Go to Bangali.Network
Go to Bangali.Network



লেখা পাঠান


আমাদের কথা
Contests

উদ্যোগ
Web Magazine


উদ্যোগ Web Magazine
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
মহাভারতের দ্বারকা নগরী — পৌরাণিক কাহিনি না প্রত্নতাত্ত্বিক সত্য?
মহাভারতের দ্বারকা নগরী — পৌরাণিক কাহিনি না প্রত্নতাত্ত্বিক সত্য?

মহাভারতের যুদ্ধ শেষে গান্ধারী শ্রীকৃষ্ণকে বলেছিলেন, "ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তুমি মহাভারতের যুদ্ধ বন্ধ করোনি তাই আমি তোমাকে অভিশাপ দিচ্ছি কৃষ্ণ, যেভাবে কৌরব বংশ ধ্বংস হয়ে গেছে সেভাবেই তোমার যদুবংশ ধ্বংস হয়ে যাবে।"

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সেদিন হাসিমুখে দেবী গান্ধারীর অভিশাপ স্বীকার করেছিলেন আর গান্ধারীর অভিশাপ বিফলে যায়নি শ্রীকৃষ্ণের যদুবংশ সত্যিই ধ্বংস হয়ে যায় আর দ্বারকা নগরী চিরকালের জন্য সমুদ্রের জলে তলিয়ে যায়।

স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণের হারিয়ে যাওয়া নগরী দ্বারকা নগরীর বিষয়ে পৌরাণিক কাহিনী থেকে আমরা দ্বারকার বিষয়ে জানতে পারি কিন্তু পরবর্তী সময় এমন কিছু ঘটেছে যার পর থেকে বৈজ্ঞানিকরাও মনে করেন যে ইতিহাসে দ্বারকা নগরীর অস্তিত্ব রয়েছে!

সময়টা ছিল ১৯৮৩ সাল। আরব সাগরের মাঝে কয়েকজন স্কুবা ড্রাইভার জাহাজ থেকে ঝাঁপ দেয় তারা গভীর সমুদ্রে কিছু এটা খুঁজতে যাচ্ছিল সমুদ্রের মধ্যে কিছুটা দূর যাবার পরেই তারা এমন কিছু খুঁজে পায় যেটা দেখার পর পুরো দুনিয়া চমকে গিয়েছিল! সমুদ্রের তলায় ছিল এক বিশাল শহর, দেখে মনে হচ্ছিল যেন জলের নীচে একটা গোটা নগরী কেউ তৈরি করেছে বিরাট বিরাট দেওয়াল দিয়ে পুরো জায়গাটা ঘেরা ছিল সমুদ্রের নীচে এরকম বিরাট একটা শহর দেখে তারা অবাক হয়ে যায়। ওখান থেকে তারা পাথরের স্যাম্পেল কালেক্ট করে আনে আর পরবর্তীকালে সেগুলো যখন পরীক্ষা করা হয়, তখন দেখা যায় সেই পাথরগুলো মহাভারতের আমলের। আর এরপর থেকে অনেকে মনে করেন এটাই হলো ভগবান শ্রীকৃষ্ণের দ্বারকা নগরী।

ভগবান বিষ্ণুর চার ধামের মধ্যে একটা হলো আরব সাগর আর গোমতি নদীর মিলনস্থলে অবস্থিত দ্বারকা — গুজরাটের জামনগর জেলায় আরব সাগরের তীরে অবস্থিত একটা ছোট্ট শহর। এখানে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের হাজার হাজার ভক্ত প্রতিদিন ভিড় করেন ভগবানের একবার দর্শনের আশায়। পবিত্র শ্রীমদ ভগবত গীতা অনুযায়ী ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্ম হয়েছিল মথুরার জেলে। কৃষ্ণের জন্মের আগেই ভবিষ্যৎবাণী হয়েছিল যে দেবকীর পুত্র মানে ভাগ্নের হাতেই মথুরার অত্যাচারী রাজা কংসের বিনাশ হবে তাই কংস দেবকী এবং বাসুদেবকে জেলে বন্দি করে রেখেছিল যাতে কৃষ্ণের জন্ম হলেই তাকে হত্যা করা যায়। শ্রীকৃষ্ণকে বাঁচানোর জন্য কৃষ্ণের পিতা বাসুদেব তাকে গোকুলে নন্দরাজ ও মা যশোদার কাছে রেখে আসেন। শ্রীকৃষ্ণের ছোটবেলা গোকুলেই কেটেছে মাতা যশোদা কৃষ্ণকে লালন পালন করে বড় করেছেন — এ পর্যন্ত সবাই জানেন।

