তারা ও রবি — এরা দুজন দুই মেরুর মানুষ। আজকের গল্পটা এদের দুজনকে নিয়ে। তারা আমার ভীষণ কাছের মানুষ, রবিও কিছু কম যায় না।
পঞ্চকপুরে তারার বাড়ি আর রবির বাড়ি বীরপাড়া। কর্মসূত্রে ব্যাঙ্গালোরের একটি ইন্টারন্যাশনাল কোম্পানিতে দুজনেই কর্মরত, কাজের সুবাদেই আলাপ তাদের। তারা ভীষণ রাগী, অহংকারী, একরোখা একটি মেয়ে। কাজ ছাড়া সে কিছুই বোঝে না। এই যে বলছি একরোখা, অহংকারী — এসব কিন্তু রবির বলা উক্তি, আমার নয়।
তারাকে বিশেষ কাজ ছাড়া কারও সঙ্গে খুব একটা কথা বলতে দেখা যায় না, নিজের ফ্ল্যাটে নিজের মতোই থাকে। রবি ঠিক তার উল্টো। কাজ নিয়ে কখনোই কোনো প্রকার মাথাব্যথা নেই তার, করতে হয় তাই করছে — এমনটাই। বেশিরভাগ সময়ই কাজের পর বন্ধুদের সঙ্গে পার্টি করতেই ব্যস্ত থাকে, বেশ কিছু মেয়েবন্ধবীও রয়েছে রবির। তবে একটা মিল আছে এদের মধ্যে — এরা দুজনেই পরিবার অন্তঃপ্রাণ।
কাজের ব্যস্ততার মাঝে রবির তারার সঙ্গে সেইভাবে আলাপ করে ওঠা হয়নি, তারার অবশ্য সেই দিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। রবিও ছাড়বার পাত্র নয়। অফিসের সব মেয়েদের সঙ্গে তার আলাপ থাকা চাই। তাই রবি একদিন ঠিক করল, তারাকে কফি খেতে নিয়ে যাবে, সেই সুযোগে তারার সঙ্গে আলাপটা সেরে নেবে। তারা প্রস্তাবটি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে না করে দিল। রবিও রেগেমেগে অফিস থেকে আড্ডাতে চলে গেল।
সেই আড্ডাতে ছিলাম আমরা কয়েকজন। ও যা, আমার পরিচয়টিই দেওয়া হয়নি। আমি শ্রীপর্ণা। তারা আমার সব থেকে কাছের একজন বান্ধবী আর রবির সঙ্গে আলাপ এই ব্যাঙ্গালোরে এসে। রবি রেগেমেগে আড্ডাতে এসে সবার সামনে বলতে শুরু করল, তারা ভীষণ রাগী, জেদি, বাজে মেয়ে। আমি তখনই রবিকে থামিয়ে দিই, “যেটা জানিস না, সেটা নিয়ে কথা না বলাই ভালো। কতটা চিনিস তুই তারাকে? কতটা জানিস ওর সম্পর্কে? তাই বলছি, চুপ কর। যার সম্পর্কে কিছুই জানিস না, তার সম্পর্কে এতটা মন্তব্য করা ঠিক নয়।”
রবি ঠিক বুঝতে পারছিল না আমার কী হলো, তারার কথাগুলো শুনে এতটা রেগেই বা গেলাম কেন? আমিও পরে ভেবেছি, হয়তো একটু বেশি বলে ফেলেছি আজকে। পরদিন অফিস গিয়ে তারার মুখে শুনি, রবি তারার কাছে এসে ক্ষমা চেয়েছে। তারাকে কেমন যেন বিধ্বস্ত দেখাচ্ছিল। আমি যতটা চিনি তারাকে, এই অফিসের কেউই সেরকমভাবে তারাকে চেনে না।
“কিছু কি হয়েছে তোর? ঠিক আছিস তো?”
