কোনো নির্দিষ্ট কবিতায় সরাসরি পৌঁছতে কবির নামের ওপর ক্লিক করুন —
ঘর
পাগল দার্শনিক
ইট, কাঠ আর পাথরের স্তূপকে আমরা ঘর বলে ভুল করি।
আসলে ঘর তৈরি হয় নিঃশ্বাসের উষ্ণতায়,
অভিমান মেশানো নীরবতায়,
আর সেই ভালোবাসায় —
যে ভালোবাসা দেয়াল মানে না, ছাদ মানে না,
যার ঠিকানা কেবল হৃদয়ের ভেতর।
ভালোবাসা যখন দিগন্ত ছাড়িয়ে যায়,
তখন সে আর ব্যক্তিগত থাকে না —
সে ছুঁয়ে ফেলে অচেনা বহু মানুষের অনুভূতির প্রান্তর।
কারও চোখে জল হয়ে ঝরে,
কারও বুকের গভীরে নীরব দীর্ঘশ্বাস হয়ে জমে থাকে।
এমন ভালোবাসাও আছে,
যারা পূর্ণতার দাবি করে না।
যারা জানে —
সব গল্পের শেষ হয় না,
সব ঘরের ছাদ থাকে না।
ভালোবাসার সেই প্রবল ঝড়ে
কখন যে ‘ঘর’ নামের বস্তুটি উড়ে যায়,
তা কেউ টেরও পায় না।
দেয়াল ভাঙে না শব্দে,
ভাঙে নিঃশব্দে —
স্মৃতির চাপে, না বলা কথার ভারে।
ভালোবাসা তখন এক উন্মুক্ত বিহঙ্গ,
সে উড়ে চলে আকাশ জুড়ে,
ডানায় বেঁধে নিয়ে যায়
অগণিত আবেগপ্রবণ হৃদয়।
কারও আশ্রয় হয় সেই উড়ান,
কারও নিঃস্বতার কারণ।
ভালোবাসা এক উন্মাদনা —
যার যুক্তি নেই, পরিমাপ নেই।
ভালোবাসা এক মাদকতা —
যার নেশায় পড়ে হৃদয় বারবার,
জেনেও যে এই নেশা
ঘর ভেঙে দিতে পারে,
তবু সে আবার ফিরতে চায় সেই আগুনের কাছে।
আর শেষে পড়ে থাকে —
একটা উড়ে যাওয়া ঘর,
যার ইট-পাথর নেই,
কিন্তু স্মৃতি আছে,
ভালোবাসা আছে,
আর আছে
অসীম আকাশের দিকে চেয়ে থাকা
একটা হৃদয়...
লেখক সমসাময়িক বাংলা সাহিত্যের এক স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর। কবিতা, গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধ রচনায় তিনি নির্মাণ করে চলেছেন নিজস্ব অনুভূতির ভুবন, যেখানে জীবনদর্শন, প্রেম, প্রকৃতি ও আধ্যাত্মিক ভাবনা এক অনন্য মেলবন্ধনে ধরা দেয়। পেশায় একজন সরকারি কর্মচারী হলেও অন্তর্লোকে তিনি নিরন্তর এক সাধক-লেখক। তাঁর ছদ্মনাম “পাগল দার্শনিক”— যা তাঁর সাহিত্যচিন্তারই প্রতিফলন: প্রশ্নমুখর, অনুভবনির্ভর এবং অস্তিত্বসন্ধানী।
শ্রীরামকৃষ্ণ আশীষ
সুদীপ ঘোষাল
অনন্ত প্রবাহে, শ্রীরামকৃষ্ণ-আশীষে
কূপমন্ডুক 'জীবন পান্ডুলিপির' উত্তরণ
ছাইভস্ম গঙ্গায় ভাসার আগে...,
মৃত্তিকা-হৃদয় জাগে আলোয়
"টাকা মাটি, মাটি টাকা", মনে রাখো
আনন্দে, বালক সময়
কর্পূর-প্রাণ, পদ্মপাতার জল,
অহঙ্কারী ফিতে-শরীর মাটিতে মেশে
বিস্তৃত আদিগন্ত গোলক গালিচায়।
এবার, মায়া-মাখা হয় আত্মা, চন্দন-আঘ্রাণে
জ্যোৎস্নার মোহময় কুমারী নিশি বরণে,
নাচে মনরাধা, মোহনবাঁশির সুরে রামকৃষ্ণ
সাধনার সংযম-শিকলে তৃপ্ততা জানে,
জীবনের অতৃপ্ত ছৌ...
