একবিংশ শতাব্দীতে এসে শিক্ষিতা, স্বাধীন, উপার্জনক্ষম নারী হিসেবে নিজেকে আধুনিকমনস্ক বা নারীবাদী পরিচয় দেওয়াটা অপেক্ষাকৃত সহজ মনে হলেও একসময় তা মোটেই সহজ ছিল না। বহু যুগ ধরে সমাজের প্রায় প্রতিটি স্তরেই নারীকে নানা বিধিনিষেধের শৃঙ্খলে বন্দী করে রাখা হতো। তবুও শত বাধা সত্ত্বেও বহু মহীয়সী নারী তাঁদের সাহস, ধৈর্য, মেধা, দূরদর্শিতা, স্নেহ, মায়া ও মমতা দিয়ে সমাজের এই শৃঙ্খল ছিন্ন করেছেন এবং হয়ে উঠেছেন স্মরণীয় ও বরণীয়। আজ আমরা তাঁদের মধ্যে একজন মহীয়সী নারীর জীবনসংগ্রাম ও অবদানকে জানবো। তিনি বেগম রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেন — বাংলার প্রথম 'ফেমিনিস্ট'।
বাঙালি মুসলিম নারী জাগরণের অগ্রদূত এবং প্রকৃত নারীবাদী বেগম রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেন ছিলেন একাধারে বাঙালি চিন্তাবিদ, প্রাবন্ধিক, ঔপন্যাসিক, সাহিত্যিক, সমাজ সংস্কারক। ছোটগল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, উপন্যাস, বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী ও শ্লেষাত্মক রচনায় তাঁর স্বকীয়তা ছিল তীক্ষ্ণ ও অনন্য। উদ্ভাবনী শক্তি, যুক্তিবাদিতা এবং কৌতুকপ্রিয়তা তাঁর রচনার সহজাত বৈশিষ্ট্য। তাঁর প্রবন্ধের বিষয়বস্তু ছিল বিস্তৃত ও ব্যাপক, এবং বিজ্ঞান সম্পর্কেও তাঁর অনুসন্ধিৎসা স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছিল। সেই সময়েই তিনি যুক্তি দিয়ে নারীদের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জনের আহ্বান জানান এবং শিক্ষার অভাবকেই নারী পশ্চাৎপদতার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন। তৎকালীন গোঁড়া মুসলিম সমাজে এটি ছিল এক অত্যন্ত কঠিন ও দুঃসাহসী বক্তব্য।
১৮৮০ সালের ৯ই ডিসেম্বর রংপুর জেলার মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন বেগম রোকেয়া। তাঁর পিতা জহীরুদ্দিন মোহাম্মদ আবু আলী হায়দার সাবের ঐ অঞ্চলের জমিদার ছিলেন এবং তাঁর মাতা রাহাতুন্নেসা সাবেরা চৌধুরানী। রোকেয়ার দুই বোন (করিমুন্নেসা ও হুমায়রা) এবং তিন ভাই ছিল; তবে তাঁদের মধ্যে একজন শৈশবেই মারা যান।
রোকেয়ার পিতা বহু ভাষায় (আরবি, উর্দু, ফারসি, বাংলা, হিন্দি, ইংরেজি) পারদর্শী হলেও কন্যাদের শিক্ষার ব্যাপারে ছিলেন রক্ষণশীল। তবে রোকেয়ার বড় দুই ভাই — মোহাম্মদ ইব্রাহীম আবুল আসাদ সাবের ও খলিলুর রহমান আবু যায়গাম সাবের — কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে পড়াশোনা করে আধুনিক চিন্তাধারায় অভ্যস্ত হয়ে ওঠেন। বড় বোন করিমুন্নেসাও ছিলেন বিদ্যানুরাগী ও সাহিত্যানুরাগী। ফলে রোকেয়ার শিক্ষালাভ, সাহিত্যচর্চা ও মূল্যবোধ গঠনে ভাই-বোনদের অবদান ছিল অপরিসীম।