কোনো উত্তর না দিয়ে উঠে চলে গেল তারা। আমারও একটা জরুরি ফোন আসায় তখন আর বিষয়টা নিয়ে সেইভাবে আলোকপাত করা হলো না। পরের দিন অফিসে গিয়ে দেখি তারা অফিসে আসেনি। পরে একজনের কাছ থেকে শুনতে পারি, তারা কয়েক দিনের জন্য ছুটি নিয়েছে। এরই মধ্যে রবিও তারার কথা ভুলে যায়।
কিছুদিন ধরে রবি দেখছে তারা অফিসে আসে না। ও ভাবতে শুরু করে, তারা তো এমন করবার মেয়ে নয়। কৌতূহলে আমাকে জিজ্ঞাসা করে। আমিও কিছুটা অপ্রস্তুত হয়েই জানাই, আমি ঠিক জানি না। রবি সেই দিন আর আড্ডায় যায়নি। শুধুমাত্র তারার কথাই ভাবতে থাকে। কেমন যেন বদলে যেতে থাকে রবিও। কারও ভাবনা রবিকে আগে কখনো এতটা বিচলিত করেনি, যতটা তারার ভাবনা করেছে। রবি একটা কথাই বারবার ভাবছে — তারা আমাকে সেই দিন কী বলছিল?
এমন করে দুই সপ্তাহ কেটে গেল, কিন্তু তারা অফিসে আসেনি। রবি সবাইকে জিজ্ঞাসা করছিল তারার কথা। সবাই বলাবলি করছে, তারা চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছে। এটা শুনে রবি নিজের মনের অজান্তেই কষ্ট পায়। সে আর বন্ধুদের আড্ডায় যায় না। অফিসের পরে রবিকে কেউ দেখতে পায় না।
আমি একদিন রবিকে কল করে আড্ডায় আসতে বলি, কিছু জরুরি কথা আছে তারার ব্যাপারে। রবি তারার কথা শুনে তাড়াতাড়ি চলে আসে আড্ডায়। এসেই আমাকে জিজ্ঞাসা করে, “কী কথা আছে? আর তারা কোথায়?”
রবি আমাকে আবারও জিজ্ঞাসা করল, “ও এখন কোথায়?”
বললাম, “আমার সঙ্গে, আমার কাছে আছে। আমি যদি আমার কাছে এনে ওকে না রাখতাম, তাহলে হয়তো ওকে আজকে বাঁচাতেই পারতাম না। আমি বেশিক্ষণ থাকতে পারব না, ও একাই আছে। আমি উঠি আজ, কাল অফিসে দেখা হচ্ছে।”
রবিও আর বসে থাকতে পারল না। তারার চিন্তা করতে করতে রবিও তার রুমে চলে গেল। সারারাত রবি বসেই কাটিয়ে দিল। সকালে অফিসে আসতেই ও আমার খোঁজ করতে শুরু করল। রবিকে দেখেই মনে হচ্ছিল যে সারারাত ও ঘুমায়নি। কী অবস্থা হয়েছে এক রাতের মধ্যে!
“রবি, তুই ঠিক আছিস তো?”
ও উত্তর করল, “তারা কেমন আছে?”
আমি বুঝতে পারলাম ওর এই অবস্থা হওয়ার পেছনে কারণটা কী।
“তারা ঠিক নেই রে। আমি চেষ্টা করছি ওকে যতটা সম্ভব ঠিক রাখার।”
রবি বলল, “আমি কি একটিবার ওর সঙ্গে দেখা করতে পারি?”
“হ্যাঁ, পারিস। তবে ও কিছুটা স্বাভাবিক হোক, তারপর।”
কিছুতেই মন মানছে না রবির। সে বলল, “অন্তত ফোন নম্বরটা দে।”
“না, আমি ওর সামনে তোকে কল করে ডেকে নেব। তুই চলে আসিস, কেমন?”
কথাগুলো চলতে চলতে হঠাৎই একটা ফোন আসে আমার ফোনে। আমি ছুটে সেখান থেকে চলে যাই। রবি কখন আমার পেছন পেছন এসেছে, আমি লক্ষ্য করতেই পারিনি। ফোনটা এসেছিল তারার ফোন থেকে। পরবর্তী মুহূর্তের জন্য আমরা মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। গিয়ে দেখি, তারা মেঝেতে পড়ে রয়েছে জ্ঞান হারিয়ে। রবি এক মিনিটও দেরি না করে অ্যাম্বুলেন্সে খবর দেয় আর সব থেকে কাছের হাসপাতালে নিয়ে যায়। ডাক্তার দেখে বলে, “ভয়ের কিছুই নেই এখন। কিন্তু খুব খারাপ কিছু একটা হবার থেকে বেঁচে গেছে। ওনাকে কখনোই একা একা রাখা যাবে না।”
রবি জিজ্ঞাসা করল, “হঠাৎ ও এমন করে অজ্ঞান কেন হয়ে গিয়েছিল?”