এস প্রিয়,
আলোপথের আদরে, ঘেসোমাটির গালিচায়...
সকল-অজ্ঞতা শেষে, রামকৃষ্ণ গীতে,
মৃত শরীর হোক অমৃতময়...।
লেখক কাটোয়া শহরের বাসিন্দা — কবিতা,গল্প, উপন্যাস লিখতে ভালোবাসেন। ছোটবেলায় স্কুলে পড়তে গল্প দিয়ে লেখা শুরু — বর্তমানে আরও আনন্দ, সানন্দা ব্লগ কবি সম্মেলন, কবিতাপাক্ষিক, আরম্ভ, ধুলামন্দির, অক্ষর ওয়েব, দৈনিক বজ্রকন্ঠ, দৈনিক সংবাদ, তথ্যকেন্দ্র, যুগশঙ্খ, আবহমান, অপরজন, কৃত্তিবাসী ওয়েব, ম্যাজিক ল্যাম্প, জয়ঢাক, অংশুমালী, প্রভাতফেরী, দৈনিক গতি প্রভৃতি পত্রিকায় নিয়মিত লেখালেখি করেন। বিভিন্ন প্রকাশনী থেকে অন্তরে আলো জ্বলে, শিশিরের ছৌ (কবিতা সংকলন), তিন-এ নেত্র সহ আরও অনেকগুলি বই প্রকাশিত হয়েছে।
হৃদয় কুঠুরির নীল নকশা
আদিত্য
যদি প্রেমের কোনো কবিতা লিখি,
সে কি পাবে ঠাঁই তোমার মনের কুঠুরিতে?
যেখানে জমানো আছে সহস্র নীরবতা —
সেখানে কি পারবে আমার শব্দরা ঘর বাঁধতে?
হয়তো ছন্দগুলো খুব সাধারণ হবে,
হয়তো তাতে থাকবে না কোনো অলঙ্কার;
তবু প্রতিটি পঙ্ক্তিতে মিশে থাকবে
তোমাকে পাওয়ার এক ব্যাকুল হাহাকার।
আমি নীল কালিতে লিখব না বিরহ,
বরং স্নিগ্ধ ভোরে শিউলি ঝরার গল্প শোনাবো;
যদি তুমি অনুমতি দাও তবে —
তোমার ওই মনের এক কোণে একটুখানি জায়গা পাবো?
সে কুঠুরিতে অন্য কারো আনাগোনা নেই,
যেখানে শুধু আমি আর আমার অনুরাগের বাস;
আমার কবিতার প্রতিটি শব্দ যেন হয় —
তোমার ওই হাসির আড়ালে লুকানো এক দীর্ঘশ্বাস।
যদি কোনোদিন আমায় ভুলে যাও,
তবু এই কবিতাটি রেখো খুব যতনে;
জানি, এক টুকরো প্রেমের ছোঁয়া পেলে —
ফাগুন আসবেই তোমার ওই মনের গহীনে।
অসম্পূর্ণ ভালোবাসা
মহিবুল জাজবত
আমরা শুরু করেছিলাম
ধার করা সাহস আর ধার করা সময় নিয়ে,
দুটি হৃদয় ভান করেছিল — নিশ্চয়তাই যথেষ্ট।
কথারা সহজেই বয়ে গিয়েছিল,
এমন প্রতিশ্রুতির মতো
যেগুলোর নিচে আমরা কখনো সই করিনি,
আর নীরবতা ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করেছিল —
ধীরে ধীরে আমাদের নাম শিখে নিতে নিতে।
ভালোবাসা ছিল,
কিন্তু প্রতিশ্রুতি দরজার কাছেই থমকে গিয়েছিল,
যেন ‘চিরকাল’ বলার জন্য আমাদের চেয়ে বেশি সাহস দরকার ছিল।
তুমি আমার হাত ধরেছিলে, আমার ভবিষ্যৎ নয়,
আর আমি দিকনির্দেশের বদলে
কিছু মুহূর্তকেই মেনে নিয়েছিলাম।
প্রতিদিন কথা হতো,
তবু কোনো পরিকল্পনা ছিল না,
হেসেছি এমনভাবে — যেন শেষ বলে কিছু অন্যদের জন্য।
