কোনো নির্দিষ্ট কবিতায় সরাসরি পৌঁছতে কবির নামের ওপর ক্লিক করুন —
পাথুরে মৃত্যু
দৃপ্ত
আমি এক মৃত্যুকে দেখি।
প্রতিনিয়ত, খুব পাশ থেকে।
কখনো মনে হয় এই বুঝি
ছুঁয়ে যাচ্ছি সেই মৃত্যুর চিবুক।
আধো-চেতনে বুঝতে পারি,
ইট পাথরের ভগ্নস্তূপে দাঁড়িয়ে
সে মৃত্যু কাতরাতে কাতরাতে ক্ষুধায়;
কখনো বা
হাত-পা হীন এক ঝলসানো আর্তনাদ।
আমার সে মৃত্যু ধূপ-আতরে নয়,
সেজে ওঠে রক্তঝরা চোখে।
সভ্যতার নগ্নতায় এ মৃত্যু পুষ্ট হয়,
বীভৎস হয়ে ওঠে তার থাবা।
তার নৃশংসতায় পৃথিবীর সকল সুর
এক প্রহরের আকুতি করে।
কিন্তু যারা ভেঙেচুরে বেঁচে থাকে
তাদের সুরে ছন্দ কোথায়?
তারা কি কারো দয়ায় বাঁচে?
নাকি সেই মৃত্যুর করুনায়?
জানিনা!
এ এক করুণ অমানিশা।
যার কোনো অধ্যায় নেই।
তবে এ মৃত্যু আমাকে মরতে দেয় না।
বাঁচিয়ে রাখে তাঁর নিজের মতো করে।
হয়তো মনুষত্বের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে
আমায় উপহাস করবে বলে!!
মনে পড়ে অনামিকা?
ড. বিজুরিকা চক্রবর্তী
অনামিকা,
তুমি এখনও আমায় ভাবো?
মনে পড়ে সেই অগোছালো ছেলেটাকে?
আজও যে এক চাতকের মতো শুধু
তোমার আশায় পথ চেয়ে বসে থাকে।
মনে পড়ে সেই বাঁশিটার কথা আজও
বাজত যে শুধু তোমার গল্প বলতে?
ভুলে যাওয়া সুর সম্বল করে বারবার
তোমার হৃদয়ে চাইত যে ঘর গড়তে।
মনে পড়ে সেই সোনালি বিকেলের আলোতে,
কাঁপা কাঁপা যত কদমফুলের গন্ধ?
একখানা ছেলে সেই বিকেলের মায়াতে
তোমার আবেশে হয়েছিল চিরঅন্ধ।
আজও দেখো তুমি,
খুঁজে পাবে তাকে রোদ্রে,
খুঁজে পাবে তাকে বর্ষা দিনের মেঘলায়।
খুঁজে পাবে তাকে দূর তারাদের রাজ্যে
মিশে থাকা ওই রুপোলি রাতের জ্যোৎস্নায়।
লেখিকা কলকাতার দমদমের বাসিন্দা। সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি অর্জন করেছেন। বর্তমানে এনআরএস মেডিক্যাল কলেজে সায়েন্টিস্ট হিসেবে কর্মরত। তাঁর রচিত কবিতা বিভিন্ন পত্রিকা, এফএম রেডিও এবং সংকলনে প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'কে তুমি?' পাঠকমহলে প্রশংসিত।
বারুদ
গৌতম বড়ুয়া
কৃতি ছাত্রের ঘিলু পেলো ৫০০ টাকার গুলি
থকথকে ঘিলু ছড়িয়ে পড়লো যুদ্ধক্ষেত্র জুড়ে,