ডক্টর বলল, “ভীষণ রকম প্যানিক অ্যাটাকের ফলে এটা হয়েছে। কিন্তু উনি এমন অবস্থায় থাকলে বেশিদিন কেউ বাঁচাতে পারবেন না ওনাকে। তাই চেষ্টা করুন ওনার কষ্টগুলো বোঝার আর সেখান থেকে বার করে আনার।”
রবি ডক্টরের সবরকম ফর্মালিটি মিটিয়ে তারাকে ছুটি করিয়ে তার নিজের ফ্ল্যাটে নিয়ে আসে। তারা রবিকে জিজ্ঞাসা করল, “আমাকে তোমার বাড়িতে কেন নিয়ে এলে?”
রবি বলল, “অনেক গল্প করতে। আসলে আমার না ভীষণ একা একা লাগছে। আর তুমি ছাড়া কোনো বন্ধুর কাছে এতটুকু টাইম নেই আমাকে দেওয়ার মতো। তাই তোমাকে নিয়ে এলাম। তোমার যদি খুব খারাপ লাগে, তাহলে আমি তোমায় শ্রীপর্ণার কাছে রেখে আসব। আশা করি তোমার এখানে কোনো অসুবিধা হবে না।”
তারা বলল, “আমি তোমাকে তুই করে বললে কোনো আপত্তি আছে?”
“যথা আজ্ঞা ম্যাডামজি! হা! হা! হা!”
তারা দেখছে চারপাশটা সবকিছু ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে আর বলছে, “কী রে, কীভাবে এত অগোছালো হয়ে থাকিস?”
রবি তারার দিকে তাকিয়ে বলল, “আমার না হয় ঘরটা, আর তোর? তুই আমার ঘরটা গোছাচ্ছিস, আমি কী করে তোর মনটা গোছাব, বলতে পারিস?”
তারা চুপ হয়ে যায়। বেশ কিছুক্ষণ নীরব। আশপাশটা যেন মনে হচ্ছে একটা ভিডিও বোধহয় থামিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিছুক্ষণ পর তারা বলে ওঠে, “কিছু অগোছালো জিনিস কখনোই গোছানো যায় না রে! চল, আজ মন্দিরে যাই, ঘুরে আসি। আজ তো শ্রীপর্ণারও ছুটি, ওকেও ডেকে নে, কেমন?”
বেশ লাগছিল। কিছুদিন বেশ কাটল। তারাও কিছুটা স্বাভাবিক হচ্ছিল। রবি একদিন তারার ঘরে এসে বলে, “অনেকদিন তো হলো, অফিসটা এবার জয়েন করে নে।”
তারা বলে, “ভাবছি বাড়ি থেকে ঘুরে এসে একেবারেই জয়েন করি। অনেকগুলো ছুটি পড়ে আছে।”
রবি কিছুই হ্যাঁ-না বলে চলে যায় তারার ঘর থেকে। আর ভাবতে থাকে, আসলে কী হয়েছিল তারার? ও কেন এমন হয়ে গিয়েছিল? আমি তো আজও জানি না।
আজ অফিসে এসে রবি আমাকে জিজ্ঞাসা করে বসে, “তুই তো তারার সব থেকে কাছের একজন। তুই কি জানিস ওর কী হয়েছিল? কেন ও এতটা আলাদা আমাদের থেকে?”