আমি শিখে নিয়েছিলাম
তোমার মেজাজ, থেমে যাওয়া, পালিয়ে যাওয়ার কৌশল,
আর তুমি শিখেছিলে —
থেকে থেকেও কীভাবে না থাকতে হয়।
কোনো বিশ্বাসঘাতকতা ছিল না, নাটকীয় বিদায়ও নয়,
শুধু উত্তরের ফাঁকে ফাঁকে
নীরবে বেড়ে ওঠা এক দূরত্ব।
অনুভূতিগুলো সত্য ছিল, উদ্দেশ্যগুলো ছিল না,
আর সত্যটা এলো —
এত দেরিতে যে আর কোনো মূল্য রইল না।
এখন রাগ নেই, আছে শুধু বোঝাপড়া —
ভালোবাসা একাই কোনো গল্প সম্পূর্ণ করে না।
কিছু সংযোগ থাকে কেবল অনুভব করার জন্য,
শেষ করার জন্য নয়,
আর কিছু হৃদয়ের দেখা হয় শুধু ছেড়ে দেওয়ার জন্যই।
যা রয়ে গেছে তা আফসোস নয়, স্পষ্টতা —
অসম্পূর্ণ ভালোবাসাও শেখায় পূর্ণতার মানে।
আমরা ব্যর্থ হইনি; আমরা কেবল থেমে গেছি,
কোথাও ‘হ্যালো’ আর ‘গুডবাই’-এর মধ্যে।
লেখক রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর এবং ইউজিসি নেট ও ডব্লিউবি সেট উত্তীর্ণ একজন স্বাধীন গবেষক। তিনি একজন প্রকাশিত কবি এবং How to Destroy Your Life শীর্ষক আত্মোন্নয়নমূলক গ্রন্থের লেখক। তাঁর হিন্দি কবিতায় (শায়েরি) ভালোবাসা, হারানো সম্পর্ক, আত্মসম্মান ও মানবিক সহনশীলতার সূক্ষ্ম অনুভব প্রতিফলিত হয়। পাশাপাশি তিনি ইংরেজি ভাষায়ও নিয়মিত কবিতা লেখেন। যা ভারতের বিভিন্ন জাতীয় সংকলনে স্থান পেয়েছে তাঁর ইংরেজি কবিতাগুলিতে আধুনিক সম্পর্কের দ্বন্দ্ব, অসম্পূর্ণ ভালোবাসা, নীরব বিচ্ছেদ এবং আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধান গভীর সংবেদনশীলতা ও দার্শনিক পরিমিতির সঙ্গে উঠে আসে। Unfinished Love, No More Explanations, The art of not chasing, The Silence of Hopeless Nights The Goodbye that Never Said My Name, , Scars of a Broken Promise — এই ধরনের কবিতাগুলির মাধ্যমে তিনি সমকালীন মানবিক যন্ত্রণা ও আত্মমর্যাদার ভাষা নির্মাণ করেছেন। লেখালেখির জগতে তিনি মহিবুল জাজবত নামেই পরিচিত।
ভালোবাসতে মন চাই
কল্লোল বিশ্বাস
"বাড়ি থেকে মানছে না আমাদের সম্পর্ক
আমি নিরুপায়,
আমি বাধ্য হয়ে বিয়ে করছি।"
নিজের দোষ এড়িয়ে ছেড়ে যাওয়া প্রেমিকার
অতি পরিচিত কথা এগুলো।
যা শোনার পর
চোখের কোনে শুকিয়ে যাওয়া কান্নার দাগ
আলপনা কাটতে পারেনি।
বেকারত্বের প্রেম স্বপ্ন দেখাবে,
কিন্তু পরিণতির মিলন মালা ধুলোয় গড়াবে।
সবটাই জানি, তবুও ভালোবাসতে মন চাই।
চাওয়া আর দেওয়া
নন্দিনী ঘোষ