ভগবত পুরাণের দশম অধ্যায় অনুযায়ী নিজের মামা কংসকে বধ করার পর যদুবংশকে সাথে নিয়ে শ্রীকৃষ্ণ মথুরাতে এসে থাকতে শুরু করেন। কিন্তু কংসের মৃত্যুতে প্রচন্ড রেগে তার শ্বশুর জরাসন্ধ ১৮ বার মথুরা আক্রমণ করে। জরাসন্ধের এই বারবার আক্রমণে বিরক্ত হয়ে শ্রীকৃষ্ণ মথুরা ছেড়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি সমুদ্রের উপরেই এক বিশাল নগরী তৈরির আদেশ দেন, কিন্তু সমুদ্রদেবের অনুমতি ছাড়া সমুদ্রের মাঝখানে জলের উপরে নগরী স্থাপন করা অসম্ভব ছিল। সে সময় শ্রীকৃষ্ণ সমুদ্রদেবের কাছে এক টুকরো জমি প্রার্থনা করেন। তখন সমুদ্রদেব ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে সমুদ্রের মধ্যেই ১২ যোজন জমি দান করেন আর ওই জমির উপরেই 'পৃথিবীর সেরা আর্কিটেক্ট' দেব বিশ্বকর্মা মাত্র দুদিনে দ্বারকা নগরী নির্মাণ করেন — যার নাম ছিল 'সুবর্ণ নগরী'। পুরো শহরটা একটা বিরাট প্রাচীর দিয়ে ঘেরা ছিল শহরটার ডিজাইন এতটাই ইউনিক ছিল যে আজকালকার মডার্ন শহরকেও হার মানাবে। বিশাল বিশাল প্রাসাদ, রাস্তা, সোনার দরজা, বাগান, পুকুর, ড্রেনেজ সিস্টেম — সবকিছু একদম নিখুঁতভাবে তৈরি করা হয়েছিল। বাইরে থেকেই নগরে আসতে গেলে শুধুমাত্র জাহাজ বা নৌকা করেই আসতে হতো, এছাড়া কোন রাস্তা ছিল না। দ্বারকা নগরীতে প্রায় ৯০০র বেশি প্রাসাদ ছিল আর এই নগরীর একদম মাঝখানে ছিল ভগবান শ্রীকৃষ্ণের রাজপ্রাসাদ — যেটা দ্বারকার সবথেকে সুন্দর প্রাসাদ ছিল।

ভগবান কৃষ্ণের এই সুখ কিন্তু বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। যেভাবে পৃথিবীর প্রত্যেকটা জীব সুখ-দুঃখের চক্রজালে বাঁধা, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ একইভাবে সেই জালে বাঁধা ছিলেন। কয়েক বছরের মধ্যেই কৌরব এবং পান্ডবদের মধ্যে শুরু হয় মহাভারতের যুদ্ধ মহাভারতের যুদ্ধে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ পান্ডব পুত্র অর্জুনের সারথী হিসেবে পান্ডবদের পক্ষে থাকেন। ১৮ দিন ধরে চলা এই যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত কৌরবরা হেরে যায় আর পান্ডবদের জয় হয়। কৌরবদের মাতা গান্ধারী নিজের শতপুত্রের মৃতদেহ দেখে শোকে দুঃখে পাথর হয়ে যান। তিনি ভগবান শ্রীকৃষ্ণকেই এই যুদ্ধের জন্য দায়ী করে ক্রোধের বশে অভিশাপ দেন যেভাবে যুদ্ধের জন্য তার পুত্ররা সবাই মারা গেছে, কৌরববংশ ধ্বংস হয়েছে, ঠিক সেইভাবেই সেদিন থেকে ৩৬ বছর পর শ্রীকৃষ্ণের যদুবংশ ধ্বংস হয়ে যাবে। দেবী গান্ধারীর এই অভিশাপ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ হাসিমুখে স্বীকার করেছিলেন।

