কোনো নির্দিষ্ট কবিতায় সরাসরি পৌঁছতে কবির নামের ওপর ক্লিক করুন —
পথহারা পথিক
অরবিন্দ নাহা
কতদিন আগে
কার হাত ধরে কোন মিছিলের সাথে
শহীদ মিনারে এসেছিল,
আজ আর মনে নেই মেয়েটির।
ভিড়ের চাপে সঙ্গীরা ছিটকে গেছে।
গ্রামের নাম, বাড়ি-ঘর
কিছুই মনে নেই।
শুধু অস্পষ্ট মনে পড়ে মায়ের মুখটা।
সেদিন থেকেই খুঁজছে বাড়ি ফেরার পথ
খুঁজছে... খুঁজেই চলেছে...
কত লোকের কাছে জানতে চেয়েছে
বাড়ি ফেরার রাস্তা।
কেউ খুঁজে দেয়নি আলোর পথ;
বরং উল্টোদিকের অন্ধকার গলিতে
হাত ধরে দিয়েছে টান।
ফলে আশ্রয় হলো — শহরের ফুটপাথ।
ক্রমে বড় হতে লাগলো,
তারি মাঝে খুঁজে চলে সে
বাড়ি ফেরার পথ।
ডাগর হয়েছে মেয়েটি,
ফলে এখন সব বোঝে সে।
রাস্তায় তার গা ঘেঁষে গাড়ি দাঁড়ায়,
আর উঠে পড়ে সে
এক-একদিন, এক-একটা গাড়িতে।
এখন তার খাবারের অভাব হয় না।
ফেরার পথে পা টলে প্রায়ই
তবু তারই মাঝে মায়ের মুখটা মনে পড়ে
ঘষা কাচের মত ঝাপসা।
একদিন প্রচন্ড ঝড়-বৃষ্টির রাতে
কোন গাড়ি এলোনা।
নিজেকে বাঁচাতে দৌড় লাগালো;
চওড়া রাস্তার বুক চিড়ে আশ্রয় নিলো
পাঁচ মাথার মোড়ে এক পাথরের মূর্তির আড়ালে।
মূর্তির পায়ে মাথা ঠুকে মেয়েটি বলল,
"আমাকে বাড়ির পথ দেখাও, হে মহামানব।"
বিকট আওয়াজে বাজ পড়তেই
তার আলোয় মেয়েটি দেখলো —
পাথুরে মূর্তির চোখে জলের ধারা।
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মূর্তিটি বলে উঠলো,
"আজ আমি নিজেই যে পথ হারিয়েছি মা,
জানিনা আমাকে পথ দেখাবে কে!"
মেয়েটি আরো দেখল —
তার ঈশ্বর ঠিক তারই মতো কাঁদছে।
লেখক জন্মগ্রহণ করেন ৩ জুন, ১৯৫২ সালে। সাহিত্যচর্চার প্রতি গভীর অনুরাগ থেকেই তাঁর নাট্যকার হিসেবে আত্মপ্রকাশ। নিজস্ব নাট্যদল "আবিষ্কার"-এর জন্য তিনি ছদ্মনামে নাটক রচনা ও পরিচালনা করেছেন। তাঁর চারটি নাটক আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্র থেকে সম্প্রচারিত হয়েছে। কলেজ স্ট্রিটের "সাহা বুক স্টল" থেকে "বিকর্ণ সেন" ছদ্মনামে তাঁর দশটি নাটকের বই প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া "এস চক্রবর্তী" প্রকাশনা সংস্থা থেকে তাঁর স্বনামে একটি কবিতার বইও প্রকাশিত হয়েছে। নাটক তাঁর সৃষ্টির প্রধান ক্ষেত্র হলেও, কবিতা তাঁর অন্তরের ভালোবাসা।
আমার শহর
সম্রাট পুরকাইত
ছোটবেলায় শহরটা ছিল অন্যরকম,
দূরের যুদ্ধেও কেঁপে উঠত রাস্তা।
কলেজ স্ট্রিটের মোড়ে উঠত স্লোগান —