তোমায় চেয়ে শুধু পেয়েছি চোখের জল,
অভিমানী মন ভরে অভিমান।
অপেক্ষার তীব্র যন্ত্রণা ভরা রাত,
আর দিনে কর্ম-বাস্তবতার মাঝে দীর্ঘশ্বাস।
তোমায় ভালোবেসে পেয়েছি
নানান শব্দে বর্ণিত প্রত্যাখ্যান,
নিস্তব্ধতায় চুপ করে থাকা দূরত্ব।
ফিরে আসবে — এই আশায় বসে থাকা চোখ,
আর সব জেনেও না-বোঝা এক মন।
দিয়েছি যা, সে তো বড়ই কম —
দিয়েছি আমার হাসিমাখা দিনগুলো,
প্রত্যাশাভরা ভবিষ্যতের আশ্বাস,
মনের আনন্দে গান গেয়ে ওঠা মন,
আর রক্ত-মাংসে গড়া পুরো অমিটাকে।
লেখিকা একজন সংবেদনশীল ও কৌতূহলী মানুষ। ভাষা, কবিতা ও সৃষ্টিশীল লেখালেখির প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ। শেখা ও শেখানো — উভয় প্রক্রিয়াকেই তিনি সমানভাবে ভালোবাসেন। নতুন ভাবনার অনুসন্ধান তাঁকে আকৃষ্ট করে, তবে সংস্কৃতির শিকড়ে স্থিত থাকার বিশ্বাসও তাঁর দৃঢ়। শব্দের মাধ্যমে অনুভূতিকে স্পর্শ করা এবং সাধারণ মুহূর্তকে অর্থবহ করে তোলাই তাঁর সৃজনযাত্রার মূল লক্ষ্য। নীরবতা, সুর এবং মানুষের গল্প তাঁকে প্রতিদিন আরও মনোযোগী ও মানবিক করে তোলে। এই পথেই তিনি খুঁজে পান এক শান্ত আনন্দ।
শূন্যতার গর্জন
ড. বরুণ রায়
স্তব্ধ নগরে আজ হাহাকার মেশে,
শব্দরা সব হারিয়েছে এক অজানার দেশে।
বুকের পাজরে বাজে কান্নার সুর —
চেনা গলিগুলো সব হয়ে গেছে বহুদূর।
বাতাসে বিষাদ মাখা, স্থবির সময়,
অন্ধকারে জেগে থাকে এক বিমূর্ত ভয়।
চারিদিকে কোলাহল, তবু সব নিঝুম,
চোখের পাতায় আর নেই কোনো ঘুম।
হৃদয়ের গহীনে এক গভীর ক্ষত,
শূন্যতা গর্জে ওঠে অবাধ্য পশুর মতো।
আর্তনাদ ফিরে আসে প্রতিধ্বনি হয়ে,
নিঃশব্দ হাহাকার চলে বুক বয়ে।
আকাশের নীল আজ ফ্যাকাশে আর কালো,
আঁধার গিলেছে সব পৃথিবীর আলো।
রিক্ত এই মরুভূমিতে স্বপ্নরা ম্লান —
শূন্যতার গর্জনে স্তব্ধ হয় প্রাণ।
প্রান্তিক
সন্দীপ গাঙ্গুলী
পাতা ঝরা হাওয়ার উদাসিন সুরে শব্দ সাজাই...
"ফিরে এসো"
যদিও কোনোদিন আসবেনা
তবুও তোমাকে পাঠাই
রোজ সকালের শুভেচ্ছা বার্তা
জানি তুমি পড় না
অনাদরে পরে থাকে রিসাইকেলবিনে
তাও নতুন কবিতাটা উৎসর্গ করি তোমাকেই।
মাঝে মাঝে রোদ মাখা বসন্তে
হারিয়ে যাই তোমার বারান্দায়,
শান্তনীল শরতের মেঘের হাত ধরে
ভেসে বেড়াই অপূর্ণ ইচ্ছার প্রান্তরে
চোখ বুজলেই পৌঁছে যাই
তোমার আসকারার ঠিকানায়;
হয়তো তুমি নেই
ঠিকানা পাল্টেছ নতুন শহরে
তবুও জলের তরঙ্গে শুনি
তোমার নূপুরের ঝংকার...