সেই ছেলেটার মা এখনো বুক বেঁধে আছে তবু
ইচ্ছাগুলো দেহের সাথে চিতায় যাবে পুড়ে।
তোমার বারুদমাখা হাত যতদূর যায়
ততোদূরে বিনাশ হলো বিকেলে ওড়া ঘুড়ি,
সেই বিকেলেই যুদ্ধ দাড়ালো লাল পতাকা নিয়ে
আগুন নদীর তীরে ডুবলো মানবতার তড়ি।
আলগা ছিল বিশ্বযুদ্ধ — প্রথম, দ্বিতীয়,
গিয়েছে যা সব থেমে প্রাণহানির চূড়ায়,
নবীন জন্ম ছাইমাখা হতে বন্দুক তোলে
সময়ের খাতার ধার বেয়ে শিশুর রক্ত গড়ায়।
প্রাচীন ইমারত গুলো ইট বালির হিসেব পাচ্ছে
নির্মাতা হাতগুলো মৃত, কাঁদে চুন সুরকির মাঝে,
যেই রাস্তায় হেঁটেছে সভ্যতা
তারা নতুন রূপে ধ্বংসস্তূপে মৃতদেহ নিয়ে সাজে।
যুদ্ধক্ষেত্রের মাটিটা উর্বর হয়ে চলেছে
সুষে নিচ্ছে তরুণ জীবের গরম রক্ত,
আর যারা বসে নির্দেশনা দিলো
তারা প্রাণনাশের নেশায় আফিম ছাড়াই আসক্ত।
কাল তো সূর্যোদয় হবে প্রতিদিনের মতো
শুকোতে থাকবে কাঁচা বারুদ আর নরম মাংস,
সমাজ দাঁড়িয়ে তখনও দেখবে কুৎসখেলা
অযৌক্তিক মুকুটমাথার সৃষ্টি করা ধ্বংস।
যে তাঁতি যুদ্ধবর্ম বুনলো নিজের ঘরে বসে
চোখেতে তার যুদ্ধবিমান ওড়ে পাখির দলে,
তারাখসার রূপে যা বুক পেতে নিল
তারাও তো ভাঙ্গা ভবিষ্যৎ এর কথা বলে।
আমি তখন সীমান্তে বসে ভাবি লালচে চোখে
ওপারের দিগন্তে বোধয় শত্রুপক্ষের ভাঙ্গা ঘর,
আমার দেশ, নাকি ক্ষমতার নলেন গুড়ের স্বাদ
তবু যুদ্ধ চাইলো
বোকাবাক্সের সামনে চেয়ে থাকা বর্বর।
বুলডোজার
অলোক রায়
স্বপ্নগুলো পড়ছে ঝরে,
বুলডোজারের পায়ের তলে;
নিঃস্ব হাতে চেয়ে থাকে
মুখ ভিজে যায় চোখের জলে।
দুদিনের ঐ ক্ষমতার জোরে,
কলকাঠি আজ নাড়ছে কারা?
চায়ের দোকান মিশলো ধুলোয়,
গরিব মানুষ সর্বহারা!
আস্ত বিকেল গড়িয়ে গেলো,
দোকান এখন শুধুই মাটি;
কাল সকালে হয়তো রে ভাই,
ধরতে হবে ভিক্ষার বাটি!
কেউ একজন কাঁদছে বসে,
নিজের চরম সর্বনাশে;
সেই দশা দেখে হাততালি মারে,
দেশবাসী আজ হেসেই ভাসে!
অলখ বন্ধন
আশাদ আলী
তোমার ওই সুদূর প্রসারিত নয়ন-আকাশে,
আমি এক যাযাবর মেঘের মতো
ভাসিয়া বেড়াতাম;
তুমি কখনো চাহিয়া দেখ নাই
আমার সেই মৌন ব্যাকুলতা,
যাহা প্রতি নিশীথে
নক্ষত্রের আলোয় ঝরিয়া পড়িত ধরণীর বুকে।
প্রেম কি কেবলি বন্ধন,
নাকি এক চিরন্তন মুক্তি?
