স্বাধীনতা শব্দটার উপলব্ধি, অনুভব জনে জনে পাল্টে যায়। বিভিন্ন জন বিভিন্নভাবে এই স্বাধীনতাকে উপলব্ধি করেন। স্বাধীনতাপ্রাপ্তির পূর্ববর্তী সময়ে "স্বরাজ আমার জন্মগত অধিকার" — মহামান্য বালগঙ্গাধর তিলকের এই প্রতিবাদমুখর উক্তি নিঃসন্দেহে প্রতিটি ভারতবাসীর চেতনাবোধকে অনেক বেশি জাগ্রত করেছে। এদিকে আমাদের যন্ত্রণাদগ্ধ কবি নজরুল লিখেছিলেন — "ওই গঙ্গায় ডুবিয়াছে হায় ভারতের দিবাকর / উদিবে সে রবি আমাদেরই খুনে রাঙিয়া পুনর্বার!" কবি রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছিলেন — "স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচিতে চায় বল কে বাঁচিতে চায়? / দাসত্ব শৃঙ্খল বল কে পরিবে পায়, বল কে পরিবে পায়?" নজরুল প্রেরণা দিয়ে আরও লিখেছিলেন — "কারার ঐ লৌহ কপাট ভেঙ্গে ফেল কর রে লোপাট / রক্ত-জমাট শিকল-পূজার পাষাণ-বেদী।" এমন সব আরও কত কত প্রতিবাদের কথায় মুখর লেখক, কবি, সাহিত্যিকেরা।
কবি-লেখকদের কত শত উদ্দীপনামূলক প্রেরণা থেকে আমাদের পূর্বপুরুষগণ মাতোয়ারা হয়ে উঠেছিলেন স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায়। তারপর স্বাধীনতার সৈনিকদের অবিস্মরণীয় আত্মবলিদান পর্বের বিনিময়ে আমরা ফিরে পেয়েছি আমাদের স্বপ্নের সেই স্বাধীনতা। আমাদের দুর্ভাগ্য যে স্বাধীনতার সেই দুর্দমনীয় আন্দোলনের দিনগুলোকে দেখার সৌভাগ্য আমাদের হয়নি। বাবা ছিলেন একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী। তাই আমাদের বাল্যাবস্থায় যখন তাঁর মুখে সেই আন্দোলনের দিনগুলোর কথা শুনতাম আর প্রতিবছর নিয়মিতভাবে বাড়িতে স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলনের ছবি দেখতাম, তখন খুব আফসোস হতো যে কেন আমরা বেশ কয়েক বছর আগে এই পৃথিবীতে আসিনি? তাহলে তো অন্তত এই আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার একটা সুযোগ আসত! তবে সেই দিনগুলোর কথা শুনতে শুনতে মনের মধ্যে অফুরন্ত উৎসাহ আর উদ্দীপনা জেগে উঠত আর মনে মনে ভাবতাম, আমরা আন্দোলনে জড়িত হইনি বটে, তবে আমাদের পিতা তো অন্তত জড়িত হয়েছিলেন। কিছুটা আত্মতৃপ্তি অন্তত পেতাম, অনেকটা দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর মতো অবস্থায়।
কিন্তু পরবর্তীতে যখন আরেকটু বড় হয়েছি, তখন নানাভাবে অন্যায়ের প্রতিবাদ করার চেষ্টা করেছি। এবং এর মূল্য চোকাতে হয়েছে অনেক বেশি মাত্রায়। আমাদের যুবক অবস্থায় পশ্চিমবাংলার মাটিতে যে রাজনৈতিক দলের শাসন ছিল, তারা স্বাধীনতায় বিশ্বাস করতেন না। তাদের ঘটমান অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় আমাদের চাষজমির জল বন্ধ করে দেওয়া হতো। আরেকটু বড় হয়েছি যখন, বিশ্ববিদ্যালয়ের পঠনপাঠন সমাপ্ত করেও নিজের বিদ্যাশিক্ষা করা বিদ্যালয়ে আমার স্নাতকোত্তরের বাংলা বিষয়ের পদ খালি থাকা সত্ত্বেও কিছুতেই আমাদের সেই শিক্ষকতায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি। বলা চলে, সেই ব্যবস্থাটাকে প্রতিবাদ জানিয়ে পশ্চিমবাংলা ছেড়ে আন্দামানে আমাকে যেতে হয়েছিল শিক্ষা বিভাগে যুক্ত হওয়ার মনোবাসনা নিয়ে এবং তাতে সফল হয়েছি।
স্বাধীনতা কোনও মুড়ি-মুড়কি অথবা দিল্লি কা লাড্ডুর মতো সহজলভ্য বস্তু নয় যে, তা দিয়ে অগণিত দরিদ্র, অশিক্ষিত, বুভুক্ষু, নিরন্ন মানুষদের জীবনকে সোনা দিয়ে মুড়িয়ে দেওয়া হবে। ওই কঠিন অবস্থায় দেশবাসীকে নিয়ে ভারসাম্য রক্ষা করে চলাটাই ছিল অনেক কঠিন একটা চ্যালেঞ্জ। তাই ভুয়ো, ফাঁকা বুলি উড়িয়ে কোনও লাভ ছিল না সে সময়!
কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপট অনেক পরিবর্তিত হয়ে গেছে। দেখতে দেখতে আমরা স্বাধীনতার পঁচাত্তর বর্ষও অতিক্রম করে ফেলেছি। বর্তমানে আমরা শিক্ষা-দীক্ষা, সংস্কৃতি, বিজ্ঞানচেতনা, প্রযুক্তি, কারিগরি দক্ষতা — সমস্ত দিক থেকেই বিশ্বের অনেক দেশকেই টেক্কা দিতে পেরেছি। আমাদের অগ্রগতি অনেক দেশের কাছেই বেশ ঈর্ষণীয় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু নির্দ্বিধায় বলা যাবে, সেই পরিপ্রেক্ষিতে আমরা নানাভাবেই আমাদের স্বাধীনতার সংকট বেশ মর্মে মর্মে উপলব্ধি করছি। আমাদের স্বাধীনতা যেন বর্তমানে একটা সংক্রমণের শিকার হয়ে দাঁড়িয়েছে। খোলা মনে পথ চলা, কথা বলা এখন আমার নিজস্ব অধিকারের বাইরে।
ভোট আসে, ভোট যায়। শাসকদলের কথার সঙ্গে বিরোধী দলের কথা কোনওদিনই মেলে না, আর মিলবেও না — এটা ধরে নেওয়াই বাঞ্ছনীয়। শাসকদল একটা প্রস্তাব দেয় আর বিরোধী দল তার প্রতিবাদ করে — এটাই দস্তুর। কিন্তু কিছু প্রশ্ন মাথার মধ্যে ঘুরে বেড়ায়। তা হলো, প্রত্যেক নির্বাচনে কিছু প্রতিবাদী মানুষের প্রাণ যায়। আমরা সাদামাটা মানুষের দল প্রতিবাদী হয়ে কিছু কথা জিজ্ঞাসা হিসেবে রাখি আপামর জনসাধারণের কাছে। যে নির্বাচন মানুষের প্রাণ নিয়ে, রক্ত নিয়ে হোলি খেলার উন্মাদনায় এভাবে মেতে ওঠে, সেই নির্বাচনের আদৌ কোনও প্রয়োজনীয়তা আছে কি? ভোটাধিকার প্রয়োগ করার অধিকার আমার সাংবিধানিক পবিত্র অন্যতম অধিকার। সেই অধিকার রক্ষার বিনিময়ে কবে আমার জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার প্রহসন বন্ধ হবে, এই সদুত্তর কবে আমরা পাব?
বহু যুগ আগে থেকেই সারা ভারতবর্ষের বিভিন্ন রাজ্যের নির্বাচনে বিভিন্ন ধরনের বিভীষিকাময় পরিবেশ তৈরি হয়। সুস্থ, শান্তিপূর্ণ নাগরিকেরা তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগের নিশ্চিত অধিকার অনেক সময় পান না। ব্যালট পেপার, ব্যালট বাক্স থেকে ইভিএম মেশিন — কত পরীক্ষা-নিরীক্ষার পথ পার হয়ে রাজনৈতিক সফলতা আনার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু আদতে কোনও কার্যকরী সফলতা আসে না। ইভিএম মেশিনের কারচুপির কারণে বিশ্বের বহু জায়গায় এই ইভিএম মেশিনকে অবৈজ্ঞানিক পন্থা-পদ্ধতি হিসেবে বাতিল করা হয়েছে, কিন্তু আমাদের দেশে ইভিএমের রমরমা চলেছে, চলছে, হয়তো আগামীতেও চলবে। কবে নির্বাচনের সঠিক পদ্ধতি আবিষ্কৃত হবে, এর জবাব কে নিশ্চিত করবে? হাস্যকরভাবে আমরা ফাঁকা আওয়াজের মতো কেবল শুনে যাব আমার জন্মগত অধিকারের কথা? কিন্তু সেই অধিকার অর্জিত বা সংরক্ষিত না হলে তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার ক্ষমতা আমার থাকবে না — এটা তো মানা যায় না কিছুতেই।
অবশ্যই এমন কথা নিশ্চয়ই বলতে চাইনি যে স্বাধীনতা মানে স্বেচ্ছাচারিতা। আমার যথেচ্ছাচার নিশ্চয়ই কোনওভাবেই সমাজ-সংস্কৃতিকে দূষিত করবে না — এটা অবশ্য কাম্য। কিন্তু তা সত্ত্বেও জোর গলায় আজ আমরা বলতে বাধ্য হই যে আমার খাওয়া-পরা, আমার ধর্মাচরণ, আমার নিজস্ব মত প্রকাশের অধিকার — সবই আজ সংকুচিত হয়ে গেছে। আজ আমরা কিছুতেই জোর গলায় বলতে পারছি না, "স্বরাজ আমার জন্মগত অধিকার"। সেই অধিকার প্রতি মুহূর্তেই খর্ব হয়ে চলেছে। কী খাব, কী পরব — এ বিষয়ে আমার স্বাধীনতা থেকে অন্যের চাপানো মতামত আজ গুরুত্ব পাচ্ছে অনেক বেশি।