নিঃশব্দে ছবি আঁকি আকাশ জুড়ে
একলা মনের অভিলাসে,
জীবনের রোমাঞ্চ পথ আজ ছায়াহীন
দূরবীনে খুঁজি ভালবাসার পদক্ষেপ।
হারিয়ে যাওয়া রূপকথা
প্রিয়া বণিক
হঠাৎ করেই ফুরিয়ে গেল, ধুলোমাখা সেই দিন,
সময়ের স্রোতে জীবন জুড়ে এখন, ভীষণ রকম ঋণ।
হাসি-ঠাট্টার আঙিনা ছেড়ে, বাস্তবের এই ভিড়ে,
অদূর ভবিষ্যতের চিন্তারা সব, আমায় কামড়ে ধরে।
বর্তমানটা ঝাপসা আজ, ভাবনার জালে ঘেরা,
শৈশবটাই তো ছিল আসলে, সবচাইতে সেরা।
ছিল না কোনো চিন্তা সেদিন, ছিল না কোনো ভয়,
এক চিলতে রোদে খুঁজে পেতাম, জগৎ জয়ের জয়।
সেই যে বন্ধু, সেই যে আড্ডা, সেই যে খোলা মাঠ,
বুকের ভেতর বাড়ায় হাহাকার, আর আক্ষেপের পাঠ।
পিছু ফিরে তাকালে আজ, ঝাপসা হয়ে আসে চোখ,
স্মৃতিরা সব মেঘ হয়ে জমায়, পাহাড় সমান শোক।
মুঠো ভরা বালুর মতো,সময় গেছে চলে,
শৈশব আজ হারিয়ে গেছে, স্মৃতির অথৈ তলে।
ফিরে কি পাওয়া যাবে না আর, সেই হারানো সুর?
যান্ত্রিক এই জীবনে আজ, শৈশব বহু দূর।
ভোলা
স্বপন চক্রবর্তী
থাকি আমি ক্ষুদ্র গেহে পরম সুখেতে দোঁহে
ভেবোনাকো সাথী মোর জায়া,
অকৃতদার আমি নহি পিতা, নহি স্বামী
সহকারী এক মোর ছায়া।
ব্যস্ত সতত কাজে সকাল হইতে সাঁঝে
স্মিত হাসি মিলায় না মোটে ,
ওঠে রোজ ভোর ভোর পরিস্কৃত ঘরদোর
বাজার সরকারও সে বটে।
অতঃপর পাকশালে রান্নাবান্না হেলেদুলে
সমাপন হয় দ্বিপ্রহরে,
ভোজন পর্ব শেষে বাসন মাজে সে হেসে
তারপর থাকে ঘুমঘোরে।
সাঁঝেও কাজের রাশি তবুও ঠোঁটেতে হাসি
কাজ করে আপন মনে,
রান্না ও কুটনো কাটা শিলেতে বাটনা বাটা
কোন কাজে বাধা নাহি মানে।
সহসা সেদিন ভোরে হেরিনু সদর দ্বারে
অর্গলখানি হায় খোলা,
গেহ মোর শূন্য করি ভৃত্য মোর সহকারী
ত্যজিয়াছে বুঝি মোরে ভোলা।
স্নানজল নাই তোলা আখোলাই পাকশালা
রান্নার নাই বন্দোবস্ত,
ঠিকানাটি নাই তার হৃদে মোর হাহাকার
ভোলার বিহনে আমি ধ্বস্ত।
ধৌত বস্ত্র মোর করে কে দেবে স্নানের পরে
ভেবে ভেবে আমি অসহায়,
ঘরদোর ছারখার কে করে পরিষ্কার
বেঁচে থাকা বুঝি মোর দায়।
ঘড়ি চলে টিক টিক কিছুই তো নেই ঠিক
যারপরনাই মোর কষ্ট,
কি করে যে চলে মোর জানেন শ্রীগদাধর
সাজা মোরে দিয়ে গেছে দুষ্ট।
সপ্তাহ হয় বীত চিত্ত মোর শঙ্কিত
আর কি ফিরবে না হায় ভোলা!
হোটেলের ভোজ খেয়ে অর্থে সামর্থ্যে ক্ষয়ে
তনুমনে ধরে গেল জ্বালা।
এমনি সময়ে সে ফিরে আসে অবশেষে
করজোড়ে করে নমস্কার,
জ্ঞানশূন্য দিকবিদিক কহিলেম তাকে “ধিক,
তোকে আর নাহি দরকার।
দূর হ রে ঘর থেকে কি করে যে আছি টিঁকে
ঈশ্বরই জানেন একমাত্র,
নেই বলা নেই কওয়া সহসাই চলে যাওয়া
ভোলা তুই এ কেমন ভৃত্য !”
তবু ভোলা করজোড়ে দাঁড়ায়ে রহে সে ঘরে
আঁখি দুটি তার ছলোছলো,
বলে - “বাবু, যাব কোথা আমার মনের ব্যাথা
তুমি বিনা কে বুঝবে বলো!
