About Bangali.Network
About Bangali.Network
মাসিক সংখ্যা
লেখক–লেখিকা
লেখা পাঠান
আমাদের কথা
উদ্যোগ
Web Magazine
Contests


উদ্যোগ Web Magazine
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
স্বপ্নের স্বাদ
দায়স্বীকার

লেখা, মতামত, মন্তব্য, বিশ্লেষণ, সাক্ষাৎকার বা অন্য যে কোনো প্রকাশিত লেখার সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সকল বক্তব্যের নৈতিক, তথ্যগত ও আইনগত দায় সম্পূর্ণভাবে তাঁদের উপরই বর্তায়। কোনো লেখা প্রকাশিত হওয়া মাত্রেই তা Bangali Network-এর সম্পাদকীয় অবস্থান, নীতি, মতাদর্শ, সমর্থন, অনুমোদন বা সরকারি মতামতের প্রতিফলন হিসেবে গণ্য করা যাবে না।

তথ্যভিত্তিক প্রবন্ধে ব্যবহৃত তথ্য, উদ্ধৃতি, অনুবাদ, পরিসংখ্যান, গবেষণা, শাস্ত্রীয় বা ঐতিহাসিক সূত্র, আইনগত বা বৈজ্ঞানিক তথ্য, বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা, সিদ্ধান্ত ও উপসংহারের যথার্থতা, নির্ভুলতা, পূর্ণতা, প্রাসঙ্গিকতা, বৈধতা ও হালনাগাদকরণের দায় সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকার। Bangali Network সম্পাদকীয় বিবেচনায় কোনো লেখা প্রকাশ, সম্পাদনা, সংক্ষিপ্তকরণ বা ভাষাগত সংশোধন করতে পারে; তবে এ ধরনের সম্পাদকীয় প্রক্রিয়াকে প্রকাশিত তথ্য, সূত্র, উদ্ধৃতি, বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা বা মতামতের সত্যতা, নির্ভুলতা, বৈধতা বা নির্ভরযোগ্যতার প্রত্যয়ন বা নিশ্চয়তা হিসেবে গণ্য করা যাবে না। এ-সংক্রান্ত কোনো দায় Bangali Network গ্রহণ করে না।

লেখক পরিচিতিতে প্রকাশিত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণের ভিত্তিতে প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ-সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

কোনো প্রকাশিত বিষয়বস্তুর কারণে কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সংস্থা বা গোষ্ঠীর আপত্তি, দাবি বা আইনগত প্রশ্ন উত্থাপিত হলে, প্রযোজ্য আইন অনুসারে তার দায় সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা বা সাক্ষাৎকারদাতার উপর বর্তাবে, যদি না আইন ভিন্নভাবে নির্ধারণ করে।

কোনো প্রকাশিত তথ্য বা দাবির যথার্থতা সম্পর্কে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণসহ আপত্তি উত্থাপিত হলে Bangali Network বিষয়টি সম্পাদকীয়ভাবে পর্যালোচনা করবে। পর্যালোচনায় তথ্যগত ভুল প্রমাণিত হলে, Bangali Network নিজস্ব সম্পাদকীয় বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট অংশ সংশোধন, অপসারণ, প্রত্যাহার বা প্রয়োজনীয় সম্পাদকীয় নোট সংযোজন করার অধিকার সংরক্ষণ করে।

দায়স্বীকার

লেখা, মতামত, মন্তব্য, বিশ্লেষণ, সাক্ষাৎকার বা অন্য যে কোনো প্রকাশিত লেখার সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সকল বক্তব্যের নৈতিক, তথ্যগত ও আইনগত দায় সম্পূর্ণভাবে তাঁদের উপরই বর্তায়। কোনো লেখা প্রকাশিত হওয়া মাত্রেই তা Bangali Network-এর সম্পাদকীয় অবস্থান, নীতি, মতাদর্শ, সমর্থন, অনুমোদন বা সরকারি মতামতের প্রতিফলন হিসেবে গণ্য করা যাবে না।