প্রচলিত কাহিনী অনুযায়ী শুধুমাত্র দেবী গান্ধারীর অভিশাপ নয়, আরো এক ভিন্ন অভিশাপের কারণে যাদব বংশ ধ্বংস হয়েছিল। দ্বারকার কাছে পিণ্ডারক নামে একটি পবিত্র জায়গা ছিল। এখানে বহু ঋষি মহারঋষিরা আসা যাওয়া করতেন। এরকমই একদিন যখন ঋষি বিশ্বামিত্র, দূর্বাসা, বশিষ্ট, এবং দেবর্ষি নারদ ওখানে এসেছিলেন, তখন শ্রীকৃষ্ণের পুত্র শাম্ব এবং তার বন্ধুরা মিলে ঋষিদের সাথে মজা করতে যায়। ঋষিদের বোকা বানানোর জন্য শাম্বর বন্ধুরা তাকে একদম মেয়েদের মত করে সাজিয়ে শাড়ি পড়িয়ে ঋষিদের কাছে নিয়ে যায় এবং বলে, "এই মহিলা গর্ভবতী।" এর পেট থেকে কন্যা না পুত্র কার জন্ম হবে তারা এই বিষয়ে ঋষিদের কাছে জানতে চায়। শাম্ব আর বাকি যাদব পুত্রদের এরকম আচরণে ঋষিরা প্রচন্ড ক্ষিপ্ত হয়ে যান এবং অভিশাপ দেন, "এর গর্ভ থেকে এক লোহার মুষল জন্ম নেবে, আর সেই মুষল গোটা যাদব বংশ ধ্বংসের কারণ হবে।"

ঋষির অভিশাপ অনুযায়ী পরদিন শাম্ব মুষল প্রসব করে। শ্রীকৃষ্ণের দাদু রাজা উগ্রসেন এই ঘটনার ব্যাপারে জানতে পেরে মুষলটিকে নষ্ট করার আদেশ দেন। অক্রূরের পরামর্শমতো যাদবরা মুষলটি ভালো করে পিষে মিহি গুঁড়ো করে ফেলে। খুব শক্ত হওয়ায় একটি ধারালো ত্রিকোণাকার টুকরো খালি গুঁড়ো করা সম্ভব হয় নি। গুঁড়ো এবং একক টুকরোটি তারা সমুদ্রে ফেলে দেয়। এই সময় মহাভারতের যুদ্ধের ৩৬ বছর পূর্ণ হয়ে গেছে এবার মাতা গান্ধারীর অভিশাপ পূরণ হওয়ার সময় চলে এসেছে।

সমুদ্রে ফেলা লোহার টুকরোটিকে একটি মাছ খাবার ভেবে খেয়ে ফেলে। পরবর্তীকালে জেলেদের জালে ধরা পড়াতে যখন সেই মাছটাকে কাটা হয়, তার পেট থেকে সেই লোহার টুকরোটি উদ্ধার হয়। টুকরোটি শেষ পর্যন্ত জরা নামের এক ব্যাধের হাতে গিয়ে পড়ে এবং জরা ওই লোহার টুকরো দিয়ে শিকারের জন্য একটা বিষাক্ত তীর তৈরি করে। অন্যদিকে, গুঁড়োগুলো ভেসে এসে দ্বারকার উপকূলে জমা হয় এবং তা থেকে নলখাগড়ার বন সৃষ্টি হয়। এই নলগুলো লোহার অস্ত্রের মতো ধারালো ছিল।