সেদিন কাকভোরে তখনও ঘুমঘোরে
দেখিনু স্বপন ভারী মন্দ,
গ্রাম মোর বাণভাসি জলস্রোত রাশিরাশি
জায়া কন্যা বাঁচে কিনা সন্দ।
কাণ্ডজ্ঞানহারা আমি ক্ষমো মোরে গৃহস্বামী
দিতে নারি কোন সন্দেশ,
ছুটে গেছি মোর গ্রামে খাসিমারা চর ধামে
দেখি হায় সব কিছু শেষ!
ভোরের স্বপন হায় সত্যই মিলে যায়
ঘরদোর পেলেম না খুঁজে,
রাতের ভয়াল বন্যা ভেসে গেল জায়া কন্যা
কষ্ট সব সহি মুখ বুজে।
অপেক্ষার অবসানে ফিরিনু তোমার টানে
মোর সনে হয়োনাকো রুষ্ট,
আশয় না দিলে মোরে যাব কোথা সংসারে
সহিতে পারি না আর কষ্ট।”
সব শুনি’ বাকরুদ্ধ শোকানলে আমি দগ্ধ
বিনা মেঘে নিদারুণ বাজ !
কহিলেম আমি তারে “যারে ভোলা নিজ ঘরে
কাজকর্ম তোলা থাক আজ।”
অবাক করে সে মোরে তার দৃপ্ত কন্ঠস্বরে
বলে - “বাবু, কাজে নয় ফাঁকি,”
যায় ফিরে নিত্যকর্মে তৃপ্ত সে স্বধর্মে
কোন কাজ নাহি পড়ে বাকি।
আমি তারে দেখি রোজ দুখের মাঝেও খোঁজ
পেয়েছে সে সুখের ঠিকানা,
সে মোর ভৃত্য নহে মিত্রই তারে কহে
ভোলাকে নতুন করে চেনা।
জীবনে চলার পথে বিষাদসিন্ধু রথে
যে কিনা নিত্য আরোহী,
সে যদি শতেক ক্লেশে জীবন কাটায় হেসে
সর্বশ্রেষ্ঠ মানব তারে কহি।
তেমনই মানুষ ভোলা ঈর্ষা, দ্বেষ, দুঃখ, জ্বালা
চিত্তমাঝে নাহি কভু স্থিতি,
কর্মই ধর্ম তার জীবনের সত্যসার
মিত্রে মোর জানাই প্রণতি॥
একটু সময় চাই
তপন কুমার দেবনাথ
জীবনের ঘুঁটিগুলো সাজাতেই
সময় চলে গেলো অনেকটাই —
ওপাশে বসে আছে মহাকাল
যে কোনো সময়েই নিয়ে যেতে
পারে আমাকে, ওপারে...
কতো অনিশ্চয়তার মধ্যেই বাঁচার
স্বপ্নগুলো বাঁচিয়ে রাখতে হয়
সযত্নে, অত্যন্ত সতর্কতায়!
জীবনের ঘুঁটিগুলো ঠিক মতো
সাজাতে না পারলেই ঘেঁটে
যাবে জীবনের পর্ব, যে কোনো সময়েই,
কাল পেরিয়ে যাবে আরও
কালের অন্ধকার গুহায়, দিশেহারা
জীবনের সময়গুলো এলোমেলো
হবে যদি জীবনের ঘুঁটিগুলো
ঠিক মতো সাজানো না হয়!
মহাকাল, দোহাই তোমার
একটু সময় দিও বেঁচে থাকার...
প্রিয় সখি
তপতী বিশ্বাস কর্মকার
আরেকটিবার ওঠ না সখি
তাকা মেলে চোখ,
নতুন করে তোর সঙ্গে
আবার দেখা হোক।
আকাশ পানে উড়বো আবার
আমরা দুজন মিলে,
ক্লান্ত হলে খুব বসবো গিয়ে
বট বৃক্ষের ডালে।
একটুখানি ডাক না সখি
প্রিয় নামটি ধরে,
জড়িয়ে নিয়ে কর না আদর
বড্ড ইচ্ছে করে।
কোন ঠিকানায় গেলি রে তুই
আমায় একলা ফেলে,
বুকের ভিতর করছে জ্বালা
বলবো কাকে খুলে।
তোকে ছাড়া বৃথাই জীবন
শূন্য হলো যে সব,
চোখের জল সঙ্গী এখন
বন্ধ আমার কলরব।
ছায়াপথ
সৌম্যজিৎ মুখার্জ্জী
সন্ধা ঘনিয়ে এসেছে,
তখনো গাঢ় অন্ধকার নামেনি,
আকাশের গায়ে লেগে আছে
দিনের শেষ রক্তিম আভা,
চিক্ চিক্ করে জ্বলছে-নিভছে আলো,
না নাহ, জোনাকি নয়,
কোনো গ্রাম বা শহরের
নিশিযাপনের প্রস্তুতি...!!