“যুদ্ধ থামাও”, মানুষের সহজ ভাষা।
ভিয়েতনাম কোথায়, বেইরুট কোন দেশে —
সবাই জানত না ঠিকঠাক।
তবু মিছিল হতো, ধীরে ধীরে হাঁটত মানুষ,
বিবেকটা যেন থাকুক অটুট।
সেই স্লোগান জেনারেলের কানে পৌঁছাত না,
কোনো প্রেসিডেন্টও শুনত না তা।
তবু শহরটা বলতে পারত গর্ব করে —
অন্যায়ের পাশে নেই আমাদের নামটা।
আজ যুদ্ধ আসে মোবাইলের পর্দায়,
ধ্বংসের ভিডিও স্ক্রল হয় চুপচাপ।
কোথাও বোমা, কোথাও শিশুর কান্না —
আর ইমোজিতে ভরে ওঠে প্রতিটা চাপ।
মঞ্চে দাঁড়িয়ে কেউ হুঙ্কার দেয়,
একটা দেশ উড়িয়ে দেওয়ার গল্প।
কেউ জিজ্ঞেস করে না, সেই আগুনে
কত প্রজন্ম হয় বিকল শরীর।
তবু মনে হয়, সেই ছোট মিছিলগুলো
শহরের শেষ বিবেক ছিল হয়তো।
ধুলো জমা ব্যানারে লেখা আজও —
“যুদ্ধ থামাও”, মানুষ বাঁচুক যত।
দেশ তত্ত্ব
পৌলমী ভট্টাচার্য
পুরোনো পুরোহিত এবং অসূয়া বাতাস
আমার খাম ভর্তি বিপ্লব...
কাটাবো কলমি ঘেষা খাতায়।
এভাবেই ঘুমিয়ে যাব আকাল নান্দীপটে,
অকাল মরশুমে।
ধান বুড়ো হয়, জ্বর আসে ভাতে;
কেবল দেশ কেমন করে চেয়ে থাকে
একলা অসুখে।
আমার অভিজ্ঞতার বন্দিশ মায়ের মুখস্থ হয় নি,
চেনে নি ভেতরকার বিসুখ দিন নামচা।
নেহাত স্বপ্ন দেখি অরক্তিম ভোরে,
নেহাত কাঁটাতার ধুলো ব'লে
ছন্দদালান ভিজিয়েছে নাবিক।
নেহাত জড়তা ভাঙবে বলে
শপিণ্ডীকরণ করবে ভেবেছিল পুরোনো পুরোহিত,
তাই সূর্য গলে জল।
মাটি সাপটে আছে নিটোল হাহাকার,
ব্যাধি খাচ্ছে অসূয়া বাতাস;
ঘ্যানঘ্যান করি ভবিষ্যতের কাছে
আর চোখ খুলে আসে প্রবল অভিশাপে।
পৃথিবীর ওপারে কে বসে আছে ও!
কেই বা জপে জপমন্ত্র!
বুঝি না, চাই না।
আমারও প্রেম আছে,
ভাষা ভরা গোলা আছে,
পান বাটায় দেশ তত্ত্ব সাজানো থরে থরে,
শুধু নতুন হয় না অন্তর অক্ষর...
গলকাপড়ে সাস্টাঙ্গে আছে মা,
চোখে একান্নবর্তী লালনের খিদে।
আঁচলের খোটে গিঁট রেখে বয়ে যায় জল,
কথা ভাসে — আমরা মাকে নিয়ে লেগে বেঁধে বাঁচব
আর মোহনা হবে স্বীকৃতি যাপনের আতুঁড়ঘর।
বেতননামা
ওয়াহেদ কাজী
পঞ্জিকার ওই লাল দাগটাতে
আটকে থাকে শ্বাস,
'বেতন' মানেই এক চিলতে সুখ,
বাকিটা বারো মাস।
একাউন্টে ওই মেসেজটা এলে
বুকটা হালকা হয়,
পরক্ষণেই হিসাবের খাতা
গ্রাস করে সব জয়।
বাড়িভাড়া আর মুদির দোকান,
মায়ের সুগার টেস্ট,
পকেটের ওই অল্প টাকায়
করতে হবে বেস্ট।
চেনা কোনো এক সুরের মতন
একলা ব্যালকনিতে,
ভাবি, মধ্যবিত্তের জীবনটাই
কেটে গেল কিস্তিতে!
