যতদূর মনে পড়ে তখন ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র ছিলাম। একদিন আমাদের গদীবেড়ো গ্রামের শ্রী শ্রী রামচন্দ্র আর্দশ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক স্বর্গীয় রঙ্গনাথ আচারিয়া মহাশয় আমদের কয়েক জনকে কাছে ডেকে কথা প্রসঙ্গে বললেন, "তোমরা তো এই গ্রামেরই ছেলে, গ্রামে গ্রন্থাগার রয়েছে তোমরা কি জানো? তোমরা কি সেখানে কেউ যাও?"
আমি বললাম, "গ্রন্থাগার তো স্কুলের সামনেই রয়েছে স্যার, তবে কোন দিনও তো সেভাবে যাইনি।"
স্যার বললেন, "এবার থেকে অবসর সময়ে তোমরা সকলেই গ্রন্থাগারে যাবে। সেখানে গ্রন্থাগারের যিনি দায়িত্বে রয়েছেন সুভাষ বাবুকে বলে দিয়েছি, তোমাদের যাওয়া কথা। খুব কম, এককালীন বার্ষিক চাঁদায় তোমাদের সদস্য পদে নাম নথিভুক্ত করে নেবেন। কারণ ছাত্র-ছাত্রীদের বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থা আছে। তোমরা কেবল ওখানে গিয়ে আমার কথা বললেই হবে। এবার বলো, সেখানে তোমরা কি করবে? গ্রন্থাগারে তোমাদের কাজ কি হবে?"
অনেকেই বলল, "স্যার বই পড়ব।"
— "শুধু বই পড়া নয় তোমরা প্রত্যেকে গ্রন্থাগারে যেদিন যেদিন যাবে, একটা নোটবুক সঙ্গে নিয়ে যাবে। সেখানে ছোটদের জন্যেও পত্র-পত্রিকা নেওয়া হয় সেগুলো পড়বে আর গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বুঝলে নোটবুকে লিখে আনবে। পরে আমি তোমাদের সকলের নোট বুক দেখব।"
স্যারের এই সুপরামর্শ মতো সেই সময় থেকে গ্রন্থাগারের বড় গেট পার হতে সাহস পেয়ে ছিলাম। গেটের দুপাশে শীতকালে ফুটত নাম না জানা কত রঙীন ফুল। পাশেই মোলায়েম ঘাসে ঢাকা জমিতে মাঝে মাঝে খানিক খেলার আনন্দ নিতাম।
সেখানে সেই সময়ে সুভাষ বাবু ও তাঁর সহযোগী অজিতদা দায়িত্বে থাকতেন। তাঁদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারলাম আমাদের সদস্যপদ দেওয়া হবে। তাহলে বই বাড়িতে নিয়ে গিয়েও পড়া যাবে। তবে বই এর পাতা বা বাঁধাই নষ্ট করা চলবে না। যথা সময়ে বই ফেরৎ দিতে হবে। হারালে মোটা টাকার জরিমানা গুনতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। সর্বোপরি বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য বাৎসরিক দেয় মাত্র ২ টাকা ছিল সেই সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে।
সেখানে আমি সদস্য পদ নিয়ে সেই ষষ্ঠ শ্রেণি থেকেই যাতায়াত শুরু করে দিলাম। বড়দের খবরের কাগজ যেমন 'আনন্দ বাজার', 'আজকাল', 'প্রতিদিন'-এর সঙ্গে ছোটদের সাপ্তাহিক খবরের কাগজ 'সকাল' পেয়ে গেলাম। তাছাড়া কার্টুন-এর বই, 'চাঁদা মামা', 'কিশোর বিজ্ঞান' ইত্যাদি হাতে পেয়ে গেলাম। ছোটদের শব্দছক পূরণে করতে চেষ্টা করতাম। আজব সংবাদ, কুইজ-এর প্রশ্ন নোটবুকে তুলে নিতাম। বিভিন্ন বই-এর আলমারি খুলে কত রকমের বই দেখতাম আর বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে যেতাম। মোটা মোটা বই প্রথমে ছবি উল্টেপাল্টে দেখতাম। পরে পরে পুরো বই পড়ার চেষ্টা করতাম। 'বিশ্বকোষ' নামে একটা মোটা বই এর কয়েক খন্ডে সারা পৃথিবীর বিভিন্ন ছবি দেখতে লাগলাম! এই ভাবে ধীরে ধীরে গ্রন্থাগারে আমাদের বেশ ভালোলাগা থেকে বই পড়ায় ভালোবাসা জেগে উঠল।
