নবমী 'মহা' হয়েছে কারণ মহাশক্তির পূজার তিথি সেদিন শেষ। তারপর ফিরে যাওয়ার পালা। ঢাকিয়ারা ফিরে যাবে। দূর দেশ থেকে ছেলে, মেয়ে, বৌমা, নাতি, নাতনি যারা ঘর আলো করে এসেছিলেন তারাও কেউ কেউ ফিরে যাবে। মানুষ কাজে ফিরে যাবে। দুগ্গা স্বর্গে ফিরে যাবে। মণ্ডপ গোটানো হবে। মাটির প্রতিমা আবার মাটি তেই ফিরে যাবে। এই দশমী মনে করিয়ে দেবে শুভ শক্তির 'বিজয়া' কে। মনে করিয়ে দেবে 'সত্যমেব জয়তে'। যা সত্য, যা শুভ, যা ন্যায্য তার জয় হোক।
আমাদের বৈচিত্রপূর্ণ ভারতবর্ষে দশমী বিভিন্ন ভাবে উদযাপন হয়ে থাকে। লোকচারবিদ্যা বিভাগ, কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে একটি জার্নালে কৃষি কাজ আর দুর্গোৎসবের মধ্যে সামঞ্জস্য খুঁজতে গিয়ে তারা বলেন — কৃষক দের কাছে শারদ উৎসব নিজেদের কে একটু রিল্যাক্স-মোড এ আনার জন্য। ভারতে চাষ-চক্র তিন ভাগে বিভক্ত। বর্ষায় ধান চাষ, শীতে গম চাষ ও গরমে তরমুজ চাষ। বর্ষা হতে শীতের মুখেই এই শারদীয়ার উৎসব পালন। ধান চাষ করে ক্লান্ত কৃষকরা এই সময় বিশ্রাম নেয়, আনন্দে মাতে এবং নিজেদের পরের চক্রের জন্য তৈরী করে। তাদের দশমী কাটে দুধ, গুড়ের মিষ্টি মুখে।
সবুজ বিপ্লবের শীর্ষে যে রাজ্যগুলি পাঞ্জাব, হরিয়ানা, উত্তর প্রদেশের দশমী নামকরণে হয় 'দশেরা'। শুধু কৃষি প্রধান অঞ্চল গুলি নয়, উত্তর ভারতে রাম-রাবণের যুদ্ধ দিয়েই শেষ আহুতী দেওয়া হয়। ন'টা রাত্রির (নবরাত্রী) উপবাস ভঙ্গ করেন তারা রাবণ দহনে। মেঘনাদ, রাবণ ও কুম্ভকর্ণের গগনচুম্বী বিশাল কায়া বানিয়ে, তা বধ করতে হয় রামের তীর দিয়ে। সত্যের আগুন জ্বলে ওঠে অসৎ এর বুক কাঁপিয়ে, বাজির আওয়াজ এবং জনসাধারণের উল্লাসের আওয়াজে ভরে ওঠে উৎসব। যদিও শক্তিরূপে তারা দুর্গাবরণ করে না কিন্তু অষ্টমীতে 'কঞ্জিকা, কঞ্জক পুজন' উৎসবে কুমারী মেয়েদের পুজার প্রথা আছে। ১০০ বছরের ঐতিহ্য নিয়ে হয় বারাণসী তে দশেরার মেলা। বহু লোকের সমাগমে মেলা প্রাণ পায়।
পশ্চিমবঙ্গের সর্বাধিক জনবহুল তফসিলি উপজাতি সাঁওতাল সম্প্রদায় যারা অনেকেই কৃষক। তাদের ঐতিহ্যবাহী দাঁশাই উৎসবে তারা মূর্তি পূজা করে না — তারা প্রাকৃতিক শক্তিকে পূজা করে। দুর্গাকে তারা খরারোধী শুভ শক্তি 'বাতাস' রূপে এবং দুর্গার দুই প্রতিবিম্ব লক্ষ্মী ও সরস্বতীকে বর্ষার পূর্বের 'ঘূর্ণিঝড়' রূপে আহ্বান করে। এই উৎসবে তারা ধুতি ও সাদা পোশাকে সজ্জিত হয় এবং মাথায় ময়ূরের পালক ধারণ করে। শুকনো লাউয়ের খোল ও বাঁশ দিয়ে তৈরি বিশেষ বাদ্যযন্ত্র 'ভুয়ং' বাজিয়ে পাড়ায় পাড়ায় নাচ-গান করে। এই ভাবেই কৃষি প্রধান অঞ্চলে দশমীর বিভিন্ন রুপ দেখা যায়।
এক ইশ্বরের হাজার নাম। তার উপাসনাও হাজার রকম। ছত্তিসগঢ় এ বাস্তার সাম্প্রদায় এর দশমীর উৎসব চলে ৭৫ দিন ধরে। তাই এই উৎসবকে পৃথিবীর দীর্ঘতম উৎসবের আখ্যা দেওয়া হয়। এই উৎসবটি এই অঞ্চলের সর্বোপরি দেবী দান্তেশ্বরী এবং অন্যান্য স্থানীয় উপজাতীয় দেবতাদের প্রতি উৎসর্গীকৃত। এমন একটি অনুষ্ঠান প্রচলিত যেখানে দেবী 'কচ্ছিন' বস্তারের রাজ পরিবারকে উৎসব শুরুর অনুমতি দেন। কাঁটার দোলনায় চড়ে, একজন বালিকাকে দেবী 'কচ্ছিন' হিসেবে গণ্য করা হয়, যিনি রাজ পরিবারকে দশেরা পালনের অনুমতি দেন।
পাহাড়ি উপত্যকায় সিকিম ও দার্জিলিঙের নেপালী হিন্দুদের দের দশাইনে দোলনা চড়ে ও ঘুড়ি উড়িয়ে বর্ষাকে বিদায় দেয় শরৎ। এক হয়ে সবাই একে ওপরকে টিকা দিয়ে শুভেচ্ছা জানায়।
মহারাষ্ট্র ও গোয়া র দশেরা শক্তির আরাধনা নয়, রামের জয়জয়কার। 'আয়ুধ পুজা' একটি অন্যতম রীতি যেখানে শস্ত্র পূজা বা অস্ত্রের পূজা করা হয়। এটি শক্তি এবং বিজয়ের প্রতীক বলে মনে করা হয়। এই দিনে আপটা গাছের পাতা একে অপরের সাথে বিনিময় করা হয়। এই পাতাগুলিকে 'সোনা' হিসেবে বিবেচনা করে পারস্পরিক শুভেচ্ছা এবং সৌভাগ্য কামনা করা হয়।
দশেরা উপলক্ষ্যে সেজে ওঠে মহীশূর। আলোর জলসায় সজ্জিত হয় মহীশূর প্যালেস। দশেরা উপলক্ষ্যে ২৮০ কেজি ওজনের সোনার সিংহাসন চাপানো হয় গজের পিঠে। তার ওপর বিরাজমান মহীশূরের রাজা। চতুর্দোলায় সাজিয়ে শোভাযাত্রা বের করা হয়। দেশ-বিদেশ থেকে আসেন পর্যটকরা। কর্ণাটকের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা লোকশিল্পীরা পা মেলান দশেরা শোভাযাত্রায়।
দশেরা বা দশমীর পালনের বিধি একই দেশে ভিন্ন মতে হলেও, তাতে আঞ্চলিক পার্থক্য থাকলেও — মূল কারণ এক। আনন্দের চাবিকাঠি আলাদা — কিন্তু আনন্দটা এক।