শ্রীকৃষ্ণের যদুংশের অবস্থা ধীরে ধীরে খারাপ হতে শুরু করে। যদুবংশীয়রা সারাক্ষণ মদের নেশায় ডুবে থাকতো, কলহ-হিংসা-দলাদলি-অবিশ্বাসে ভরে উঠেছিল যদুবংশ। একদিন সামান্য কলহ থেকে যাদবরা সমুদ্রতীরে নিজেদের মধ্যে একটি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে এবং অস্ত্রের মতো ধারালো নল গুলো ছিঁড়ে একে অপরকে আঘাত করে সমগ্র যদু বংশের বিনাশ হয়। এর মধ্যে অগ্রজ বলরামকে খুঁজতে গিয়ে কৃষ্ণ দেখেন বলরামের মুখ দিয়ে বিশাল একটি সাপ বেরিয়ে সমুদ্রে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে এবং এর মাধ্যমে বলরাম স্বেচ্ছায় তাঁর পার্থিব দেহ ত্যাগ করলেন।

বলরাম ছিলেন শেষ নাগের শাশ্বত অবতার, যাঁর উপর ভগবান বিষ্ণু বিশ্রাম নেন। শেষ নাগ এবং বিষ্ণুর বন্ধন চিরন্তন সংযোগের প্রতীক। বিষ্ণু-অবতার শ্রীকৃষ্ণ বুঝতে পারেন তাঁরও মর্তলোক ত্যাগের সময় এসে গেছে। তিনি দ্বারকা সংলগ্ন অরণ্যে গিয়ে একটি গাছের ডালে যোগনিদ্রায় বিলীন হন। এই সময় জরা নামের সেই ব্যাধ — যে ওই লোহার টুকরোটা জেলেদের কাছ থেকে কিনেছিল — তার নজর পড়ে শ্রীকৃষ্ণের পায়ের দিকে। দূর থেকে সেই শ্রীকৃষ্ণের পা দেখে ভাবে কোন হরিণের কান। জরা শ্রীকৃষ্ণের পা লক্ষ্য করে তীর নিক্ষেপ করে এবং শিকার সংগ্রহ করতে গিয়ে দেখে সে স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণের পায়ে তীর মেরেছে। অপরাধবোধ ও আতঙ্কে জরা ক্ষমাপ্রার্থনা করলে কৃষ্ণ তাকে আশ্বাস দিয়ে মনে করান পূর্বজন্মে রাম অবতারে তিনি লুকিয়ে বালি-বধ করেছিলেন, এই জন্মে সেই বালি-ই জরা। অর্থাৎ কর্মফলের উর্ধে স্বয়ং তিনিও নন। এরপরেই তিনি মর্তলোক ছেড়ে স্বর্গলোকে ফিরে যান।

শ্রীকৃষ্ণের মৃত্যুর খবর পেয়ে অর্জুন তড়িঘড়ি দ্বারকায় এসে পৌঁছান। এই সময় পুরো দ্বারকা আগুনে জ্বলছিল। প্রভু শ্রীকৃষ্ণের স্বপ্নের নগরীর দ্বারকার এই বীভৎস হাল দেখে অর্জুন প্রচন্ড কষ্ট পান এবং বাসুদেবের শেষকৃত্য সম্পন্ন করে, সমস্ত মহিলা ও শিশুদের নিয়ে দ্বারকা ত্যাগ করেন। সবাই দ্বারকা নগরীর ছেড়ে বেরিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে অর্জুনের চোখের সামনে সম্পূর্ণ দ্বারকা নগরী আবারো সমুদ্রের নীচে বিলীন হয়ে যায়। যে ভূমি সমুদ্রদেব ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে দান করেছিলেন, তিনি নিজের সেই ভূমি ফিরিয়ে নেন, এবং ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নগরী দ্বারকা চিরকালের মতো আরব সাগরের নীচে চলে যায়।