তথ্যভিত্তিক প্রবন্ধে ব্যবহৃত তথ্য, উদ্ধৃতি, অনুবাদ, পরিসংখ্যান, গবেষণা, শাস্ত্রীয় বা ঐতিহাসিক সূত্র, আইনগত বা বৈজ্ঞানিক তথ্য, বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা, সিদ্ধান্ত ও উপসংহারের যথার্থতা, নির্ভুলতা, পূর্ণতা, প্রাসঙ্গিকতা, বৈধতা ও হালনাগাদকরণের দায় সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকার। Bangali Network সম্পাদকীয় বিবেচনায় কোনো লেখা প্রকাশ, সম্পাদনা, সংক্ষিপ্তকরণ বা ভাষাগত সংশোধন করতে পারে; তবে এ ধরনের সম্পাদকীয় প্রক্রিয়াকে প্রকাশিত তথ্য, সূত্র, উদ্ধৃতি, বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা বা মতামতের সত্যতা, নির্ভুলতা, বৈধতা বা নির্ভরযোগ্যতার প্রত্যয়ন বা নিশ্চয়তা হিসেবে গণ্য করা যাবে না। এ-সংক্রান্ত কোনো দায় Bangali Network গ্রহণ করে না।

লেখক পরিচিতিতে প্রকাশিত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণের ভিত্তিতে প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ-সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

কোনো প্রকাশিত বিষয়বস্তুর কারণে কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সংস্থা বা গোষ্ঠীর আপত্তি, দাবি বা আইনগত প্রশ্ন উত্থাপিত হলে, প্রযোজ্য আইন অনুসারে তার দায় সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা বা সাক্ষাৎকারদাতার উপর বর্তাবে, যদি না আইন ভিন্নভাবে নির্ধারণ করে।

কোনো প্রকাশিত তথ্য বা দাবির যথার্থতা সম্পর্কে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণসহ আপত্তি উত্থাপিত হলে Bangali Network বিষয়টি সম্পাদকীয়ভাবে পর্যালোচনা করবে। পর্যালোচনায় তথ্যগত ভুল প্রমাণিত হলে, Bangali Network নিজস্ব সম্পাদকীয় বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট অংশ সংশোধন, অপসারণ, প্রত্যাহার বা প্রয়োজনীয় সম্পাদকীয় নোট সংযোজন করার অধিকার সংরক্ষণ করে।

স্বপ্নের স্বাদ

ম্লান হাসি মাখা অপেক্ষমাণ উপোসী মুখ লাইনে দাঁড়িয়ে। চারদিকে ভক্তির ধূপ-ধুনো বিক্রি হচ্ছে মহাসমারোহে। ভক্তের ভিড়ে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়ানো আকন্দ ফুল, বেলপাতা। পায়ের তলায় অগ্রবর্তী ভক্তকুলের ঢালা গঙ্গাজলের পাতলা কাদা দেবদাসীর আলতা পায়ে এঁকেছে কলঙ্করেখা। দুধ, ফল আর মিষ্টিতে সাজানো ভগবানের নৈবেদ্যের দিকে মৃত মাছের মতো দৃষ্টি মেলে চেয়ে আছে এক জ্যান্ত শিব; শুষ্ক ঠোঁটজোড়া সে চাটছে আরও শুষ্ক জিভ দিয়ে।

‘ভগবানের জন্য ভক্ত’ নাকি ‘ভক্তের জন্য ভগবান’ — তা আজও বোঝেনি প্রদর্শিত ভক্তির ঘোর বিরোধী লুৎফর শেখ। স্নেহবৎসল পিতা দশ বছরের মেয়েকে নিয়ে শিবরাত্রির মেলায় গেছে। বাড়ির পাশেই মেলা। আগে যেত বন্ধুদের সঙ্গে, কখনও বোনকে নিয়ে; বিয়ের প্রথম প্রথম এক-দু’বছর বউকে নিয়ে, এখন মেয়েকে নিয়ে। মেয়ে বড়ো হয়ে গেলে কার সঙ্গে যাবে, সে বিষয়ে কিছু না ভাবলেও এটা সে জানে, মেলায় তাকে যেতেই হবে। মেলা যে তাকে ডাকে।

