জন্মান্ধ যুগে মাঝে মাঝে কিছু মানুষ আসে, যাদের চোখে আগুন থাকে, হৃদয়ে ঝড় থাকে — তবুও সমাজ তাদের দেখে না। বরং তাদের চোখের আগুন নিভিয়ে দিতে, তাদের ডানার হাওয়া কেড়ে নিতে, তাদের অস্তিত্ব মাটিতে মেশাতে সমাজ নেমে আসে সমগ্র শক্তি নিয়ে। স্বামী বিবেকানন্দ, যাকে আমরা নরেন্দ্রনাথ বলে চিনি — সেই মানুষটিকে আজও ভারত গর্বের সঙ্গে বহন করে, যাকে বিশ্ব সম্মান করে — তিনি এই আগুনেই গড়া ছিলেন।
স্বামীজির জীবনের প্রথম ছায়া ছিল দারিদ্র্য। পিতা বিশ্বনাথ দত্তের মৃত্যুর পরে দারিদ্র্যের অন্ধকারে নরেন্দ্রনাথের ঘরে চুলা জ্বলে না। অনাহার। অর্ধাহার। এদিকে মা তাকিয়ে থাকে দরজার দিকে — কেউ যদি একটু সাহায্য করে। আর বাইরে থেকে নরেন হাসিমুখে বলে —
"মা, আজ আমি খেয়ে এসেছি। এক ভদ্রলোক নিমন্ত্রণ করেছিলেন।"
কিন্তু সেটা নিমন্ত্রণ ছিল না — ছিল ক্ষুধাকে লুকোনোর চেষ্টা, ছিল মাকে ভাঙতে না দেওয়ার অদম্য মানসিক যুদ্ধ।
যে মানুষ ক্ষুধা লুকিয়ে মাকে হাসিয়েছিলেন, অন্যায়ে বিদ্যাসাগরের প্রতিষ্ঠিত মেট্রোপলিটন স্কুলে বিদ্যাসাগরের জামাতার ঈর্ষান্বিত কারণে চাকরি হারিয়েও মাথা উঁচু রেখেছিলেন — সেই মানুষই পরবর্তীতে হয়ে উঠলেন ভারতকে জাগিয়ে তোলা অগ্নিপিণ্ড। যে দেশে অপমানই ছিল তাঁর প্রাতরাশ, অবহেলাই ছিল তাঁর পথের সঙ্গী — সেই মানুষটাই পরে হয়ে উঠল ভারতের প্রথম বিশ্ববিজেতা সন্ন্যাসী।
এই অধ্যায় সেই বিস্ফোরণের গল্প — যেখানে ক্ষুধা, দারিদ্র্য, অপমান আর নীরব অশ্রু পরিণত হয়েছিল মহাজাগরণের শিখায়।
১৯০২ সালের ৪ জুলাই। রাত ঠিক ৯টা ১০ মিনিট। রাতের বেলুড় মঠে তখন তীব্র নীরবতা। বিদ্যুৎ নেই, আলো নেই — শুধু গঙ্গার ওপর ঢেউ ভাঙার শব্দ, হাওয়ার হালকা শব্দ। কক্ষের ভেতর বসে আছেন এক মানুষ — শরীর ক্ষীণ, চোখ জ্বলজ্বল করছে এখনো, কিন্তু সেই চোখের গভীরে যেন হাজার বছরের ক্লান্তি। এই মানুষটিকে আমরা আজ "বিশ্বগুরু" বলি, কিন্তু তাঁর শেষ নিশ্বাসের সাক্ষী ছিল নিঃসঙ্গতা আর অবহেলার অন্ধকার।
তিনি ই — স্বামী বিবেকানন্দ।
তাঁর শরীর যখন ভেঙে পড়েছে বহুমূত্র, হাঁপানি, অনিদ্রায় — তখন এত কষ্ট সহ্য করে তিনি একদিন ডাক্তার দেখাতে গেলেন ডা. রসিকলাল দত্তের চেম্বারে। ফি নেওয়া হল — ৪০ টাকা। ওষুধের জন্য — ১০ টাকা (আজকের দিনে প্রায় ১৬ হাজার টাকার সমান!)। এটুকু টাকাও তাঁকে বেলুড় মঠের তহবিল থেকে ধার করতে হয়েছিল।
সন্ধ্যা নামতেই মঠের গঙ্গার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা সন্ন্যাসীরা টের পেলেন — মঠের মধ্যে অদ্ভুত গাম্ভীর্য। যেন পুরো পরিবেশ শ্বাস আটকে অপেক্ষা করছে কারও জন্য। একজন দুর্বল শরীর, কিন্তু অদম্য আত্মার মানুষ। তাঁর চক্ষু কোমল, কিন্তু তার মধ্যে যেন আগ্নেয়গিরির লেলিহান শিখা।
