গতকাল দুম করে একটা ছুটির অ্যাপ্লিকেশন দিয়ে দিল অনির্বাণ। দিন দশেকের জন্য।
কোলিগরা সব হা হা করে হেসে ওঠে। “তুমি পাগল? এখন জানুয়ারি। এই মাসের শেষেই প্রোমোশন লিস্ট বের হবে। এখন ছুটি নেওয়া মানে নিজের পায়ে কুড়ুল মারা। ভেবে সিদ্ধান্ত নাও।”
অনির্বাণ যে ভাবেনি তা নয়। এমনকি এখনও ভাবছে। কিন্তু সে নিরুপায়। একটা গলা, হারিয়ে যাওয়া হাসিময় রিনরিনে একটা গলা। সব সময় কানে বাজে। ঘণ্টা নাড়ার মতো অনবরত তা বেজে যাচ্ছে অনির্বাণের ভিতরে। “তুই কী বোকা রে অনিদা!”
কার গলা? চেনা, অথচ নাম মনে আনতে পারছে না। বহু দূরের ফেরিঘাট যেন অবিরল বৃষ্টিধারায় ঝাপসা। একটা প্রাগৈতিহাসিক যুগ যেন তার চেতনা থেকে, তার জীবন থেকে মুছে গেছে। তাকে ফিরিয়ে আনতে হবে সেই সবুজ সতেজ সকাল। গন্ধময় স্মৃতিঘেরা লতার বাগান।
আসলে একটা স্বপ্ন তাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিল। প্রায় ভোররাতে সে স্বপ্নটা দেখে। ধান কাটা হয়ে গেছে। মাঠে খড়ও পড়ে নেই। বিস্তৃত সবুজ কলাইখেত। লকলক করছে কচি কলাইশাকের ডগাগুলো। তার ভিতরে পা ডুবিয়ে মাঠের আলপথ ধরে সে আর এক কিশোরী দৌড়চ্ছে।
পৌষ শেষের ছোট্ট বেলা তার হলদেটে ম্লান অল্প আলোটুকু নিয়ে যাই যাই করছে। এবার ঝুপ করে সন্ধ্যা নামবে। সংক্রান্তির মেলা-ফেরত দুটি ছেলেমেয়ে দৌড়চ্ছে পরস্পরের হাত ধরে। অন্ধকার হবার আগেই বাড়ি ফিরতে হবে। না হলে পিঠে বাড়ি পড়বে। বাড়ির গিন্নি আর দাদারা খুব কড়া। কাউকে বলে আসেনি। এতক্ষণ হয়তো হুলুস্থুল পড়ে গেছে।
শীতেও ঘামে ভিজে গেছে দু’জন। “আয় তাড়াতাড়ি, আয়!” কিশোর তাড়া দেয়। হাঁপাচ্ছে কিশোরী। দম নেই, পারছে না আর। তবুও চেষ্টা করতে গিয়ে হোঁচট খেল। দু’জনে ছিটকে পড়ল কলাইক্ষেতে। কিশোরের বুকে কিশোরী। গরম নিঃশ্বাস পড়ছে মুখে। ওঠানামা করছে বুক হাপরের মতো। পরস্পরের শরীরের গন্ধে আবিষ্ট হচ্ছে তারা। গভীর আবেগের গোপন স্পর্শ বয়ঃসন্ধির নিষিদ্ধ দরজা খুলে দিল। কিশোর অস্ফুটে বলল, “জল।”
“জল কোথায় পাব?” কিশোরী কিশোরের বুক থেকে উঠে বসল। ফ্রক খুলে ফেলল। তারপর ওর সদ্যফোটা পদ্মকলি বুকের ওপর চেপে ধরল কিশোরের মুখ। “নে খা।”
কিন্তু যত দিন গেল, স্বপ্নের সেই কিশোরী, মনে না-পড়া দূরের আবছা ফেরিঘাট, আকুলিবিকুলি করা স্মৃতি অনির্বাণকে তোলপাড় করে। অফিসের কাজে মন বসে না। প্রায়ই ভুল হয়। উদ্দেশ্যহীনভাবে বেরিয়ে পড়ে। আনমনে রাস্তা হাঁটে। কখনও গঙ্গার ধারে গিয়ে বসে থাকে। অবিরল জলস্রোতেও সেই মুখ খোঁজে। নিজের মধ্যেকার সেই ঘণ্টা নড়েই যাচ্ছে। অনিকেত একটা দোলন। পতনের ভয়। তার যাবতীয় প্রতিরোধ ভেঙে যায়। অন্ধকারে সাঁতার কাটতে কাটতে গতকাল সে খড়কুটোর সন্ধান পেয়ে আঁকড়ে ধরেছে। এই স্বপ্ন আর স্মৃতিকে সে খনন করবেই।