আমি আর তারা অনেক ছোটবেলার বন্ধু, ক্লাস ওয়ান থেকে একসঙ্গে। ও ভীষণ নরম স্বভাবের একটি মেয়ে। কলেজে সেকেন্ড ইয়ারে আমরা তখন, ও জীবনে প্রথম প্রেমে পড়ে। আগে তেমন কোনো ছেলের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে ওকে দেখিনি, তবে সুজনদাকে ভীষণ ভালোবেসে ফেলে। সুজনদা আমাদের কলেজের সিনিয়র। তারা সুজনদাকে ছাড়া কিছুই বুঝত না, তেমনি সুজনদাও। একটা সময় তাদের সম্পর্কের কথা বাড়িতে জানাজানি হয়। তারার বাড়ি থেকে তেমন কোনো আপত্তি ছিল না। সুজনদার বাড়িতেও সবাই রাজি। শুধুমাত্র সুজনদার মা একটু আপত্তি করেছিলেন, কারণ তাঁর ছেলের বউ টুকটুকে ফর্সা হতে হবে আর তারার গায়ের রং একটু চাপা। তবে এতে সুজনদার কোনো অসুবিধাই ছিল না। কথা এগোল। মোটামুটিভাবে বিয়ের কথা ঠিকঠাক। আমরা খুব খুশি এই ভালোবাসার পরিণতি দেখে।
একদিন ক্লাস শেষ করে বাড়ির দিকে ফিরছিলাম আমরা। হঠাৎই সুজনদা এসে তারাকে ডাকল একটু আলাদা কথা বলতে। আমি ভাবলাম, সামনে বিয়ে, হয়তো কিছু ব্যক্তিগত কথা আছে। সেই দিন সুজনদা একটা প্রস্তাব দেয় তারাকে। বলে যে, “আর মাত্র কিছুদিন বাকি বিয়ের। আমি তার আগে তোমার সঙ্গে একটিমাত্র রাত কাটাতে চাই।”
তারা ভেবেছিল, এতদিনের সম্পর্ক, সুজন আমার কাছে কিছুই তেমন চায়নি, আর কিছুদিন পর তো সবটা দিতেই হবে, তাহলে এখন দিতে ক্ষতি কী? তারা রাজি হয়ে যায়। সুজনদা বলে, “তবে আজই চলো আমার সঙ্গে আর বাড়িতে বলো, শ্রীপর্ণার সঙ্গে ওর বাড়িতে থাকবে।”
তারাও তাই করল। এই বিশ্বাস, ভালোবাসাটা দেখে আমারও ভীষণ ভালো লাগল। সঙ্গে একবার এটাও মনে হচ্ছিল, হঠাৎ সুজনদার এই ইচ্ছেটা হবার কারণ কী? তবে এই ব্যাপারটা খুব একটা আমায় ভাবায়নি। ওরা কোথায় ছিল সেই দিন, আমি জানি না আজও।
তার একদিন পর তারা কাঁদতে কাঁদতে আমায় ফোন করে বলে দেখা করতে। কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না, কেন, কী হলো হঠাৎ করে? তারপর ওর সঙ্গে দেখা হয় বিকেলে আমার। ও দেখা করে বলে, “আমার বিয়ের আর ২৭ দিন বাকি। সুজন বলছে, ও আমাকে বিয়ে করতে পারবে না।”
আমি কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না এই কথাটা। বলছিলাম, “আমাকে বোকা বানিয়ে কী মজা পাচ্ছিস, বল না!”
এই কথাটা শুনে আমার চারপাশটা অন্ধকার হয়ে আসে। বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না এটা সুজন আমাকে বলল। কিছুতেই ভাবতে পারছিলাম না। পরে বুঝলাম, ওটা সুজনই বলছে। ওর নাকি আমার সঙ্গে সময় কাটিয়ে ভালো লাগেনি। আমাকে কী করে ও বিয়ে করে সারাজীবন কাটাবে — এটাই নাকি বিয়ে না করার আসল কারণ।”
আমি নিজের চোখের জল সেই দিন ধরে রাখতে পারিনি। বারবার বলছিলাম, “আমি কি একবার বলে দেখব?”
ও বলল, “কোনো লাভ হবে না রে, ছেড়ে দে।”
আমি এই জবটা পাই তারার জন্যই। পরীক্ষার ফর্ম ফিলাপের টাকাটা দিয়েছিল তারাই আমাকে। জবটা পাওয়ার পর আমি চেষ্টা করি ওকে এখানে নিয়ে চলে আসার। বিয়ের দিনটা এল, কিন্তু সেই দিন কোনো বিয়ে হয়নি। কিছুদিনের মধ্যে আমি তারাকে এখানে নিয়ে চলে আসি। বুঝলি, ওর জীবন কতটা কষ্টের।
রবি বলল, “ও তো বাড়িতে যাবে বলছে। আজকে আমায় বলল, বাড়ি থেকে এসে অফিসে জয়েন করবে। ওকে এখন বাড়ি কিছুতেই যেতে দেওয়া যাবে না। আমার ভীষণ ভয় ওকে নিয়ে। তার থেকে ভালো হবে ওকে নিয়ে বাইরে কোথাও ঘুরে আসি। কী বলিস?”
