Go to Bangali.Network
Go to Bangali.Network



লেখা পাঠান


আমাদের কথা
Contests

উদ্যোগ
Web Magazine


উদ্যোগ Web Magazine
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
স্মৃতি ঘেঁটে ফিরে দেখা শৈশবের পুজো
স্মৃতি ঘেঁটে ফিরে দেখা শৈশবের পুজো

হাঁটার সময় আমরা অনেক সময়তেই পেছন দিকে সরে সরে যাই। জীবনের অনেক যুদ্ধেও আমাদের বুঝতে হয় — “One step forward, two steps backward।” কিন্তু প্রতিটি মানুষের একটি ইচ্ছে কোনদিনই পূরণ হয় না। আমরা শৈশবে ফিরতে চাই, ফিরতে পারি না। সেই কারণেই বড় হয়ে ছোটবেলার স্কুলে একবার অন্তত যেতে ইচ্ছে করে। যেখানে মানুষটির জন্ম, যেখানে শৈশব — সেখানে যাওয়ার জন্য মনের টান গভীর থেকে গভীরতর হয়। সেই কারণেই প্রতিটি মানুষের কাছে বড় প্রিয় তার জন্মভূমি।

কিন্তু শৈশবে আর ফেরা হয় না। শৈশবে ফেরার পথ একটাই — চিউং দ্য কাড্‌। রোমন্থন। সেই পথের নাম “Down the Memory Lane।” শৈশবের সব স্মৃতিই যেন এক একটা ইভেন্ট। স্মৃতিপথ দিয়ে হাঁটতে থাকলে মনে পড়ে শারদোৎসবের কথা। তখন মহালয়ার ভোর থেকেই পৃথিবীটা বদলে যেত। বদলে যেত আকাশের রঙ, বদলে যেত পথঘাট, বদলে যেত চারপাশ।

মহালয়ার আগে থেকেই বিভিন্ন নামজাদা পূজাগুলির প্রতিমা দেখা হয়ে যেত। শোভাবাজারে থাকার কারণে পড়তে যেতাম বাগবাজারে। গলি-ঘুপচি দিয়ে হেঁটে ফেরার সময় দল বেঁধে কুমারটুলি দিয়ে ফিরতাম। শর্টকাট হতো। প্রত্যেকটা স্টুডিওতে ঢুকে প্রতিমা দেখতাম। প্রতিমার রিস্টে ঝুলত বায়নাদারদের কাগজ। সেখান থেকেই জানতে পারতাম কোনটা সংঘর্ষীর প্রতিমা, কোনটা শতদল-এর, এমনি আরও অনেক।

কুমারটুলিতে প্রতিমার কারিগর মানেই পালদের রাজ — রমেশচন্দ্র পাল, শ্রীদাম পাল ও আরও অনেকে। সবার নাম এখন মনে পড়ে না। মহালয়ার দিন হত “চক্ষুদান।” সেই দিন থেকেই প্রতিমা বিভিন্ন মণ্ডপের দিকে যাত্রা শুরু করতো। বনমালী সরকার স্ট্রিটের মোড় থেকে শোভাবাজারের কাছে গুড়পট্টি পর্যন্ত পরপর ট্রাক দাঁড়িয়ে থাকতো। পুরো এলাকাটাই নো-এন্ট্রির কবলে পড়ে যেত। ওই সময় ভিন রাজ্য থেকেও চলে আসত হৃষ্টপুষ্ট বাহকের দল।

আমার আনন্দের কারণ ছিল অন্যত্র। আমাদের বাড়িটা শোভাবাজার স্ট্রিটে। আমাদের বাড়িকে বলা হত কুমার বাহাদুরের বাড়ি। আমাদের বাড়ির মেইন গেট বরাবর বন্ধ থাকতো। কিন্তু মহালয়ার সকাল থেকে একবারও বন্ধ হতো না গভীর রাত না হওয়া পর্যন্ত। সেই গেট দিনের বেলা আবার বন্ধ থাকতো বিজয়া দশমীর পর।

মহালয়ার আগের রাত থেকেই সমস্ত শোভাবাজার স্ট্রিট ভরে যেত ঢাকীদের উপস্থিতিতে। তাছাড়া থাকতো বিভিন্ন বাঁশীবাজিয়ে ও আমার তখনকার বয়েসী ছোট্ট ছেলেরা, যারা কাঁসর বাজাবার তালে তালে নেচে গ্রাহক তথা আশেপাশের সবাইকে মুগ্ধ করে তুলতো।

