চন্দনা আজ আর মামমামের থেকে চোখ সরাতে পারছে না। ভরতনাট্যম নাচের পোশাকে, হাত ও পা-র মুদ্রা-বিভঙ্গে এত সুন্দর লাগছিল, ও যে চন্দনার মেয়ে — মাত্র বছর বারো বয়স, ভাবতেই পারছিল না। জোরে একটা কাজলের ধাক্কা খেয়ে হুঁশ ফেরে — "ওরে, এত মুগ্ধ দৃষ্টিতে মেয়েকে দেখতে হবে না। চল, অতনু স্যার আমাদের দিকেই হাত নাড়ছেন।"
ব্যারাকপুরের স্টেশনে এসে যখন চন্দনা আর মামমাম দাঁড়িয়েছে, চোখের সামনে দিয়ে চলে গেল কৃষ্ণনগর লোকালটা। যাঃ! "মেহুলিদের ট্রেনটা এসে গেল, মা, ওরা তাড়াতাড়ি বাড়িতে চলে যাবে।" ইসস, মামমামের গলায় কি প্রচণ্ড ক্লান্তি!
চন্দনার কিছুর দিকেই আর মন নেই। শরীরের মধ্যে চাপা অস্বস্তি — বিরিয়ানি আর চিকেন চাপটা না খেলেই মনে হয় ভালো হত! ইসস, যদি একটা ঠান্ডা কোলা-টাইপ কিছু বা কোনো অ্যান্টাসিড পাওয়া যেত! এখন ট্রেন আসবে, সেই তারপর রানাঘাট যাবে, সেখান থেকে নাসড়া — ওদের পাড়া। যদি বেশি শরীরটা খারাপ লাগে, যদি বমি পায়! "মামমাম, তোর বাবাকে বাইকটা নিয়ে স্টেশনে আসতে বলব, বুঝলি।"
আর মামমাম! সে তো এখান ব্যারাকপুর স্টেশনের এক নম্বর প্ল্যাটফর্মের লাল থামকে তার নাচের মুদ্রা দেখাচ্ছে। আটটা পঁয়তাল্লিশের শান্তিপুরের পেছনের লেডিসটা কপালগুণে চন্দনা আজ একটু ফাঁকা পেয়েছে। এক ঘণ্টা দশ মিনিট যদি কোনো মতে কাটাতে পারে, তারপর বাড়ি যেতে মিনিট দশ কি পনেরো। "হে বাবা মহাদেব, একটু দেখো আমায়!" কিন্তু মহাদেব বোধহয় চন্দনাকে নিয়ে অন্য কিছু ভাবছিলেন... ওমা, মা... ওয়াক!
"আরে আরে, বউটা পড়ে যাবে, কী রকম ঝুঁকছে! এই মেয়ে, কাঁদছো কেন? জল আছে?"
মামমাম দিশেহারা। তার কাজল মাখা টানা চোখ, আলতায় রাঙানো দুই হাত ভেঙাচ্ছে — "বোকা মেয়ে" বলে। সিটে বসে থরথর করে মামমাম কাঁপছে, মাকে জল দেবে কি! ভারী সাউথ ইন্ডিয়ান শাড়ির বুকের কাছটা জলে ভিজে গেছে অনেকটা, মুখে-চোখে-চুলে জলের কুচি, শীত শীত করছে। ট্রেন ছুটছে মদনপুরের দিকে। গোটা কামরায় মিনিট কুড়ি ঝড় বয়ে গেল। কেউ কাছে এসেছে, কেউ দূর থেকে আহা-আহা করেছে, কেউ আবার চন্দনার লালা-বমি মাখা মুখ দেখে স্বাভাবিক নিয়মেই ঘেন্না পেয়েছে।
চন্দনা তাকিয়ে আছে জানলা দিয়ে — অতি পরিচিত রাস্তা। মামমামকে নিয়ে ব্যারাকপুরে শনিবারগুলো আসে অতনু স্যারের "ডান্স একাডেমি"-তে। এছাড়া নাচের অনুষ্ঠান, কম্পিটিশন লেগেই আছে — আজ বছর চারেক হলো। কেন যে লোভ করে বিরিয়ানি, চাপ, দুধ-চা খেতে গেল! মেয়ের ওই জেতার আনন্দে নাকি! চোখটা বুজে আসছে চন্দনার। ভেতরটা পুরো মরুভূমি। "জল পাওয়া যাবে? জল?"