এই সংশয়ে কাটিয়া গেল
কত শত বসন্তের কোকিল-কূজন।
আমি তোমার চরণে
কোনো দিন পুষ্পাঞ্জলি দিই নাই,
কেবল দূর হইতে তোমার ছায়াটুকুকে
বন্দনা করিয়াছি;
হিয়ার গহন কোণে
যে নীরব রাগিণী বাজিয়া উঠিত,
তাহা সমীরণের ডানায় চড়িয়া
অলক্ষ্যে ছুঁইয়া যাইত তোমার অলকগুচ্ছ।
লোকে যারে বিরহ কহে,
আমি তারে পূজার আসন পাতিয়াছি,
যেখানে কোনো অধিকারের দাবি নাই,
নাই কোনো পাওয়ার কোলাহল।
যদি কখনো শ্রাবণের মেঘ
অন্ধ করিয়া দেয় তোমার দিগন্ত,
জানিও,
আমার অশ্রুধারা সেখানে
বর্ষণরূপে নামিয়া আসিয়াছে;
তোমার সুখে আমার আমোদ,
তোমার শান্তিতে আমার পরম নির্বাণ।
এই তো দুই আত্মার
এক নিভৃত ও অখণ্ড জলযাত্রা,
যেখানে নদী চলিয়াছে
সাগরের সন্ধানে আপনারে বিসর্জন দিতে,
মোদের এই মৌন সংযোগই
মহাকালের পটে এক অবিনশ্বর আলপনা।
মাটি সাক্ষ্য দেয়
মানস করমহাপাত্র
বিহারের মাটি আজ লবণ চেনে,
শস্য ভুলে গেছে।
খবরের কালি শুকোয়, ক্ষত শুকোয় না।
মোমবাতির আলোয় দুই দিনের প্রতিজ্ঞা।
তারপর,
অন্ধকার আবার চুক্তি করে নেয়।
আসামি গোনে ঋতু,
আদালত গোনে কাগজ।
প্রমাণ খোঁজে বাতাস;
বাতাস ফিরিয়ে দেয় নীরবতা।
ফাঁকের ফাঁকে ফসকে পড়ে ন্যায়।
শিকল একজনের পায়ে,
মালা আরেকজনের গলায়।
লজ্জা বসে থাকে ন্যায়ের দরজায়।
আমরা পাশ কাটাই,
এড়িয়ে যাওয়া রপ্ত করেছি।
ভুলে যাওয়া এখন রাষ্ট্রীয় শিষ্টাচার।
পুরনো দগদগে ঘায়ে,
নতুন তারিখ বসাই।
কাগজ পোড়ে, ছাই ওড়ে, স্মৃতি মরে না।
মাটি সব জমা রাখে, মাটি হিসাব চায়।
শিকড়েরা নখ দিয়ে ঘুম ভাঙায়।
স্তম্ভ কাঁপে, দেয়ালের গায়ে ফাটল হাসে।
এবার মোম গলে না, পাথর গলে জল হয়।
আয়নার সামনে দাঁড়াক সভ্যতা।
যতক্ষণ না লজ্জা, নিজের মুখ চেনে।
ক্ষুধা
সৈকত বৈরাগী
জীর্ণ জানালার ধারে স্থির এক ক্ষুদ্র দেহ,
দৃষ্টিতে অনন্ত শূন্যতার বিস্তার।
দূরবর্তী কোনো অগ্নিকুণ্ডের ধোঁয়া উঠলেই
তার মনে জাগে অন্নের মায়াবী গন্ধ।
ঊনানের অঙ্গার বহুদিন নির্বাপিত।
হাঁড়ির অন্তঃস্থলে প্রতিধ্বনিত শূন্যতা।
লবণের স্বাদ আজ স্মৃতিমাত্র,
চালের কলসিতে কেবলই বাতাসের অধিকার।
পিতৃহীন এই দীর্ঘ প্রতীক্ষায় জীবন
যেন ক্রমশ নিষ্প্রভ।
ছায়া আশ্রয় দিত প্রতিদিন,
সে ছায়া অদ্য অনুপস্থিতির গভীরতায় নিমজ্জিত।
মাতা নির্বাক,
স্তব্ধতার আবরণে আচ্ছন্ন।
অভ্যন্তরীণ বেদনাকে গোপন করে