অবশেষে সম্মুখীন হল
নিকষ কালো আঁধার,
যার কালিমায় হার মানে
অমাবস্যার আকাশ,
মাঝে মাঝে উঁকি দিচ্ছে
ধোঁয়াশার ঘেরাটোপ,
আকাশের লক্ষ তারার মত
মনের সহস্র ইচ্ছা প্রদীপও
আজ ম্লান হয়ে যাচ্ছে,
ভয়ানক স্বপ্নের মতো আঁধার
ভরেছে দু'চোখের পাতা,
ছড়িয়েছে শিহরণ
ধমনী-শিরায়,
নিদ্রা গেছে জড়িয়ে
কোনো এক অজানা মায়াজালে,
ফেরবার পথ সব রুদ্ধ...!!
ঠিক সেভাবেই নিভছে জ্যোতি
অমলিন মানবিকতার,
তলিয়ে যাচ্ছে গাঢ় অন্ধকারে,
যার শুরু থাকলেও শেষ নেই,
মিশে যাচ্ছে মলিনতার
নিখাদ পঙ্কিল ছায়াপথে...!!!!
লেখকের জন্ম ও বড় হওয়া হাওড়ার শিবপুরে। ছোটবেলায় ফুটবল নিয়ে খেলতে খেলতে কখন শব্দের ছন্দ নিয়ে খেলায় মেতে মনের খেয়ালে একটা দুটো কবিতার সৃষ্টি। তারপর ক্রমশ কবিতার প্রেমে পরা। সেইসঙ্গে গান, নাটকে অভিনয় আর পড়াশোনায় বাণিজ্য শাখায় স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করে বর্তমানে কলকাতায় চাকরিরত। এই দৈনন্দিন জীবনের সুখে দুঃখে আশ্রয় কবিতা। কলমের মাধ্যমে নিত্যনতুন ছন্দে জন্ম দেয় নতুন কবিতার।
অগ্রদুতের আকাঙ্খায়
কাজী সেরিনা খাতুন
বিশ্ব আজ কলুষিত ।
মানবতা অশুচিত ।
কোথায় সেই সত্যবান ।
করি তার আহ্বান ।
মন্দিরে মসজিদে ঘর্ষণ ।
শিক্ষার আলো বিসর্জন ।
আয়রে অগ্রদুৎ চক্রবান ।
চাই অমঙ্গলের অবসান ।
নারী শরীরের লালসা ।
আঁধারে লোভাতুর পিপাসা ।
আয়রে গেয়ে প্রলয়ের গান ।
ছুঁড়ে দে তোর বিধ্বংসী বান ।
ষড়যন্ত্রের ক্ষুধার্ত দাঁত ।
রক্তের গন্ধে মাতাল ফাঁদ ।
তোর আগমনের আমরা প্রতীক্ষমান ।
স্তব্ধ হোক মানবতার অপমান ।
স্বজনপোষণের এই ঘোরে ।
প্রকৃত প্রতিভা গুমরে মরে ।
চলরে মোরা গড়ব মহান ।
মানবহিতৈষী নিদান ।।
কে আছিস বীর ভয়াল ।
কে ধরবি আলোর মশাল ।
আয় রে তোরা নির্ভীক প্রাণ ।
মঙ্গলের করি জয়গান ।
বন্ধ হবে অস্ত্র-নিনাদ ।
আঁধারে গড়ব আলোর প্রাসাদ ।
মিলনের স্রোতে হবো বহমান ।
বাজাবো প্রলয়বিশান ।।
লেখিকা মাস্টার্স সম্পন্ন করার পর বর্তমানে রাজ্য সরকারি কর্মচারী হিসেবে কর্মরত। তিনি বারুইপুরের বাসিন্দা। ছোটবেলা থেকেই তাঁর লেখালেখির অভ্যাস। স্কুল ও কলেজের বিভিন্ন ম্যাগাজিনে তাঁর লেখা প্রকাশিত হয়েছে। সম্প্রতি সমাপ্ত কলকাতা বইমেলায় তাঁর প্রথম একক কাব্যগ্রন্থ “নতুন কুঁড়ি” প্রকাশিত হয়েছে। প্রকৃতি এবং সমাজের নানা কুৎসিত বাস্তব বিষয় তাঁর লেখার প্রধান অনুষঙ্গ।
বাংলা আমার জীবন মরণ
সামসুজ জামান
বাংলা আমার জীবন মরণ বাংলা আমার প্রাণ।