পুরাণে কথিত কৃষ্ণের দ্বারকাকে বহু বছর ধরে একটা মিথ বা লোকগাথা মনে করা হতো, বহু খোঁজার পরেও আমাদের পুরাণে উল্লেখিত এই অপূর্ব সুন্দর দ্বারকা নগরীর অস্তিত্ব প্রমাণ করা সম্ভব হয়নি, আর অনেকেই মনে করতো এটা সম্পূর্ণরূপে একটা কাল্পনিক ঘটনা।

দ্বারকা নগরীর প্রথম ঐতিহাসিক রেকর্ড পাওয়া যায় ষষ্ঠ শতকে গুজরাটের ভাবনগরের রাজা সিংহাদিত্যর পান্ডুলিপিতে বলা হয়েছে — সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যে শ্রীকৃষ্ণ এখানে থাকতেন। আর এরপর থেকেই দ্বারকার অস্তিত্বের ব্যাপারে মানুষজন আরো বেশি আগ্রহী হন। এই বিষয়ে সিএসআইআর ইন্ডিয়া মানে কাউন্সিল অফ সাইন্টিফিক এন্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চের প্রাক্তন ডিরেক্টর এবং বিজ্ঞানী ডক্টর রাজীব নিগম বলেছেন, "মহাভারতে উল্লেখ করা আছে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন দ্বারকা সমুদ্রের মাঝখান থেকে উঠে আসা একটা জমিতে তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু যখন জল আবার সেই জায়গাটিকে এসে গ্রাস করে তখন শহরটা ডুবে যায়। তার মানে হলো সমুদ্রে জলস্তর বাড়ার সাথে সাথে দ্বারকা শহর একটু একটু করে জলের নীচে তলিয়ে গেছে।"

১৯৩০ সালে প্রথমবার দ্বারকা নগরীর খোঁজ শুরু হয়, কিছু প্রমাণও পাওয়া যায়। ১৯৬৩ সালে প্রথমবার আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে করা হয় যাতে বহু পুরনো আর্টিফেক্টস এবং মূর্তি পাওয়া যায়। এরপর ১৯৮৩ থেকে ৯০ সালের মধ্যে সেই সময়ের বিখ্যাত আন্ডারওয়াটার আর্কিওলজিস্ট ডক্টর এস আর রাও এবং তার টিম এই মিশনটাকে কমপ্লিট করার জন্য এগিয়ে আসেন বহুদিন ধরে খোঁজাখুঁজির পর তাঁরা জলের নীচে এক অদ্ভুত ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পান।

বেট দ্বারকা দ্বীপের উপকূলীয় এবং সমুদ্র উপকূলীয় অনুসন্ধানে ২০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের প্রোটোহিস্টোরিক কাল থেকে শুরু করে আধুনিক যুগ পর্যন্ত একটি দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা দেখা গেছে। এই সার্ভেতে রাও এর টিম জলের নীচে ৫৬০ মিটার লম্বা একটা দেওয়াল খুঁজে পান যেটির গঠন মহাভারতে উল্লিখিত দ্বারকার নগরীর সাথে অনেকটাই মেলে। পৌরাণিক কাহিনী অনুযায়ী দ্বারকাতে প্রায় ৫০ টা বিশালাকার পিলার ছিল। আর্কিওলজিস্টরা এই সার্ভের সময় প্রায় ৩০ টারও বেশি বিশালাকার পিলার খুঁজে পেয়েছিলেন। এই এলাকা থেকে ৫০০ টারও বেশি প্রাচীন বস্তু খুঁজে পাওয়া গেছে। সেখান থেকে তারা বড় বড় পাথরের থাম এবং অনেক মূর্তি মাটির ভাঁড় আরো অনেক কিছুর ছবি তুলে নিয়ে আসেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে গভীর সমুদ্রে যেখান থেকে জিনিসপত্রগুলো উদ্ধার করা হয়েছে, সেটা যে সত্যিই ভগবান শ্রীকৃষ্ণের দ্বারকা নগরী তার কি প্রমাণ?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়ার জন্যই আর্কিওলজিস্টরা পাথরগুলো কার্বন ডেটিং করার ডিসিশন নেন। কার্বন ডেটিং করে একটা বেসিক ধারণা পাওয়া যায় যে কোন বস্তু কত বছর পুরনো হতে পারে। ডক্টর নরহরি আচার মহাভারতে উল্লেখ করা গ্রহের অবস্থান এবং গ্রহাণুর বর্ণনা দেখে বিশ্লেষণ করে জানান যে মহাভারতের যুদ্ধ ৩১২৬ খ্রিষ্ট পূর্বে হয়েছিল, আর সেই সময় মানে দ্বাপর যুগেই দ্বারকাও তৈরি হয়েছিল। আর এই পাথরগুলোর যখন কার্বন ডেটিং করা হয় তখন দেখা যায় যে পাথরগুলো ওই সমসাময়িক। তবে এরপরেও অনেকেই যুক্তি মানতে নারাজ কারণ পাথর তো যেকোনো সময়ের হতে পারে।

