পরিবার সমাজবদ্ধ মানুষের প্রাথমিক গোষ্ঠী। পরিবার গঠন হয় নারী পুরুষের বিবাহ সম্পর্কের মাধ্যমে। ছেলেবেলা মেয়েবেলা পেরিয়ে ছেলেটা মেয়েটা নাম বদলে বর-কনে। চঞ্চল যৌবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানের নাম বিবাহ,আর সম্পর্কটার নাম দাম্পত্য। কিছুদিনের জন্য বর কনে হলেও এর প্রকৃত পরিচিতি "স্বামী স্ত্রী" হিসেবে নামাঙ্কিত হন। বিবাহিত সম্পর্ক স্থায়ী হলে সেই ছেলে মেয়েটির একসাথে এগিয়ে যাবার নাম দাম্পত্য জীবন। সমাজ চিনে নেয় স্বামী-স্ত্রী রূপে। বর্তমান সমাজে দাম্পত্যের মাধ্যমে যে পরিবার গঠন হয় তার স্থিতিশীলতা নিয়ে যথেষ্ঠ সন্দেহ থেকে যায়। এই পরিবার নামক ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর বন্ধন টেকসই করতে যে বোঝাপড়ার ভাবনা দরকার সেটা ধীরে ধীরে আবছা হয়ে আসছে, বাড়ছে বাঁধন ছেড়ার আইনি প্রক্রিয়া ডিভোর্স।
উনবিংশ শতাব্দী থেকে বিংশ শতাব্দীর দীর্ঘ সময় ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষ নারীজাগরণের কথা ভেবেছেন। সমাজ সংস্কারকগণ নারীশিক্ষা প্রসারে সচেষ্ট হয়েছেন। ধীরে ধীরে মেয়েদের শিক্ষার হার বৃদ্ধি পেয়েছে। আর্থিক দিক থেকে এগিয়েছে নারীজাতি। পুরুষ অনেকটাই চাপমুক্ত। তবে পরিবার ভেঙে সিঙ্গেল মাদার, বা সিঙ্গেল ফাদারের অতি ক্ষুদ্র পরিবার জন্ম নেয় কেন? ডিভোর্স গত ২০ বছরে প্রায় ৩গুণ বেড়েছে। ২০০৩ থেকে ২০০৫ বছরে গড়ে ৫০-৬০ হাজার মামলা হতো, ২০১০ এর পর বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লক্ষের বেশি। মেট্রো শহরগুলোর বিবাহবিচ্ছেদ দ্রুত বাড়ছে। বলা বাহুল্য আবেদন হয় স্ত্রী-পক্ষ থেকে বেশী। পশ্চিমা দেশগুলিতে বিচ্ছেদের হার অনেক বেশি, তবে বিগত ২০ বছরে বিচ্ছেদ দ্বিগুণ বেড়েছে।
এই বিচ্ছেদের কারণ হিসাবে দেখা যায় মেয়েদের স্বনির্ভর হয়ে ওঠা, তৃতীয় ব্যক্তির ইন্ধন, পরকীয়া, পশ্চিমী দেশের অনুকরণ, সিনেমা-সিরিয়ালের প্রভাব ইত্যাদি। একদিন যারা পথ চলতে কেউ কারোর হাত ছাড়ত না, কিছুদিনের মধ্যেই তারা বিপরীত স্রোতে বিছিন্ন হন। পরিবার গঠনের সূচনাতেই এই ভাঙনের বীজ থেকে যায়। সাজসজ্জা, ফটোশুট, উপহার, সোশ্যাল মিডিয়াতে পোস্টের বাহুল্য গ্রাস করছে বর্তমান প্রজন্মকে। প্রি-ওয়েডিং পোস্টে যে আগ্রহ তৈরি হয়, হানিমুন ট্রিপে আগ্রহী থাকলেও সম্পর্কের ভেতরে অন্তসারশুন্য। প্রতিযোগিতা জেগে ওঠে সম্পর্কের সূচনা থেকে। সন্তানপালনে কার অবদান বেশি সেখানেও পরিমাপ। দায়িত্বের ভাগাভাগি, দোষারোপ আর বিদ্বেষ ―এই ভাবেই চলে আসে আলাদা হবার ভাবনা। তাতে সামিল অভিভাবক, সহকর্মী প্রতিবেশী। একটি শান্ত ভদ্র পরিবার সমাজে একটি সুন্দর বার্তা দেয়, অপরদিকে একটি অশান্ত ঝগড়া ঝামেলা জর্জরিত পরিবার সমাজে একটি বিপরীত বার্তা দেয়। সুন্দর সমাজের জন্য চাই সুন্দর বার্তা ও সুন্দর পরিবেশ। আকাশ ছোয়া চাহিদা, প্রতিযোগিতা আর ঔদ্ধত্য শুরুতেই দাম্পত্য জীবনের স্থায়িতের চাবিকাঠি ছিনিয়ে নিচ্ছে।