ছোটখাটো সব স্বপ্নগুলো
ড্রয়ারে তোলা থাক,
ছেঁড়া জুতোটার সুকতলা আজ
লুকিয়েই হাঁটা যাক।
নতুন জামার ইচ্ছেগুলোকে
ইস্ত্রি করে তুলি,
'বেতন' নামের ওষুধে আমরা
রোজকার ক্ষত ভুলি।
শহর জুড়ে ট্রাফিক জ্যাম আর
ট্রামের চেনা শব্দ,
মাসকাবাড়ির ফর্দ দেখে
আমার জেদও জব্দ।
তবু একটা ডায়েরি কাঁধে,
মনখারাপের রাতে,
ভাবি, বাঁচা তো যায় মধ্যবিত্ত
এই রূপকথাতেই!
তবু মাস শেষে এই 'বেতন' শব্দে
এক চিলতে আলো হাসে,
ঠিক যেন ওই বৃষ্টির ফোঁটা
তপ্ত পিচের ঘাসে।
খুব বেশি নয়, অল্পতেই যে
আমাদের সংসার,
বেতন মানেই বেঁচে থাকার
আরও একটা মাস উপহার।
লেখক ১৯৯৬ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। পিতা কাজী আব্দুস সালাম এবং মাতা কোহিনুর বিবি। জন্ম, বেড়ে ওঠা ও বর্তমান বসবাস পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার বেলডাঙার দেবকুণ্ড গ্রামে। তিনি ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক। স্কুলজীবন থেকেই তাঁর লেখালেখির সূচনা। মূলত কবিতা লিখলেও ছড়া ও ছোটোগল্পও লেখেন। সাহিত্যজগতে তাঁর প্রথম পদার্পণ ইংরেজি একক কাব্যগ্রন্থ "The Poetry By Soul"-এর মাধ্যমে। ২০২৪ সালের কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায় প্রকাশিত হয় তাঁর বাংলা একক কাব্যগ্রন্থ "হৃদয়ের এপিটাফ"। বিগত কয়েক বছরে বিভিন্ন বাংলা ও ইংরেজি পত্রিকায় তাঁর কবিতা, ছড়া ও ছোটোগল্প প্রকাশিত হয়েছে। লেখালেখির পাশাপাশি ক্রিকেট তাঁর অন্যতম নেশা।
স্বাধীনতা
তারক নাথ পাল
স্বাধীনতা কাল্পনিক
যার কাছে পৌঁছানো যায় না।
যা বন্দী শাসকের ক্ষমতার লোহার খাঁচায়।
শাসক আবির্ভূত হোন বা নাগরিক তৈরি করুক।
সমান দাম্ভিকতায় প্রতীয়মান সিংহাসনে।
রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা,
তবু তা অধরা
অভিনয় করে নাগরিক, গায় মুক্তির গান।
না পাওয়ার গল্প গাথা, দিন যাপনের বেদনা
আছড়ে পড়ে একনায়কের ঔদ্ধত্যের প্রাসাদে।
অবিরাম চলমান পরাধীনতা
চরাই উতরায় পথে কাজ ফেলে চলে
আন্দোলন, বাঁচার লড়াই।
মনে পড়ে এ তো স্বাধীন দেশ,
তবে কেন রক্ত ঝরে!