আর্কিওলজিস্টরা সমুদ্রের গভীরে ওই শহরের এরিয়া মাপতে শুরু করে আর অদ্ভুতভাবে এই এরিয়া আয়তন ছিল ১২ যোজন! ভগবত পুরাণ অনুসারে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের দ্বারকা নগরীর আয়তনও ছিল ১২ যোজন — যেটা সমুদ্রদেব ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে দান করেছিলেন। দ্বারকা নগরীর তৈরির জন্য শুধু তাই নয় এই জায়গায় পাথরের জেটি, অনেক ত্রিভুজাকৃতির নোংওর পাওয়া গেছে — যা থেকে আন্দাজ করা হয় যে এই জায়গায় একটা ঐতিহাসিক বন্দরও ছিল। ১৫ থেকে ১৮ শতাব্দী পর্যন্ত এই বন্দর দিয়ে ভারত আরবসহ বহু দেশের সঙ্গে বাণিজ্য করতো। তবে পরবর্তীকালে টাকার অভাবে এই সার্ভে বন্ধ হয়ে যায়।

কিন্তু ২০০৫ সালে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া এখানে আবার নতুন করে খোঁজখবর শুরু করে। ২০০৭ সালে ইএসআই এর একটা টিম ভারতীয় নৌসেনা অফিসারদের সাহায্যে সমুদ্রের নীচে খনন কার্য চালায় যেখান থেকে তারা বহু চুনো পাথরের টুকরো নিয়ে আসে। আর এরপর ইএসআই থেকে এই দুর্লভ নমুনাগুলোকে দেশ-বিদেশের বহু আর্কিওলজিস্টের কাছে পাঠানো হয়। বিভিন্ন দেশে এগুলো পাঠানোর পেছনেও একটা উদ্দেশ্য ছিল — যাতে দেশ-বিদেশের বড় বড় সংস্থাগুলো দ্বারকার অস্তিত্বের ব্যাপারে বিশ্বাস করে আর তার ইতিহাস খুঁজতে তারাও আগ্রহী হয়। বহুবছর ধরে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানা যায় এই পাথরগুলোর সাথে সিন্ধু সভ্যতার কোন সম্পর্ক নেই — এগুলো সিন্ধু সভ্যতার থেকেও বহু পুরনো।

ইএসআই ডিরেক্টর এ কে সিনহার কথা অনুযায়ী দ্বারকাতে যে শুধুমাত্র সমুদ্রের নীচেই খোঁজখবর করা হয়েছে তা কিন্তু নয়, মাটির নীচেও খোঁজা হয়েছে। মাটির নিচে প্রায় ১০মিটারের বেশী গভীর পর্যন্ত খনন কাজ চালানোর পর এখান থেকে বহু পুরনো মুদ্রা এবং শিল্পের নমুনা পাওয়া গেছে আর এখনো পর্যন্ত এই সার্ভে চলছে। একটা থিওরি অনুযায়ী আজ থেকে ৩৫ বছর আগে যে ভূমিতে দ্বারকা নগরী তৈরী হয়েছিল, সেটা সমুদ্রের ওপরেই হয়েছিল। হয়তো সমুদ্রতল বাড়ার সাথে সাথে ভগবান কৃষ্ণের ওই নগরী সমুদ্রের তলায় বিলীন হয়ে যায়। কিন্তু এখানেও একটা প্রশ্ন থাকে যে সমুদ্রতল একটু একটু করে বাড়ে, কিন্তু মহাভারতের মহাপ্রস্থানিকা পর্ব অনুসারে অর্জুনের চোখের সামনে একটা বড় ঢেউ এসে সম্পূর্ণ দ্বারকা নগরীকে গ্রাস করে নিয়েছিল।