অনুসন্ধানের প্রথম ধাপ অফিসে ছুটি নেওয়া, যেটা সে গতকাল করেছে। এবার গাঁইতি, শাবল, কোদাল নিয়ে খনন আর উত্তোলন। গভীর থেকে আরও গভীরে প্রোথিত ওই চন্দনগন্ধের উৎস তার চাই। যা হারিয়েছে সেই কৈশোরে। যা অমূল্য। ফিরে পেতে হবে আবার।
পরদিন খুব ভোরে, তখন কাকও ডাকেনি, একমাত্র দিদিকে একটা চিঠি লিখে বাড়ি ছাড়ল অনির্বাণ। শহরের কেন্দ্র থেকে একটা দূরপাল্লার বাসে চেপে বসল। একসময় শহর ছেড়ে বাস ছুটে চলল শ্যাওলা-সবুজ গ্রামের পথ ধরে। অনির্বাণ ফিরে চলল ফেলে আসা তার ফসিল জীবনের দিকে। দুপুর গড়িয়ে বিকেল। ম্লান রোদে ছায়া। নেমে পড়ল মাধবপুর। এখান থেকে আর তিন কিলোমিটার গেলে পলাশপুর।
গতজন্মের ওপার থেকে যেন ভেসে আসছে সোঁদা গন্ধ। মাটির রাস্তা। বেশিরভাগ মানুষ হেঁটেই যাচ্ছে। কিছু ভ্যানরিকশা আছে। তারই একটাতে চেপে বসল অনির্বাণ। তার হাতে সময় কম। অনেকটা বিলম্ব হয়ে গেছে স্মৃতি ফিরে পেতে। অনেকটা সময় নষ্ট হয়েছে। কিন্তু আর না। এই পলাশপুরেই তার শৈশব কেটেছে। বাবার বদলির চাকরি। মা অসুস্থ, তাই দূরসম্পর্কের এক আত্মীয়ের বাড়িতে থেকে পড়াশোনা।
এত বছরে খুব পাল্টায়নি গ্রাম। ফেলে যাওয়া স্মৃতির জায়গাগুলো একই আছে। স্কুলে যাওয়ার পথঘাট। ভ্যানরিকশা এবার বড় উঁচু রাস্তা ছেড়ে মাঠের মাঝের অপেক্ষাকৃত নিচু সরু রাস্তা ধরল। বিকেল আরও পড়ে এসেছে। দিনশেষের রাঙা আলো দু’পাশের সবুজ আর বিস্তীর্ণ কলাইখেতে যেন জাদু জাগিয়েছে।
এবার স্মৃতির কুঠুরি খুলে গেল। জ্বলে উঠল আলো। অনির্বাণ ফিরে পেল স্বপ্ন। জলের গভীর তলদেশ থেকে বুদবুদের মতো জেগে উঠল এক ইন্দ্রধনু। কিশোরীর মুখ। স্বেদাক্ত দুটো অধর। বয়ঃসন্ধিকালের উত্তাপ। কুয়াশাজড়ানো সন্ধ্যার অলৌকিক আঁধারে জেগে উঠল সে মুখ। তৃণা। আর তার বুকের সেই চন্দনগন্ধ প্রাগৈতিহাসিক গাঢ় বিভায় জড়িয়ে ধরল সেদিনের কিশোর, আজকের মেদুর অনির্বাণকে। গন্ধের উৎস ছুঁতে সে এখন পলাশপুর গ্রামে ঢুকল।
সন্ধ্যা নেমে এসেছে। বাড়ি বাড়ি শাঁখ বাজছে। চেনা বাড়িটার কাছে গিয়ে দাঁড়াল অনির্বাণ। সে যেন গুপ্ত গুহামুখে এসে গেছে। এবার চিচিং ফাঁক বললেই সরে যাবে প্রাচীন পাথর। বিপুল ঐশ্বর্যে আলোকিত হবে জীবন। ভাঙা পাঁচিল পেরিয়ে সদর দরজা দিয়ে উঁকি দিল অনির্বাণ। টালির ঘরের এক পাশটা ভেঙে পড়েছে। উঠোনে অনেক দিনের আবর্জনা। শুকনো পাতা। কোনও ঘরে কোথাও আলো জ্বলছে না। তাহলে বাড়ির লোক সব গেল কোথায়? কাকিমা, দাদারা, তৃণা…!