ইচ্ছেগুলো জমাট বাঁধে,
হারিয়ে যায় স্বপ্নগুলো।
ভবিষ্যতের কান্ডারী ছাত্রদল,
দিন কাটে রাজপথে বিবর্ণ স্বপ্ন রঙিন,
লাঞ্ছিত যারা হয়নি তাদের সারা।
হে রাজাধিরাজ
একদিন ধূলোময় রাস্তায় হেঁটেছিলে —
আজ ধুলোহীন কার্পেটে
ক্ষমতার বলিষ্ঠ পদক্ষেপে।
নিপীড়িত নাগরিকের আশা আকাঙ্ক্ষা উপেক্ষিত,
বিক্ষোভ ধ্বনি অনুরণিত হয় গণতন্ত্রের ইমারতে।
তার কথা থাক
শুভদীপ ঘোষ
তার কথা থাক,
বরং বলি ভোরের শিশিরের কথা,
ঘাসের ডগায় ঝুলে থাকা
স্বচ্ছ জলের কথা।
না, তার কথা থাক —
শিশির তো সূর্য উঠলেই হারিয়ে যায়,
সে তার চেয়েও সুন্দর।
বলি কাশফুলের কথা,
শরতের নীল আকাশের কথা,
কিংবা নদীর বুকে পড়ে থাকা
সোনালি বিকেলের আলো।
না, তার কথা থাক —
এসব সৌন্দর্য তো ঋতু বদলালে ফুরিয়ে যায়,
সে তার চেয়েও সুন্দর।
বলি পূর্ণিমার চাঁদের কথা,
তার চারপাশে ছড়িয়ে থাকা
রুপালি আলোর কথা।
না, তার কথা থাক —
চাঁদেরও কলঙ্ক আছে,
সে তার চেয়েও সুন্দর।
বলি গোলাপের কথা,
সদ্য ফোটা জুঁইয়ের কথা,
বৃষ্টিভেজা মাটির গন্ধের কথা।
না, তার কথা থাক —
ফুল ঝরে যায়, গন্ধ মিলিয়ে যায়,
সে তার চেয়েও সুন্দর।
বলি রবীন্দ্রনাথের গানের কথা,
কিংবা জীবনানন্দের অমর কবিতার কথা।
না, তার কথা থাক —
কিছু সৌন্দর্য ভাষায় ধরা যায় না,
সে তেমনই এক অনন্ত বিস্ময়।
লেখক বীরভূম জেলার নাচনসাহা গ্রামের বাসিন্দা। বর্তমানে দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র। পড়াশোনার পাশাপাশি বাংলা সাহিত্য, বিশেষ করে কবিতার প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ। নিয়মিত লেখালেখির চর্চা করেন। অনুভূতি, প্রকৃতি, প্রেম ও জীবনের নানা অভিজ্ঞতাকে শব্দে প্রকাশ করতে ভালোবাসেন। কবিতার মাধ্যমে মানুষের হৃদয় ছুঁতে চাওয়াই তাঁর উদ্দেশ্য। সততা, নিষ্ঠা ও দায়িত্ববোধকে তিনি জীবনের অন্যতম মূল্যবোধ বলে মনে করেন।
ভোর
দীপান্বিতা নস্কর
রাত শেষে ভোরের আলো ফুটলো
কিছু অভুক্তদের মনের আশা জাগলো।
কিছু দুঃখীদের হয়তো এবার দরিদ্রতা মুছবে,
এই নবনির্মিত ভোরের আলোয়।
সময়ের কালো স্রোতের
একটা অবসান হলো হয়তো।
ওই যে ছুটে চলা ক্লান্ত পথিকেরা
এবার পথ খুঁজে পাবে,
নতুন করে বাঁচার।
কোনো মা হয়তো
আর তার ক্ষুধার্ত শিশুকে ভোলাবে না —
"রাত হয়েছে, শুয়ে পড়!" বলে;
এই ভোর যে নতুন ভোর,
আগামীর পথ চলার।
নতুন ভাবে নতুন রূপে
এগিয়ে যাবার ভোর।
এ যে অন্ধকার রাতের
শেষ হওয়ার ভোর।
নিঃশেষিত
কালপুরুষ
মনের দরজাটা এখন খোলাই থাকে।
সময়ের নিরন্তর অভিঘাতে, চোখ দুটো পাথর।
দৃষ্টিহীন চোখ দুটো এখন অপেক্ষার শক্তি হারিয়েছে।
নিয়তিকে বলি, “তুমি ছুটি নাও।”
মনের ডাকবাক্সে আমার ঠিকানার গরমিল।
তাই, তোমার পাঠানো সুখ
আজ আবদ্ধ থাক আমার বিবর্ণ খামে।
অসুখের আলিঙ্গনে, দগ্ধ মানসে —
আজ আমি নিঃশেষিত।
ইচ্ছে নৌকা
বিশ্বনাথ বসাক
নির্ণয়ের শেষে এক ইচ্ছে মাত্রা
বৃষ্টির রেখায় হোক সাগরস্নান
তবু উঠোন কালো জলেই বন্দী
বঞ্চিত, সে তো কারোর কল্পনার অভিমান।
কোনো রূপকথার চোখেই তার দৃষ্টি
নির্ভরতার চাবিতে তার দ্বার খোলে
একসময় নিঃশাসের শেষ বিন্দু ছোঁবে
সে মিশবে স্বপ্নের অশ্রুজলে।
অবলুপ্তের মহিমায় ফুরোবে তার স্মৃতি
বিড়ম্বনার পাতায় তার অযাচিত ঘ্রাণ
জানে, তাসের ঘরে জন্ম হয়েছে
তবু হৃদয়ে ছিল তার জাহাজ প্রাণ।
নামের সোপান
তীর্থ মুখার্জী
কোন সোপানে রয়েছে লেখা —
নামের মানে জানতে শেখা।
জীবন মানে ক্ষণিক বাঁচা,
মরণ তো শেষের যে ঘুম।
পথের দাবী মানতে বলা —
অনন্ত এক আদিম চলা।
কোন ঠিকানায় বেঁচে থাকা?
