বিদায়, মৃত্যু, বিসর্জন — কথাগুলো মুখে উচ্চারণ করা যতটা সহজ, অনুভব করার চেষ্টা করলে তার চেয়ে বহুগুণে বেশি বেদনাদায়ক! হয়তো আদ্যাশক্তি মা মহামায়াও সময়ের এ নিয়মে আষ্টেপৃষ্টে বন্দী — তাইতো দুই দিনের অতিথি হয়ে এসে তাঁকেও ফিরে যেতে হয় হাসিমুখে। সপ্তমীর সকালে পালকিতে করে নবপত্রিকার আগমনে যত না আনন্দ লাগে, নবপত্রিকার বিসর্জনের পর শূন্য পালকি দেখে বুকটা হু হু করে ওঠে ততধিক যন্ত্রণায়!
সত্যি বলতে কি, মা 'আসছে'-ই ভালো! খরস্রোতা সময়ের টানে বয়ে চলে যাওয়া এই পাঁচটা দিন বাকি ৩৬০ দিনের অপেক্ষার ঋণ কতটুকু শোধ করতে পারে — তা আমার অজানা! মা ফিরে যেতেই অপেক্ষায় দিন গোনা শুরু হয় আবার।
তবুও মনকে বোঝাই — মায়ের আসা তো নিশ্চিত বছর বছর। আর এই নিশ্চয়তার জন্যই অপেক্ষাটা এত বেশি সুন্দর! তাছাড়া, সকল আগমন তো বিদায়ের নামেই তোলা থাকে — মায়ের আসা চার দিনের, জীবনও খানিকটা তেমনই!
জন্মের আগে পরিবারের কত উৎসাহ, কত আনন্দ! তারপরে জীবনের সূচনা, কানে আসে মায়ের কন্ঠস্বর —
🔸জীবনের ষষ্ঠী ওই শৈশব থেকে কৈশোর পর্যন্ত।
🔸জীবনের সপ্তমী কৈশোর থেকে যৌবনে উত্তীর্ণ হওয়া আর সংসারী হওয়ার সূচনা বলা চলে।
🔸জীবনের অষ্টমী সংসার ধর্ম পালন থেকে অবসর গ্রহণের পূর্ববর্তী সময় ধরে নেওয়া যায় অনায়াসে।
🔸জীবনের নবমী মানে অবসর গ্রহণ এবং কিছুটা সময় প্রিয়জনদের সঙ্গে, আবার কিছুটা সময় পূজা-অর্চনা কিংবা ঠাকুর-নামে অতিবাহিত করা।
🔸জীবনের দশমী আবার মা দুর্গার বিজয়া দশমীর মতোই দুঃখে শরীরকে নিস্তেজ আর মনকে ভারাক্রান্ত করে দেয়! এটি মূলত মৃত্যুশয্যা — যখন চিকিৎসাধীন অবস্থায় থেকে মুক্তির দিন গোনা ছাড়া মানুষের আর কিছুই করার থাকে না!
অবশেষে — বিসর্জন! যেমন ভাবে বিসর্জন হয় মায়ের মৃন্ময়ী মূর্তির। চিন্ময়ী রূপ চির অক্ষয়, বছর বছর যার আগমন ঘটে! আগুন কিংবা মাটিতে তেমনভাবেই মানুষের রক্ত-মাংসে গড়া দেহ মিশে যায় মৃত্যুর পর — অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার মাধ্যমে। আত্মার বা চেতনার মৃত্যু হয় না, জীবনের তথা জন্ম-মৃত্যুর চক্রে বারংবার সেই আত্মার আগমন ঘটে — কোনো নতুন দেহে। যেমন ভাবে বছর বছর মায়ের চিন্ময়ী রূপ শিল্পীর হাতে গড়া নতুন মৃন্ময়ী মূর্তিতে ফিরে ফিরে আসে!
মনকে একশো বার বোঝাই — মা কি সন্তানের চোখের জল সহ্য করতে পারেন? তবুও বিজয়া মানে বরাবরই আমার কাছে ঝাপসা হয়ে আসা চোখে, ভাপ জমে যাওয়া চশমার লেন্সের আড়াল থেকে মায়ের সিঁদুর-রাঙানো মুখের দিকে চেয়ে থাকা! সব চাওয়া-পাওয়া ভুলে গিয়ে একটাই প্রার্থনা, "ভালো থেকো মা, ভালো রেখো সবাইকে। আসছে বছর আবার এসো, অপেক্ষায় থাকবো!"
সে দুঃখও অবশ্য দীর্ঘস্থায়ী হয় না, সময় তাকেও ভাসিয়ে নিয়ে যায় আপন স্রোতে। সেই স্রোতের টান যে ভরা বর্ষায় দামোদর নদের স্রোতের চেয়েও বহুগুণে বেশি! তাই হয়তো পরক্ষণেই চোখের জল মুছে, একগাল হাসি দিয়ে প্রিয়জনদের জড়িয়ে ধরি, প্রণাম করি অথবা ফোনকল কিংবা মেসেজে ব্যস্ত হয়ে পড়ি একটাই কথা বলার জন্য — "শুভ বিজয়া"।