“এটা আমি বললে হবে না। তুই আজকে আসিস আমার ফ্ল্যাটে, এসে তোর বান্ধবীকে রাজি করাবি।”
আমি ঠিক সময়মতো তারার কাছে চলে আসি। এসে দেখি, ও বাড়ি যাওয়ার জন্য ব্যাগ গুছিয়ে রাখছে। আমি কিছু না জানার ভান করে জিজ্ঞাসা করি, “কোথাও যাচ্ছিস নাকি? ব্যাগ গুছিয়ে রাখলি যে!”
“বাড়ি যাব ভাবছি। কিছুদিন ছুটি রয়েছে।”
“ও আচ্ছা, একা একাই যাবার জন্য তৈরি হচ্ছিস? একটাবার বলা গেল না আমাকে?”
কোনো উত্তর নেই। কিছুক্ষণ পর তারা বলল, “বেশ কিছুদিন হলো যাওয়া হয়নি। তার ওপর ছুটিগুলো পড়ে আছে।”
“আমাদের তো একসঙ্গে যাবার কথা ছিল। তবে আমাকে ছেড়ে একাই কেন? যাই হোক, সাবধানে যাস। আমি চললাম।”
তারা হঠাৎই পেছন থেকে ডেকে আমায় বলল, “তুই কি কিছু বলতে এসেছিলিস আমাকে? কিছু না বলেই চলে যাচ্ছিস যে?”
আমি এই কথাটারই অপেক্ষা করছিলাম।
“না, তেমন কিছু না। তুই তো বাড়ি চলে যাচ্ছিস, আর বলেও কোনো লাভ হবে না।”
“না না, তুই বল না। বাড়ি যাচ্ছি তো কী হয়েছে?”
“না, আসলে ভেবেছিলাম দুদিনের জন্য তোকে নিয়ে কোথাও একটু বেরিয়ে আসব। কিন্তু তুই তো একাই প্ল্যান করে ফেললি বাড়ি যাবার।”
“কে কে যাবি বলে ঠিক করেছিস?”
রবি সবটা বাইরে থেকে শুনছিল। রবি অফিস ছাড়া আর কখনোই খুব একটা কোথাও বের হয় না রুম থেকে এখন। রবি বাইরে দাঁড়িয়ে ভাবছিল, বোধহয় রবিকে নিয়ে যাবে না।
এটা ভাবতে ভাবতেই তারার ডাক আসে। রবি কিছুটা দূরে গিয়ে উত্তর দিল। তারা ওর ঘর থেকে বলছিল, “রবি, একটু আসতে পারবি আমার ঘরে?”
রবি বলল, “আসছি।” বলতে বলতেই রবি হাজির। আমাকে দেখে এমন একটা ভান করল, যেন আমি এসেছি বা আসব — কোনোটাই ওর আগে থেকে জানা ছিল না।
“শ্রীপর্ণা, কখন এলি?”
“এই তো, কিছুক্ষণ হলো।”
এর মাঝেই তারা বলে বসল, “শ্রীপর্ণা একটি বিশেষ আবদার নিয়ে এসেছে। ও চাইছে আমরা তিনজন মিলে কোথাও গিয়ে ঘুরে আসি।”
রবি বলল, “এ তো বেশ ভালো কথা। কোথায় যাবি, কিছু ঠিক করলি? কিন্তু তারা, তুই যে বলেছিলি বাড়িতে যাবি, সেটা?”
রবি ভীষণ খুশি, কিন্তু তারার সামনে সেটা প্রকাশ করার সাধ্য নেই মাত্র।
“চল তাহলে প্ল্যানটা করেই ফেলি। কোথায় যাবি? মানালি? ১০ দিনের একটি ট্রিপ প্ল্যান করে বের হয়ে যাই। মানালি এখান থেকে ২৬৪৬ কিমি দূরত্বে রয়েছে। যেতে দুদিন সময় লাগে। মাঝে চার থেকে পাঁচ দিন ওখানে কাটাব, তারপর সবাই মিলে ব্যাক টু হোম। কী বলিস?”
