Go to Bangali.Network
Go to Bangali.Network



লেখা পাঠান


আমাদের কথা
Contests

উদ্যোগ
Web Magazine


উদ্যোগ Web Magazine
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
অতীতের দেবী, ভবিষ্যতের আয়না — দুর্গাপুজোর রূপান্তরিত মহাকাব্য
অতীতের দেবী, ভবিষ্যতের আয়না — দুর্গাপুজোর রূপান্তরিত মহাকাব্য

দুর্গাপুজো বাঙালির জীবনে কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং সময়ের সঙ্গে কথোপকথনের এক মহাকাব্য। শরৎকালের আকাশে কাশফুল দোলে, কুমোরটুলির গলিতে মাটির গন্ধ ভেসে আসে, কলকাতার পথে আলো ঝলমল করে ওঠে — এসব দৃশ্য আসলে ইতিহাসের এক দীর্ঘ স্রোতের অংশ। কিন্তু এই স্রোতের ভেতরেই লুকিয়ে আছে প্রশ্ন — আগামী দিনের দুর্গাপুজো কেমন হবে? প্রযুক্তি, পরিবেশ, রাজনীতি, শিল্প, লিঙ্গপরিচয় আর অর্থনীতি মিলিয়ে এই উৎসবের রূপান্তর আমাদের চোখের সামনে এক নতুন দিগন্ত তৈরি করছে।

আজও প্রতিমা গড়ার সময় মাটির গন্ধে ভরে ওঠে চারপাশ। খড়, বাঁশ, কাঠ আর কারিগরের হাতের ছোঁয়া মিলিয়ে গড়ে ওঠে দেবীর রূপ। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত এই প্রক্রিয়াকে প্রতিদিন আরও কঠিন করে তুলছে। নদীর ভাঙন, বন্যা, খরা — সব মিলিয়ে ভালো মানের মাটি পাওয়া কঠিন হয়ে উঠেছে। প্রতিমা বিসর্জনের পর নদীতে রঙ, প্লাস্টার আর প্লাস্টিকের মিশ্রণ ভেসে যায়, নদীর প্রাণপ্রবাহকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই প্রশ্ন উঠছে—দুর্গাপুজো কি তার প্রাচীন মাটির মূর্তি হারিয়ে ফেলবে? হয়তো ভবিষ্যতে দেবী দাঁড়াবেন আলোর তৈরি এক হলোগ্রামে, যেখানে বিসর্জন মানে হবে কেবল এক ‘switch off’। জ্যঁ বডরিয়ার্ড যেমন বলেছিলেন, আধুনিক যুগে আমরা বাস্তব নয়, বরং প্রতিলিপির প্রতিলিপি—‘simulacra’—এর ভেতরে বাস করি। তখন দেবীর মূর্তিও কি হয়ে উঠবে সেই simulacra, যেখানে প্রতিমা আর মাটি নয়, বরং ডিজিটাল প্রতিফলন? তবুও প্রশ্ন রয়ে যায় — মানুষ কি সেই আলোকদেবীর সামনে দাঁড়িয়ে একই রকম ভক্তি অনুভব করবে, নাকি দেবীর ছোঁয়া হারিয়ে যাবে?

প্রযুক্তি ইতিমধ্যেই পুজোয় প্রবেশ করেছে। ভার্চুয়াল রিয়েলিটি প্যান্ডেল, কিউআর কোডে দান, এআই-চালিত আলোকসজ্জা আজ আর নতুন কিছু নয়। ভবিষ্যতের পুজো হয়তো আরও এগিয়ে যাবে — বিদেশে থাকা প্রবাসীরা VR হেডসেট পরে একসঙ্গে ভার্চুয়াল প্যান্ডেলে ঢুকবেন, দেবীর প্রণাম করবেন, ঢাকের শব্দ শুনবেন অ্যালগরিদম থেকে তৈরি সাউন্ডস্কেপে। হয়তো দেবী নিজেই হবেন এক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, যিনি দর্শকের সঙ্গে কথোপকথন করবেন, প্রশ্নের উত্তর দেবেন, এমনকি আপনার মনের ভয় বা দুঃখ বিশ্লেষণ করবেন। তখন দেবী কি দেবীই থাকবেন, নাকি তিনি হয়ে উঠবেন এক সফটওয়্যার-চেতনায় ভরা ডিজিটাল মা? ফুকো যেমন বলেছিলেন ক্ষমতা সবসময় দৃশ্যমান কাঠামোর বাইরে থেকেও কাজ করে, তেমনি প্রযুক্তির ক্ষমতা হয়তো ভবিষ্যতের দেবীকেও বদলে দেবে। দেবী তখন আর মাটির বা পুরাণের দেবী নন, বরং এক নতুন ডিসকোর্সের অঙ্গ — প্রযুক্তি-নির্ভর সংস্কৃতির প্রতিনিধি।

