নাচের জগতের সাথে দীর্ঘদিন যুক্ত থাকার সুবাদে বহু জায়গায় ঘোরার অভিজ্ঞতা আছে। আর ছোটবেলা থেকেই আমি অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয়। তাই বছর খানেক আগে ফেসবুকে যখন মৌসুনী আইল্যান্ডে টেন্টে থাকার একটা বিজ্ঞাপন দেখেছিলাম, তখন থেকেই যাওয়ার ইচ্ছে জেগে উঠেছিল। কিন্তু নানা কারণ বশত যাওয়াটা আর হয়ে উঠছিল না। তাই গত বছর যেই একটা সুযোগ হয়েছে, অমনি আমরা মিঞা-বিবি ঠিক করলাম এবার বেরিয়েই পড়বো অ্যাডভেঞ্চার করতে। ক্যাম্প বুক করার পর ঠিক করলাম অতি ভোরে বেরিয়ে লাভ নেই। কারণ বাস পাবোনা। তাই একটু পরের দিকে বেরোনোই ভালো।
তবে বেশি বেলা বাড়িয়েও লাভ ছিল না। তাই সকাল সাতটা নাগাদ বেরোনো হলো। শিয়ালদহ স্টেশনে পৌঁছে নামখানা ট্রেনের অ্যানাউন্সমেন্টের সাথে সাথে ছুটলাম ট্রেন ধরতে। ট্রেনে উঠে নানা ধরনের লোক দেখতে দেখতে সুন্দর সময় কেটে গেলো। যখন নামখানা পৌঁছলাম তখন দুপুর প্রায় একটা। সেখানে মেইন রোড এন এইচ ১১৭-এ আছে টাটা ম্যাজিকের স্ট্যান্ড। প্রথমে সেখান থেকে একটা ম্যাজিক গাড়ি নিয়ে গেলাম দশমাইল বাজার, তারপর দশমাইল বাজারের ভ্যান-স্ট্যান্ড থেকে ভ্যান ধরে দশমাইল ঘাটে পৌঁছলাম। সেখান থেকে আবার নৌকা, ভাড়া জন প্রতি ১০ টাকা। নৌকাতে নদী পেরিয়ে মৌসুনী ঘাটে পৌঁছে এবার টোটো, ভাড়া জন প্রতি ২৫ টাকা। সেই টোটো নিয়ে অবশেষে পৌঁছে গেলাম মৌসুনী ওয়েভস্ ক্যাম্পে।
পৌঁছতেই ওয়েলকাম ড্রিংকস হিসাবে সার্ভ করা হলো ডাবের জল। তেষ্টা মিটিয়ে আমরা নিজেদের ক্যাম্পের দিকে চলে গেলাম। এই ক্যাম্পটায় আটটা কাপল টেন্ট, দুটো ফ্যামিলি টেন্ট, আর দুটো কটেজ। বাথরুমগুলো যদিও জেনারেল। আমাদের টেন্টে বিছানা আর বালিশ দেওয়াই ছিল দেখলাম। ব্যাগগুলোর জিপার টেনে টেন্টের ভেতরে রেখে আমরা বাইরে বেরিয়ে এলাম। তারপর চারিদিক ঘুরে ফিরে দেখতে শুরু করলাম। লক্ষ্য করলাম প্রচুর ঝাউ গাছ রয়েছে এই ক্যাম্পটায়।
পাশেই একটা কটেজ তৈরি হচ্ছিল। কেয়ারটেকার বললো ৩১শে ডিসেম্বরের জন্য এই ব্যবস্থা। সেদিন নাকি ১০০ জনের বুকিং আছে। কলকাতা থেকে পারফর্মারদের আনা হচ্ছে নিউ ইয়ার ইভ-এর অনুষ্ঠানের জন্য। ভবিষ্যৎ অনুষ্ঠানের বর্ণনা শুনতে শুনতে হঠাৎ উপলব্ধি করলাম যে খিদে পাচ্ছে খুব। যদিও তখনও স্নান হয় নি। কিন্তু বেড়াতে এসে নিয়মভঙ্গ না করলে আর কিসের অ্যাডভেঞ্চার! তাই স্নানটা পরে সারা যাবে ভেবে নিয়ে আমরা খেতে বসে গেলাম।
শাল পাতার থালায় এসে গেলো গরম ভাত, ডাল, আলু পটলের তরকারি, বেগুন ভাজা, আলু ভাজা, মাছ, পাপড়, চাটনি। আহা! কি সুস্বাদু সেসব খাবার। খেতে খেতে গল্প শুনলাম মৌসুমী আইল্যান্ডের। খুব পুরোনো নয় এই ক্যাম্পগুলো। এখনো অনেক ক্যাম্প তৈরি হচ্ছে। টুরিস্টদের জন্য এই জায়গা বেশ উপভোগ্য। কিন্তু এখনো অনেকেই জানেনা এখানকার সম্বন্ধে। সমুদ্রতট থেকে অনেক ওপরে ক্যাম্পগুলো। জোয়ারের ঢেউ যাতে কোনোভাবেই ক্যাম্পগুলোতে আঘাত দিতে না পারে তার জন্য এই ব্যবস্থা।
সমুদ্রের ধারে বসে বসে ভাবছিলাম এখানকার জনজীবন কত কঠিন। এরা বসে থাকে সারাবছর ট্যুরিস্ট দের জন্য। শীতকাল হলো আদর্শ সময়। নভেম্বর থেকে শুরু করে ফেব্রুয়ারি অবধি হেভি বুকিং থাকে। তারপর আস্তে আস্তে কমতে থাকে। পাশের গ্রামগুলো থেকে মানুষ আসে এই ক্যাম্পগুলোতে কাজ করতে। গ্রামের বৌরা আসে রান্না করতে। অনেকেই দোকান দিয়েছে ওখানে। চিপস, কোল্ড ড্রিঙ্কস, আরো টুকিটাকি নানা খাবারের জিনিস পাওয়া যায় সেগুলোতে। সেই দোকানগুলো বাঁশের মাচার ওপর তৈরি। দোকানের সামনে চেয়ারে বসে সমুদ্র দেখতে দেখতে ভাবছিলাম, এত শান্ত নিরিবিলিতে যদি বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেওয়া যেত, তাহলে বেশ হতো!
