একসময় বাঙালি খোঁজা আর জানার কাজটা করত বইয়ের পাতা উল্টে। অভিধান আর বিশ্বকোষ প্রায় সব ছাত্রছাত্রীর বাড়িতেই থাকতো। আজ চোখের পলকে সার্চ ইঞ্জিনে সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়। এছাড়া চ্যাটজিপিটি বা জেমিনাই-এর মতো এলএলএম তো আছেই। ইন্টারনেটের কৃপায় কবে একাদশী, কখন সূর্যগ্রহণ, কাল বৃষ্টি হবে কি না, শুভদিন কবে — এসব কিছুর উত্তরও কয়েক সেকেন্ডেই মোবাইল স্ক্রিনে হাজির।
কিন্তু একটা সময় বহু বাঙালি বাড়িতে এই কাজটা করত পঞ্জিকা।
গোলাপি মলাটের মাঝের পাতাগুলো ছিল একেবারে বহুপযোগী তথ্যভাণ্ডার। সেখানে তিথি-নক্ষত্র তো থাকতই, সঙ্গে থাকত রাশিফল, পূজার সময়সূচি, গ্রহণের খবর, শুভক্ষণ, এমনকি কখনও ট্রেনের সময়, আয়ুর্বেদিক তেলের বিজ্ঞাপন, জ্যোতিষীর প্রচার বা গোপন রোগের কবিরাজি ওষুধের হদিশও। মানে, একই বইয়ের মধ্যে আজকের গুগল, আবহাওয়া দপ্তর, জ্যোতিষ অ্যাপ আর ফেসবুক বিজ্ঞাপন — সব একসঙ্গে!
সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, বাড়ির সবচেয়ে কম প্রযুক্তি-জানা মানুষটিই সাধারণত পঞ্জিকার সবচেয়ে বড় বিশেষজ্ঞ হতেন। দাদু বা ঠাকুমা পাতা উল্টে মুহূর্তের মধ্যে বলে দিতেন — “আগামী মঙ্গলবার যাত্রা নেই, অশুভ।”
আর পঞ্জিকা নিয়ে বাঙালির আবেগও ছিল প্রবল। কোনো বাড়িতে গুপ্ত প্রেস ছাড়া পঞ্জিকা ঢুকত না, কোথাও আবার পি এম বাগচীই শেষ কথা। যতদূর মনে পড়ছে, আমাদের বাড়িতে আসত বেণীমাধব শীলের ফুল পঞ্জিকা।
পুরোহিতরাও অনেক সময় নিজেদের পছন্দের পঞ্জিকা নিয়েই অটল থাকতেন। তিথি নিয়ে মতভেদে অনেক সময় একই পাড়াতেই আলাদা সময়ে লক্ষ্মীপুজো হয়ে যেত। একই উৎসবের দিনে কারও বাড়িতে প্রসাদ খাওয়া শেষ, ওদিকে পাশের বাড়িতে তখনও পাঁচালি পড়া চলছে।
ছোটবেলায় পঞ্জিকার শেষ পাতাগুলো উল্টে শরীরের কোন অংশে টিকটিকি পড়লে তার কী প্রভাব জেনে খুব মজা পেতাম। যদিও বাড়িতে পঞ্জিকা ওই তথ্য জানার জন্য আসত না। তবে গোলাপি মলাটের ওই বইটাই একসময় বহু বাঙালির ‘গুগল’ ছিল।
১৪৩৩-এ পঞ্জিকা কিনেছেন নাকি কেউ?
প্রকাশিত হলো — বাঙালি.নেটওয়ার্ক-এর ❛উদ্যোগ❜ ওয়েব ম্যাগাজিনের বৈশাখ ১৪৩৩ সংখ্যা। নিবন্ধ, তথ্য, ছোট-বড় গল্প, কবিতা, প্রতিচিন্তা ও ধারাবাহিক রচনার সম্ভার নিয়ে।
চলুন, একসাথে পড়ি, ভাবি, আর Glocal বাংলার জন্য Vocal হই।