'চাইল্ডস প্লে' ফ্র্যাঞ্চাইজির হরর সিনেমাগুলো যাঁরা দেখেছেন, তাঁরা হাড় হিম করা সেই পুতুল 'চাকি'র সঙ্গে নিশ্চয়ই পরিচিত। কলকাতার কেওড়াতলা মহাশ্মশানে মহানায়ক উত্তম কুমারের যে আবক্ষ মূর্তিটি বসানো হয়েছে, একটি নিউজ পোর্টালে তার ছবি দেখে সাময়িকভাবে আমার সেই 'চাকি'কে মনে পড়েছিল। সমাজমাধ্যমেও মূর্তিটির সঙ্গে মহানায়কের মুখাবয়বের অসাদৃশ্য নিয়ে ইতিমধ্যেই বিস্তর আলোচনা ও সমালোচনা হয়েছে।
কিন্তু ঘটনাটিকে শুধুই জোকস বা ট্রোলিংয়ের বিষয় হিসেবে দেখলে সম্ভবত মূল প্রশ্নটাই এড়িয়ে যাওয়া হবে।
বাঙালির কাছে উত্তম কুমার শুধু একজন জনপ্রিয় অভিনেতা নন — তিনি কয়েক প্রজন্মের আবেগ, নস্টালজিয়া এবং বাংলা চলচ্চিত্রের সাংস্কৃতিক স্মৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। ফলে তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতে তৈরি একটি মূর্তিতে যদি তাঁর পরিচিত মুখাবয়বই ধরা না পড়ে, তবে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে —
এই ধরনের স্মারক নির্মাণে শিল্পমান যাচাইয়ের প্রক্রিয়াটি ঠিক কী?
এটিকে শুধু বর্তমান প্রশাসনের ব্যর্থতা বলে দায় সেরে ফেললে সমস্যাটির গভীরে পৌঁছোনো যাবে না। কারণ কলকাতা এর আগেও লেকটাউনে স্থাপিত লিওনেল মেসির এমন একটি বহুল আলোচিত মূর্তি দেখেছে। সেটির মুখাবয়ব নিয়েও বিস্তর ঠাট্টা-সমালোচনা হয়েছিল; এবং পরবর্তীকালে মূর্তিটিতে কাঠামোগত ত্রুটিও ধরা পড়ে।
এই ঘটনাগুলো তাই একটি বৃহত্তর প্রশ্ন সামনে আনে — পাবলিক আর্টকে আমরা কি নিছক আর পাঁচটি সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক কাজের মতো করেই দেখি?
একটি রাস্তার ছোটোখাটো মেরামত, চেয়ার কেনা কিংবা সাধারণ নির্মাণসামগ্রীর বরাতের সঙ্গে একটি ভাস্কর্য তৈরির মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। শিল্পকর্মে শুধু খরচ নয়, শিল্পীর দক্ষতা, পূর্ববর্তী কাজ, নান্দনিক বোধ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মুখাবয়ব ধরার ক্ষমতা, ব্যবহৃত উপাদান, স্থায়িত্ব এবং প্রকল্প সম্পন্ন করার জন্য প্রয়োজনীয় সময় সবকিছুকেই গুরুত্ব দিতে হয়। এমন প্রকল্পে যদি কেবল 'L1' পদ্ধতি বা সর্বনিম্ন দরকে অন্ধভাবে প্রাধান্য দেওয়া হয়, তবে তার ফল বিপজ্জনক হতে পারে। কারণ সবচেয়ে কম টাকায় কাজটি কে করতে পারবেন এবং সবচেয়ে ভালো শিল্পকর্মটি কে তৈরি করতে পারবেন — এই দুটি প্রশ্নের উত্তর সবসময় একই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নয়।
তার সঙ্গে রয়েছে ডেডলাইনের চাপ। একটি বৃহৎ ভাস্কর্যে জটিল অ্যানাটমি, প্রাথমিক মডেল, স্কেলিং, কাঠামোগত নকশা, মোল্ডিং, কাস্টিং এবং ফিনিশিং — প্রতিটি পর্যায়ের জন্যই যথেষ্ট সময় প্রয়োজন। কাজ শেষ করার তারিখ আগে ঠিক করে দিয়ে শিল্পী ও কারিগরদের অবাস্তব সময়সীমার মধ্যে ঠেলে দিলে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত শিল্পমান কিংবা নিরাপত্তা — দুই ক্ষেত্রেই পড়তে পারে। যেমন লিওনেল মেসির মূর্তিটিকে প্রবল হাওয়ায় দুলতে দেখা যাওয়ার পর স্থানীয় বাসিন্দারা নিরাপত্তা নিয়ে অভিযোগ জানান। পিডব্লিউডি-র পরিদর্শনে কাঠামোগত সমস্যা ধরা পড়ায় উদ্বোধনের প্রায় সাড়ে পাঁচ মাসের মধ্যেই মূর্তিটি সরিয়ে নেওয়া হয়। ৭০ ফুট উঁচু সেই মূর্তিটি মাত্র ২৭ দিনে তৈরি করা হয়েছিল!
তাই এই ধরনের পাবলিক আর্টের ক্ষেত্রে শুধু Lowest Bidder নয়, Best Value-কে গুরুত্ব দেওয়ার সময় এসেছে। শিল্পীর পোর্টফোলিও, কাজের অভিজ্ঞতা, একটি স্বাধীন বিশেষজ্ঞ কমিটির মূল্যায়ন, প্রস্তাবিত মডেলের অনুমোদন এবং প্রয়োজনে স্ট্রাকচারাল রিভিউ — সব মিলিয়ে একটি স্বচ্ছ নির্বাচনপ্রক্রিয়া তৈরি করা যেতে পারে। আরও একটি পথ হতে পারে স্বীকৃত ভাস্কর, শিল্পীসমষ্টি বা আর্ট ইনস্টিটিউটের কাছ থেকে সরাসরি কনসেপ্ট প্রোপোজাল আহ্বান করা। তবে সেখানেও নির্বাচন অবশ্যই হতে হবে স্বচ্ছ, প্রতিযোগিতামূলক এবং পক্ষপাতহীন।
কারণ জনপরিসরে স্থাপিত একটি মূর্তি শুধু পাথর, ধাতু বা ফাইবারের তৈরি কোনো বস্তু নয়। সেটি শহরের দৃশ্যমান সাংস্কৃতিক স্মৃতির অংশ হয়ে যায়। সেখানে যাঁকে সম্মান জানানো হচ্ছে, তাঁর প্রতি সম্মান যেমন জরুরি, তেমনই জরুরি শিল্পীর প্রতিও যথাযথ সম্মান, উপযুক্ত পারিশ্রমিক, স্বাধীনতা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, কাজটি ঠিকমতো করার মতো সময়।
প্রকাশিত হলো — বাঙালি.নেটওয়ার্ক-এর ❛উদ্যোগ❜ ওয়েব ম্যাগাজিনের ভাদ্র ১৪৩৩ সংখ্যা। বর্ষা এখনও বিদায় নেয়নি, অথচ বাতাসে এসে গেছে ঋতুবদলের আভাস। এই সংখ্যাতে শব্দ আর ভাবনা মিলিয়ে ধরা রইল সময়ের সেই সন্ধিক্ষণ।
চলুন, একসাথে পড়ি, ভাবি, আর Glocal বাংলার জন্য Vocal হই।