আমাদের বাড়ির গেট ওই দিন সকালে খুললেই দেখা যেত তাদের ভিড়। আমাদের গেটের বাইরের অনেকটা অংশে বাড়তি চাতাল ছিল। এমনিতেই উত্তর কলকাতার সব বাড়িতেই রক আছে। এখনও বাইরে থেকে যারা প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ঘুরে প্রতিমা দেখতে আসেন, তাদের অধিকাংশই ওই রকে বসে জিরোন, বিশ্রাম নিয়ে থাকেন।

ঢাকীরা আমাদের বাড়ির ভেতরে ঢুকে আসতেন, কল থেকে জল নিতেন। আমি মহালয়ার পরের দিন স্কুল যাবার সময় ওদের পাশ কাটিয়ে, ভিড় ঠেলে গ্রে স্ট্রিট অবধি হেঁটে গিয়ে স্কুলের বাস ধরতাম। তখন মন চাইতো না, তবুও স্কুলে যেতে হতো। সেই রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাবার সময় শোভাবাজারের মোড়ে বাটা কোম্পানির দোকানে নানান গান চলত। তখন পূজার গান রেকর্ড করতেন বিভিন্ন শিল্পীরা। বাটার দোকান নানা রঙের বেলুনে সেজে উঠতো। আর সন্ধ্যাবেলায় দোকানটা আলোর রোশনাইতে ঝলমল করতো। স্কুলে যাবার সময় উপর দিকে তাকালেই দেখতে পেতাম ঘুড়ির মেলা। কত রঙের ঘুড়ি — নানান ঘুড়ির নানান প্যাঁচ, নানান মাঞ্জা দেওয়া সূতো। আমি কোনদিন ঘুড়ি ওড়াইনি। আমাদের বাড়িতে ছোটদের ছাদে যাওয়া বারণ ছিল।

দুর্গাপূজার ক’টা দিন দারুণ, দারুণ। সন্ধে হতেই শোভাবাজার হাটখোলা সার্বজনীনে ভলান্টিয়ার হতাম। তখন এখনকার মতো VIP, সাধারণ ইত্যাদি ধরণের গেট-পাস ছিল না। সবাই একসাথে লাইন দিয়ে মণ্ডপে ঢুকতো। আমরা কচি-কাচা ভলান্টিয়ার বন্ধুরা দড়ি দিয়ে আলাদা করা নারী-পুরুষের প্রবেশপথে দর্শকদের ম্যানেজ করতাম। দড়িতে হাত দিলেই বলতাম — "দড়ি স্পর্শ করবেন না।"

আমার উপর বাবার কড়া হুকুম ছিল, ন’টা বাজলেই বাড়ি ঢুকে যেতে হবে। বাবাকে ভয় পেতাম। সামনেই ছিল (এখনও আছে) নন্দন-বিড়ির দোকান। সেখানে ছিল ঘড়ি। ন’টা বাজতে পাঁচ হলেই ব্যাজ খুলে পকেটে ভরে বাড়ি ঢুকে যেতাম। বাড়ি ঢুকে ডিনার সেরে চলে যেতাম উপরের ঘরে ঠাকমার কাছে।

প্রত্যেকবার এই দিনগুলিতে আমাদের বাড়িতে আত্মীয়ের সমাগম হতো। বাবা সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমী এই তিন দিন সবাইকে নিয়ে তিন কলকাতা — উত্তর, মধ্য ও দক্ষিণে সারারাত ব্যাপী প্রতিমা দেখতে বেরতো। আমি ঠাকমার পাশে শুয়ে তখন ঠাকমার রেঙুন যাত্রার কাহিনী শুনতাম। আমার ঠাকমা ছিলেন আজাদ-হিন্দ-বাহিনীর কুক। শুনতে শুনতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়তাম। সেই ছেলেবেলাতেই ঠাকমাকে হারাতে হয়েছিল। ঠাকমার সেই গল্প পুরোটা কোনদিনও শোনা হয়নি। ছেলেবেলায় তার গুরুত্বও বুঝিনি। আজও সেই গল্প আমাকে টানে। মনে পড়ে শুধু জাহাজে যাত্রার কাহিনী। সম্ভবত সেই চলমান জাহাজের ঘটনা শুনতে শুনতেই ঘুমিয়ে পড়তাম।