সঙ্গে যেই থাক, চেতন ইতিহাসের ছাত্র লুৎফর মুসলমান বসতি-লাগোয়া সুউচ্চ পাঁচিলে চারদিক ঘেরা এই মেলায় দেখে ভিন্ন চিত্র, ভিন্ন স্বর। মেলার হরেক কিসিমের জিনিসের সঙ্গে সমবেত জনতার বেপরোয়া উল্লাসে উৎসারিত জগতের বিচিত্র থেকে বিচিত্রতর আওয়াজ মিশে তৈরি হওয়া ছায়াহীন, পথহীন জঙ্গলের মাঝে সে শুনতে পায় অসহিষ্ণু সময়ের দোতারায় সমন্বয়ের সুর।

এক-এক সময় তার মনে হয়, মেলার চারদিকের সুউচ্চ পাঁচিল যেন এক লহমায় শুষে নেয় সব রং। খবর রাখে না পাঁচিলের ওপারে বিধবা সিঁথির মতো বিবর্ণ পল্লীর ততোধিক বিবর্ণ মুখগুলোর। রংচটা এই সময়ের আবর্তে ঘুরপাক খেতে খেতে সে শুনতে পায় মানবতার ককিয়ে ওঠা মৃত্যুযন্ত্রণা, আহত জীবিতের অবিশ্বাস্য গোঙানি আর বাঁচার তীব্র আকুতি। ক্লান্ত লুৎফর তাই বন্ধ করে রাখে চেতনার দ্বার। চোখ-কান বুজে অতিক্রম করে নিজের ভাগের পৃথিবী। অন্যের বেড়া ভেঙে বা গলা বাড়িয়ে চাখে না ফুল, প্রজাপতি কিংবা লকলকে কচি পুঁই।

তবু প্রতিবছর নিয়ম করে মেলায় যাওয়া চাই। কখনও কখনও ভেবেছে যাবে না। আবার না গিয়েও থাকতে পারে না। মন ভালো করতে মেলায় গিয়ে খুলি ভর্তি করে নিয়ে আসে বেদনা, তাজা রক্তক্ষরণের দাগ লেগে থাকে চোখের কোণে অনেক দিন। একরোখা চলমান সময়ের প্রলেপে ধীরে ধীরে ভোঁতা হয়ে আসে সে অনুভূতি। তাই নিয়েই সে অফিস যায়, খাবার খায়। বউয়ের পাশে ঘুমায়, আবার অফিস কলিগ সুতপার সঙ্গে খুনসুটিতেও মাতে। ঘড়ি দিয়ে মাপে ঊর্ধ্বতনের আদেশ।

রোজ অফিসের পথে, স্টেশনে ঢোকার মুখে দেখে যে মেয়েটা অন্ধ, যে মেয়েটা ভিক্ষা করে, সেও স্বপ্ন দেখে — একটা ঝলমলে ভোর, অবজ্ঞাহীন সকাল, ঘৃণাহীন দুপুর, ফোটা ভাতের গন্ধ, বুকভরা বিশ্বাস, একটু সহানুভূতি, মমতা জড়ানো স্বর। স্বপ্ন দেখে একটা নিরবচ্ছিন্ন ঘুমের রাত, যে রাতে চোখের পাতা ভারী হয়ে এলে দুপুরে ভাব জমানো পাহারাওয়ালা দু’পায়ের মাঝখানে বীরত্বপূর্ণ(!) আঘাতের চিহ্ন আঁকতে না পারে।

স্বপ্ন দেখে ছেঁড়া শাড়িতে না-আঁটা যৌবন যেন পথের ধারে বেআব্রু পড়ে না থাকে। বড্ড বেয়াড়া সে স্বপ্ন। জেগে দেখা স্বপ্ন সব মুছতে চায় দেওয়ালের ফাঁকে ফাঁকে জীবাশ্ম হয়ে জমে থাকা পূর্বজ অশ্রু। লিখতে চায় স্পর্ধার রক্তে নতুন দেয়াললিখন। লুৎফর বুঝতে পারে না, সে ঠিক কী চায়।