বাংলা আমার ভালবাসা বাংলা আমার মান।
বাংলা আমার ধুলোর কনা ভরা নদীর জল
বাংলা আমার পদ্ম পাতায় শিশির টলমল।
বাংলা আমার কাঠফাটা রোদ মিষ্টি বাঁকা চাঁদ।
বাংলা আমার মিছিল স্লোগান অত্যাচারীর ফাঁদ।
বাংলা আমার ভাবের জগত কল্পনা চিন্তন।
বাংলা রে তুই আছিস জুড়ে আমার হৃদয় মন।
বাংলা তোকে বিদেশীরা করলো রে নিঃস্ব।
বাংলা তোকে তবুও তো আর ভোলেনি বিশ্ব।
বাংলা তোকে টুকরো করে করলো যে খান খান।
বাংলা রে তোর হয়নি ক্ষতি, বাড়লো রে তোর টান।
বাংলা আমার নিশার স্বপন,বাংলা রাতের ঘুম।
বাংলা আমার গোপন প্রিয়া কপালে দেয় চুম।
বাংলা আমার মাথার মণি বুক ভরি নিশ্বাস।
বাংলা আমার বুকের রক্ত আবেগ আর উচ্ছাস।
বাংলা আমার দুঃখিনী মা, অথবা স্নেহ
বাংলা আমার বাড়ির উঠোন, শান্তি ভরা গেহ।
বাংলা আমার মন্দির মসজিদ গির্জা পীরস্থান।
বাংলা রে তোর পরশ পেতে হৃদয়ে আনচান।
বাংলা তোকে মাথার দিব্যি মানবোনা আর হার।
বাংলা তোকে রক্ত দিয়ে আনবো রে জোয়ার।
বাংলা তোকে করতে আদর হয়েছি খবর।
বাংলা রে তোর অশ্রু জলে ভিজল ভাই-এর কবর।
বাংলা আমার গাছগাছালি বাংলা দিঘির ফুল।
বাংলা আমার দিগন্ত মাঠ বাংলা নদীর কূল।
বাংলা আমার বাউল বাতাস রাখালিয়া সুরে।
বাংলা আমার পুবের সূর্য উদাসী দুপুর।
বাংলা আমার পানের বরজ পাখির মিষ্টি গান।
বাংলা আমার শ্যামল মাটি আউশ আমন ধান।
বাংলা আমার কৃষ্ণ হরি আল্লাহু আকবর।
বাংলা রে তুই ঘুঁচিয়ে দিলি বিভেদ আপন পর।
বাংলা তোকে কাড়তে এলে করব এবার পণ।
বাংলা তোকে বলছি আমার হৃদয় রণাঙ্গন।
বাংলা তোকে জান দিয়েছি একুশে ফেব্রুয়ারি।
বাংলা রে তোর সোনার ও মুখ ভুলতে কি আর পারি!
লেখক স্বাধীনতা সংগ্রামী খলিলুর রহমান ও সেতারা বেগমের পুত্র, পূর্ব বর্ধমানের টোলা গ্রামে জন্ম। বাংলা ও শিক্ষা তত্বে স্নাতকোত্তর এবং বি.এড ডিগ্রিধারী এই শিক্ষাবিদ দীর্ঘদিন আন্দামানে শিক্ষা বিভাগে কর্মরত ছিলেন। শিক্ষকতা ও অনুবাদ ক্ষেত্রে অসাধারণ অবদানের জন্য তিনি লেফটেন্যান্ট গভর্নরের প্রশস্তিপত্রে সম্মানিত হন। CBSE-র ইংরেজি ও হিন্দি পাঠ্যপুস্তক বাংলায় অনুবাদের জন্যও তিনি বিশেষভাবে প্রশংসিত। বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত হলেও সাহিত্য, সঙ্গীত ও সংস্কৃতিচর্চার সঙ্গে তাঁর অটুট সম্পর্ক রয়েছে। প্রকাশিত গ্রন্থসংখ্যা ১৭; তাঁর লেখা নিয়মিত প্রকাশিত হয় আকাশবাণী, দূরদর্শন ও বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়।