তাঁর মৃত্যুর পর তবুও খবর পৌঁছল না কোথাও — না কোনো সরকারি দপ্তরে, না কোনো সংবাদপত্রে, না বাঙালি সমাজের তথাকথিত "অগ্রগামী" বুদ্ধিজীবীদের কাছে।
পরদিন বাংলার তৎকালীন সবচেয়ে প্রভাবশালী জাতীয়তাবাদী পত্রিকা "অমৃত বাজার পত্রিকা", "স্টেটসম্যান", এছাড়াও "সন্দেশ" পত্রিকা সহ আরও পত্রিকাতেও তাঁর মৃত্যুসংবাদ প্রকাশিত হয়নি — যেখানে এই সব পত্রিকাই স্বামীজি জীবিত থাকাকালে প্রচণ্ড জনপ্রিয় ছিল। আর তাঁর বয়স তখন মাত্র ৩৯।
শহরের প্রতিটি চায়ের দোকানে, প্রতিটি বৈঠকখানায়, সেই সংবাদপত্রগুলোর পাতায় পাতায় সেদিনও হয়তো চলছিল বিতর্ক, সমালোচনা, রাজনীতি — কিন্তু একটিও চোখ ঘুরে তাকায়নি বেলুড়ের দিকে। সেদিন রাতেই ভারতের এক যুগপ্রবর্তকের নিঃশ্বাস থেমে গেছে — কিন্তু পরদিন ভোরে কলকাতার কোনো প্রেসে লোহার হরফে লেখা হয়নি তাঁর নাম। কোনো শিরোনাম বলেনি — "বিবেকানন্দ আর নেই।" একবারও থেমে ভাবেনি — "আজ ভারতের এক মহাযুগের সমাপ্তি ঘটল।"
এ যেন ইতিহাসের এক অদ্ভুত নিষ্ঠুরতা।
যে মানুষটি হৃদয়ের আগুন দিয়ে হাজারো হৃদয় জ্বালিয়েছিলেন, যে মানুষের বক্তৃতায় আমেরিকা থেকে লন্ডন পর্যন্ত সভাকক্ষ দাঁড়িয়ে গিয়েছিল — সেই মানুষটির প্রয়াণ সংবাদ সেই সময়ের ১৮টি কাগজের পাতায় একফোঁটা জায়গা পেল না। একটি অভেদ্য উদাসীনতা।
স্বামীজির মৃত্যুর কোনো ছবি নেই, ডেথ সার্টিফিকেট ইস্যু নেই। সরকারি নথিতে কোনো উল্লেখ নেই। উল্টে বেলুড়-বালি মিউনিসিপ্যালিটি চিতা জ্বালানোর ঘটনাকে "Amusement Tax" — অর্থাৎ "বিনোদন কর" — বসিয়ে দিল, কারণ এক মহাপুরুষের শেষকৃত্য তাদের কাছে "আনন্দের জিনিস" বলে মনে হয়েছিল! যেন এই মানুষটি বাঙালিরই কেউ নন।
ভারত আজ যাকে বিশ্বগুরু বলে সম্মান করে, জীবদ্দশায় সেই বিবেকানন্দই ছিলেন সবচেয়ে বেশি ভুল বোঝা, সবচেয়ে বেশি আঘাতপ্রাপ্ত।
২৩ বছর বয়সে মেট্রোপলিটন স্কুলে যখন শিক্ষকতা শুরু করলেন, তখন সমাজ ভেবেছিল — এ বোধহয় উজ্জ্বল ভবিষ্যতের শুরু। কিন্তু বাঙালির চিরন্তন রোগ — অহেতুক ঈর্ষা — ক্লান্ত করে তুলেছিল তাঁকে। বিদ্যাসাগরের জামাতা সূর্যকুমার অধিকারী তাঁকে পছন্দ করতেন না। আর সেই অকারণ বিদ্বেষই একদিন চাকরির সমাপ্তি ডাকল। বাঙালি সমাজ প্রতিভাকে কখনও আগলে ধরতে শেখেনি; বরং তাকে তাড়িয়ে দিতে পারলেই স্বস্তি পায়। তাই তাঁকে বিনা বাক্যব্যয়ে বহিষ্কার করা হলো। বিদেশে যিনি ভারতকে পরিচয় করালেন, তিনিই নিজের দেশে এসে লাঞ্ছিত হলেন। একদল জঘন্য বাঙালি তাঁকে নিয়ে অপপ্রচার করল — "বিবেকানন্দ নাকি মদ খায়", "বহু নারীসঙ্গ আছে", "বিদেশিনী নারীর দ্বারা প্রভাবিত", "সে ভণ্ড — সন্ন্যাসী সাজছে।"