অশ্রুবিন্দুগুলি আলো পায় না;
অন্ধকারেই তা নিজেকে ক্রমশ বিলিয়ে দেয়।
তবুও ক্ষুদ্র প্রাণে
অবিনাশী প্রত্যাশা অলক্ষ্যে রচিত হয়।
বিনিময়ের আকাঙ্ক্ষা —
হয়তো বা কোনোদিন মিলবে
একবেলা আহার;
হবে ক্ষুধার সঙ্গে সামান্য সন্ধি।
লেখক মনে করেন বাস্তব আর ভাবনার মাঝেই তাঁর লেখার জন্ম। সমসাময়িক জীবন, মানবিক অনুভূতি ও চারপাশের বাস্তবতা তাঁর লেখার প্রধান ভিত্তি। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও চিন্তার গভীরতা থেকে উঠে আসে সেইসব শব্দ, যেখানে সরল বাস্তবতা ও অন্তরের সূক্ষ্ম অনুভূতি মিলেমিশে যায় — সেখানেই তিনি খুঁজে পান সৃজনশীলতা ও আত্মপ্রকাশের পথ।
স্মৃতির তলানি
তীর্থ মুখার্জী
জানিনা পারবো কিনা
এই পৃথিবীতে টিকে থাকতে,
এই সময়ের সাথে
নিজের উপযোগিতা বজায় রাখতে।
যখন কালো মেঘ ঘনিয়ে আসে
এই বিশ্বজাল বুনতে,
আমি শিখি তখন
এই পিচ্ছিল রাস্তায় পা টিপে হাঁটতে।
পাশ কাটিয়ে যদি কাউকে দেখি
আমার চেয়ে এগিয়ে,
আমি চেষ্টা করি ফেলে দিতে,
নয়তো সে দেবে পিছিয়ে।
তাই লড়াই করি নিজের সাথে,
ভাঙতে এই দেয়াল,
অন্যকে হারিয়ে নয়,
নিজেকেই জিততে হবে চিরকাল।
সময়ের প্রবাহে,
কত কিছু ভেসে যায়।
আবেগের জড়তায়,
মোহের বন্ধনে।
বাঁধতে পারে না কোনভাবে কিছুতেই।
তবুও আবেশ থেকে যায় স্মৃতির তলানিতে।
কোন কোণে ধরা দেয়,
মাঝে মাঝে স্বপনেতে।
খোলা চোখেও ভেসে ওঠে,
অতীতের ছবিগুলো।
যেই পথ পেরিয়ে এসেছি বহুকাল আগেই।
সেই পুরনো বাঁকে, এসে দাঁড়াই আবার।
দৃশ্য হয়ে ওঠে সব,
সেই অদৃশ্য মনে গাঁথা।
নাড়া দিয়ে যায়, এখন এই সময়টাকে।
সূর্যোদয়
পাগল দার্শনিক
বিভ্রমের ভাঙা আয়নায়
মুখ ঢেকে ছিল বহুদিন,
অন্তর্গহ্বরের গোপন ক্ষতকে ভেবেছি
নিয়তির অনিবার্য দহন।
জলাভূমির স্তব্ধ গন্ধে
ডুবে ছিল সমস্ত স্বপ্ন,
শ্যাওলা-ঢাকা অন্ধ বিশ্বাসে
নিজেকেই করেছি নির্বাসিত।
অন্ধকারের গর্ভে জন্মানো কত বিষণ্ন পাখি
প্রতিদিন ঠুকরে খেয়েছে হৃদয়ের শেষ সবুজ,
তবু নিঃশেষ হইনি —
কারণ কোথাও এক বিন্দু আলোর সম্ভাবনা
নিভৃতে জেগে ছিল প্রার্থনার মতো।
তারপর তুমি এলে —
বৈশাখশেষের প্রথম বর্ষার মতো,
দীর্ঘ দহন পেরিয়ে আসা মৃত নদীর বুকে
হঠাৎ জেগে উঠল জলের উচ্ছ্বাস।
তোমার চোখের গভীরে আমি দেখেছিলাম
অচেনা এক মুক্ত আকাশ,
যেখানে কোনো শৃঙ্খল নেই,