তখনই হঠাৎ চোখে পড়ল দূরে সমুদ্রে কিছু একটা ভাসছে। সমুদ্রের পাড়ে কিছু কুকুর চিৎকার করছে। দৃশ্যটা দেখে কৌতুহল হতে কাছে গিয়ে দেখলাম একটা মড়া ছাগল ভাসছে। ভাসতে ভাসতে পারের কাছে আসতেই কুকুরগুলো তাকে নিয়ে টানাটানি শুরু করলো। এত খারাপ লাগছিল দেখতে যে উঠে চলে এলাম ওখানে থেকে। হাঁটতে হাঁটতে অনেক দূর অবধি চলে গিয়েছিলাম। দূর দূরান্ত অবধি কিছু নেই। কোনো ক্যাম্পও নেই এই দিকটায়। দূরে সমুদ্রে সূর্য যেন ডুব দিচ্ছে। গোধূলির আকাশ, সঙ্গে সমুদ্র — মন ভালো করার ওষুধ যেন। ছবি তোলা হলো অনেকগুলো। সন্ধ্যে গড়িয়ে আসতে আবার ফিরে এলাম ক্যাম্পে।
কখন ঘুমিয়ে পড়েছি বুঝতেই পারিনি। ঘুম ভাঙ্গলো মুড়ি-চা-এর ফাঁকে। বাইরে তখন সমুদ্রের গর্জন। বেরিয়ে দেখলাম একটা কমবয়েসী বন্ধুদের গ্রুপ, তারা বারবিকিউ-এর অর্ডার দিয়েছিল, খুব উদগ্রীব হয়ে বসে আছে কখন হাতে খাবার পাবে। লোহার জালের ওপর চিকেন রেখে সেঁকা হচ্ছিল। নিচে কাঠ কয়লা। আমরা আবার সমুদ্রের ধারে গেলাম। দেখলাম ভাটার টানে জল এবার বহুদূরে চলে গেছে। বিশাল বিশাল বোল্ডার জেগে উঠেছে সমুদ্র সৈকতে। রাতের অন্ধকারে ভয়ঙ্কর লাগছিল দেখতে। আবার আমরা ক্যাম্পে ফিরে এলাম।
এসে দেখি বক্স বাজিয়ে গান চলছে। ইয়ং ছেলেমেয়েগুলোর দেখলাম গানের চয়েস বেশ ভালো। '৯০ দশকের গান চলছিল — এত শ্রুতিমধুর লাগছিলো! ছেলেমেয়েগুলো খুবই ভদ্র। বার বার এসে জিজ্ঞেস করে যাচ্ছিলো যে, আমাদের কোনো অসুবিধা হচ্ছে কিনা। চারিদিকে টুনি বাল্ব দিয়ে সাজানো হয়েছে দিওয়ালি রাতের মতো করে।
এই মনোরম পরিবেশে দোলনায় দুলতে দুলতে, গান শুনতে শুনতে, বুঝতেই পারিনি কত রাত গড়িয়ে যাচ্ছে! হঠাৎ গান থামতে চমক ভাঙলো, বুঝলাম রাত ১০ টা বেজে গেছে। এখানকার নিয়মানুযায়ী রাত ১০ টার পর কোনো ক্যাম্পে গান চলবেনা। ডিনারে চিকেন-ভাত খেয়ে শুতে চলে গেলাম। কাল ভোরবেলায় ছেলেমেয়েগুলো চলে যাবে। আমরা হয়তো একাই থাকবো এই ক্যাম্পে। বরের সাথে গল্প করতে করতে কখন একসময় ঘুমিয়ে পড়েছিলাম খেয়াল করি নি।
ঘুম ভাঙ্গলো মেসেজ আর ফোন এর জন্য। জন্মদিনের উইশ পেতে পেতে সকাল সকাল মনটা খুব ভালো হয়ে গেলো। হ্যাঁ, জন্মদিন উপলক্ষেই আসা এই ছোট্ট ট্যুরে। জলখাবার খেতে গিয়ে দেখি ওমা, পিল পিল করে লোক ঢুকছে! প্রথমে প্রায় জনদশেকের একটা ফ্যামিলি ঢুকলো। তারপরেই ঢুকলো একটা ইয়ং ছেলেদের গ্রুপ। তারপর আরো একটা ফ্যামিলি গ্রুপ ঢুকলো। গতকাল রাত্তিরে মনে হচ্ছিল আমরা বোধহয় একা হয়ে যাবো এই