অর্থনীতির প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। কলকাতার দুর্গাপুজো এখন UNESCO’র স্বীকৃত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। কিন্তু এই স্বীকৃতির সঙ্গে এসেছে অর্থনৈতিক দিকও। বড় প্যান্ডেলগুলির বাজেট এখন কোটি টাকায় গিয়ে পৌঁছেছে, বহুজাতিক কোম্পানির স্পন্সরশিপে তৈরি হচ্ছে থিম আর আলোকসজ্জা। ভবিষ্যতে হয়তো দুর্গাপুজো পুরোপুরি কর্পোরেট ব্র্যান্ডিং-এর হাতে চলে যাবে। কিন্তু তখন মফস্বলের ছোট পুজো, যেগুলো স্থানীয় দোকানদারের চাঁদায় টিকে থাকে, তাদের ভবিষ্যৎ কী হবে? তারা কি হারিয়ে যাবে, নাকি নতুন গ্রাসরুটস আন্দোলন তৈরি করে নিজেদের টিকিয়ে রাখবে? অর্থনীতি এখানে কেবল টাকা-পয়সার হিসেব নয়, সংস্কৃতির টিকে থাকার লড়াই।

দুর্গাপুজো সবসময়ই রাজনৈতিক মঞ্চও ছিল। ঊনবিংশ শতকের গণপূজা থেকে স্বাধীনতার সময়ের মিলনক্ষেত্র, আজকের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা — সবখানেই দেবীর উপস্থিতি ছিল এক প্রতীক। ভবিষ্যতেও তাই হবে। UNESCO’র স্বীকৃতির পর পুজো এখন আন্তর্জাতিক কূটনীতির হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। হয়তো আগামী দিনে পুজো হবে ভারতের ‘soft power’-এর প্রধান প্রদর্শনী, যেখানে বিশ্বকে দেখানো হবে আমাদের সংস্কৃতির ঐশ্বর্য। কিন্তু একইসঙ্গে পুজো হবে সামাজিক আন্দোলনেরও অঙ্গ। নারীর সমতা, তৃতীয় লিঙ্গের অন্তর্ভুক্তি, প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর — এসবই দেবীর আরেক রূপ হয়ে উঠবে। ঋষি অরবিন্দ যেমন বলেছিলেন, দেবী আসলে শক্তি — শক্তির প্রকৃত রূপ সমাজের ভেতরে, মানুষের ভেতরে। ভবিষ্যতের দুর্গাপুজো তাই কেবল মন্দির বা প্যান্ডেলের ভেতর নয়, রাস্তায়, প্রতিবাদে, সমতার দাবিতে প্রতিফলিত হবে।

শিল্প ও নন্দনতত্ত্বের দিক থেকেও দুর্গাপুজো এক চলমান বিপ্লব। আজকের থিম প্যান্ডেল আসলে ইনস্টলেশন আর্ট, যেখানে কাঠ, কাপড়, আলো, শব্দ মিলিয়ে তৈরি হয় এক অভিজ্ঞতা। দর্শক কেবল দর্শক নন, বরং শিল্পের অংশগ্রহণকারী। ভবিষ্যতে এই প্রবণতা আরও বাড়বে। হয়তো দর্শক প্রতিমার ভেতর দাঁড়িয়ে দেবীর চোখ দিয়ে নিজেদের দেখবেন। হয়তো দেবীর মুখে দর্শকের মুখ প্রতিফলিত হবে। তখন প্রশ্ন উঠবে — দেবীকে আমরা দেখছি, নাকি দেবী আমাদের ফিরিয়ে দিচ্ছেন? দেরিদার ‘différance’-এর মতোই দেবী তখন উপস্থিতও থাকবেন, অনুপস্থিতও থাকবেন — দৃশ্যমানও হবেন, আবার অধরাও হবেন।

নারীর ভূমিকা এই আলোচনার কেন্দ্রে। দুর্গাপুজোর কেন্দ্রে দেবী, কিন্তু সমাজে নারী এখনও বৈষম্যের শিকার। ভবিষ্যতের পুজোতে যদি সত্যিই রূপান্তর আসে, তবে হয়তো নারীরাই হবেন পুরোহিত, কারিগর, আচার-আচরণের সিদ্ধান্তনির্মাতা। তৃতীয় লিঙ্গের পুরোহিতও হয়তো দেবীর সামনে মন্ত্রপাঠ করবেন। তখন দেবী হবেন এক fluid identity — যিনি নারী, পুরুষ, তৃতীয় লিঙ্গ — সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করবেন। মহিষাসুর তখন কেবল পৌরাণিক দানব নয়, হবে বৈষম্য, দমন আর অবিচারের প্রতীক।

