে আসে — "অকারণ দুঃখ করে লাভ নেই, আমি এইরূপেই বিরাজিত হতে চাই, মূর্তিকে দ্রব্য ইত্যাদি দ্বারা পবিত্র করে স্থাপন করো।" রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন দৈববাণী শুনে পুলকিত হয়ে যথাবিহিত আচার-আচরণপূর্বক প্রতিমা স্থাপন করেন। সেই বিগ্রহটিরই দর্শন অভিলাষে অগণিত ভক্তবৃন্দের সমাগম মহাপবিত্র স্থল পুরীধামে যুগযুগ ধরে হয়ে চলেছে।
মহানন্দে লোকে করে জয় জয় ধ্বনি।
জয় জগন্নাথ বই আর নাহি শুনি।।