অনির্বাণ জোরে ডাকল, “কাকি-মা...আ...আ…।” কোনও সাড়া নেই। আস্তে আস্তে পা টিপে ভিতরে ঢুকল। এবার আর একটু জোরে ডাকল, “তৃ...ণা...আ...আ...। আমি তোর অনিদা এসেছি। তোরা কোথায়?”
কোনও সাড়া নেই। নৈঃশব্দ্যের ঘোর স্তব্ধতায় সে ডুবে গেল। স্মৃতির যে আলোয় অনির্বাণ এতক্ষণ পথ হাঁটছিল, তা যেন সহসা নিভে গেল। অন্ধকার আরও গাঢ়। স্বপ্নটা কোথায় যেন কুয়াশায় হারিয়ে যাচ্ছে।
কতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল খেয়াল নেই। দূর থেকে একটা আলোর রেখা। মোমবাতি ধরা একটা হাত এগিয়ে এল। “কে বাবা, তুমি? কাকে ডাকছ? আজ দু’দিন হলো ঝড়ে তার ছিঁড়ে গেছে, তাই কারেন্ট নেই। কাকে খুঁজছ?”
মোমবাতির আলো মুখে পড়তেই অনির্বাণ চিনতে পারল, পাশের বাড়ির উমা জেঠিমা। মুখে যদিও এখন বলিরেখা।
অনির্বাণ এবার সচেতন হয়। আলোর সামনে নিজের মুখটা এগিয়ে নিয়ে বলে, “দেখো তো জেঠিমা, চিনতে পারো? আমি সেই অনি, তোমাদের এখানে থাকতাম ছোটবেলায়। তারপর কলকাতা চলে গেলাম।”
“না বাবা, ঠিক ঠাওর হচ্ছে না। বয়স হয়েছে তো, সব ভুলতে বসেছি।”
অনির্বাণ মরিয়া হয়, “জেঠিমা, এ বাড়িতে থাকত রমা কাকিমারা, ওর মেয়ে তৃণা... ওরা সব কোথায়?”
দমকা হাওয়ায় মোমবাতি নিভে গেল। হঠাৎ ভূমিকম্পে অনির্বাণের পায়ের তলায় মাটি কাঁপছে। তার এত দিনের যত্নে ধরা স্বপ্ন আলেয়ার কুহেলিকায় হারিয়ে যেতে বসেছে। অনির্বাণ মুখ ঢেকে মাটিতে বসে পড়ল।
অনেকক্ষণ পর অনুভব করল, সেই হারিয়ে যাওয়া চন্দনগন্ধ আবার ফিরে আসছে। তার খুব তৃষ্ণা পেল। সে তৃণার পালকনরম বুকের শীতলতায় ডুবে যেতে যেতে শুনতে পেল, “তুই কী বোকা রে অনিদা!”
লেখক জন্মগ্রহণ করেন ১৯৫৮ সালে। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ২৫। গল্প ও উপন্যাসের জন্য পেয়েছেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের জেলা সেরা গল্পকার সম্মান (১৯৮৭), মহাশ্বেতা দেবী স্মৃতি পুরস্কার (২০১৮), প্রভাতকুমার সরকার স্মৃতি পুরস্কার (২০১৯) এবং কমলা মাহাত স্মৃতি পুরস্কার (২০২৫)। কবিতার জন্য পেয়েছেন ১০টি পুরস্কার। এছাড়াও তাঁর ঝুলিতে রয়েছে তিনটি জীবনকৃতি সম্মাননা।
আপনার প্রতিক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
প্রতিক্রিয়া দেওয়ার নিয়ম
আপনি এই সংখ্যায় আপনার পছন্দের সব লেখাতেই প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবেন। তবে একটি লেখায় সর্বোচ্চ ২টি ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেওয়া যাবে। একই লেখায় তৃতীয় প্রতিক্রিয়া নির্বাচন করলে, প্রথমে নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং নতুন প্রতিক্রিয়াটি গণ্য হবে। আপনার প্রতিটি প্রতিক্রিয়া লেখকদের অনুপ্রেরণা জোগায় এবং বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সৃজনশীলতার প্রতি আপনার সমর্থনকে তুলে ধরে।