মাঝে মাঝে তার সব গোলমাল পেকে যায়। যখন শোনে স্বার্থের টানে সন্তান দু’হাতে পিতৃরক্ত মেখে শোধ করে মাতৃঋণ। পিছুটান কাটাতে মা গুম করে ছেলের লাশ, বাপ ফেলে যায় পথের ধারে অজানা ডাস্টবিনে রক্তমাখা জ্যান্ত পুঁটলি। আরও কী কী, সব মনে করতে পারে না। মাথার ভিতর দপদপ করে, মস্তিষ্কে রক্তবাহী রগগুলো ছিঁড়ে পড়তে চায় প্রবল বিদ্রোহে, কিন্তু পারে না। চোখ খুলে কিংবা বুজে দেখে শিক্ষাদানের বদলে বাজারে, বিবাহের নামে নারীমাংসের ব্যবসা, রাজনীতির নামে দেশ বিক্রি, সমাজসেবার আড়ালে আত্মপ্রচার। রাস্তায় বেরোলে গা ঘিনঘিন করে। রাস্তা জুড়ে ছড়ানো হীনচরিত্রের দেশনেতাদের হাতে সম্ভ্রম হারানো ধর্ষিতা রাষ্ট্রের শ্বাপদে খাবলানো নগ্ন শরীর।

মেয়ের টানে এগিয়ে যায় এক দোকান থেকে আর-এক দোকানে। এক রং থেকে আর-এক রঙে। এক আলো থেকে আর-এক আলোতে। এক ছায়া থেকে আর-এক ছায়াতে। মুখোশের দোকানে বিক্রি হচ্ছে রকমারি মুখোশ — বাঘের, সিংহের, ভূতের, হনুমানের। বেছে-কুছে একটা ভূতের মুখোশ কিনল লুৎফরের মেয়ে শাবানা। দোকানদারকে দাম মিটিয়ে এগিয়ে যায় চুড়ির দিকে, তারপর ক্লিপ, একে একে হেয়ার ব্যান্ড, চুল বাঁধা ফিতে, নকল সোনার আংটি, গলার হার, ঝুমকো — সবাই নিজে থেকে এসে ঢুকে পড়ে তার হাতে ধরা কচি মুঠোর ভিতর। ছোট্ট দুটো হাত তার, তার মধ্যে একটা আবার আব্বুর হাতের ভিতর। বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় বউয়ের করা নির্দেশ — কোনও অবস্থাতেই হাত ছাড়া যাবে না।

তার খামখেয়ালি স্বভাবের জন্য বউ প্রথম প্রথম বেরোলেও এখন আর তার সঙ্গে বেরোয় না। মুখোশটা কচি হাতের দোলনায় দুলতে দুলতে মেলায় ঘুরল। বাচ্চা মানুষ শখের জিনিস ভরসা করে অন্য কারও হাতে ছেড়ে দিতে পারে না, এমনকি যে হাত তাকে ছাতার মতো আগলে রেখেছে, তাকেও না। মেয়ের আবদারমতো মোমো আর পাপড়ি চাট খাইয়ে, বাড়ির জন্য আড়াই প্যাঁচের জিলিপি আর বাদাম কিনে ফেরে। রাত তখন সাড়ে আটটা কি ন’টা হবে।

আত্মভোলা, খেয়ালি জীবনে সন্দেহ আর অবিশ্বাসের দোলাচলে দগ্ধ চার দেওয়ালের দাম্পত্য যেন পিঁপড়ের বয়ে নিয়ে যাওয়া তার নিজের ওজনের চেয়ে তিন গুণ ভারী কোনও পাউরুটির টুকরো — যাকে বয়ে নিয়ে যেতে সে বাধ্য, কিন্তু সম্পূর্ণ নাগালে পায় না কখনও। গর্তের বাইরে ছেড়ে দিতে হয়। দীর্ঘ যৌনতাহীন দাম্পত্যের ভারে সে যেন ক্ষুধামান্দ্যে ভোগা বৃদ্ধ নির্বিষ সাপ। আগের মতো এখন আর লাফিয়ে বাড়ি ফিরতে ইচ্ছা করে না। তবু ফিরতে হয়। মাকে হারিয়েছে। বৃদ্ধ পিতা হাজি মোবারক শেখ বয়সের ভারে অর্জিত জড়ত্বটুকু ছাড়া সম্পূর্ণ সুস্থ। রোগের মধ্যে আছে দু’চোখে আংশিক দৃষ্টিহীনতা, গ্লুকোমা। বারান্দায় বসে রেডিও শুনছেন। এটা তাঁর বহুদিনের অভ্যাস। তাদের সাড়া পেয়ে খাটের উপর দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসা স্ত্রী মগ্ন মোবাইলের স্ক্রিন থেকে চোখ তোলে।