এরপরই বিজয়া দশমী। এই দিনটি ছিল একেবারেই অন্যরকম। আমাদের বাড়িতে সব মহিলারা এই দিন সকাল থেকেই ঠাকমার তত্ত্বাবধানে নানাকিছু শিল-নোড়া, হামানদিস্তায় বাটতেন, গুঁড়ো করতেন। দুপুর থেকেই শোভাবাজার ও আহিরীটোলা ঘাটে প্রতিমা নিরঞ্জন হতো। দিনের বেলাতেই শোভাবাজার রাজবাড়ি, কুমারটুলির রায়বাড়ি (বিখ্যাত ক্রিকেটার পঙ্কজ রায়দের পরিবার), মদনমোহনতলা, কাঁসারীবাড়ি ও লাহাবাড়ির প্রতিমা নিরঞ্জন হয়ে যেত। এই সমস্ত প্রতিমাই সেইসব পরিবারের পুরুষেরা ও বাহকেরা বইতো। সঙ্গে থাকতো অনেক, অনেক ঢাকীর দল।

সন্ধেবেলায় বাড়ির সবাইকে ঠাকমা গ্লাসে করে সিদ্ধি দিতেন। সবাই পান করতো। আমি ছোট হলেও আমাকেও দেওয়া হতো। তখন জানতাম না, ওটা নেশাদ্রব্য। অনেক পরে বড় হয়ে জেনেছিলাম। তবে আমার কেন, বাড়ির কারোরই কোনো বৈকল্য কোনদিন দেখিনি।

সন্ধেবেলাতে বাড়ির সবাই মিলে গঙ্গাতীরে। সেখানে তখন ব্যান্ডপার্টি সমেত ভিড় জমতো বিভিন্ন ক্লাবের প্রতিমা, সঙ্গে থাকতো তাসা পার্টি। তাদের বাজনার দাপটে কানে তালা লেগে যেত। অনেকেই প্রতিমা নৌকায় তুলে নিয়ে যেতেন মাঝগঙ্গা বরাবর। আমরা একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতাম সেই নৌকার দিকে। মনে আছে, এই দৃশ্য দেখাবার জন্য বাবা আমাকে কাঁধে তুলে নিতেন। সেখানে প্রতিমা জলে ফেলে দিতেই গঙ্গার ঘাট থেকে সমস্বরে আওয়াজ উঠতো — "মা... মা..."

কিছু কিছু প্রতিমা ঘাটেই কয়েক পাক দিয়ে কোমর জলে নেমে ভাসিয়ে দেওয়া হতো। সঙ্গে সঙ্গে কিছু বালক-বয়েসী ছেলে জলে ঝাঁপিয়ে পড়তো। তারা প্রতিমার শরীর থেকে খসে যাওয়া সৌন্দর্য হারিয়ে গেলে খড়ের কাঠামোটা টেনে ঘাটের কাছে একপাশে এনে জড়ো করতো। এই সময় গঙ্গার পাড়ে প্রচুর আলোর ব্যবস্থা থাকতো। আর গঙ্গার উপর দিয়ে পাড়ের দিকে সার্চলাইট ফেলতে ফেলতে স্পিডে ঘোরাফেরা করতো রিভার ট্রাফিক পুলিশের বোট।

বিসর্জন দেখার পর বাবা গঙ্গায় নেমে সবার দিকে গঙ্গার জল হাত দিয়ে আচমনের ভঙ্গিতে ছুঁড়ে দিত। আমিও কিছুটা নিচের দিকে নেমে যেতাম, সেই জলের ছোঁয়া মাথা পেতে নিতাম।

বিজয়া দশমী সেরে শোভাবাজার স্ট্রিট ধরে বাড়ি ফেরার সময় দেখতাম হাটখোলা সার্বজনীনের মণ্ডপটি নির্জন। রাস্তায় ইলেকট্রিশিয়ানরা মণ্ডপের ব্যবহৃত বাতিগুলি খুলে নিচ্ছে। মণ্ডপের বেদীতে তখন একটি বড় প্রদীপ জ্বলছে।