বিতর্ক আজও থামেনি। কেউ বলেন দ্বারকা কৃষ্ণের স্বপ্ননগরী, কেউ বলেন এটি শুধু আরেক প্রাচীন নগরী। কিন্তু একটি সত্য অস্বীকার করা যায় না — এই কাহিনি ভারতের ধর্মীয়, ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে করে তুলেছে আরও রহস্যময় ও গৌরবময়। বহুবছরের গবেষণায় প্রত্নতাত্ত্বিকরা এখন মনে করেন, দ্বারকা নিছক মিথ নয় — এটি এক প্রাচীন ও সমৃদ্ধ সভ্যতার বাস্তব চিহ্ন। এমনই আরো বহু উদাহরণ রয়েছে যেগুলো প্রমাণ করে দেয় ভারতে মানবজাতির সভ্যতা মহেঞ্জদারো সময় থেকে নয় — তারও বহু আগে শুরু হয়েছিল।




আপনি কি লিখতে ভালোবাসেন?

‘উদ্যোগ’ ওয়েব ম্যাগাজিনের এপ্রিল সংখ্যা ❛নববর্ষ ১৪৩৩❜ প্রকাশিত হবে ১৫ এপ্রিল। ওয়েবসাইটে ঘোষিত বিভাগগুলি থেকে আপনার পছন্দের বিষয়ে লেখা পাঠান ১০ই এপ্রিলের মধ্যে। লেখা পাঠানোর আগে অতি অবশ্যই শর্তাবলী পড়ুন। নির্বাচিত লেখাগুলি লেখক / লেখিকার ছবি ও সংক্ষিপ্ত পরিচিতিসহ Bangali.Network ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হবে, এবং ১২ জন পর্যন্ত লেখক / লেখিকা পাবেন 'মাসের সেরা কলম' সম্মান। বিশদে জানতে ও আপনার লেখা পাঠাতে এখানে ক্লিক করুন

পৃষ্ঠা

ডিসক্লেইমার : লেখা, মতামত, মন্তব্য বা সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সম্পূর্ণ দায়ভার তাঁদের উপরই বর্তায়। এই সমস্ত মতামত Bangali Network-এর নিজস্ব মতামত, অবস্থান বা নীতির প্রতিফলন নাও হতে পারে। লেখক পরিচিতিতে প্রদত্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণ অনুযায়ী প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

ডিসক্লেইমার : লেখা, মতামত, মন্তব্য বা সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সম্পূর্ণ দায়ভার তাঁদের উপরই বর্তায়। এই সমস্ত মতামত Bangali Network-এর নিজস্ব মতামত, অবস্থান বা নীতির প্রতিফলন নাও হতে পারে। লেখক পরিচিতিতে প্রদত্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণ অনুযায়ী প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

ভালো লাগলে ভালোবাসা দিন
অপছন্দ হলে পরামর্শ দিন
মতামত জানাতে মন্তব্য করুন
4.7 3 ভোট
স্টার
guest
0 কমেন্ট
নতুন থেকে পুরোনো
পুরোনো থেকে নতুন ভোটসংখ্যা অনুসারে
ইনলাইন প্রতিক্রিয়া
সকল কমেন্ট দেখুন
ফেসবুক পেজ
Udyog Bengali Web Magazine by Bangali Network

বিভিন্ন বিষয় থেকে বেছে নিয়ে লেখা পড়ুন

    বিভিন্ন সংখ্যায় প্রকাশিত হওয়া লেখা পড়ুন

    মাসিক সংখ্যাগুলি দেখুন
    Scroll to Top