কোন মানুষের মন বোঝা?
শুধু শুধু মন খারাপের
ভাঙা কাঁচ কুড়িয়ে রাখা।
গুলিয়ে ফেলি সময় আমি,
সময় মানে ভাঙা গড়া।
জোয়ার আসে ভাটির টানে,
নৌকা ভাসাই উজান স্রোতে।
হারিয়ে গিয়েই খুঁজে পাই —
নামের ভিতর লেখা সোপান।
হারিয়ে যাওয়ার গান
কালাপ্রিয়া
জানো, আমি হারিয়ে যেতে চাই,
চেনা শহর থেকে বহু দূরে —
যেখানে অচেনার মাঝে শুধু শান্তি পাই;
নাহয় হবো ক্ষ্যাপা, ভবঘুরে।
তবুও আমি হারিয়ে যেতে চাই,
যেখানে আমাকে হারাবার ভয় নেই,
যেখানে দায়িত্ব, কর্তব্য, ভালোবাসা নেই,
যেখানে আমাকে বাঁচাবার
বা মারবার লোকের অভাব,
সেখানেই ঠিক সেখানেই আমি থাকবো
সঙ্গে আমার স্বভাব।
জানো, আমি হারিয়ে যেতে চাই বহু দূরে —
অচেনা শহরে...
অজানা মানুষের ভীড়ে...
লেখিকা পেশায় একটি বেসরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। পাশাপাশি চাকরির প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতিও চালিয়ে যাচ্ছেন। লেখালেখির হাতেখড়ি তাঁর মায়ের কাছ থেকে, আর প্রথম শ্রোতা ছিলেন তাঁর দুই বান্ধবী। ছোটবেলা থেকেই প্রকৃতি, সম্পর্ক ও সমাজের নানা দিক তাঁকে ভাবায়। বাস্তববাদী কবিতা আবৃত্তি তাঁর অন্যতম ভালো লাগা। তাঁর বিশ্বাস, সমাজের চোখরাঙানিকে তুচ্ছ করে নিজের সরলতা ও খ্যাপামিকে বাঁচিয়ে রাখার মধ্যেই জীবনের সৌন্দর্য।
পাথরের জীবন
মানস করমহাপাত্র
চায়ের কাপে ডুবছে
দুপুরের তীব্র রোদ্দুর।
টেবিলে জমাট বাঁধা
অমীমাংসিত হিসেবের খাতা।
রান্নাঘরের পেঁয়াজের ঝাঁঝ
আর অফিসের ডেডলাইন,
এদের মাঝখানে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মরে
আমাদের রূপকথা।
স্মৃতিগুলো আলমারির কোণে
জমে থাকা মৃত ধুলো,
বর্তমান শুধুই এক লাফে পার হওয়ার
ট্রাফিক সিগন্যাল।
আমরা কেবল বেঁচে থাকার
অভিনয়টুকুই নিখুঁত করেছি,
অথচ পাঁজরের নিচে জমাট বাঁধে
অনন্ত হাহাকার।
জীবন কোনো রূপক নয়,
এক টুকরো নিষ্ঠুর পাথর,
যা প্রতিদিন আমাদের রক্ত মেখে
ক্ষয়ে যায়, অলক্ষ্যে।
সময় সব ফিরিয়ে দেয়
মিলন হাঁড়া
আমি বহুতল থেকে ঝাঁপ দিয়ে দেখেছি
আমার নিয়তির মৃত্যু নেই।
বৈধতার কয়েকটা হাড়গোড় ভেঙেছে মাত্র
আর সামান্য রক্ত পাত।
আমি বেঁচে ফিরছি বারেবার