শুরু হতো কোলাকুলির পালা। আমরা বড়দের পা ছুঁয়ে প্রণাম করতাম। বিনিময়ে পেতাম নানান মিষ্টি। বাড়ির প্রত্যেক পরিবার সেই রাতেই বিভিন্ন ঘরে যাতায়াত করতো, কোলাকুলি করতো, মিষ্টি বিতরণ হতো। মনে আছে, বাড়ির বড়রাও আমাদের ছোটদের কোলে তুলে কোলাকুলি করতো।

এরপর থেকেই শুরু হতো বিভিন্ন আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি যাওয়া বিজয়ার সাক্ষাৎ সারতে। অনেকেই আসতো আমাদের বাড়িতে। ঠাকমা সবার কাছ থেকেই প্রণাম পেতেন।

দুর্গাপূজা মিটে গেলেই ঢাকী আসতো বাড়ি-বাড়ি। এটা এখন এই মফস্বল শহরেও টের পাই। তারা বাড়িতে এলেই নানান পুরোনো জামা-কাপড়, শাড়ি, শীতের পোশাক, টাকা-পয়সাও দেওয়া হতো। মনে আছে, বাবা বলতো — "শোনো, আমাদের পুজো শেষ, এবার এরা গ্রামে ফিরে যাবে। এদের ছেলে-মেয়ে এইসব পুরোনো জামা-কাপড় পরে আনন্দ পাবে। জেনে রাখো, প্রতিবার যখন আমরা কলকাতায় পূজার আনন্দে মেতে উঠি, তখন গ্রাম ভাসে বন্যায়।"

এই কথা তখন শুনেছি। এখনও একই অবস্থা। দেবী দুর্গতিনাশিনী। কিন্তু এই আনন্দ, এই উৎসবকে বলা হয় সার্বজনীন। মনে হয়, এই উৎসব এখনও সার্বজনীন বা সর্বজনীন কোনটিই হয়ে ওঠেনি।




আপনি কি লিখতে ভালোবাসেন?

‘উদ্যোগ’ ওয়েব ম্যাগাজিনের এপ্রিল সংখ্যা ❛নববর্ষ ১৪৩৩❜ প্রকাশিত হবে ১৫ এপ্রিল। ওয়েবসাইটে ঘোষিত বিভাগগুলি থেকে আপনার পছন্দের বিষয়ে লেখা পাঠান ১০ই এপ্রিলের মধ্যে। লেখা পাঠানোর আগে অতি অবশ্যই শর্তাবলী পড়ুন। নির্বাচিত লেখাগুলি লেখক / লেখিকার ছবি ও সংক্ষিপ্ত পরিচিতিসহ Bangali.Network ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হবে, এবং ১২ জন পর্যন্ত লেখক / লেখিকা পাবেন 'মাসের সেরা কলম' সম্মান। বিশদে জানতে ও আপনার লেখা পাঠাতে এখানে ক্লিক করুন

পৃষ্ঠা

ডিসক্লেইমার : লেখা, মতামত, মন্তব্য বা সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সম্পূর্ণ দায়ভার তাঁদের উপরই বর্তায়। এই সমস্ত মতামত Bangali Network-এর নিজস্ব মতামত, অবস্থান বা নীতির প্রতিফলন নাও হতে পারে। লেখক পরিচিতিতে প্রদত্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণ অনুযায়ী প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

ডিসক্লেইমার : লেখা, মতামত, মন্তব্য বা সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সম্পূর্ণ দায়ভার তাঁদের উপরই বর্তায়। এই সমস্ত মতামত Bangali Network-এর নিজস্ব মতামত, অবস্থান বা নীতির প্রতিফলন নাও হতে পারে। লেখক পরিচিতিতে প্রদত্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণ অনুযায়ী প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

ভালো লাগলে ভালোবাসা দিন
অপছন্দ হলে পরামর্শ দিন
মতামত জানাতে মন্তব্য করুন
2.8 4 ভোট
স্টার
guest
1 কমেন্ট
নতুন থেকে পুরোনো
পুরোনো থেকে নতুন ভোটসংখ্যা অনুসারে
ইনলাইন প্রতিক্রিয়া
সকল কমেন্ট দেখুন
ফেসবুক পেজ
Udyog Bengali Web Magazine by Bangali Network

বিভিন্ন বিষয় থেকে বেছে নিয়ে লেখা পড়ুন

    বিভিন্ন সংখ্যায় প্রকাশিত হওয়া লেখা পড়ুন

    মাসিক সংখ্যাগুলি দেখুন
    Scroll to Top