প্রথমে দিকে 'পান্ডব গোয়েন্দা', 'সবুজ দ্বীপের রাজা'র মতো গোয়েন্দা বই পড়লাম। তার পর 'রামের সুমতি', 'বিন্দুর ছেলে', 'শ্রীকান্ত' ইত্যাদি পড়লাম। ধীরে ধীরে শরৎ চন্দ্র মহাশয়ের লেখাগুলো আমাকে আকৃষ্ট করে ছিল। আমার এখনো মনে আছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা বড় বইগুলো বাড়িতে আনার নিয়ম ছিল না, ওখানেই পড়তে হত। টেবিলে-বেঞ্চে বসেই কয়েক দিন ধরে 'গোরা', 'রাজর্ষি' উপন্যাস পড়ে ফেলি। পরে শরৎচন্দ্র মহাশয়ের সমগ্র, বিভূতি ভূষন বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়ের সমগ্র পড়ে ভালো লাগতো। সাহিত্য সম্রাট বঙ্গিম চন্দ্র মহাশয়ের লেখাগুলো পড়তে খুব ভালো লাগতো না, তবুও দু-একবার বই নিয়ে দেখেছি।
সেই সময় বিশেষ করে আমাদের পাঠ্যপুস্তকের পড়া গল্প-কবিতাগুলোর মূলগ্রন্থ বা পড়ানোর সময় স্যারেদের আলোচনায় উঠে আসা নামের বইগুলো খুঁজে খুঁজে পড়তে শুরু করলাম। এভাবেই বাংলা, ইতিহাস, ভূগোল ইত্যাদি নানা বিষয়ের বিশেষ বই-এর নাম বলে অজিতদাকে খুঁজে দিতে বলতাম। অজিতদাও আমাদের কথার গুরুত্ব দিতেন, সব বিষয় ভালোভাবে বুঝিয়ে দিতেন।
পরে উচ্চ মাধ্যমিক বিষয়ের পড়ার জন্য শহরের বিদ্যালয়ে যেতে হল। সেই বিদ্যালয়ে নিজস্ব গ্রন্থাগার থাকায় সুবিধাই হল। সেখানে বিভিন্ন স্বাদের বই পড়ার চেষ্টা করলাম। আরো পরে কলেজে থেকে অনেক বই নেওয়া-দেওয়া করেছি।
ভাবিনি এভাবে আজ আবারো আমাকে গ্রন্থাগার কাছে ডাকবে। এখন আমি গ্রন্থাগারেই ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে বেশি সময় কাটাতে ভালোবাসি। তাই মনে হয় সামাজিক জনশিক্ষার এই বিশেষ দিকটা আজ অবহেলিত। রাজ্যের প্রত্যন্ত এলাকার গ্রন্থাগার গুলোতে যে শত শত গ্রন্থ সজ্জিত রয়েছে, তারা যেন আজ গুমরে গুমরে কাঁদছে — তাদের ভালোবাসার মানুষ, পড়ার মানুষ নেই। আবার অনেক গ্রন্থাগার আজ বন্ধ হয়ে গেছে বা বন্ধের মুখে।
উন্নত শহরে ডিজিটাল গ্রন্থাগারের সূচনা হয়েছে। মেচাদার (কোলাঘাট) বিদ্যাসাগর গ্রন্থাগারে এক মিটিং থেকে আলোচনায় শুনতে পেয়েছিলাম মানুষকে বইমুখী করতে ভ্রাম্যমান গ্রন্থাগারের কথা। বাড়ি বাড়ি বই দেওয়া-নেওয়ার গাড়ির ব্যবস্থা প্রয়োজন।
বলতেই হয় — বই পড়তে এখন মানুষ গ্রন্থাগারে যাবেন না, গ্রন্থাগারের বইগুলো বাড়ি এসে পাঠককে পড়তে অনুরোধ করবে।
লেখক রাজ্য, দেশ তথা আন্তর্জাতিক স্তরে বাংলা সাহিত্য সাধনায় ব্যপ্ত রয়েছেন। রঘুনাথপুর, পুরুলিয়ার শ্রী শ্রী রামচন্দ্র আর্দশ বিদ্যালয়ে পড়ার সময় সাহিত্যের প্রতি তাঁর আকর্ষণের জন্ম, এবং বিদ্যালয়েরই পত্রিকা 'ধ্রুব তারা'য় লেখক হিসাবে আত্মপ্রকাশ। এরপর একে একে প্রকাশ হয়েছে বিভিন্ন শৈলীতে তাঁর লেখা একাধিক কাব্যগ্রন্থ, অনু কবিতা ও প্রবন্ধের সংকলন।