পরিচ্ছন্ন রাজনীতি আজ অস্তমিতপ্রায়, পরিবর্তে দূষিত, হীন রাজনীতিতে ভরপুর হয়ে একদল রাজনীতিবিদ প্রকাশ্যে সমাজটাকে দূষিত করে বেড়াচ্ছেন প্রতিনিয়ত। পরধর্মসহিষ্ণুতাকে আমরা বিশ্বাস করি না, আচরণে প্রকাশ তো পাই-ই না। কিছু রাজনীতিবিদের ভিন্ন চক্রান্তে অন্য ধর্মের প্রতি সোজাসাপ্টাভাবে আঘাত চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কিছু খাদ্যাখাদ্য খাওয়া-না-খাওয়ার ব্যাপারে মানুষকে বাধ্য করা হচ্ছে। রাজধর্ম আজ ধুলোয় ভূলুণ্ঠিত। তা কিছুতেই সুষ্ঠুভাবে রক্ষিত হচ্ছে না। কোনওভাবেই তা আজ আমাদের সোজা-সরল পথে চলার অধিকারকে সহযোগিতা তো করেই না, বরং তার প্রকাশ্য সমর্থন থেকেও আমাদের বঞ্চিত করে।
একথা অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই, মনে স্বাধীনতার বোধ যদি আমাদের না থাকে, অন্যের চলার, বলার স্বাধীনতার প্রতি যদি বিন্দুমাত্র সহানুভূতি না থাকে, তাহলে অকারণে স্বাধীনতার বড় বড় বুলি আওড়ে অথবা চাপ প্রয়োগ করে পতাকা উত্তোলন করার আড়ম্বর দেখিয়ে বাস্তবিকপক্ষে কোনও লাভ নেই।
পরিশেষে বলি, ওই দেশাত্মবোধক গান আমাদের সকলের কণ্ঠে ধ্বনিত হোক — "আমার প্রতিবাদের ভাষা / আমার প্রতিরোধের আগুন / দ্বিগুণ জ্বলে যেন / দ্বিগুণ দারুণ প্রতিশোধে / করে চূর্ণ ছিন্ন-ভিন্ন / শত ষড়যন্ত্রের জাল যেন / আনে মুক্তি আলো আনে / আনে লক্ষ শত প্রাণে।।" আর আমাদের প্রাণপ্রিয় কবি রবীন্দ্রনাথ যে সহজ-সরল, সকলের বোধগম্য ভাষায় মন্ত্রবাণী উচ্চারণ করে গেছেন আমাদের সকলের জন্য, অন্তত সেই গান তো আমরা মুক্তকণ্ঠে গেয়ে উঠতে পারি — "যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে / তবে একলা চলো রে।" এর চেয়ে ভালো প্রতিবাদের ভাষা আর আছে নাকি?
লেখক স্বাধীনতা সংগ্রামী খলিলুর রহমান ও সেতারা বেগমের পুত্র, পূর্ব বর্ধমানের টোলা গ্রামে জন্ম। বাংলা ও শিক্ষা তত্বে স্নাতকোত্তর এবং বি.এড ডিগ্রিধারী এই শিক্ষাবিদ দীর্ঘদিন আন্দামানে শিক্ষা বিভাগে কর্মরত ছিলেন। শিক্ষকতা ও অনুবাদ ক্ষেত্রে অসাধারণ অবদানের জন্য তিনি লেফটেন্যান্ট গভর্নরের প্রশস্তিপত্রে সম্মানিত হন। CBSE-র ইংরেজি ও হিন্দি পাঠ্যপুস্তক বাংলায় অনুবাদের জন্যও তিনি বিশেষভাবে প্রশংসিত। বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত হলেও সাহিত্য, সঙ্গীত ও সংস্কৃতিচর্চার সঙ্গে তাঁর অটুট সম্পর্ক রয়েছে। প্রকাশিত গ্রন্থসংখ্যা ১৭; তাঁর লেখা নিয়মিত প্রকাশিত হয় আকাশবাণী, দূরদর্শন ও বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়।
আপনার প্রতিক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
প্রতিক্রিয়া দেওয়ার নিয়ম
আপনি এই সংখ্যায় আপনার পছন্দের সব লেখাতেই প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবেন। তবে একটি লেখায় সর্বোচ্চ ২টি ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেওয়া যাবে। একই লেখায় তৃতীয় প্রতিক্রিয়া নির্বাচন করলে, প্রথমে নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং নতুন প্রতিক্রিয়াটি গণ্য হবে। আপনার প্রতিটি প্রতিক্রিয়া লেখকদের অনুপ্রেরণা জোগায় এবং বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সৃজনশীলতার প্রতি আপনার সমর্থনকে তুলে ধরে।