দাম্পত্য জীবনের সাফল্যের মূল হলো বোঝাপড়া। মনোচিকিৎসক যে ভাবে দুটি মানুষের ভুলবোঝা বুঝি ভাঙতে দুজনকে একে অন্যের চেয়ারে বসিয়ে ভাবতে বলেন ঠিক সেভাবে ভাবতে শিখতে হবে। তৃতীয় ব্যক্তির প্রভাব থেকে মুক্ত হতে চরিত্রের বলিষ্ঠতা বজায় রাখা জরুরি। আমাদের সমাজের উত্তরসুরিদের কাছে সঠিক বার্তা পৌঁছাতে হলে কলহমূক্ত শান্ত পরিবার চাই। ভালো পরিবার সমাজকে দেবেন সচেতন দায়িত্ববান নাগরিক। বিছিন্ন পিতামাতার সন্তানের ভাবনা গোড়াতেই বিছিন্ন, স্বার্থপর হয়। মানিয়ে নেয়াকে মেনে নেয়া বলে না। বোঝাপরায় মানিয়ে নেয়ার মোলায়েম স্পর্শ ভালোবাসাকে গভীরতা দেয়। পেছনে ছেলের মা আর মেয়ের মায়েদের গদগদ ভাবে "আমার বাবু" আর "আমার মনা" বিষয়টা বন্ধ করলে ভালো হবে। পুরাতন দাম্পত্য জীবনের রাগ-অভিমান নিজেদের সন্তানের মাধ্যমে প্রতিশোধের চেষ্টা করতে গিয়ে নতুন দাম্পত্যের মাথা মোরানো বন্ধ হওয়া দরকার। দম্পতির জীবনে পরিবারের প্রভাব থাকবেই, কিন্তু গভীরতা না থাকলেই ভালো। নিম্নচাপের গভীরতা যেমন দুর্যোগ আনে, তেমনই ২ জনের মধ্যে পরিবার, কলিগ, বন্ধুর প্রভাব গভীর না হলেই ভালো। এখন পরিণত ২ টি মন উত্তরাধিকারিকে সুস্থ পরিবার উপহার দিলে শিশুর জন্য ভালো,সমাজের জন্যও ভালো। আর্থিক সমস্যা থাকলেও সমাধান মেলে কিন্তু সীমাহীন চাহিদা মেটাতে দাম্পত্য গুলিবিদ্ধ হয়। বর্তমানে গতানুগতিক পাঠক্রমে জীবনশৈলীর যে পাঠ ছেলে-মেয়েরা পায় তার মধ্যে চাহিদার বাস্তবতার পাঠ সংযুক্ত হোক। নিজেদের চেয়ে বেশি ভাবতে হবে সন্তানের কথা। আজকের কর্মফল অদূর ভবিষ্যতে যে ভয়ঙ্কর তার আন্দাজ করতে পারলেই অনেকটা বোঝাপড়া সম্ভব। হঠকারিতা আর একটি ব্যাধি বর্তমান দাম্পত্যে। পরিণত মগজ সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে পরবর্তী প্রজন্মের কথা ভাবলে তাঁদেরই সৃষ্টি গুলি কষ্ট পায়না। অযথাই অনাথ হয়না শিশুগুলি। পরবর্তী প্রজন্মের জন্য ঘরে ঘরে তৈরী হোক একটা বলিষ্ঠ চিন্তা ধারার দাম্পত্য সম্পর্ক।
দাম্পত্য সম্পর্কের উন্নতি করতে খোলামেলা আলোচনা প্রথম পদক্ষেপ। দ্বিতীয়ত, পৃথিবীতে সন্তান আনার আগে ডাক্তার দেখানো যেমন জরুরি তার দৈহিকভাবে সুস্থ জীবনের জন্য তেমনই প্রয়োজন মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে লক্ষ্য রেখে পিতামাতার সম্পর্কের বন্ধন ঠিক রাখা।উভয়ের ইচ্ছায় যে সন্তান পৃথিবীতে আসে তার দায়িত্ব নেবার মানসিক প্রস্তুতি দম্পতির নেয়া উচিত সন্তান ভুমিষ্ট হওয়ার আগেই। কোনোভাবেই যে দাম্পত্যে মতের মিল হয়না সেক্ষেত্রে সন্তান অবাঞ্ছিত হয়ে যায়, অবহেলার শিকার হওয়ার চেয়ে, সন্তানের জন্মের ভাবনা না থাকলেই ভালো।
দেশের পরবর্তী প্রজন্মের সুরক্ষায় এমন আইন আসুক যাতে ছোটো নিষ্পাপীদের ডিভোর্সই বাবামায়েরা তাদের স্নেহের অধিকারে সময়ে, প্রয়োজনে সন্তানের পাশে থাকতে বাধ্য থাকেন। সন্তান দম্পতির হলেও ওরাই দেশের ভবিষৎ ― তাই ওদের যত্ন নিতে সমাজ সচেতন হোক । কার দোষ সেটা নিয়ে তর্ক করতে গিয়ে অবহেলিত না হয়ে যায় নিষ্পাপ শিশুগুলি।