লুৎফর বউকে ভড়কে দেবে ভেবে দ্রুত মেয়ের হাত থেকে মুখোশটা নিয়ে ঝুলিয়ে নেয় নিজের মুখে। মুখোশটা মুখের উপর লাগাতেই একটা উল্টো রক্তস্রোত বইতে শুরু করে মাথার ভিতর। বউয়ের মুখময় ছড়িয়ে পড়েছে লাজুক হাসি। যেন এইমাত্র উপহার পেয়েছে হীরকখচিত জড়োয়া কিংবা তৃপ্ত গাঢ় চুম্বন।

সংবাদ পাঠিকা রেডিওতে সংবাদ পড়ছে — দেশের সমস্ত শিশুর সর্বোচ্চ স্তরের উন্নত মানের শিক্ষার দায়িত্ব নিয়েছে সরকার। দেশের স্বাস্থ্য পরিষেবার সম্পূর্ণ দায়িত্ব বহন করবে সরকার। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সরকারি দপ্তরে সমস্ত শূন্য পদে নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি জারি হয়েছে। তার মানে, পাড়ার মোড়ে মোড়ে কর্মহীন যৌবন কথার তুফানি ফোয়ারা ছোটাতে ছোটাতে বিয়ের বয়স ভুলে যাবে না। দেশজুড়ে মাদক উৎপাদন, চোরাচালান ও বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে সরকার। লুৎফরের অবাক হওয়ার এখনও বাকি ছিল, যখন শুনল স্টেশন, বাসস্ট্যান্ড, বাজার কিংবা ধর্মীয় স্থানে থাকা প্রতিবন্ধী, ভিক্ষাজীবী ও ভবঘুরেদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য দেশের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঞ্চিত অর্থে বিশেষ হোমের ব্যবস্থা করেছে।

রাত তখনও ততটা ঘন হয়নি এই জেলা সদরে। রাস্তায় বেরিয়ে দেখে বর্ষার বেজন্মা লতার মতো জড়াজড়ি করে ফুটপাত দখল করে থাকা গুমটিগুলো, রাস্তার ধারে ছেঁড়া চটে ঘেরা জংধরা ক্যানেস্তারা-ছাওয়া বিবর্ণ বৃদ্ধের বলিরেখার ফাঁকে ফাঁকে জেগে থাকা ত্বকের মতো ঝুপড়িগুলো জাস্ট ভ্যানিশ! মোড়ের মাথায় চায়ের দোকানে কাপ ধুত যে ছেলেটা, সে হোস্টেলে চলে গেছে। হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে যায়, এগিয়ে যেতে যেতে দেখতে থাকে বদলে যাওয়া পৃথিবীর রূপ-রং। বদলে যাওয়া মানুষগুলো বদলাচ্ছে শরীরী ভাষা। রাস্তার প্রতিবিম্বে তার কর্নিয়াজুড়ে খেলা করে নতুন পৃথিবী।

স্টেশনের কাছে যেতেই দেখে সেই অন্ধ মেয়েটি, যাকে সে প্রতিদিন নিয়ম করে ভিক্ষা দিত। না, ভিক্ষা নয়। দান নয়। বরং তার চোখে বুনত নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন। একটা পরিষ্কার জামা পরে হোমের গাড়িতে উঠছে, তার দু’চোখে জ্বলে উঠছে ভোরের মিষ্টি আলোর আভা। ইতিহাসে পড়া নতুন পৃথিবী তাহলে স্বপ্ন নয়! সত্যি!