টুকরো টুকরো কথা কানে আসছে। একটা কর্কশ পুরুষালি গলা মামমামকে বলছে — "ব্যাগটা ঠিক করে ধরো, পারবে তো দুটো ব্যাগ ধরতে? নাকি আমাকে দেবে?" চোখটা টেনে ধরে চন্দনা দেখে, লোমশ হাতের মালিকের মুখটাও যেন কেমন কর্কশ। সালোয়ার-কামিজ পরা শরীরের মধ্যে কোনো লালিত্য নেই। চন্দনা ভেতরে শিউরে ওঠে — "ইসস, আমাদের ছুঁয়ে আছে!"
সহযাত্রীরা কি কিছু মনে করল? মনে করলে ভারী বয়ে গেল।
চাকদা ছাড়ল ট্রেন, কিন্তু আবার যেন গা-টা গুলিয়ে উঠল। চন্দনা মেয়েকে বলে — "বাবাকে ফোনটা কর এইবার।" "বাবা এখনও বাড়িতে আসেনি, জেমমা বলল তো, মা।" বারো বছরের ঘেরাটোপের জীবনে মামমাম এত বড় বিপদে কোনো দিনও পড়েনি। কম্পিটিশন জেতার আনন্দ কোথায় হারিয়ে গেছে। শাড়ি, সাজ, গয়না — পারলে এক্ষুনি ফেলে দেয় ও।
পায়রাডাঙা ছাড়ছে। গেটের কাছে মেয়ে নিয়ে চলে এসেছে চন্দনা। মিশন গেটে ঢোকার আগেই — ওয়াক! "আরে একটু চেপে রাখুন, গায়ে করে দেবেন না। কেন যে বাড়ির লোক একা ছাড়ে!" কথাগুলো কানে গরম সিসা হয়ে প্রবেশ করছে। কী লজ্জা, কী ঘেন্না! অপমানে চন্দনার চোখে জল চলে আসে। "মেয়েটা কি ওর বাবাকে ফোনটা করল?"
কোনোমতে নামে চন্দনা, লাইনের কাছে ছুটে যায়। ধাতস্থ হয়ে সিমেন্টের সিটে বসেছে চন্দনা। খেয়াল করে — সেই সবুজ সালোয়ার-কামিজ আবারও যত্ন করে লালা মুছিয়ে দিল। কর্কশ স্বরটা বলছে — "জলটা খাও।" চন্দনা আর বসে থাকতে পারছে না। সবুজ সালোয়ার-কামিজের কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে পড়েছে।
ঘুম, গভীর ঘুমে যাওয়ার আগে মামমামের গলা শুনছে — "মাসিমনি, তুমি থাকো আমাদের সাথে, বাবা আসলে চলে যেও।"
চাঁপা কান পাতে। বউটা বিড়বিড় করে বলছে, "মা, ও মা, মা..."
মেয়েটা তার মতো মানুষকে মাসিমনি ডাকল! চাইলেই চাঁপা চলে যেতে পারে। এই বউটাই ঘেন্না পেয়েছিল চাঁপাকে দেখে ট্রেনে। ঘেন্না — সবাই করে এসেছে, যারা আড়ালে ডাকে তারাও।
তবু এই আঁকড়ে ধরা, "মাসিমনি" ডাক! না, চাঁপা উপেক্ষা করতে পারে না। "ঘর" কে না চায়! আর চাঁপারা... আপন মনে হাসে। ও চন্দনা এখন বহু দূরে চলে গেছে।
ছোট্ট মেয়ে ও মাকে চেপে ধরে রেখে দেবে, আর যেতে দেবে না কোথাও, কোনো দিনও।
"মাথায় হাত রাখো, মা..."
আপনার ভোটেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
বিস্তারিত নিয়ম
প্রতিটি কলম প্রতিক্রিয়াই একবার করে দেওয়া যাবে, তবে প্রয়োজনে সেই প্রতিক্রিয়া পরিবর্তন করা সম্ভব। কোনো লেখায় একটি কলম প্রতিক্রিয়া দেওয়ার পর, একই মাসে অন্য কোনো লেখায় সেই একই কলম প্রতিক্রিয়া নির্বাচন করলে আগের প্রতিক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে, রয়ে যাবে সর্বশেষ প্রতিক্রিয়াটি। এই প্রতিক্রিয়াগুলির মাধ্যমেই নির্বাচিত হবেন ‘মাসের সেরা কলম’ সম্মানের ‘পাঠকের প্রতিক্রিয়া’ পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক–লেখিকারা।