নেই অতীতের ক্লেদমাখা কারাগার।
আমি তো চেয়েছিলাম শুধু
এক মুঠো নির্মল বাতাস,
যেখানে নিঃশ্বাস নিলে
ফুসফুসে জমবে না শতাব্দীর বিষ।
চেয়েছিলাম তোমার নীরবতার পাশে বসে
নিজের সমস্ত ভাঙাচোরা সুর মেলাতে।
তুমি দিলে আশ্বাস,
দিলে অনন্তের দিকে খোলা এক জানালা,
দিলে এমন এক স্পর্শ,
যেখানে মৃত নক্ষত্রও পুনর্জন্মের স্বপ্ন দেখে।
তবু বিভ্রান্তি বড়ো গভীর —
যে আলোকে সূর্য ভেবেছিলাম,
সে কি কেবলই ক্ষণিক জোনাকির দহন?
যে প্রেমকে মুক্তি মনে হলো,
সে কি নিঃসঙ্গতারই নতুন অলংকার?
আমি বুঝিনি।
তবু আজও সহস্র ডানার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে
অপলক তাকিয়ে থাকি দিগন্তের দিকে —
যদি আবার কোনো ভোর নামে
তোমার নামের ভিতর দিয়ে,
যদি আবার নিষ্ক্রিয় মৃত্যুর ভিতর থেকে
জেগে ওঠে জীবনের উন্মত্ত স্পন্দন।
কারণ আমি জানি,
সব হারানো মানেই শেষ নয় —
কখনও কখনও
সবচেয়ে গভীর অন্ধকারই জন্ম দেয়
সবচেয়ে দীপ্ত সূর্যোদয়ের।
লেখক সমসাময়িক বাংলা সাহিত্যের এক স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর। কবিতা, গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধ রচনায় তিনি নির্মাণ করে চলেছেন নিজস্ব অনুভূতির ভুবন, যেখানে জীবনদর্শন, প্রেম, প্রকৃতি ও আধ্যাত্মিক ভাবনা এক অনন্য মেলবন্ধনে ধরা দেয়। পেশায় একজন সরকারি কর্মচারী হলেও অন্তর্লোকে তিনি নিরন্তর এক সাধক-লেখক। তাঁর ছদ্মনাম “পাগল দার্শনিক”— যা তাঁর সাহিত্যচিন্তারই প্রতিফলন: প্রশ্নমুখর, অনুভবনির্ভর এবং অস্তিত্বসন্ধানী।
বৃষ্টির পরে
অশোক নন্দন
তোমার সঙ্গে দেখা হওয়ার পর
পৃথিবীটা হঠাৎ বদলে যায়নি,
শুধু কিছু সাধারণ জিনিসের অর্থ
বদলে গিয়েছিল।
বিকেলের আলো
একটু বেশি কোমল লেগেছে,
জানালায় এসে বসা পাখিটাকে
অকারণে আপন মনে হয়েছে।
তোমার নামের ভেতর
একটা নদীর শব্দ ছিল —
শুনলেই মনে হতো কোথাও
নীরবে জল বয়ে যাচ্ছে।
আমরা খুব বেশি কথা বলিনি,
তবু নীরবতারও যে একটি ভাষা আছে,
তা তোমার কাছেই প্রথম শিখেছিলাম।
আজ এতদিন পরে বুঝি,
ভালোবাসা আসলে কোনো ঝড় নয় —
সে বৃষ্টির পরের মাটির গন্ধ,
ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে।
আর তুমি —
সেই গন্ধের মতোই,
চলে গিয়েও আমার চারপাশে থেকে গেছ।
কলকাতার ফেরারি গন্ধ
সেখ মঈনুল হক