সেই সময়ে মেয়েদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার কোনো সুযোগ ছিল না। পাঁচ বছর বয়সে মায়ের সঙ্গে কলকাতায় থাকার সময় রোকেয়া একজন মেম শিক্ষয়িত্রীর কাছে কিছুদিন লেখাপড়ার সুযোগ পান, তবে সমাজের ভ্রুকুটি ও আত্মীয়দের আপত্তিতে সেটিও বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু তিনি দমে যাননি। বড় ভাই-বোনদের সহায়তায় বাংলা, ইংরেজি, উর্দু, ফারসি ও আরবি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন।
১৮৯৮ সালে তাঁর বিয়ে হয় বিহারের ভাগলপুরের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ সাখাওয়াৎ হোসেনের সঙ্গে। স্বামী ছিলেন সমাজসচেতন, প্রগতিশীল ও কুসংস্কারমুক্ত। তাঁর উৎসাহে রোকেয়া দেশি-বিদেশি সাহিত্য গভীরভাবে অধ্যয়ন করার সুযোগ পান এবং ইংরেজি ভাষায় পারদর্শিতা অর্জন করেন। সাহিত্যচর্চার সূত্রপাতও ঘটে স্বামীর অনুপ্রেরণায়। তবে বিবাহিত জীবন দীর্ঘস্থায়ী হয়নি; ১৯০৯ সালের ৩ মে সাখাওয়াৎ হোসেন মারা যান। এর আগে তাঁদের দুই কন্যা সন্তানের জন্ম হয়েছিল, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তারা অকালেই মারা যায়।
১৯০২ সালে 'পিপাসা' নামের একটি ছোটগল্প দিয়ে সাহিত্যজগতে অভিষেক ঘটে তাঁর। এরপর 'মতিচূর'-এর প্রবন্ধসমূহ ও 'Sultana’s Dream' নামের নারীবাদী বিজ্ঞান-কল্পকাহিনী তাঁকে বিশেষ খ্যাতি এনে দেয়। কলকাতা থেকে প্রকাশিত নবপ্রভা পত্রিকায় 'পিপাসা' ছাপা হলে তিনি পরিচিতি পান। পরে তাঁর ইংরেজি রচনা 'Sultana’s Dream' ১৯০৫ সালে মাদ্রাজ থেকে প্রকাশিত এক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এই কল্পবিজ্ঞানে সৌর ওভেন, উড়ন্ত গাড়ি এবং ক্লাউড কনডেন্সার প্রভৃতি অনাবিষ্কৃত জিনিসের উল্লেখের পাশাপাশি একটি বিকল্প, নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গিও চিত্রিত হয়েছে যেখানে পুরুষ ও নারীর ভূমিকা ছিল তৎকালীন সমাজের অনুপাতে উল্টো, অর্থাৎ কাহিনীতে নারীরা ছিল প্রভাবশালী লিঙ্গ এবং পুরুষরা ছিল অধীনস্থ। ধীরে ধীরে তিনি সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক ও সমাজচিন্তক হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন।
স্বামীর মৃত্যুর পর নিঃসঙ্গ রোকেয়া নারীশিক্ষা ও সমাজসেবায় আত্মনিয়োগ করেন। ১৯০৯ সালের ১ অক্টোবর স্বামীর প্রদত্ত অর্থে মাত্র পাঁচ ছাত্রী নিয়ে ভাগলপুরে প্রতিষ্ঠা করেন 'সাখাওয়াৎ মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল'। পারিবারিক কারণে কলকাতায় চলে এলে ১৯১১ সালের ১৬ মার্চ ওয়ালিউল্লাহ লেনের একটি বাড়িতে মাত্র আটজন ছাত্রী নিয়ে পুনরায় স্কুলটি শুরু করেন। সমস্ত বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে ১৯১৬ সালের মধ্যে স্কুলের ছাত্রীসংখ্যা একশো পেরিয়ে যায়।