ভ্যাবাচ্যাকা লুৎফর আরও এগিয়ে যায়। যত এগোয়, ততই যেন বিস্ময় অপেক্ষা করে থাকে তার জন্য। রাস্তায় তার গা ঘেঁষে একটা বাস এসে থামে। একজন বাসকর্মী নেমে এসে ভদ্রভাবে তাকে জিজ্ঞেস করে, “কোথায় যাবেন?” সে অনির্দিষ্টভাবে হাত দেখায়। বাসকর্মী তাকে ইশারায় বাসে উঠতে বললে বিনা বাক্যব্যয়ে সে উঠে পড়ে। খুব বেশি ভিড় নেই। সকলের হাতে খোলা বই। বুঁদ হয়ে আছে বইয়ে। আচমকা দেখলে মনে হবে পরীক্ষার্থীরা যেন পরীক্ষার আগে শেষবারের জন্য বুলিয়ে নিচ্ছে চোখ। এতদিন শুধু বদলের কথা শুনেছে। দেখেনি। আজ দেখছে। দেখতে দেখতে এগিয়ে চলেছে।

শহর ছাড়িয়ে বাস থামল। সামনে উর্বর ক্ষেত, মাঝে মাঝে দু-একটায় ফসল বোনা হয়েছে। সকলের সঙ্গে সেও নামল। সকলেই পোশাক পাল্টে মাঠে ফসল বোনার কাজে লেগে গেল। লুৎফরও। তার বেশ মজা লাগছিল। মনে পড়ে যাচ্ছিল, ছোটবেলায় আব্বার জন্য খাবার নিয়ে যেত। আব্বা তখন মোড়লের জমিতে লাঙল বাইত। গরু দুটোকে জিরোতে দিয়ে আব্বা খেতে বসলে সে লাঙলের বোঁটায় হাত দিত। জোয়ান মোবারক খাওয়া ফেলে তেড়ে আসত। ছেলেকে নাকি লাঙল ধরতে দেবে না। যেমন করেই হোক ভাগ্য বদলাতে হবে। চাষার ছেলে যেন চাষা না হয়। গাঁয়ের লোককে দেখিয়ে দেবে। একবার আব্বার তাড়া খেয়ে পালাতে গিয়ে গরুর পায়ে ফাল বাধিয়ে ফেলেছিল।

আজ তাড়া দেওয়ার কেউ নেই। ব্যঙ্গ করার কেউ নেই। মোড়ল নেই। তারা সকলেই নিজের নিজের মোড়ল। সকলেই নিজের নিজের কাজে ব্যস্ত। ভুল করলে কেউ শাস্তি দিচ্ছে না, মজুরি কেটে নেওয়ার হুমকি দিচ্ছে না; বরং শান্তভাবে জ্ঞান-অজ্ঞানের ভুল ধরিয়ে দিচ্ছে। হাতে ধরে শিখিয়ে নিচ্ছে। আজ প্রথমবার সে নিজের ইচ্ছায় কোনও কাজে অংশ নিয়েছে, পূর্ব অভিজ্ঞতা ও কোনও বাহানা ছাড়াই। কেন জানে না, কিন্তু নিজেকে ভারমুক্ত মনে হচ্ছে। মুক্তির আনন্দ দু’হাতে মাখছে গায়। এতদিন যা কিছু করেছে, অন্যের ইচ্ছা ও চাহিদার নিরিখে। নিজেকে নিজেই বানিয়েছে গিনিপিগ।

মেয়ে খাটের উপর লাফাচ্ছে, হাততালি দিয়ে হাসছে। মাকে মেলার গল্প বলছে। মোবারক শেখ রেডিও বন্ধ করে আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়েছেন। বউয়ের বুড়ো পুঁইয়ের মতো প্যাঁচালো শ্লেষ, “বুড়ো হতে চলল, ছেলেখেলা গেল না। এবার গিলে আমাকে উদ্ধার করা হোক।” বলে সে খাবার বাড়তে চলে গেল।