কালো রক্ত পায়েই হেঁটে ফিরেছি।
কিন্তু এরকম অনেক মৃত্যু আমি দেখেছি
যাদের ঠুনকো অহমিকার মিথ্যে বড়াই ছিল
প্রতি পদে পদে ছিল অবৈধতা
মুখোশের প্রতিটি দাগে ছিল
সুশৃঙ্খল অভিনয়।
আত্মসম্মান বিক্রি করে সম্ভ্রম কিনে খায়।
তারা ভাবে,
সময় থমকে এগিয়ে যাবে।
অথচ,
অবৈধ লম্বা লম্বা মাথা গুলো
নুইয়ে মাটিতে পড়ছে বহুতল থেকে
কি দারুণ রক্তপাত
নিমেষেই ভেঙে খান খান সব শাখা-প্রশাখা।
দুটো সময়ের ফারাকে
কোনো সময় থেমে থাকে না
সেখানে এক বিশাল ঘূর্ণবাত তৈরি হয়।
নারী
হাবিবা খাতুন
ভোরের শিশির, সন্ধ্যাতারা —
দুই-ই তোমার রূপ,
অগ্নিপথে হেঁটেও রাখো
হাসির নীরব ধূপ।
মায়ের কোলে পৃথিবী শেখে
প্রথম ভালোবাসা,
তোমার চোখে জেগে থাকে
অনন্ত আশার ভাষা।
ঝড়ের কাছে মাথা নোয়াও না,
বুকেই রাখো ঢাল,
অশ্রু দিয়ে সিঞ্চন করো
আগামী দিনের কাল।
কলম হাতে, কর্মপথে,
জ্ঞানের দীপ্তি ছড়াও,
অন্ধকারের প্রতিটি দ্বারে
নতুন সূর্য গড়াও।
অবহেলার ইতিহাস আজ
মুছে যাক একদিন,
সম্মান হোক প্রতিটি ঘরে,
প্রতিটি মানুষের ঋণ।
নারী মানে আমার চোখে
সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ বিস্ময়,
তোমার হাতেই জেগে থাকে
আগামী দিনের বিজয়।
নৈবেদ্যের অনুরাগে
অশোক নন্দন
মোর চেতনার গহন বনে
তোমারই পদধ্বনি,
মর্মর রবে বেজে ওঠে আজ
স্মৃতির নূপুরমণি।
হৃদয়-সরসী শান্ত শীতল,
ফুটেছে রক্তিম শতদল,
তোমার আঁখির অতল গভীরে
প্রেমের কাজল টলমল।
অস্তরাগের স্বর্ণাভ ছটায়
জ্বেলেছি বিরহী বাতি,
নিভৃত লগনে তোমারে ভেবেই
কেটে যায় বিভাবরী রাতি।
ক্লান্ত চাতক তৃষ্ণা হারায়
তোমার করুণার ধারায়,
সহস্র জনম ধন্য আমার,
যদি এই মন তোমায় হারায়।
পলাশ রাঙানো ফাগুন বেলায়
তুমিই চৈত্রালি হাওয়া,
জীবন-খাতার পাতায় পাতায়
তোমারই আসা-যাওয়া।
তুমি শ্রাবণের মেঘমল্লার,
তুমিই হেমন্তের কুয়াশা,
রন্ধ্রে রন্ধ্রে বোনা আছে মোর
অনন্ত ভালোবাসা।
শব্দের মাঝে খুঁজি নিশিদিন
তোমার অলৌকিক ছবি,
মোর কাব্যের প্রতিটি চরণে
তুমিই উদিত রবি।
নিঃশব্দ এই সমর্পণে
নাহি কোনো চাওয়া-পাওয়া,
তোমারই ছন্দে মেলালাম আজ
মোর তরীখানি বাওয়া।
মলিন ধুলোয় অমর হোক এই
মনের গোপন টান,
মোর অক্ষয় প্রেমে রচিত হোক
আগামীর আখ্যান।