“এক কোটি তিরিশ লাখ টাকার বাড়িটা যখন ওদের নামে সই করে দিচ্ছিলাম, হাতটা একবারও কাঁপেনি অণিমেষ... আজ সকাল থেকে শুধু হাত দুটো কাঁপছে।”
পুরুলিয়া স্টেশনের তিন নম্বর প্ল্যাটফর্মের এক কোণে ধোঁয়া ওঠা চায়ের ভাঁড় হাতে কথাটা বললেন সত্তরের কোঠা পেরোনো এক প্রবীণ মানুষ। কাঁধে জীর্ণ একটা থলে, গায়ে ময়লা ফতুয়া।
অণিমেষবাবু আজকের বিকেলটা শুরু করেছিলেন খুব সাধারণভাবে। পুরুলিয়ার এক প্রত্যন্ত গ্রামের অনাথ শিশু ও বৃদ্ধদের আশ্রম ‘স্নেহনীড়’-এ একটা ছোট্ট কাজে এসেছিলেন। অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মী তিনি, সামান্য পেনশনের টাকা থেকে মাসে তিন হাজার টাকা এই আশ্রমে দেন। আজ স্বচক্ষে আশ্রমটা ঘুরে দেখে তৃপ্ত মনে যখন স্টেশনে ফিরতি ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছিলেন, ঠিক তখনই চোখ পড়ে প্ল্যাটফর্মের একটি বেঞ্চে। সেখানে বসে থাকা তাঁরই বয়সী এক ভদ্রলোককে দেখে অণিমেষবাবুর খুব চেনা চেনা লাগে। কৌতূহলবশত তিনি এগিয়ে যান সেই ভদ্রলোকের দিকে। কাছে গিয়ে পরিচয় করতেই আস্তে আস্তে প্রকাশ পায়, সেই ভদ্রলোক আর কেউ নন, অণিমেষবাবুর কলেজের সহপাঠী অঙ্কূর দত্ত, এককালের শহরের বিখ্যাত সিভিল ইঞ্জিনিয়ার! যিনি একসময় শহরের নামজাদা আবাসন তৈরি করতেন, আজ তিনি একলা, নিঃস্ব হয়ে স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে!
“কী বলছিস তুই এসব অঙ্কূর?” — অণিমেষবাবু চায়ের ভাঁড় ফেলে দিয়ে বন্ধুর দুটো হাত চেপে ধরলেন। “তোর সেই সল্টলেকের তিনতলা বাড়ি, নিউ টাউনের ফ্ল্যাট... তুই তোর ছেলে-মেয়ের নামে আইনিভাবে লিখে দিয়েছিস?”
অঙ্কূরবাবু হাসলেন। “লিখে দিয়েছিলাম তিন মাস আগে। ভেবেছিলাম, জীবনের বাকি কটা দিন ছেলে আর মেয়ের সঙ্গে কাটাব। নিজের উপার্জনের সবটা ওদের হাতে তুলে দিয়ে ভেবেছিলাম, আমি তো ওদের বাবা, আমাকে আর কে আটকায়? কিন্তু ভিটেমাটি হারিয়ে বুঝলাম, কাগজে সই শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাবাও ওদের কাছে ‘বোঝা’ হয়ে গেল।”
অঙ্কূরবাবুর কণ্ঠস্বরে কোনো রাগ ছিল না, ছিল এক অগাধ অভিমান আর ক্লান্তি।
যে বাড়িটা আমি নিজের রক্ত জল করে বানিয়েছিলাম, শেষপর্যন্ত সেই বাড়ির এক কোণেই আমি অতিরিক্ত হয়ে গেলাম। আজ সকালে কাউকে কিছু না জানিয়ে ঘরের চাবিটা টেবিলে রেখে বের হয়ে পড়েছি।”
অণিমেষবাবুর বুকের ভেতরটা যেন দুমড়ে-মুচড়ে গেল। “তাহলে তুই এখন কোথায় যাবি অঙ্কূর? এই বয়সে তুই কোথায় মাথা গুঁজবি?”
অঙ্কূরবাবু নিজের থলে থেকে একটা দুমড়ানো খবরের কাগজের টুকরো বের করে দেখালেন। “আজ সকালে ট্রেনে আসার সময় কাগজের এই বিজ্ঞাপনটা দেখলাম। পুরুলিয়ার ‘স্নেহনীড়’ নামের একটা অনাথ ও বৃদ্ধাশ্রম। নিঃস্ব ও আশ্রয়হীন প্রবীণদের ওরা নাকি বিনামূল্যে ঠাঁই দেয়। অণিমেষ, আমি আর কারও করুণা চাই না। কোনো বন্ধুর ওপর বোঝা হতে চাই না। জীবনের শেষ কটা দিন এই আশ্রমে কাটাতে পারলেই আমি শান্তিতে মরতে পারব।”
‘স্নেহনীড়’!
নামটা শুনতেই অণিমেষবাবুর গায়ের লোম খাড়া হয়ে উঠল। মাথার ভেতরটা যেন একমুহূর্তে ফাঁকা হয়ে গেল। ‘স্নেহনীড়’? যে আশ্রম থেকে মাত্র আধ ঘণ্টা আগে তিনি নিজে হেঁটে এলেন?