কলকাতা মোর ফেরার গল্পে মেশা —
ভোরের কফির স্বাদ, বিকেলের আড্ডা;
পার্ক স্ট্রিটের ওই আলোর মায়া নেশা —
হাওড়া ব্রিজের ধুলোয় মোড়া বুনোট গাড্ডা।
ট্রামের লাইন বেয়ে ভেসে চলে স্মৃতি —
পুরনো গানের সুর, ম্লান ওই পোস্টার;
ছেঁড়া টিকিটে জমা শাশ্বত প্রীতি —
মায়ায় জড়ায় আজও হৃদয়ের ওপার।
এ শহর বুকে রাখে আপন করে সব —
পথের কাঙাল থেকে আর্ট গ্যালারি;
গলি ঘুঁজি জুড়ে থাকা চেনা কলরব —
একলা লণ্ঠন দেয় রাতের পাহারাদারি।
কলকাতা মানে শুধু ভৌগোলিক সীমানা —
নয়তো কেবল কোনো শুকনো এক ঠিকানা;
মায়ের হাতের মতো ওমটুকু জানা —
যেখানে পৌঁছাতে নেই কোনো মানা।
যত দূরে চলে যাই, টেনে আনে ফেরে —
শহরের মলিন ওই রূপালি ধোঁয়ায়;
অতীতের পিছুটান যায় না তো ছেড়ে —
কলকাতা বেঁচে থাক প্রাণের ছোঁয়ায়।
লেখক পেশায় একজন আইনজীবী এবং মূলত উত্তর ২৪ পরগনার বারাসাতের বাসিন্দা। আইন পেশার কঠোর নিয়মের পাশাপাশি সাহিত্যের আঙিনায়ও তাঁর অবাধ বিচরণ। তিনি নিয়মিত কবিতা, ছোটগল্প ও প্রবন্ধ রচনা করেন। তাঁর লেখনীতে যেমন উঠে আসে সামাজিক অসঙ্গতি, প্রকৃতির রূপ ও মানবিক সম্পর্কের গভীরতা, তেমনি রহস্য ও গোয়েন্দা কাহিনির জটিল বুননেও তিনি সমান পারদর্শী। সম্প্রতি সাহিত্যে অনন্য অবদানের জন্য তিনি 'কাজী নজরুল ইসলাম মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড ২০২৬'-এ ভূষিত হয়েছেন। সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি তিনি একটি সমাজকল্যাণমূলক সংস্থার সভাপতি হিসেবে বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক উদ্যোগের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত। বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্র, প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যপত্রিকা ও লিটল ম্যাগাজিনে তাঁর লেখা নিয়মিত প্রকাশিত ও সমাদৃত হয়।
ভোট
কুশল রায়
নেতা আসে একদিন বললেক হাসে,
"কী রে কেমন আছিস?
চলে যাচ্ছে কেমন ভাবে?"
হামরা বললাম, "তা বাবু এতদিন ফর!
আসুন বসুন ইখানটতে বসুন তা,
দে রে পিডাট দে বাবুকে।"
বাবু বললেক, "এই দিকে যাচ্ছিলাম,
তাই ভাবলাম দেখা টা করে যাইতা।
ভোট আসছে, ভোট টা আমাদের ই দিবি ত?
আমার পাটি তদের কত দেখেতা।
হ্যা রে পাটির চিহ্ন টা জানিস ত?
আর হ্যা, টাকা কাজ সব পাচ্ছিস ত?"