রবীন্দ্রনাথ একসময় লিখেছিলেন — "শক্তি, সৌন্দর্য, প্রেম—এই তিনেই জীবনের পূর্ণতা।" দুর্গাপুজোর ভবিষ্যৎও হয়তো এই ত্রয়ীর দিকেই ইঙ্গিত করবে। প্রযুক্তি আমাদের নতুন রূপ দেবে, অর্থনীতি নতুন কাঠামো আনবে, রাজনীতি নতুন বার্তা দেবে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত উৎসবের প্রাণ থাকবে মানুষের হৃদয়ে। কারণ উৎসব মানে মিলন, উৎসব মানে অশুভের বিরুদ্ধে শুভের জয়, উৎসব মানে বিভেদের ভেতরে মিলনের ডাক।

দুর্গাপুজো আসলে প্রতি বছর পুনর্লিখিত এক মহাকাব্য। গ্রামবাংলার আঙিনা থেকে কলকাতার রাজপথ, জমিদারবাড়ির প্রাচীন আড়ম্বর থেকে আজকের কর্পোরেট থিম প্যান্ডেল — প্রতিটি রূপই সময়ের আয়না। ভবিষ্যতের দুর্গাপুজোতেও সেই আয়নায় আমরা নতুন প্রতিফলন দেখব। তখন দেবী হবেন আলো, কোড, অ্যালগরিদম, নেটওয়ার্ক। বিসর্জন হবে নদীতে নয়, ডিজিটাল তরঙ্গে। ঢাক বাজবে ইলেকট্রনিক রিদমে, কিন্তু তার ভেতরে থাকবে সেই একই স্পন্দন — অন্ধকার থেকে আলো খোঁজার, অবিচার থেকে ন্যায়ের দিকে যাত্রার।

শেষ পর্যন্ত দুর্গাপুজোর ভবিষ্যৎ মানে মানুষের আত্মার ভবিষ্যৎ। যতদিন মানুষ অন্ধকারের ভেতর থেকে আলো খুঁজবে, যতদিন অন্যায়ের ভেতর থেকে ন্যায়ের ডাক শুনবে, ততদিন দেবী থাকবেন। হয়তো আর কুমোরটুলির মাটির প্রতিমায় নয়, হয়তো আর গঙ্গার বিসর্জনে নয় — তবুও তিনি থাকবেন, এক অনন্ত বিমূর্ততায়, আমাদের হৃদয়ের গভীরে। দুর্গাপুজো তখন হয়ে উঠবে সময়ের আয়না, যেখানে দেবী কেবল অতীতের নয়, ভবিষ্যতেরও।




আপনি কি লিখতে ভালোবাসেন?

‘উদ্যোগ’ ওয়েব ম্যাগাজিনের এপ্রিল সংখ্যা ❛নববর্ষ ১৪৩৩❜ প্রকাশিত হবে ১৫ এপ্রিল। ওয়েবসাইটে ঘোষিত বিভাগগুলি থেকে আপনার পছন্দের বিষয়ে লেখা পাঠান ১০ই এপ্রিলের মধ্যে। লেখা পাঠানোর আগে অতি অবশ্যই শর্তাবলী পড়ুন। নির্বাচিত লেখাগুলি লেখক / লেখিকার ছবি ও সংক্ষিপ্ত পরিচিতিসহ Bangali.Network ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হবে, এবং ১২ জন পর্যন্ত লেখক / লেখিকা পাবেন 'মাসের সেরা কলম' সম্মান। বিশদে জানতে ও আপনার লেখা পাঠাতে এখানে ক্লিক করুন

পৃষ্ঠা

ডিসক্লেইমার : লেখা, মতামত, মন্তব্য বা সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সম্পূর্ণ দায়ভার তাঁদের উপরই বর্তায়। এই সমস্ত মতামত Bangali Network-এর নিজস্ব মতামত, অবস্থান বা নীতির প্রতিফলন নাও হতে পারে। লেখক পরিচিতিতে প্রদত্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণ অনুযায়ী প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

ডিসক্লেইমার : লেখা, মতামত, মন্তব্য বা সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সম্পূর্ণ দায়ভার তাঁদের উপরই বর্তায়। এই সমস্ত মতামত Bangali Network-এর নিজস্ব মতামত, অবস্থান বা নীতির প্রতিফলন নাও হতে পারে। লেখক পরিচিতিতে প্রদত্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণ অনুযায়ী প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

ভালো লাগলে ভালোবাসা দিন
অপছন্দ হলে পরামর্শ দিন
মতামত জানাতে মন্তব্য করুন
2.8 16 ভোট
স্টার
guest
2 কমেন্ট
নতুন থেকে পুরোনো
পুরোনো থেকে নতুন ভোটসংখ্যা অনুসারে
ইনলাইন প্রতিক্রিয়া
সকল কমেন্ট দেখুন
ফেসবুক পেজ
Udyog Bengali Web Magazine by Bangali Network

বিভিন্ন বিষয় থেকে বেছে নিয়ে লেখা পড়ুন

    বিভিন্ন সংখ্যায় প্রকাশিত হওয়া লেখা পড়ুন

    মাসিক সংখ্যাগুলি দেখুন
    Scroll to Top