অণিমেষবাবুর চোখের সামনে ভেসে উঠল আজকের বিকেলের ঘটনাটা। আশ্রমের পরিচালক দেবব্রতবাবু যখন তাঁকে পুরো ক্যাম্পাসটা ঘুরে দেখাচ্ছিলেন, তখন দোতলার প্রবীণ নিবাসের সামনে দাঁড়িয়ে কথা হচ্ছিল। অণিমেষবাবু জিজ্ঞেস করেছিলেন, “দেবব্রতবাবু, এই প্রত্যন্ত গ্রামে এত বড় আশ্রম, এতগুলো অনাথ শিশু আর বৃদ্ধদের নিখরচায় থাকা-খাওয়া, চিকিৎসার খরচ আপনারা চালান কীভাবে?”
দেবব্রতবাবু হেসে উত্তর দিয়েছিলেন, “সবটাই এক মহৎ মানুষের কৃপায়, অণিমেষবাবু। উনি নিজের বেতনের আর পেনশনের একটা বড় অংশ প্রতি মাসে আমাদের কাছে পাঠাতেন ওঁর এক পরিচিতের মাধ্যমে। উনি নিজে কোনোদিন এখানে আসেননি, কারণ উনি প্রচারে বিশ্বাসী নন। কোনোদিন নিজের নাম প্রকাশ করতে দেননি। আজ আমাদের আশ্রমে যে নতুন তিনতলা বৃদ্ধাবাস আর বাচ্চাদের পড়াশোনার বিল্ডিং দেখছেন, তার সবটাই ওঁর এক লপ্তে দেওয়া কয়েক লাখ টাকার অনুদানে তৈরি।”
অণিমেষবাবু তখন পরিচালকের টেবিলে থাকা ডোনার লিস্টের সেই পুরোনো ফাইলটার দিকে ভালো করে তাকাননি। কিন্তু এখন অঙ্কূর দত্তের কথাগুলো আর খবরের কাগজের কাটিংটা মেলাতেই অণিমেষবাবুর সামনে সত্যটা যেন এক লহমায় উন্মোচিত হয়ে পড়ল। অঙ্কূরবাবু চাকরিজীবনে নিজের বেতনের আর পেনশনের সিংহভাগ সঞ্চয় নিঃশব্দে সমাজসেবায় দান করে তৈরি করেছিলেন এই ‘স্নেহনীড়’ আশ্রম! অঙ্কূরবাবু নিজের সন্তানকে অঢেল সম্পদ দিয়েছিলেন, কিন্তু সমাজের জন্য যা করেছিলেন, তা রেখেছিলেন একেবারে গোপনে। তিনি নিজেই জানেন না যে, আজ সন্তানরা তাড়িয়ে দেওয়ার পর খবরের কাগজে যে ‘স্নেহনীড়’-এর বিজ্ঞাপন দেখে তিনি আশ্রয় নিতে আসছেন — সেই আশ্রমের আসল প্রাণপুরুষ আসলে তিনি নিজেই!
অণিমেষবাবুর চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। তিনি হঠাৎই প্ল্যাটফর্মের ভিড়ের মাঝেই অঙ্কূরবাবুকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন।
“তুই কাঁদছিস কেন অণিমেষ?” — অঙ্কূরবাবু অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন।
অঙ্কূরবাবু থমকে গেলেন। চশমার কাচের পেছন থেকে ওঁর কোটরগত চোখ দুটো বড় বড় হয়ে উঠল। “তুই... তুই কী বলছিস অণিমেষ?”
অণিমেষবাবু এক নিঃশ্বাসে দেবব্রতবাবুর সঙ্গে হওয়া বিকেলের কথোপকথন আর সেই ট্রাস্টের কথা সব খুলে বললেন। কানের কাছে ট্রেনের বিকট বাঁশির শব্দটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। স্টেশনের আলোয় দাঁড়িয়ে থাকা দুই প্রবীণ মানুষের মধ্যে তখন এক শ্মশান-নীরবতা।
অঙ্কূরবাবু আস্তে আস্তে নিজের কাঁধের থলেটার দিকে তাকালেন, তারপর তাকালেন আকাশের দিকে। তাঁর চোখ দুটো জলে ভেসে যাচ্ছিল, কিন্তু সেই জলের মধ্যে ছিল না কোনো হাহাকার বা অপমান। সেখানে খেলা করছিল এক স্বর্গীয় প্রশান্তি। নিজের রক্তের সম্পর্ক হয়তো আজ তাঁকে অপ্রয়োজনীয় করে দূরে ঠেলে দিয়েছে, কিন্তু তাঁর হাত দিয়ে নিঃস্বার্থভাবে করে যাওয়া কাজগুলো আজ তাঁর সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে এক বিশাল পরিবার—যেখানে কেউ তাঁকে বের করে দেবে না, বরং জ্বেলে রাখবে শ্রদ্ধার প্রদীপ।
দূরে ট্রেনটা এসে থামল।
অণিমেষবাবু বন্ধুর হাতটা চেপে ধরে হেসে বললেন, “চল অঙ্কূর, তোকে তোর নিজের স্নেহের নীড়ে পৌঁছে দিয়ে আসি...”
আপনার প্রতিক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
প্রতিক্রিয়া দেওয়ার নিয়ম
আপনি এই সংখ্যায় আপনার পছন্দের সব লেখাতেই প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবেন। তবে একটি লেখায় সর্বোচ্চ ২টি ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেওয়া যাবে। একই লেখায় তৃতীয় প্রতিক্রিয়া নির্বাচন করলে, প্রথমে নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং নতুন প্রতিক্রিয়াটি গণ্য হবে। আপনার প্রতিটি প্রতিক্রিয়া লেখকদের অনুপ্রেরণা জোগায় এবং বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সৃজনশীলতার প্রতি আপনার সমর্থনকে তুলে ধরে।