লুৎফর হাতে ধরা মুখোশটা আবার মুখে পরে ফেলে, দেখতে থাকে তার চলে যাওয়া। ভাবতে থাকে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সবকিছুই কেমন বদলে যায় — স্বভাব, চরিত্র, ধৈর্য। যখন খুব কাছের মানুষটাও একটু একটু করে বদলাতে বদলাতে অচেনা, দুরূহ, দুর্বোধ্য হয়ে ওঠে, তখন নিজেকে খুব অসহায়, দুর্বল আর ব্যর্থ মনে হয়। তখন মাঝে মাঝে সবার মাঝেও একা হতে ইচ্ছা করে, ভীষণ একা — যতটা একা হলে নিজের সঙ্গে নিজে কথা বলা যায়, ততটা একা।

নতুন পৃথিবীর স্বপ্নে বিভোর লুৎফর মেয়ের কথা ভেবে যাপিত জীবনের ব্যর্থতার গ্লানি ভুলে দিনবদলের সংগ্রামে অংশগ্রহণের ইচ্ছাকে বাঁচিয়ে রাখতে খাবার টেবিলে বসে।




আপনার প্রতিক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’

এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন

প্রতিক্রিয়া দেওয়ার নিয়ম

আপনি এই সংখ্যায় আপনার পছন্দের সব লেখাতেই প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবেন। তবে একটি লেখায় সর্বোচ্চ ২টি ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেওয়া যাবে। একই লেখায় তৃতীয় প্রতিক্রিয়া নির্বাচন করলে, প্রথমে নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং নতুন প্রতিক্রিয়াটি গণ্য হবে। আপনার প্রতিটি প্রতিক্রিয়া লেখকদের অনুপ্রেরণা জোগায় এবং বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সৃজনশীলতার প্রতি আপনার সমর্থনকে তুলে ধরে।

আগামী সংখ্যার জন্য লেখা পাঠান

❛উদ্যোগ❜ ওয়েব ম্যাগাজিনের শারদ ১৪৩৩ সংখ্যাটি ৫ অক্টোবর ২০২৬ (১৭ই আশ্বিন) প্রকাশিত হবে। ওয়েবসাইটে প্রদত্ত লেখার বিভাগ ও বিষয় থেকে আপনার পছন্দের বিষয় বেছে নিয়ে লেখা পাঠান ২৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে। নির্বাচিত লেখাগুলি লেখক / লেখিকার ছবি ও সংক্ষিপ্ত পরিচিতিসহ প্রকাশিত হবে। লেখা পাঠানোর ফর্ম এবং অন্যান্য সকল তথ্যের জন্য অনুগ্রহ করে মেনুতে ‘লেখা পাঠান’ বিভাগটি দেখুন।

পৃষ্ঠা
ভালো লাগলে ভালোবাসা দিন
অপছন্দ হলে পরামর্শ দিন
মতামত জানাতে মন্তব্য করুন
0 0 ভোট
স্টার
guest
7 কমেন্ট
নতুন থেকে পুরোনো
পুরোনো থেকে নতুন ভোটসংখ্যা অনুসারে
ফেসবুক পেজ
Udyog Bengali Web Magazine by Bangali Network

বিভিন্ন বিষয় থেকে বেছে নিয়ে লেখা পড়ুন

    বিভিন্ন সংখ্যায় প্রকাশিত হওয়া লেখা পড়ুন

    মাসিক সংখ্যাগুলি দেখুন
    Scroll to Top

    ‘উদ্যোগ’ ফোনে রাখুন

    ‘উদ্যোগ’ ওয়েব ম্যাগাজিন ইনস্টল করুন। ইনস্টলের পর অ্যাপ তালিকা থেকে আইকনটি হোমস্ক্রিনে যোগ করে নিতে পারেন। এরপর সহজেই পড়ুন আপনার প্রিয় ম্যাগাজিন। ভালো না লাগলে যেকোনো সময় এক ক্লিকে আনইনস্টল করতে পারবেন।