সমাজের কিছু রক্ষণশীল ব্রাহ্মণ তখন কদর্য ভাষায় ঘোষণা করল — "কায়স্থ সন্ন্যাসী হতে পারে না।" তখন তারা বলেছিল — বিবেকানন্দ মন্দিরে ঢুকতে পারবেন না, সন্ন্যাসী বলে মানবে না। নিজের দেশে তাঁর চরিত্রহনন থেকে সামাজিক বর্জন — সবই ঘটল। শিকাগো জয় করে দেশে ফেরার পর বহু সংবর্ধনার মঞ্চ থেকে তাঁকে দূরে রাখা হল শুধু তাঁর জাতের জন্য। শিকাগোতে বিশ্বমঞ্চে ভারতকে পরিচয় করালেও নিজের সমাজ তাঁকে জাত-অভিজাত্য নিয়ে তুচ্ছ করেছে।
তারপরও তিনি লিখেছেন — "যা কিছু আসুক, আমি ভয় পাব না। মানবসেবাই আমার সত্য সন্ন্যাস।"
নিজের জীবনের সমস্ত অপমান, ক্ষুধা ও যন্ত্রণার শেষে তিনি আবারও বলেছেন — "নিজেদের লোকেরাই আমার পথে সবচেয়ে বেশি কাঁটা ছড়িয়েছে।"
স্বামীজির শেষ আক্ষেপ — যা আজও আমাদের ধিক্কার দেয়। সবশেষে তিনি বলেছিলেন — "আর একজন বিবেকানন্দই বুঝতে পারবে, এই বিবেকানন্দ কী করে গেল।"
তিনি আরও বলেছিলেন — "আমাদের ধর্ম এখন কেবল ভাতের হাঁড়িতে সীমাবদ্ধ। আমরা এখন আর 'বেদান্তবাদী' নই, আমরা হয়েছি 'ছুঁতমার্গী'।"
সবশেষে একটাই কথা — বাঙালি কি সত্যিই বিবেকানন্দকে চিনেছে? আজ আমরা তাঁর মূর্তিতে মালা দিই, কিন্তু তাঁর ক্ষুধা আমরা ভুলে যাই। আজ তাঁর উক্তি দিয়ে বই ভরি, কিন্তু তাঁর যন্ত্রণা থেকে শিখি না।
স্বামীজিকে কখনো রাজা অভিষেক করেনি, করেনি কোনো রাজনীতি, কোনো প্রভাবশালী সমাজ। তাঁকে অভিষেক করেছে তাঁর নিজের দুঃখ, অপমান, সংগ্রাম আর ইচ্ছাশক্তি।
এই অধ্যায় বলছে — মহত্ত্বের জন্ম উৎসবে নয়; মহত্ত্বের জন্ম হয় অবহেলার আগুনে। যে আগুনে একদিন একটি তরুণ সন্ন্যাসী পুড়ে গিয়েছিল, এবং সেখান থেকেই জন্ম নিয়েছিল এক মহাবিস্ফোরণ — অলক্ষ্য বিবেকানন্দ।
লেখকের মতে — বাস্তব আর ভাবনার মাঝেই তাঁর লেখার জন্ম। সমসাময়িক জীবন, মানবিক অনুভূতি ও চারপাশের বাস্তবতা তাঁর লেখার প্রধান ভিত্তি। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও চিন্তার গভীরতা থেকে উঠে আসে সেইসব শব্দ, যেখানে সরল বাস্তবতা ও অন্তরের সূক্ষ্ম অনুভূতি মিলেমিশে যায় — সেখানেই তিনি খুঁজে পান সৃজনশীলতা ও আত্মপ্রকাশের পথ।
আপনার ভোটেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
বিস্তারিত নিয়ম
প্রতিটি কলম প্রতিক্রিয়াই একবার করে দেওয়া যাবে, তবে প্রয়োজনে সেই প্রতিক্রিয়া পরিবর্তন করা সম্ভব। কোনো লেখায় একটি কলম প্রতিক্রিয়া দেওয়ার পর, একই মাসে অন্য কোনো লেখায় সেই একই কলম প্রতিক্রিয়া নির্বাচন করলে আগের প্রতিক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে, রয়ে যাবে সর্বশেষ প্রতিক্রিয়াটি। এই প্রতিক্রিয়াগুলির মাধ্যমেই নির্বাচিত হবেন ‘মাসের সেরা কলম’ সম্মানের ‘পাঠকের প্রতিক্রিয়া’ পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক–লেখিকারা।