শিক্ষা বিস্তার, সাহিত্যচর্চা ও সংগঠনের পাশাপাশি তিনি সক্রিয়ভাবে সামাজিক কর্মকাণ্ডেও যুক্ত ছিলেন। ১৯১৬ সালে প্রতিষ্ঠা করেন 'আঞ্জুমানে খাওয়াতিনে ইসলাম' — মুসলিম বাঙালি নারীদের সংগঠন। ১৯২৬ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত বাংলার নারী শিক্ষা সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন। ১৯৩০ সালে বঙ্গীয় মুসলিম সম্মেলনে বাংলা ভাষার পক্ষে তাঁর জোরালো বক্তব্য সে যুগে ছিল এক দুঃসাহসী পদক্ষেপ।
১৯৩২ সালের ৯ ডিসেম্বর, রোকেয়া কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তিনি 'নারীর অধিকার' নামে একটি প্রবন্ধ লিখছিলেন। তাঁর সমাধি বর্তমানে পানিহাটি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে অবস্থিত। তখনকার দিনে কলকাতার কোনো কবরখানায় তাঁকে সমাহিত করা সম্ভব হয়নি — কারণ, তিনি ছিলেন সেই নারী, যিনি মুসলিম নারীদের জন্য বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দুঃসাহস দেখিয়েছিলেন। মৃত্যুর কিছুদিন আগে তিনি তাঁর এক ছাত্রীকে বলেছিলেন, "কবরে শুইয়া শুইয়াও যেন আমি মেয়েদের কলকোলাহল শুনিতে পাই।"
পরবর্তীতে তাঁর সেই ইচ্ছা পূর্ণ হয়, কারণ তাঁর সমাধিস্থলেই প্রতিষ্ঠিত হয় পানিহাটি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। এই তথ্য জনসমক্ষে আসে অনেক পরে, যখন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অমলেন্দু দে মহাশয় এটি আবিষ্কার করেন।
আজ তাঁর স্মৃতিকে ধরে রাখতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে নানা প্রতিষ্ঠান ও সম্মাননা। ২০০৮ সালে রংপুরে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরণ করা হয় 'বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়'। রংপুরের পায়রাবন্দে তাঁর পৈতৃক ভিটায় গড়ে উঠেছে 'বেগম রোকেয়া স্মৃতি কেন্দ্র'। বাংলাদেশ সরকার প্রতিবছর ৯ ডিসেম্বর প্রদান করে 'বেগম রোকেয়া পদক'। তাঁর জন্ম ও মৃত্যুদিবসটি আজ পালিত হয় 'রোকেয়া দিবস' হিসেবে।
সকল সামাজিক ও পারিবারিক বাধা সত্ত্বেও বেগম রোকেয়া ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে গিয়েছিলেন। নিজ প্রচেষ্টায় বিদ্যা অর্জন করেছেন; সাহিত্য রচনা করেছেন; নারীশিক্ষা ও সমাজ সংস্কারে অসামান্য ভূমিকা রেখেছেন। তাঁর জীবনের প্রতিটি পরতে ধৈর্য, শৌর্য, সংযম, আত্মগরিমা, দায়িত্বশীলতা, কর্তব্যপরায়ণতা ও স্নেহের ছাপ অঙ্কিত। তাই আজও তিনি বাঙালি তথা বিশ্বের কাছে প্রাতঃস্মরণীয়।
লেখিকা একজন পশুপ্রেমী। ভালোবাসেন আঁকতে, বাগান করতে, এবং অনাথ আশ্রম ও বয়স্ক কেন্দ্রে গিয়ে সেবা করতে। স্বপ্ন দেখেন গাছপালার জন্য নার্সারী, পশুপাখিদের জন্য শেল্টার, এবং বয়স্ক আশ্রয়হীনাদের জন্য বৃদ্ধাবাস গড়ে তোলার। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করে বর্তমানে একটি বেসরকারি প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকতা করছেন। বহু পত্রপত্রিকায় লিখেছেন, পুরস্কৃত হয়েছেন। মঞ্চস্থ হয়েছে তাঁর তিনটি নাটক। কলকাতা বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে কবিতার বই।