"হ বাবু মাসে একশ টাকা পাই,
আর একশ দিন কাজ।
তা বাবু,
বাকি দিন গুলা কনরকম না খায়ে চলে।
আর আমাদের ছিলা গুলা সব
পডে সরকারি ইসকুলে,
আর তুমার বিটি কী বলে ওই
প্যরাইভট ইসকুলে।
তুমার টাকা ছিল,
তুমি তুমার বাপ কে ভরতি করলে
একটা বড প্যারাইভেট হাসপাতালে;
আর ভুবনের বাপ সরকারি হাসপাতালে মরলে।
কসেই হাসপাতালের কন ডাক্তরের,
বাপের নক ব্যাথা টর ওসুধ ও
উ হাসপাতালে লেই নাইই।
টাই আমাদের ভাল থাকা!
আর আমার ব্যাটা ট যে ইসকুল টয় পরে,
সেই ইসকুলের মাসটরের ব্যাটা পডে
ওই বড ইসকুলেই।
টাই আমাদের লিখাপডার ভালথাকা!
আতশত রাজনীতি বুঝি নাই;
সাদা দেখব সজা চলব,
যাকে ভাল লাগবেক ভোট ও তাকে দিব।
তবু এমন কাওকে দুব নাই
যে পাচ বছরে একবার আসে বলবেক —
কী রে ভোট দিতে যাবি ত?"
কথাগুলা বলতে গিয়ে আটকে গেল —
শুধু ব্যত টা খুলে "হ" টা বললাম।
নেতা চটাই কী মানুষ বাচে!
ভাবলাম হয়ত একদিন বলব।
লেখক পশ্চিমবঙ্গের লাল মাটির জেলা বাঁকুড়ার তালাডাঙা গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর পিতা তপন কুমার রায় পেশায় একজন দোকানের কর্মচারী এবং মা শুভা রানি রায় গৃহবধূ। ২০১৬ সালে মাধ্যমিকে উত্তীর্ণ হয়ে বিজ্ঞান শাখা নিয়ে পড়ার সময় একঘেয়েমি কাটাতে কবিতা লেখা শুরু করেন। পরবর্তীতে গণিতে স্নাতক হলেও সেই অভ্যাস আর ছাড়তে পারেননি। বর্তমানে গৃহশিক্ষকতার পাশাপাশি চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতির ব্যস্ততার মাঝে ছেলেবেলার ক্রিকেট, আড্ডা ও ভলিবল পিছনে পড়ে গেলেও কবিতা লেখার চেষ্টাটুকু আজও অটুট রয়েছে।
এই বৃষ্টি
সঞ্জয় সাহা
এই বৃষ্টি...
তুই যা না আমায় একটু খানি ছুঁয়ে,
দে না একটু কালো আকাশটাকে ধুয়ে।
এই বৃষ্টি...
তুই আঁক না এবার জলছবিটা রং-বেরঙে,
মলিন আকাশ ভরিয়ে দে না নিত্য নতুন সঙে।
এই বৃষ্টি....
শ্রাবণ হাওয়ায় দোল খেয়ে ঝর না সারা দুপুর,
দূরের মাঠে সপ্ত সুরে তুই বাজা রে জল নূপুর।
এই বৃষ্টি...
বরষা ঝমঝমিয়ে নাম না এবার, যাসনে যেন থেমে,
নদীর বুকটা ভরিয়ে দে না বাঁধন ভাঙা প্রেমে।
এই বৃষ্টি...
আদর মাখা পরশ দে না সবুজ-সবুজ পাতায়,
টাপুর-টুপুর মুগ্ধ ঝরা কচু পাতার ছাতায়।
এই বৃষ্টি...
সাপলা ফুলে রং ঢেলে দে, সবুজ এনে দে প্রাণে,
কদম ফুলে ভাব এনে দে গন্ধরাজের ঘ্রাণে।
এই বৃষ্টি...