ক্যাম্পে। আর আজ সকালেই দেখি এত লোক! খাওয়ার পর স্নান সেরে নতুন জামা পরে সমুদ্রের ধারে ঘুরতে গেলাম। কিন্তু খুব বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না। প্রচণ্ড রোদ। বাধ্য হয়ে আবার ক্যাম্পে ফিরে এলাম। এসে দেখি এরাও সবাই বক্স বাজিয়ে নাচ-গান করছে। দেখতে বেশ ভালই লাগছিলো আমার। একদম অন্যরকম একটা জন্মদিন।
দুপুরে খেয়ে উঠে একটু ঘুমিয়ে নিলাম। আজ বারবিকিউ বলেছিলাম। দুর্দান্ত স্বাদের সেই খাবার খেতে খেতে দেখছিলাম তখনও সবাই কি সুন্দর নাচ করছে। আনন্দ করছে। তিনটে ফ্যামিলি একসাথে এসেছিল। তাদের নাচ দেখে আমি অভিভূত। পরে শুনলাম তারা তিনজনেই নাকি দারোগা! দারোগারা এত 'হাসমুখ' হতে পারে আগে জানা ছিলোনা।
রাতের খাবার খেয়ে শুয়ে পড়লাম। গভীর ঘুমিয়েছিলাম। ঘুম ভাঙলো পরের দিন বাইরের চেঁচামেচিতে। বেরিয়ে শুনি কে বা কারা পুলিশের জুতো চুরি করে নিয়ে পালিয়েছে, তাও আবার এক পাটি। কিন্তু রাগ করার বদলে পুলিশগুলো হেসে কুটোপুটি। যার জুতো চুরি গেছে তাকে আরেকজন বলছে, "তুই নাহয় এক পায়ে জুতো আরেক পায়ে প্লাষ্টিক বেঁধে চলে যাবি, আমি কি করবো? আমার তো দুটো জুতোয় কেটে কুচি করেছে।" বোঝা গেল সম্ভবত কোনো ছোট কুকুর বাচ্চার কাজ এটা। শেষে অনেক খুঁজে পাশের ক্যাম্পে পাওয়া গেলো অন্য জুতো। পুলিশ মানেই ত্রাস এটা জেনেই বড় হয়েছি। কিন্তু অত দশাসই চেহারার তিনজন লোক দারোগা হয়েও জুতো চুরির ঘটনায় এতটুকু উত্তেজিত না হয়ে পুরো ঘটনাটা এই ভাবে হেসে উড়িয়ে দিলো দেখে মনটা বেশ খুশি খুশি হয়ে গেলো।
এবার আমাদেরও যাওয়ার পালা। ব্যাগ গুছিয়ে লুচি-ঘুগনি আর রসগোল্লা দিয়ে ব্রেকফাস্ট সেরে বেরিয়ে পড়লাম। যাওয়ার আগে ওখানকার কর্মরত লোকেদের হাতে কিছু টাকা টিপস হিসেবে দিতে গিয়ে এক অদ্ভুত পরিস্থিতির সম্মুখীন হলাম। ঝরঝর করে কেয়ারটেকার ভদ্রলোক কেঁদে ফেললেন। কেনো কাঁদছেন জিজ্ঞেস করাতে বললেন, "তোমাদের থেকে কি টাকা নেবো, তোমরা এত ভালো ব্যবহার করেছো, এটাই যথেষ্ট। অনেকেই সেটুকুনিও করেনা।" কিছুতেই তিনি টাকা নিলেন না। মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে গেলো এই ভেবে যে কিছু মানুষের মন কতটা অসংবেদনশীল হয়ে গেছে! ইকোনমিক স্ট্যাটাস দেখে আমরা মানুষের সাথে কিরকম ব্যবহার করবো ঠিক করি। দুদিন খুব আনন্দে কাটলেও শেষবেলায় খানিকটা মন খারাপ নিয়ে বাড়ি ফেরার পথ ধরলাম। পেছনে পড়ে রইলো মৌসুনী আইসল্যান্ড, কিছু মন ভালো করা স্মৃতি, আর কিছু ভালো মনওলা মানুষ।