সবাই খুশি, এটা দেখে তারাও বেশ খুশি। রবি বলছে, “আজকে না খেয়ে যাবি না কিন্তু, শ্রীপর্ণা। আর দেরি না, চল টিকিটগুলো কেটে ফেলি।”
তারা বলল, “আজকে না। তোরা অফিসে যাবার পর আমি কেটে রাখব সব টিকিট। তোরা বসে গল্প কর, আমি দেখি ডিনারে কী করা যায়।”
আমি দেখছি, তারা আগের থেকে অনেকটাই ভালো রয়েছে।
“রবি, একটা কথা তোকে জিজ্ঞাসা করব, কিছু মনে করবি না তো?”
“না না, বলে ফেল। এত ভাবার কী আছে?”
“তুই তারার প্রেমে পড়ে যাসনি তো?”
রবি মোটেও এই প্রশ্নের জন্য তৈরি ছিল না। নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে বলে ওঠে, “ঠিক জানি না। প্রেম নাকি বলতে পারব না। তবে এটা অস্বীকার করতে পারব না, তারাকে ছাড়া এক মুহূর্ত আমার ভালো লাগে না। ও আশেপাশে থাকলেই আমার শান্তি। এটা প্রেম না অন্য কিছু, আমি সত্যি এর ব্যাখ্যাতে যেতে চাই না। আমার কারণে কোনো কষ্ট তারার জীবনে আসুক, এটা আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারব না।”
“আমি যদি বলি, তারাকে বিয়ে করতে, করবি?”
“ওকে জীবনে পেলে আমি নিজেকে ধন্য মনে করব। কিন্তু আমার সাধ্য বা সাহস কোনোটাই নেই তারার সামনে এই কথা বলার। সাহস নেই ওকে হারিয়ে ফেলার।”
তারা সবটাই শুনেছে বাইরে থেকে। কথার মাঝেই তারা ঘরে প্রবেশ করে, “কী রে, চল। যা আছে অল্প করে খেয়ে নিবি, চল।”
রাতের খাবার শেষ করে আমি বলি, “আজ তারা আমার সঙ্গে আমার রুমে চল। দুদিন পর চলে আসিস।”
তারা না করার আগেই রবি “না” বলে বসে। আমি হেসে বলি, “অন্তত আমাকে পৌঁছে দিয়ে আয়, অনেকটাই রাত হয়েছে।”
বেশ চলছিল সম্পর্কগুলো। রবি কখনোই বলে উঠতে পারেনি তারাকে, আর তারাও কখনোই জিজ্ঞাসা করেনি। তবে দুজনে বেশি বুঝত — এরা দুজনেই দুজনের পরিপূরক।
লেখিকা একজন নবীন কবি ও সাহিত্যপ্রেমী। উত্তরবঙ্গের কোচবিহারে তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা। ছোটবেলা থেকেই কবিতা ও সাহিত্যের প্রতি গভীর অনুরাগ। দৈনন্দিন জীবনের অনুভূতি, ভালোবাসা, প্রকৃতি, মানুষের সম্পর্ক ও আবেগকে সহজ ভাষায় প্রকাশ করতে ভালোবাসেন। লাইব্রেরি অ্যান্ড ইনফরমেশন সায়েন্সে স্নাতক। পেশাগত ব্যস্ততার মধ্যেও সাহিত্যচর্চাকে নিজের মনের কাছের জায়গা হিসেবে ধরে রাখতে চান। শব্দের মাধ্যমে নিজের অনুভূতি পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই তাঁর সাহিত্যচর্চার অন্যতম প্রেরণা।
আপনার প্রতিক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
প্রতিক্রিয়া দেওয়ার নিয়ম
আপনি এই সংখ্যায় আপনার পছন্দের সব লেখাতেই প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবেন। তবে একটি লেখায় সর্বোচ্চ ২টি ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেওয়া যাবে। একই লেখায় তৃতীয় প্রতিক্রিয়া নির্বাচন করলে, প্রথমে নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং নতুন প্রতিক্রিয়াটি গণ্য হবে। আপনার প্রতিটি প্রতিক্রিয়া লেখকদের অনুপ্রেরণা জোগায় এবং বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সৃজনশীলতার প্রতি আপনার সমর্থনকে তুলে ধরে।