আজকে কিছু কথা বলতে চাই। আমাদের চারপাশে যত সমস্যাই দেখি — টক্সিক প্যারেন্টিং, ধর্ষণ, আত্মহত্যা, ডিভোর্স — এসব কিছুর অন্যতম বড় কারণ হলো জেনারেশন গ্যাপ।
আমরা এক অদ্ভুত সময়ে জন্মেছি। ছোটবেলা কেটেছে পুরোনো দিনের আবহে, আর বড় হয়েছি আধুনিকতার স্রোতে ভেসে। তাই আমরা অনেকটাই এগিয়ে গেছি, কারণ জানি যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হয়। কিন্তু আমাদের বাবা-মায়েদের প্রজন্ম এখনো সেই পুরোনো চিন্তাভাবনায় আবদ্ধ। ফলে আমাদের সঙ্গে তাঁদের ভাবনার অমিল হয়েই যায়। এর ফলেই বাড়ছে আত্মহত্যা, ডিপ্রেশন, অশান্তি। অথচ তাঁদের সময়ে এই সমস্যা খুব একটা ছিল না, কারণ তাঁদের চিন্তাভাবনা মিলে যেত দাদু-ঠাকুমাদের প্রজন্মের সঙ্গে।
আমরা জানি পোশাক কারো চরিত্র নির্ধারণ করে না — যে যার ইচ্ছেমতো পোশাক পরতে পারে। ছোট পোশাক পরলেই তার দোষ নয়, আর তাকে ধর্ষণ করার কোনো যুক্তিই হতে পারে না। কিন্তু আগের দিনে সবাই বিশ্বাস করত — মেয়েরা ছোট পোশাক পরবে না, তাহলে সমস্যাও হবে না।
ধর্ষণের মূল কারণ আসলে শিক্ষার অভাব। আগে মেয়েদেরকেই নানা রকম শিক্ষা দেওয়া হতো — রান্না শিখতে হবে, স্বামীকে সেবা করতে হবে, বড়দের ভুলভাল কথাও মেনে নিতে হবে, প্রতিবাদ করা যাবে না, ছোট জামাকাপড় পরা যাবে না, গলা উঁচু করা যাবে না, শ্বশুরবাড়ি যেমনই হোক মানিয়ে নিতে হবে, কেউ বাজেভাবে গায়ে হাত দিলে চুপ থাকতে হবে — নইলে সম্মান নষ্ট হবে, বিয়ে হবে না। মেয়ে মানেই ঘরে থাকা, স্বপ্নহীন জীবন, নিজের পায়ে দাঁড়ানো অপ্রয়োজনীয়। কিন্তু ছেলেদের এসব শেখানো হতো না। তাদের ক্ষেত্রে নিয়ম-কানুন-আচরণ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন, অনেক মুক্ত, স্বাধীন। এবং সবাই এটা মেনে নিয়েছিল, কারণ সমাজের চিন্তাভাবনা ছিল একরকম।
কিন্তু আমাদের প্রজন্ম এসব মানতে নারাজ। তাই ডিভোর্স বেড়ে গেছে, কারণ সম্পর্কের ভারসাম্যে নতুন প্রশ্ন উঠছে।
আগের দিনে সবাই বিশ্বাস করত — শুধু পড়াশোনাই জীবনের সফলতার পথ। দাদু-ঠাকুমা থেকে বাবা-মা পর্যন্ত সেই ধারাটাই চলে এসেছে। তাই তখন আত্মহত্যার ঘটনা কম ছিল।
কিন্তু এখন আমরা জানি শুধু পড়াশোনা নয়, নিজের প্যাশন দিয়েও জীবনে সফল হওয়া যায়। অথচ বাবা-মায়েরা সেটা মানতে পারছেন না। ফলে টক্সিক প্যারেন্টিং বেড়ে গেছে। অনেক ছেলে-মেয়ে বাড়ির চাপে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছে, কেউ কেউ আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে।
আগের দিনে সবাই বিশ্বাস করত — ছোটদের 'গুড টাচ ব্যাড টাচ' শেখালে তারা অল্প বয়সে পেকে যাবে। ছেলেদের পিরিয়ড সম্পর্কে জানালে তারা খারাপ হয়ে যাবে। এমনকি বাবা-দাদা-কাকাদেরও বলা যেত না স্যানিটারি ন্যাপকিন আনতে। এগুলোকে স্বাভাবিক করে তুলতেই যেন ভয় ছিল। তাই তখন ঝামেলা কম ছিল। কিন্তু আমাদের প্রজন্ম এসব ভাঙতে চাইছে। আমরা এসব নিয়ে বললেই সমাজ আমাদের খারাপ বলে, আমাদের শিক্ষাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
তবুও আমি আশাবাদী। আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম আগের দিনের মতোই হবে — তাদের জীবনে এত ধর্ষণ, ডিভোর্স, অকালে আত্মহত্যা বা টক্সিক প্যারেন্টিং থাকবে না, কিংবা থাকলেও অনেক কমে যাবে।
কারণ আমরা তাদের শেখাব —
▪ ছেলেমেয়ে সমান দায়িত্ব নেবে ঘরে-বাইরে।
▪ স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে সহায়তা করবে, সম্মান করবে, অসুস্থ হলে সেবা করবে।
▪ মেয়েদের শুধু মা-বোন ভেবে নয়, মানুষ ভেবে সম্মান করতে হবে।
▪ মেয়েদের যেমন ভদ্র পোশাক পরার প্রত্যাশা থাকে, তেমনি ছেলেদেরও উচিত শালীনভাবে চলাফেরা করা।
▪ 'গুড টাচ ব্যাড টাচ' ছোট থেকেই শেখানো হবে, যাতে তারা প্রতিবাদ করতে পারে।
▪ ছেলেদেরও পিরিয়ড সম্পর্কে সচেতন করা হবে, যাতে তাদের মধ্যেও সহমর্মিতা ও সম্মানবোধ তৈরি হয়।
আমরা চাই আমাদের সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুর মতো সম্পর্ক গড়ে তুলতে, যাতে তারা আমাদের কাছে খোলামেলা হতে পারে। এই প্রজন্মের কাছে জেনারেশন গ্যাপ যেন গলার কাঁটার মতো। কিন্তু আশা করি, আমাদের প্রচেষ্টায় পরবর্তী প্রজন্ম এই যন্ত্রণায় আর ভুগবে না।