ভালোবাসার খেয়ায় চড়ে, মন ভেজাবি বল,
মেঘলা দিনে মন খারাপে সঙ্গ দিবি চল।
প্রাণময়
সিদ্ধার্থ লাহা
বারি-জলে বাস ওই প্রাণময়,
সেই প্রাণময়। সে কারণ —
হরিৎ মাঠ হরিৎ বৃক্ষময়,
দানা দানা শস্য ,দানা-সোনা ফলে তায়।
সে দানায় প্রাণময়,
বেঁচে থাকে সহায়তায় যার
সব জীব, জীবশ্রেষ্ট মানব তার।
মানব অন্তরে ঈশ্বর, মেতেছেন প্রাণ দানে
পেরেকে গিলোটিনে,
জানেন — ন হন্যতে হন্যমান শরীরে।
শরীরে বাস প্রেমময়, তার নয়ন বারি
নীল সৈকতে খেলে আছড়ে আছড়ে পড়ে।
সেই নীলিমায় আছেন প্রাণময়
তাই ঝরে বারি-জল।
চেতনা-রুপি আজ নিভৃতে কাঁদে নগর সভ্যতায়!
কেঁদে ফেরে নগর সভ্যতায়।
স্রোতস্বিনী
জীবুন্নেষা খাতুন
যে মেয়েটি ভালোবাসতে গিয়ে নদী হয়ে গেছে,
তাকে তোমরা কোন বাঁধনে বাঁধতে চেয়েছিলে?
তোমরা ভেবেছিলে অবহেলার কড়া রোদে
সে শুকিয়ে যাবে কোনো এক চিলতে বালুতটে।
অথচ সে নিজের ভেতরেই জমিয়ে রেখেছিল
পাহাড়-ভাঙা জল,
তোমাদের দেওয়া সব আঘাতকে
সে রূপ দিয়েছে স্রোতে।
নদীর কি কোনো নিজস্ব ঘর থাকে?
তার তো কেবলই সম্মুখে বয়ে যাওয়ার তাড়া।
থমকে যাওয়া যাকে তোমরা বলো,
সে তো আসলে তার গভীরে জমে থাকা
এক মস্ত নীরবতা;
কিন্তু সেই নীরবতা ভেঙে
যখন সে আবার জাগে,
তখন চরের ভাঙনও
তার গতির কাছে হার মানে।
তোমরা তাকে আটকে রাখতে চেয়েছিলে
চেনা নিয়মের গণ্ডিতে,
ভেবেছিলে অভিমানের চরে আটকে যাবে
তার উজান গাঙ।
কিন্তু যে একবার সমুদ্রের ডাক শুনে ফেলেছে,
তাকে কি আর ফিরিয়ে আনা যায়
মাটির খাঁচায়?
সে তো নিজের চোখের জলকে
নদীর জল করে নিয়েছে,
তার বুকের ভেতর এখন শুধু
একলা চলার গান।
তার স্রোতে কোনো ক্লান্তি নেই,
কোনো পিছুটান নেই,
সে কেবলই বয়ে চলে নিজের ছন্দে,
নিজের অহংকারে।
যে মেয়েটি ভালোবাসতে গিয়ে নদী হলো,
সে আজ আর কারও একার নয় —
সে এখন এক অফুরান স্বাধীনতা,
এক অনন্ত ধারা,
যাকে থমকে দেওয়ার সাধ্য
কোনো কূলেরই নেই।
লেখিকা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করে বর্তমানে B.Ed অধ্যয়নরত। পেশাগতভাবে একটি স্কুলে জীবন বিজ্ঞান বিষয়ের শিক্ষিকা হিসেবে কর্মরত। পড়াশোনার পাশাপাশি লেখালেখির প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ রয়েছে। নিয়মিত না লিখলেও লেখাই তাঁর অনুভব প্রকাশের সবচেয়ে প্রিয় মাধ্যম। ভাবনা, অনুভূতি ও জীবনঘনিষ্ঠ বিষয়গুলোকে শব্দে ধরতে ভালোবাসেন।